নির্বাচন হলেও বহুঘোষিত মডেল হলো না
৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৪:৩৯
॥ মাহবুবুল হক ॥
আলহামদুলিল্লাহ। মহান আল্লাহর রহমতে জাতীয় নির্বাচন একদম এসে গেছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন। আমি লিখতে বসেছি জানুয়ারি মাসের শেষ তারিখে। সেদিক থেকে আর মাত্র ১১ দিন বাকি। কিন্তু সমস্যা হলো এ লেখাটি যেদিন প্রকাশিত হবে, তা হলো শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। মাত্র ৫ দিন পাঠকদের নজরে থাকবে। যখন নজরে আসবে, তখন আল্লাহর রহমতে হয়তো নির্বাচনের জন্য স্বচ্ছ, সুন্দর, স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করবে, নয়তো (আল্লাহ না করুন) নানা বিশৃঙ্খলার মধ্যে উত্তপ্ত থাকবে।
এখন পর্যন্ত দৃশ্যপটে যা আছে, তাতে মনে হয় আল্লাহর রহমতে জাতীয় নির্বাচনটা নানা বাধা-বিপত্তির মধ্যেও হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। ৩০ জানুয়ারি বিএনপি চেয়ারম্যান গণভোটের বিষয়ে (যা এ বছর বা এখন দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রের জন্য সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ) খুব সাধারণভাবে বলেছেন হ্যাঁ ভোটে সিল মারতে। যদিও তিনি উদাত্ত কণ্ঠে বলেননি, তবুও আমরা শেষমেশ তার কণ্ঠ থেকে এ শুভ বাণী শ্রবণ করে আশান্বিত হয়েছি। আশ্বাসে ও বিশ্বাসে উত্তপ্ত রাতটা কাটিয়েছি। হাজারো ঈমানদার মানুষ এ বিষয়ের ওপর সালাত আদায় করে মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জ্ঞাপন করেছে।
সত্য বা বাস্তব সব কথা এখন বলার সময় নয়। একসময় যাদের কাছ থেকে আমরা, দেশবাসী গণতন্ত্রের জন্য, জাতিসত্তা ও আত্মপরিচয়ের জন্য, জাতীয় ঐক্যের জন্য, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য বেশি আশা করেছিলাম, তারাই এ ১৬ মাসে যা ওলট-পালট করেছে, তা ছিল দেশ-জাতির জন্য নজিরবিহীন। তারা এখন যেভাবে ২৪-এর বিপ্লবকে বা বিপ্লবীদের ওয়েলকাম করছে, অন্তর্বর্তী সরকারকে যতটুকু সহযোগিতা করছে, দেশবাসীর কণ্ঠে কণ্ঠ মেলানোর জন্য কষ্টকর প্রয়াসে অবতীর্ণ হচ্ছে, তা যদি শুরু থেকেই করত, তাহলে দেশবাসী, বিপ্লবের অগ্রবর্তী দলসমূহ, অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক কষ্ট কম হতো। উপর্যুক্ত তিন গোষ্ঠীকে গত প্রায় ৫০০ দিনে অন্তত ৫০০ বার দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটাতে হয়েছে। স্মরণ করা যেতে পারে, বিপ্লবের সঙ্গে যেসব জাতীয় নেতা সংযুক্ত ছিলেন, তাদের মধ্যে অনেকেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন। পেরেশানি ও উৎকণ্ঠার আক্রমণে কেউ কেউ হয়তো ইন্তেকালও করেছেন। এটা ছিল বড় মানুষের খবর। শিশু-কিশোর, তরুণ ও যুবকদের কথা যদি আমরা হৃদয় দিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করি, তাহলে এখানে তা বর্ণনা করার কোনো অবকাশ নেই। শুধু এটুকু বলা যায়, তাদের স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে পায়ের তলে পিষে মারা হয়েছে। বিপ্লবীরা মূলত আশা করেছিল, একটা বিপ্লবী সরকার গঠিত হবে। সেই সরকার অন্তত পরবর্তী নির্বাচনের সময় পর্যন্ত অবস্থান করে দেশ ও জাতির জন্য যত স্বপ্ন তারা দেখেছে, সেসব সংস্কার করে নতুন নির্বাচন দিয়ে সরে দাঁড়াবে। গত নির্বাচন ছিল ৭ জানুয়ারি ২০২৪ সালে। সেই হিসাবে এর পরের নির্বাচন