আটটি কারণে জামায়াতে ইসলামীর সরকার গঠনের সম্ভাবনা বেশি
১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫৮
সোনার বাংলা ডেস্ক : হাসিনা সরকারের পতনের পর গত ১৮ মাসে কল্পনাতীতভাবে জামায়াতে ইসলামীর প্রতি এদেশের মানুষের সমর্থন বেড়েছে। সাম্প্রতিক পরিচালিত বিভিন্ন জরিপে ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের কথা বলা হলেও এ উত্থান জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের বিজয়ের ইঙ্গিত বলে মনে করেন ব্রিটিশ সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী ডেভিড বার্গম্যান। গত ৮ ফেব্রুয়ারি দ্য ডেইলি স্টারে তিনি ‘Eight reasons that explain Jamaat’s rise’ অর্থাৎ জামায়াতের উত্থানের আটটি কারণ। এতে তিনি দেখিয়েছেন কোন আটটি কারণে সকল জরিপের ফলাফল পাল্টে দিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকার গঠন করার মতো আসন পেতে যাচ্ছে।
তিনি দাবি করেছেন, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে জনগণের এ সমর্থনকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।
তিনি লিখেছেন, আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকার সময়; বিশেষ করে শেষ বছরগুলোয়, ব্যাপক অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছে। অনেক নেতাকর্মীকে কারারুদ্ধ করে রাখা হয়েছিলো। প্রকাশ্যে কোনো তৎপরতা চালাতে দেয়া হয়নি। পরে উল্লেখ করলেও ভূমিকায় তিনি জামায়াত নেতাদের বিচারের নাটক সাজিয়ে ফাঁসিতে হত্যা করার কথা এবং দল নিষিদ্ধের কথা উল্লেখ করেননি।
তিনি উল্লেখ করেছেন, জেনারেল এরশাদের পতনের পর জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ১২ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি। এরপর তিনি আটটি কারণ উল্লেখ করেছেন। কারণো হলো-
১. ১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে বিরোধীপক্ষের অস্ত্র এখন আর কাজ করছে না। যদিও এখনো বিরোধীদের একটি অংশ এ বিষয়টিকে সামনে আনার ব্যর্থ প্রয়াস চালাচ্ছে। কিন্তু তরুণরা গভীরভাবে জামায়াতে ইসলামীকে বিচার করছে, বর্তমানে তারা কী করছে তার ভিত্তিতে। বার্গম্যান লিখেছেন, প্রথমত, ১৯৭১-এর দশকের ঘটনায় সাথে জড়িত থাকার (আওয়ামী আদালতের অভিযোগে অভিযুক্ত) জামায়াতের সিনিয়র নেতাদের আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকাকালীন দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। যে ঘটনার সাথে বর্তমান নেতৃত্বের সরাসরি কোনো যোগসূত্র ছিল না। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগের পতনের পর তাদের তৈরি করা জামায়াতবিরোধী বয়ান দুর্বল হয়ে গেছে। তৃতীয়ত, ক্রমবর্ধমান প্রভাবশালী তরুণরা ১৯৭১ সালকে টেনে এনে দেশের বর্তমান সময়ের শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করায় বিশ্বাসী নয়। তারা চায় চোখের সামনে এখন কারা দেশ ও জনগণের জন্য ইতিবাচক কাজ করছে।
২. বিএনপির বিপরীতে জামায়াতের সততার জন্য খ্যাতি
৫ আগস্টে হাসিনার পতনের পর বিএনপির অব্যাহত চাঁদাবাজি, দুর্নীতি এবং সন্ত্রাস এবং জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে অবস্থান। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, তবুও ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত অনেক চাঁদাবাজি নেটওয়ার্ক দ্রুত বিএনপি-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা দখল করা হয়। ভোটাররা বিশ্বাস করতে শুরু করে বিএনপি আওয়ামী লীগের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
