শেরপুর-৩ আসনের জামায়াত প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের মৃত্যু ॥ নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা
৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:২৬
সোনার বাংলা ডেস্ক : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী শেরপুর জেলা শাখার সেক্রেটারি ও শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত প্রার্থী আলহাজ মো. নুরুজ্জামান বাদল (৫১) ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শেরপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা হাফিজুর রহমান। এছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে নুরুজ্জামান বাদলের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। জানা গেছে, মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে হঠাৎ শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন নুরুজ্জামান বাদল। তাৎক্ষণিক তাকে শ্রীবরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে দ্রুত ময়মনসিংহে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী আলহাজ মো. নুরুজ্জামান বাদলের মৃত্যুতে নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সকালে নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ এ তথ্য জানান।
ময়মনসিংহ নেওয়ার পথে রাত ২টার দিকে শহরের প্রবেশমুখ ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে তার অবস্থার অবনতি ঘটে এবং সেখানে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। পরিবারের পক্ষ থেকে মৃতের ভাই সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ওয়ারেন্ট অফিসার মো. মাসুদুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে দেওয়া একটি পোস্টে নুরুজ্জামান বাদলের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। পোস্টে বলা হয়, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী শেরপুর জেলা শাখার সেক্রেটারি ও শেরপুর-৩ সংসদীয় আসনে জামায়াত মনোনীত এমপি প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদল গত ৪ ফেব্রুয়ারি রাত ২টা ৩০ মিনিটে কিডনি রোগে হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
জানাজা ও দাফন : মরহুমের ১ম জানাজা দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে শেরপুর পৌর ঈদগাহ মাঠ ও বিকাল ৫টায় শ্রীবরদী সরকারি কলেজ মাঠে ২য় জানাজা শেষে শ্রীবরদী পৌর শহরের ১নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ পোড়াগড় গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি : নুরুজ্জামান বাদল ছিলেন শ্রীবরদী উপজেলার সকল মহলের এক পরিচিত নাম। ধর্ম-বর্ণ, জোয়ান-বৃদ্ধ সকলের কাছেই তিনি আপনজন। সততা, নৈতিকতা ও আদর্শিক রাজনীতিতে তার পদচারণা তাকে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। তিনি শ্রীবরদী উপজেলার সাবেক তাতীহাটী ইউনিয়ন, বর্তমানে শ্রীবরদী পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের পোড়াগড় গ্রামে এক সম্ভান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মরহুম মোহাম্মদ আলী একজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও শিক্ষানুরাগী ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রুকন এবং থানা সেক্রেটারি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। শ্রীবরদী সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন, তাদের মধ্যে তিনি একজন। প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্নে দূর-দূরান্তে ঘুরে ঘুরে কলেজের জন্য ছাত্র-ছাত্রী সংগ্রহ করে এ উপজেলায় শিক্ষার-আলো সম্প্রসারণে উনার অবদান অনস্বীকার্য। তার মাতা নুরজাহান বেগম। দাদা মরহুম হোসেন আলী মুন্সী। মরহুম হোসেন আলী মুন্সী অত্র এলাকার আধ্যাত্মিক মুসলিম ছিলেন। তার মাতৃলালয় এতিহ্যবাহী রানীশিমুল ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া গ্রামে। নানা হাজী আব্দুল গফুর-ও [ গফুর হাজী] ছিলেন একজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, রানীশিমুল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক জনপ্রিয় চেয়ারম্যান এবং কর্মজীবনে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। পারিবারিক ঐতিহ্যই তাকে রাজনীতি ও সমাজসেবার সাথে জড়িত করেছে।
শিক্ষাগত যোগ্যতা : তিনি শ্রীবরদীর ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শ্রীবরদী এ. পি. পি. আই. থেকে এসএসসি, শ্রীবরদী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরবর্তীতে শ্রীবরদী সরকারি কলেজ থেকে ব্যাচেলর অব আর্টস (বিএ) পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে গ্রেফতার হলে তিনি সেখানে আর পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। পরবর্তীতে শেরপুর সরকারি কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজ থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন এবং সব শেষে আইন বিষয়ে ‘এলএলবি’ ডিগ্রি সমাপ্ত করেছেন।
কর্মজীবন : ছাত্রজীবনেই তিনি অনুভব করেন যে, জনবহুল তাতীহাটীতে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন; যা অত্র এলাকার জনগণের দীর্ঘদিনের আকাক্সক্ষা। তাই শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করেই অনেক লোভনীয় চাকরি পরিত্যাগ করে স্কুল প্রতিষ্ঠায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন। অত্র এলাকার বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক অধ্যাপক মাজহারুল ইসলামের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘তাতীহাটী আইডিয়াল স্কুল’। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তার দক্ষ পরিচালনায় বর্তমানে ফলাফল বিবেচনায় এটি শ্রীবরদীর অন্যতম সেরা স্কুল। পাসের হার প্রায় শতভাগ। এছাড়া সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া অঙ্গনে এ স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা বিভিন্ন স্তরে প্রতিনিয়ত অর্জন করছে শ্রেষ্ঠত্ব।
তিনি ১৯৯৭ সালে শ্রীবরদী উপজেলা সদরের সাতানী শ্রীবরদী মহল্লার বাসিন্দা শ্রীবরদী এ পি পি আই এর শিক্ষক মরহুম মো. আবেদ হোসেনের দ্বিতীয় মেয়ে নাসরিন বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। প্রাণীবিদ্যায় মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনকারী নাসরিন বেগম রানীশিমুল ইউনিয়ন গার্লস স্কুলের শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত। এই দম্পতির এক পুত্র সন্তান রয়েছে।
রাজনৈতিক জীবন : ছাত্রজীবন থেকেই নুরুজ্জামান বাদল রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, শ্রীবরদী সরকারি কলেজের সভাপতি, শ্রীবরদী শহর শাখার সভাপতি ও ১৯৯৩-৯৪ সালে শ্রীবরদী উপজেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী ১৯৯৫-৯৬ সালে শেরপুর জেলা সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। ছাত্রজীবন শেষে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। ছিলেন শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের আমীর। দায়িত্ব পালন করেছেন জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও নায়েবে আমীরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে। ২০ দলীয় ঐক্যজোটে ছিলেন শেরপুর জেলার অন্যতম শীর্ষনেতা। মৃত্যুকালে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী শেরপুর জেলার সেক্রেটারির দায়িত্বে ছিলেন।
কারানির্যাতন : তিনি জীবদ্দশায় ৫ বার কারা নির্যাতনের শিকার হন। ১৯৯৩ সালের তাকে পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে শ্রীবরদী সরকারি কলেজে পরীক্ষার হল থেকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে একই মামলায় দ্বিতীয়বারের মতো কারাবরণ করেন। ১৪ দলীয় জোটের সময় তিনি ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তৃতীয়বারের মতো কারাবরণ করেন। পরবর্তীতে তিনি এ-মামলায় বেকসুর খালাস পান। ২০১৩ সালের রমজান মাসে তিনি অসুস্থ অবস্থায় বাড়ি থেকে গ্রেফতার হন। এরপরও ষড়যন্ত্র থেমে ছিল না। ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারির ঘটনার দিন তিনি ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলেও তাকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত দেখিয়ে দুটি মামলায় প্রধান আসামি করা হয়। ২০১৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রায় সকল মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়েই তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সর্বশেষ নির্বাচন শেষ করার ১৫ দিনের মাথায় তিনি ৮/১০টি মামলা মাথায় নিয়ে আত্মসমর্পণ করেন এবং ৬ মাস কারাবন্দী ছিলেন। মৃত্যুর শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের জন্য কাজ করে গেছেন।