৩৫০ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, অফিস, ঘরবাড়িতে হামলা-অগ্নিসংযোগ

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় তিন শতাধিক হতাহত


১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:২৮

স্টাফ রিপোর্টার : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী দেশজুড়ে ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এসব সহিংসতায় জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ১১ দলীয় জোটের অন্য শরিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন অনেকেই। এর মধ্যে নারী ধর্ষণের মতো পৈচাশিক ঘটনার খবরও পাওয়া গেছে। ঘটনা যা ঘটেছে, তার খণ্ডাংশ এসেছে গণমাধ্যমে, অনেক ঘটনাই খবরের শিরোনাম হয়নি। অন্যদিকে বিভিন্ন পর্যবেক্ষক সংস্থাও কিছু ঘটনার চিত্র তুলে এনেছে।
জার্মানভিত্তিক সাংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের বাংলা সংস্করণে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের পরবর্তী দুই দিনের সহিংসতায় চারজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন তিন শতাধিক। উঠেছে ধর্ষণের অভিযোগও। ৩০টি জেলায় এসব সহিংসতার ঘটনা বিশ্লেষণ করে ডয়চে ভেলে দেখেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘাতের ঘটনা বেশি ঘটেছে। পাশাপাশি বিএনপির সঙ্গে জামায়াত ও এনসিপির সংঘাতের ঘটনাও কয়েকটি ক্ষেত্রে আছে। নোয়াখালীর হাতিয়ায় ধর্ষণের একটি অভিযোগ উঠলেও প্রশাসনের তরফ থেকে অস্বীকার করা হয়েছে। এখনো অভিযোগকারী নারীর স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তা প্রমাণিত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন-পরবর্তী দুই দিনে ৩০টি জেলায় দুই শতাধিক সহিংসতার ঘটনার কথা জানিয়েছে। তাদের তথ্যানুযায়ী নিহত হয়েছে তিনজন, আহত তিন শতাধিক। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক এজাজুল ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচন-পরবর্তী দুই দিনে ৩০টি জেলায় সহিংসতার ঘটনা ঘটে। সহিংসতায় মুন্সীগঞ্জ ও বাগেরহাটে দুই যুবক নিহত হন। আর ময়মনসিংহে নিহত হয় একটি শিশু। এছাড়া নোয়াখালীতে একটি ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নির্বাচন-পরবর্তী এসব সহিংসতায় ৩৫০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, অফিস, ঘরবাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।’ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন ১৫ ফেব্রুয়ারি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার ঘটনায় দলটির যারা সম্পৃক্ত হবে, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এরই মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
গত ১৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা পর্যন্ত বাগেরহাট, পটুয়াখালী, নড়াইল, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, নোয়াখালী, ঝালকাঠি, চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, ফেনী, নারায়ণগঞ্জ, সাতক্ষীরাসহ ৩০ জেলায় সংঘাতের খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। নোয়াখালীর হাতিয়া ও সেনবাগে এনসিপির সমর্থকদের বাড়িঘরে হামলা, মারধর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। গত শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত হাতিয়া উপজেলার চানন্দি ও নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নে এবং সেনবাগ পৌরসভা ও বীজবাগ ইউনিয়ন এলাকায় এসব ঘটনা ঘটে। ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া ও রাজাপুরে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে জামায়াতের কর্মী-সমর্থকদের বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। গত শুক্রবার ও শনিবারের এসব ঘটনায় স্থানীয় এক বিএনপি নেতাকে দল থেকে বহিষ্কারের কথা জানান দলটির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল। পটুয়াখালীর গলাচিপায় গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হাসান মামুনের সমর্থকদের সংঘর্ষে দুই নারীসহ ২০ জন আহত হয়েছেন। ফরিদপুরের সালথা ও বোয়ালমারী উপজেলায় বিএনপির লোকেরা জামায়াত নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায়, এতে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষ চলাকালে বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। কুষ্টিয়া সদরে বিএনপির দু’পক্ষের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও মারধর ঘটনায় তিনজন আহত হয়েছেন। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার রাতের এ ঘটনায় জেলা স্বেছাসেবক দলের যুগ্ম সম্পাদক আবদুস সালাম ও শহর স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব ইমতিয়াজ দিবসের পদ সাময়িক স্থগিত করেছে দলটি। ধানের শীষের বিপক্ষে কাজ করার অভিযোগে ময়মনসিংহের ফুলপুরে কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সহ-সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য আবুল বাশার আকন্দের ওপর হামলা চালিয়েছে বিএনপির নেতাকর্মীরা। ১৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে পৌরসভার বালিয়া মোড় এলাকায় দুই দফায় তার গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এতে অন্তত দুজন আহত হয়েছেন। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, নাটোরের বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর ও সিংড়ায় নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় ১৪ জন আহত হয়েছেন। রাঙ্গুনিয়ায় গত ১৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ইটভাটায় সন্ত্রাসীদের হামলা ও অগ্নিসংযোগে সাতজন আহত হয়েছেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া অভিযোগ করে বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন থেকে শনিবার পর্যন্ত বিএনপি ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হামলায় এনসিপির প্রায় এক হাজার নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। ১৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় রাজধানীর কল্যাণপুরে বেসরকারি হাসপাতাল ইবনে সিনায় চিকিৎসাধীন এনসিপির নেতাকর্মীদের দেখতে গিয়ে এ অভিযোগ করেন তিনি। আহতরা নির্বাচনের দিন নোয়াখালীর হাতিয়ায় বিএনপির নেতাকর্মীদের হামলায় গুরুতর আহত হন বলে দাবি করা হয়েছে। আসিফ মাহমুদ অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের শর্তে তাদের সমর্থন নিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। এ সময় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি দুপুরে রাজধানীর রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত নির্বাচন-পরবর্তী নানা ঘটনা নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম ভয়েস নেটওয়ার্ক। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামগ্রিকভাবে সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হলেও নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা সেই সাফল্যকে ম্লান করে দিয়েছে। সংগঠনটি জানায়, ফলাফল ঘোষণার পর দেশের প্রায় সব বিভাগে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এ পর্যন্ত ৪০টি জেলায় অন্তত ৭০টি সহিংসতার তথ্য পেয়েছে ভয়েস নেটওয়ার্ক। বাগেরহাট ও মুন্সীগঞ্জে দুজন নিহত হয়েছেন। নোয়াখালীতে নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দেওয়ার অভিযোগে এক নারী যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। দিনাজপুর, নাটোর, পঞ্চগড়, ফেনী, কুমিল্লা, পটুয়াখালী, বরিশাল, বরগুনাসহ বিভিন্ন জেলায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। সংগঠনটি বলেছে, এ ধরনের সহিংসতা সুষ্ঠু নির্বাচনের ইতিবাচক দিকগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ফলাফল ঘোষণার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত সহিংসতা, প্রাণহানি, রাজনৈতিক ও পূর্বশত্রুতায় হামলা, সংঘর্ষ, নারী নির্যাতন এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনায় নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। একই সঙ্গে সহিংসতা বন্ধে রাষ্ট্রের দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি সব রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। ১৬ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ দাবি জানিয়েছে এমএসএফ।