জামায়াত তাদের কাছে আলাদা তাদের কেন্দ্র থেকে নিয়ে তৃণমূল পর্যায় কোথায় জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি দুর্নীতির অভিযোগ নেই।
৩. কল্যাণমূলক রাজনীতি
আওয়ামী লীগের পতনের পর শত শত মানুষ পরিবার-পরিজন ও স্বজন হারিয়েছে। শোক আক্রান্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছিলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। জামায়াত এই পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করার জন্য এবং যেখানে সম্ভব সরাসরি সহায়তা প্রদানের জন্য পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ নিয়েছে। তাদের তালিকা তৈরি করেছে- প্রতিটি শোকাহত পরিবারকে কমপক্ষে ১০০,০০০ টাকা (জামায়াতের সূত্রে জানা গেছে ২ লাখ) এবং আহতদের অনেককে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছিল, প্রায়ই হাসপাতালে পরিদর্শনের মাধ্যমে।
যদিও কিছু ক্ষেত্রে বিএনপির রাজনীতিবিদরা সাহায্য প্রদান করেছিলেন, তাদের প্রচেষ্টা ততটা ব্যাপক বা সমন্বিত ছিল না। জামায়াতের প্রতিক্রিয়া একটি সুশৃঙ্খল সংগঠন হিসেবে তাদের ভাবমর্যাদা এতে আরো উজ্জ্বল হয়েছে। এ ধরনের কল্যাণমূলক কাজে জামায়াতে ইসলামীর গণভিত্তি মজবুত হয়েছে।
৪. সাংগঠনিক শৃঙ্খলা
জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠিক শৃঙ্খলা বিজয়ের জন্য একটি ইতিবাচক অনুষঙ্গ। এতে সাংগঠনিক দিকে তারা অনেক বেশি শক্তিশালী সংগঠনে পরিণত হয়েছে। আওয়ামী লীগের পতনের পরপরই জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনের জন্য আন্তরিকভাবে প্রস্তুতি শুরু করেছিল। জামায়তে ইসলামীর অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক সুশৃঙ্খলায় প্রচার কাজ দ্রুত তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়েছে মূল প্রচারণার অনেক আগেই সম্পন্ন হয়। জামায়াতে ইসলামী ব্যাপকভাবে ভোটারদের মুখোমুখি হয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় ব্যাপকভাবে ঘরে ঘরে গিয়ে ব্যক্তিগত প্রচারণা এবং বড় বড় সমাবেশ করেছে। মিডিয়ায় তা প্রচারের ব্যবস্থা করেছে।
৫. একটি মধ্যপন্থী, নমনীয় অবস্থান উপস্থাপন
জামায়াতে ইসলামী তার মূলে একটি ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল। ইসলামের আলোকে বাংলাদেশে ইসলামী আইন প্রবর্তনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয়, দলটি ইচ্ছাকৃতভাবে আরও মধ্যপন্থী এবং মধ্যপন্থী ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। তার ধর্মীয় এজেন্ডাকে সামনে রাখার পরিবর্তে এটি ব্যবহারিক সংস্কার; বিশেষ করে দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং শাসনব্যবস্থার উন্নতির ওপর জোর দিয়েছে।
বার্গম্যান নতুন বাংলাদেশ গড়ার জামায়াতে ইসলামীর এ আহ্বান তুলে উল্লেখ করেছেন, উদাহরণ ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ‘প্রত্যাশার বাংলাদেশ’ শীর্ষক নীতি সম্মেলনে দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমানের দেওয়া একটি বক্তৃতা দ্বারা প্রদান করা হয়েছিল। উল্লেখযোগ্যভাবে, ভাষণে ধর্মের কোনো উল্লেখ ছিল না। পরিবর্তে মি. রহমান জামায়াতকে ‘মূলধারার মুসলিম গণতন্ত্রীদের প্রতিনিধিত্বকারী’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যারা ধর্মতাত্ত্বিক উচ্চাকাক্সক্ষার পরিবর্তে গণতান্ত্রিক বৈধতার ওপর জোর দেয়।