ছিল ২০২৯ সালের জানুয়ারি মাসে। সেভাবেই তারা পরিকল্পনা করছিল এ ৫ বছর তারা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব পাহারা দেবে। দেশ থেকে দুর্নীতি ও ফ্যাসিবাদ কাল-মহাকালের জন্য উচ্ছেদ করবে। যতরকম বৈষম্য আছে, তা দূর করবে। বাস্তবতার নিরিখে জাতিসত্তা ও আত্মপরিচয় নির্মাণ করবে, দেশে বিরাজিত সমূহ দুর্নাম দূর করবে। দেশ-বিদেশে শত্রু চিহ্নিতকরণ নয়, বন্ধুত্ব সৃষ্টির চেষ্টা করবে। জাতি-উপজাতি, ধর্ম-বর্ণ নিয়ে বিভেদ নয়, ঐক্য প্রতিষ্ঠা করবে। অর্থাৎ যেসব কারণে আমরা পিছিয়ে আছি, সেসব দূর করে সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করবে। কিন্তু এ স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে শুরু থেকেই বিএনপি বাধা দিয়েছে। তারা নানা অজুহাত এবং জুজুর ভয় দেখিয়ে বিপ্লবী সরকার গঠন করতে দেয়নি। তারা বিপ্লবকে সরাসরি সমর্থন করেনি। তাদের কিছু চিন্তাশীল ব্যক্তি, কর্মী ও নেতৃবৃন্দ তলে তলে বিপ্লবকে সমর্থন ও সহযোগিতা করলেও দলগতভাবে বিএনপি বিপ্লবকে কৌশলে পাশ কাটানোর একদিকে যেমন চেষ্টা করেছে; অপরদিকে কেউ কেউ এ পরিবর্তনের সাথে সংযুক্তও থেকেছে এবং কেউ কেউ অস্বীকার করেছে। যারা অস্বীকার করেছে, তারাই বিপ্লবী সরকার গঠনে বাধা সৃষ্টি করে নিয়মতান্ত্রিক সরকার গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিল এবং সফলকামও হয়েছে। সুতরাং দেখা যায়, ২০২৪-এর বিপ্লবকে শুরুতেই নস্যাৎ করে দিয়েছে বিএনপি। যেমন বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে শুরু থেকেই নস্যাৎ করে দিয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগ। স্বাধীনতার চেতনা সেখানেই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং ফ্যাসিবাদের সূচনা হয়েছিল তখন থেকেই। পরবর্তীতে যা ছিল শুধু ফ্যাসিবাদের স্তর থেকে আরেক স্তরে উন্নীত হওয়া।
বিএনপি শুধু বিপ্লবকে অস্বীকার করে বসে থাকেনি; তারা সবকিছুকে অস্বীকার করে তাৎক্ষণিক নির্বাচন অনুষ্ঠান করার দাবি জানিয়েছে। এ দাবিটা ছিল মূলত পতিত সরকারের পার্শ্ববর্তী দেশের এবং সেক্যুলার বিশ্বের সরকারপ্রধানদের এই তিন উৎসই বিএনপিকে শুধু উপদেশ, পরামর্শ ও আর্থিক সহযোগিতা দিয়েই থেমে থাকেনি; পতিত সরকারের সর্বস্তরে বিএনপিকে সরাসরি প্রতিষ্ঠা করেছে। সরকারের ভেতরে-বাইরে যেখানে যেখানে পতিত সরকারের নেতা ও কর্মীগণের অবস্থান এবং প্রতিষ্ঠা ছিল সেখানে রাতারাতি বিএনপির অবস্থান ও প্রতিষ্ঠা নিশ্চিতকরণ করা হয়েছে। তাদের কথিত নির্বাচনের দাবি উত্থাপনের পূর্বের বিএনপি আসলে ক্ষমতায় চলে গেছে। সত্যিকার অর্থে গত ১৬ মাস থেকে বিএনপি ক্ষমতায় আছে। এর সাদামাটা ব্যাখ্যা হলো- বিএনপি ক্ষমতায় আছে মানে পতিত সরকার ক্ষমতায় আছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ক্ষমতায় আছে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সেক্যুলার বিশ্ব আছে।
বিএনপি গত ১৬ বছর পতিত সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে যত স্বপ্ন উত্থাপন করেছিল, যত পরিকল্পনা জনগণের সামনে তুলে ধরেছিল এবং যত ওয়াদা ও শপথ ঘোষণা করেছিল, তার সবই তারা বিপ্লবের পর নাকচ করে দিয়েছে। নিজেদের ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং জুলুম-নির্যাতন সব তারা ভুলে যাওয়ার বা ভুলে থাকার প্রত্যক্ষ প্রমাণ দিয়েছে।