বার্গম্যান দাবি করেছেন, ভাষণটি আংশিকভাবে আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে। যার মধ্যে বিদেশি কূটনীতিকরাও অন্তর্ভুক্ত, এটি জামায়াতকে অভ্যন্তরীণভাবে কীভাবে উপস্থাপন করে তার একটি বৃহত্তর কৌশলগত পরিবর্তনকেও প্রতিফলিত করে। কেউ এই পুনর্গঠনকে সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাসযোগ্য মনে করুক বা না করুক, এটি নিঃসন্দেহে দলটিকে তার আবেদন প্রসারিত করতে সাহায্য করেছে, বিশেষ করে শহরাঞ্চলীয় এবং তরুণ ভোটারদের মধ্যে যারা অন্যথায় ধর্মীয় দলকে সমর্থন করার বিষয়ে সহজাতভাবে সতর্ক থাকতে পারেন।
৬. আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ না করা
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তও জামায়াতের পক্ষে ইতিবাচক। ঐতিহাসিকভাবে যখন আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে থাকে, তখন জামায়াত হয় স্বাধীনভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে অথবা বিএনপির সাথে জোট গঠন করে। এর ফলে আওয়ামী লীগ বিরোধী বেশিরভাগ ভোট বিএনপির বাক্সে পড়ে। বিএনপির সাথে জোট করলে জামায়াত সাধারণত সীমিত সংখ্যক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।
তবে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে গতিশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। যারা আগে আওয়ামী লীগের জয় ঠেকাতে বিএনপিকে সমর্থন করেছিলেন, তারা এখন জামায়াতকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে আরও স্বাধীন, এই চিন্তা ছাড়াই যে তাদের ভোট অজান্তেই আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে।
৭. ভারতবিরোধী মনোভাব
আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকাকালীন বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছিল। এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ ছিল, যার মধ্যে ছিল সীমান্ত হত্যা, বাংলাদেশিদের সম্পর্কে ভারতীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের উসকানিমূলক বক্তব্য এবং ভারত সরকার আওয়ামী লীগকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে এমন ধারণা। ২০২৪ সালে যখন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান, তখন ভারতীয় ‘আধিপত্য’-এর প্রতি জনগণের ক্ষোভ তীব্রতর হয়, অনেক মানুষ প্রকাশ্যে এ ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে, জামায়াতকে কিছু ভোটার বিএনপির তুলনায় ভারতীয় প্রভাব প্রতিরোধে আরও বিশ্বাসযোগ্য শক্তি হিসেবে দেখছে। বার্গম্যান লিখেছেন ভোটাররা মনে করেন, ভারতের প্রতি বিএনপি নমনীয়। এ কারণে ভারতবিরোধী ভোটারদের সমর্থন জামায়াত বিএনপির চেয়ে বেশি পাবে।
৮. ‘পরিবর্তনের’ দল হিসেবে জামায়াত
আওয়ামী লীগের পতনের পর পরিবর্তনের জন্য জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে- স্বৈরাচার, প্রতিষ্ঠিত দুর্নীতি এবং অনেকে যাকে দেশের ‘ক্লান্ত পুরাতন রাজনীতি’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায়, কিছু ভোটারের মতে, জামায়াতই (সরকার গঠন করলে) সম্ভবত মৈত্রী পুনরুজ্জীবনের সেই অনুভূতিকে আরও দৃঢ়ভাবে ধারণ করবে।
তাছাড়া জামায়াত জুলাইয়ের জাতীয় সনদের সংস্কার প্রস্তাবগুলির প্রতি বেশি উৎসাহী হয়ে অবস্থান নিয়েছে, যেখানে বিএনপি সাধারণত আরও সতর্ক এবং রক্ষণশীল অবস্থান গ্রহণ করেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাথে জামায়াতের সাম্প্রতিক জোট সম্ভবত সংস্কার ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাথে তাদের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করেছে, যা বিপ্লবকে বা পরিবর্তনকে অগ্রাধিকার দেয়া জনগোষ্ঠির সাথে জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্ক আরো সুসংহত করেছে।