ক্ষমতা ও দুর্নীতির মধ্যেই তারা নাক ডুবিয়ে অবস্থান করেছে বা অবগাহন করেছে। গোটা বিশ্ব সেসব অবলোকন করেছে। কিন্তু কেউ তেমন প্রতিবাদ করেনি। কারণ তথাকথিত গণতন্ত্রের জন্য বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ সেক্যুলার দল বরাবরের মতো প্রতিষ্ঠা থাকা দরকার।
এ মুহূর্তে পর্দার অন্তরালে কী হচ্ছে বা কী হতে যাচ্ছে আমরা জানি না। আমরা শুধু এটুকু উপলব্ধি করছি, সেসব কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ বলে ইলেকশন কমিশন পূর্বাহ্নেই ঘোষণা করেছে সেসব কেন্দ্র ঝুঁকিহীন করার দায়িত্ব সরকারের। সরকার সেটা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছে কিনা, আমাদের জানা নেই। তবে শঙ্কা হচ্ছেÑ পুলিশ ও আনসার বাহিনী সরকারকে পূর্বের মতো সহযোগিতা করছে না। পতিত সরকারকে পুলিশ বাহিনী যথেচ্ছভাবে সহযোগিতা করেছে। তারা সরকারের পেটোয়া বাহিনীর দায়িত্ব পালন করেছে। এসব কারণে বিপ্লবের পর দেশের সব পুলিশ চাকরিতে ফিরে আসেনি। এখানে অনেক গ্যাপ ছিল। বলা হয়েছিল, অন্তত ৫০ হাজার পুলিশ নিয়োগ করা হবে। কিছু নিয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু সেখানেও নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ বাহিনী শক্তিশালী করার জন্য দেশপ্রেমিক যোগ্য নাগরিক পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে আংশিকভাবে হলেও ব্যর্থ হয়েছে। অনেকেই পরামর্শ দিয়েছিলেন মাদরাসার যুবকদের এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়ার জন্য। কিন্তু সেই পরামর্শ ধোপে টেকেনি। সুতরাং আইনশৃঙ্খলা যথাযথভাবে রক্ষা করা নাও হতে পারে। এক্ষেত্রে দুর্বলতা বজায় রেখে নানা চাপে নির্বাচনটা আমাদের ১২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এক্ষেত্রে আমাদের পরামর্শ হলো, শুধু পূর্বঘোষিত ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র নয়, যেসব কেন্দ্রে ঝুঁকি প্রতিষ্ঠা করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে, সেসব কেন্দ্র প্রমাণসাপেক্ষে নির্বাচন আপাতত স্থগিত করে পরবর্তীতে একটা উপর্যুক্ত সময়ে নির্বাচন করা যেতে পারে। এখনো সময় আছে, নির্বাচন কমিশন বিষয়টি পরিষ্কার করে বলতে পারে, যেখানে ঝুঁকি সৃষ্টি করা হবে, সেই কেন্দ্রটি সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করা হবে। তাতে নির্বাচনের সাথে যারা জড়িত আছেন, তারা সতর্ক ও সাবধান হবেন বলে আমাদের বিশ্বাস। শুধু সরকার, শুধু নির্বাচন কমিশন, শুধু রাজনৈতিক দল, শুধু নির্বাচনের প্রার্থীর ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করা যাবে না। একটা সুষ্ঠু, সুন্দর, আইনানুগ, নির্ভেজাল, পরিচ্ছন্ন, স্পষ্ট নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ভোটার এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পূর্ণ সচেতন ও সক্রিয়ভাবে সজাগ থাকতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। এলাকার দায়িত্ব এলাকার জনগণের- সরকারকে এ স্লোগান নতুন করে ধরিয়ে দিতে হবে।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে প্রায় প্রতি এলাকায় ঝগড়া-ঝাঁটি, মারামারি, খুন-জখম ইত্যাদি চলছে। ডিকশনারিতে নেই এমন শব্দাবলি নিয়েও প্রচণ্ড গালিগালাজ চলছে। সম্ভ্রান্ত ও সুধীজন প্রথমদিকে গালিগালাজকে সহ্য করার চেষ্টা করেছেন। এখন ভদ্র-অভদ্র, ভালো-খারাপ সবাই মিলে ঝগড়া-ঝাঁটি ও গালিগালাজ করছেন। আমরা দেখছি, নির্বাচনের জন্য লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়নি। বাস্তবে যারা ক্ষমতায় আছেন, সেই বিএনপির সন্ত্রাসীরা যা কিছু করে বেড়াচ্ছে। এ ব্যাপারে আমাদের পরামর্শ ছিল নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সব এলাকার সন্ত্রাসীদের মেহমান করে ধরে রাখার জন্য। কিন্তু এ পরামর্শ সরকারিভাবে কেন নেয়া হলো না, সে বিষয়ে আমরা পজিটিভ ওয়েতে আন্দাজ করতে পারছি না।
আমাদের বিশ্বাস, উপর্যুক্ত দুটি বিষয়ে সরকার ও ইলেকশন কমিশন যদি একতাবদ্ধ হয়ে এগিয়ে আসে, তাহলে উদ্বিগ্নতা, পেরেশানি ও উৎকণ্ঠার বিষয়টি কমে আসবে। দুনিয়ার কোথাও এসব নেগেটিভ বিষয় নেই, সে কথা ভেবে আমাদের লাভ হবে না। আমরা নানা কারণে অসভ্য হয়ে গেছি, এ কথাটা সরলভাবে মেনে নিয়েই শক্ত ভূমিকা আমাদের পালন করতে হবে। নির্মমভাবে অসভ্যতাকে দূর করার প্রকৃষ্ট উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে।
এবারের নির্বাচনে সর্বোচ্চ নিকৃষ্ট যে বিষয়টি দেশের চিন্তাশীল বয়স্ক মানুষকে চরমভাবে ভাবিত করেছে, তা হলো অযাচিতভাবে নারীদের ওপর পৈশাচিকভাবে অত্যাচার ও নির্যাতন চাপিয়ে দেয়া। দু-চার জায়গায় ভুলক্রমে এসব হচ্ছে বলে কথাটা আমরা লেখার শেষে এসে বলছি না। সারা দেশে অতীতের যেকোনো নির্বাচনে নারীদের ওপর এমন অন্যায়ভাবে জুলুম-নির্যাতন প্রয়োগ বা বাস্তবায়ন করা হয়নি। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিষয় হলে বিষয়টি আমরা সামনে আনতাম না।
আমরা একদিকে নারীদের ক্ষমতায়নের কথা বলছি। শুধু স্বাধীনতা নয়। কিন্তু বাস্তবে আমরা জাতীয় নির্বাচনকালে দেখছি যে, নির্বাচনের প্রার্থী, সঙ্গী-সাথী এবং ইলেকশনের কাজে সম্পৃক্ত হয়েছেন বা আছেন, তারা কোনো না কোনোভাবে নিগ্রহ ভোগ করছেন। বিষয়টি ফিরে একটু দেখা যাক।
মায়ের জাতি নির্বাচনের সময় পূর্বে মা-চাচি, খালা-মামি বলে ভক্তি ও শ্রদ্ধাসহ কদমবুচি পেত। উপঢৌকন হিসেবে পান-সুপারি, সাদাপাতা বা জর্দা পেত। সবাই পেত এমন কথা বলছি না বা এ উপঢৌকনকে কেউ ঘুষ বা এ ধরনের কোনো কিছু মনে করত না। বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গায় মুরুব্বিদের সাথে দেখা করার সময় এ ধরনের উপহার রেওয়াজ হিসেবে প্রচলিত ছিল। পান খেতে খেতে মুরুব্বিদের সাথে নির্বাচন সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা হতো। মুরুব্বিরা সাধারণত ভোটকেন্দ্রে যেতে চাইতেন না। এর ওপর যে বিষয়টি ছিল গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো বোরকার অভাব। বোরকা ছাড়া কোনো মুরুব্বি মহিলা ঘরের বাইরের যেতে চাইতেন না। উঠান বৈঠকে সেই সমস্যার একটা সমাধান তৈরি করা হতো।
জীবন সঙ্গিনীরা এত সহজে ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হতেন না। জীবনসঙ্গী অনেক অনুরোধ-উপরোধ করে বা মুরুব্বিদের সহযোগিতা নিয়ে স্ত্রীদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসার কষ্টকর প্রয়াস পেতেন। এক্ষেত্রে জীবনসঙ্গিনী নিরাপদ জীবনসঙ্গীর কাছ থেকে আবদার-আহ্লাদ করে কিছু না কিছু আদায় করত। অন্তত ওড়না, চাদর বা বোরকা আদায় না করে ছাড়ত না।
সঙ্গিনী সহোদররা বড় হোক, ছোট হোক তসবিহ, স্নো, ক্রিম, স্যান্ডেল, আলতা, ফিতা, কাঁচের চুড়ি, ক্লিপ, সেপটিপিন, সুরমা, কাজল, পাউডারসহ যার যার সঙ্গতি অনুযায়ী কিছু না কিছু তো পেতই। জীবনসঙ্গী এ বিষয়ে অবহেলা বা গড়িমসি করলেও জীবনসঙ্গিনী অভিমান করে বলত, যদি কিছু একটা না পাই, তাহলে আমরা ভোটকেন্দ্রে যাব না। তোমাদের বন্ধু বা আত্মীয়কে ভোট দেব না।
নির্বাচনের সময় কি একটা জান্নাতি পরিবেশ ছিল গাঁয়ে-গাঁয়ে, পাড়ায়-পাড়ায়, মহল্লায়-মহল্লায়। আবার এসব নিয়ে নানা ধরনের সমস্যাও সৃষ্টি হতো। রাগ-অনুরাগ, মান-অভিমানের কিছু কথা কাটাকাটি ও ঝগড়া-বিবাদও হতো।
তখন নারীদের ভোটও কম ছিল। এখন সে জায়গায় জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। সে কারণে ভোটার সংখ্যাও সমান-সমান। পূর্বে নারীরা প্রার্থীও হতো না। ভোটের ক্যাম্পেইনও করত না। তারা শুধু নানা চাপে পড়ে ভোট দেয়ার জন্য ভোটকেন্দ্রে যেত। এখন তো প্রার্থীও অনেক। নারীরাও ভোট ক্যাম্পেইন করছেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঘরের বাইরে অবস্থান করে ভোটযুদ্ধে অংশগ্রহণ করছেন। এটা তাদের সাংবিধানিক অধিকার এবং সাংবিধানির দায়িত্ব ও কর্তব্য। বহু লড়াই করে নারীরা এ অধিকার অর্জন করেছেন। কিন্তু সামাজিক ও পারিবারিক নানা কারণে নারীরা হয়তো ৫০ ভাগের জায়গায় ১০ ভাগও অধিকার ও কর্তব্য পালন করতে পারছেন না। না পারাটা এক বিষয়। সমাজ সুস্থভাবে বিষয়টিকে দেখছেন না, সেটা আরেক বিষয়।
এবার যে ঘটনা ঘটছে, তা নির্মম ও নিষ্ঠুর। এখন সেই নারীরা মহল্লায় মহল্লায় হরদম মার খাচ্ছে, লাথি খাচ্ছে, তাদের শরীর থেকে হিজাব-নিকাব খুলে ফেলা হচ্ছে। গায়ের আবরণ খুলে ফেলা হচ্ছে, টাকা-পয়সা, মোবাইল ছিনতাই করছে। সবাই মিলে এ কাণ্ড না করলেও দু-চারজন যুবক এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করছে। অন্যরা দূরে দাঁড়িয়ে হা করে দেখছে। মনে হচ্ছে, নতুন এক ইলেকশন সার্কাস চলছে। এতো যেন এক ইলেকশন বিনোদন। এ বিষয়ে সরকার, ইসি বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চুপচাপ।
নারীরা মানুষ। তাদের যে মৌলিক অধিকার হরণ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে কারো কোনো উৎকণ্ঠা পরিদৃষ্ট হচ্ছে না। নারীর আওয়াজ কোনো কর্ণকুহরে পৌঁছাচ্ছে না। বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে অনেকে মন্তব্য করছেন।
মোদ্দাকথা, এবারের নির্বাচনে নারী অধিকার সর্বোতভাবে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে- এটাই সবচেয়ে দুঃসহ, দুর্বহ ও নিকৃষ্ট অবস্থান। এ বিষয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট সকলের আশু দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
আল্লাহ না করুন! নারীদের সাংবিধানিক অধিকার এভাবে ক্ষুণ্ন হতে থাকলে অর্থাৎ তাদের ইজ্জত, সম্মান ও মর্যাদা ধুলায় লুণ্ঠিত হতে থাকলে এখনকার অল্প কয়েকদিনের মধ্যে কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেও যেতে পারে। এ বিষয়ে আমাদের সর্বোচ্চ সতর্কতা ও সাবধানতা অবলম্বন করা বিশেষ জরুরি মনে করছি।
শুরু থেকে মাত্র কয়দিন পূর্ব পর্যন্ত ইসি, সরকার ও সরকারি যন্ত্রকে যত সক্রিয় আমরা দেখেছি; এখন তা আমাদের নজরে আসছে না। তারপরও আমরা আল্লাহ ভরসা করছি। আমরা গভীর আস্থা ও বিশ্বাসের সাথে অনুভব করছি, ইনশাআল্লাহ নির্বাচন ও গণভোট মধ্যম অবস্থানের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়ে যাবে। ফি আমানিল্লাহ।