নির্বাচনের ফলাফল যেন জাতীয় ঐক্যকে বিভাজিত না করে
৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৪:৩৩
॥ সরদার আবদুর রহমান ॥
বাংলাদেশের ইতিহাসের এক বিপুল ও বিস্তৃত দিগন্তজুড়ে রয়েছে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই ও সংগ্রাম। এটি শুরু হয়েছিল পাকিস্তানি শাসকদের; বিশেষত সামরিক সরকারগুলোর কবল থেকে শাসনক্ষমতার চাবি জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টার মাধ্যমে। পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এ আন্দোলনের গতিবেগ ও পরিধি কোনো অংশে কম ছিল না। বিশেষ করে ’৭২-’৭৫-এর বাকশাল, আশির দশকের স্বৈরশাসনের পুরোটাজুড়ে এবং ২০০৮-২০২৪-এর আওয়ামী লীগ মহাজোটের দীর্ঘ সময়জুড়ে লাগাতার আন্দোলন করতে হয়েছে দেশবাসীকে।
হাসিনা রেজিমে পরিস্থিতি তো এমন দাঁড়িয়েছিল যে, অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙে কেবল গণতন্ত্রই নয়, মানবাধিকার ও মানবিকতার রেশটুকুও মুছে যাওয়ার উপক্রম হয়। অতঃপর চব্বিশের ঘূর্ণিবায়ু সেই দুঃসহ অবস্থার অবসান ঘটিয়ে স্বস্তির আবহ তৈরি হয়। নতুন করে এক ঐতিহাসিক নবযাত্রার সূচনা হয়। আর এই যাত্রার পটভূমিতে ছিল ইস্পাত দৃঢ় জাতীয় ঐক্য। আর এই ঐক্যের ভিত্তি কী ছিল? সেই ভিত্তি কি অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে? না, বরং সেটি একটি স্থায়ী বুনিয়াদ হিসেবে থেকে যাওয়ার তাগিদ দিচ্ছে। এই ঐক্যের ভিত্তি ছিল প্রতিবেশী দেশের আধিপত্য, দাদাগিরি এবং শোষণ-লুণ্ঠনের একচেটিয়া দাপটের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াইয়ে আকাক্সক্ষাজনিত তাড়না।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতেই ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটেছে। তার মানে এই নয় যে, এই ঐক্যের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। না, সেটি আরো মজবুত করার ইঙ্গিত সর্বত্র দেখা দিয়েছে। নির্বাচনের পর গঠিত সরকারের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার দাবিদার হলো সেই সরকারকে ফ্যাসিবাদী চরিত্র ধারণ করা থেকে রক্ষা করা। পাশাপাশি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অটুট ও শক্তিশালী রাখার ক্ষেত্রে অনমনীয় থাকা। অন্য যা কিছু নিয়ে বিরোধ ও মতভেদ থাকুক না কেন- সার্বভৌমত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় না দেয়া।
বাংলাদেশের মানুষ এ কথা এমনিতেই জানতো যে, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের অস্তিত্বকে ভারতের কাছে বর্গা দিয়ে রেখেছে। কিন্তু তার পালিয়ে সেই ভারতের কাছে আশ্রয় নেয়া এবং সেখানে বসে বাংলাদেশের ভেতরে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার মধ্য দিয়ে সেটি হাতে নাতে প্রমাণ হয়েছে।
নির্বাচন-পরবর্তী ঐক্য
নির্বাচন মানেই প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এর মধ্য নিয়ে জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচিত হবেন। একজন প্রতিনিধি একটি নির্দিষ্ট দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হলেও তিনি হয়ে যান তার নির্দিষ্ট এলাকার সকল মানুষের প্রতিনিধি। সংসদে তাঁরা সকলেই সমমানের সুযোগ-সুবিধা লাভ করবেন। কেবল একজন সংসদ সদস্য হিসেবে কেউ কারো ওপর প্রাধান্য লাভ করবেন না। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রগুলো কেবল সংসদ নয়, যে সকল স্থানে ও স্তরে উন্মুক্ত ভোটের প্রক্রিয়া অনুসরণের বিধান আছে, তার সবগুলোতেই এ বিধিবিধান অনুসরণ অব্যাহত রাখতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ভারত সবসময়ের জন্য কৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজনকে। আর এটি কার্যকর রাখার জন্য হেন হীনপন্থা ছিল না, যা তারা ব্যবহার করেনি। তাদের সর্বশেষ অস্ত্র হিসেবে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক জোটকে ছিন্নভিন্ন করতে একটি দলের শীর্ষনেতৃবৃন্দকে বিচারের নামে প্রহসন করে হত্যা করে। এখন এই হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি ভুলিয়ে দিতেও নয়াকৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, বর্তমান প্রেক্ষাপটে জাতি একটি সংবেদনশীল সময় অতিক্রম করছে। জুলাইয়ের পক্ষের সকল শক্তির মধ্যে সুপরিকল্পিতভাবে বিভাজন সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশি-বিদেশি নানা এজেন্ট ও চক্র সক্রিয়ভাবে কাজ করছে বলে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করা যাচ্ছে। বিভ্রান্তি ছড়ানো, পারস্পরিক অবিশ্বাস তৈরি এবং গণআকাক্সক্ষাকে দুর্বল করার এ অপচেষ্টা জাতীয় স্বার্থের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের একটি অংশের কথাবার্তায় এমন উদ্বেগ প্রকাশ পাচ্ছে। বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করে জাতি যখন বহুল কাক্সিক্ষত জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন একটি মহল সুপরিকল্পিতভাবে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জুলাইয়ের শক্তির মধ্যে বিভাজন সৃষ্টির চেষ্টা করছে। জুলাইয়ের আকাক্সক্ষা ছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সকল পক্ষের ঐক্যবদ্ধ থাকা। রাজনৈতিক বৈচিত্র্যের কারণে দলগুলোর মধ্যে ভিন্নমত থাকা গণতন্ত্রের অন্যতম সৌন্দর্য হলেও মৌলিক জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও বিভাজন তৈরি করা জাতির জন্য সুখকর কোনো বিষয় নয়। জুলাই আকাক্সক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
শঙ্কার বিষয় হলো, ইতোমধ্যে জুলাইয়ের শক্তির মধ্যে বিভাজনের সুযোগ নিয়ে দেশে পরিকল্পিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে। জুলাইযোদ্ধা শহীদ শরীফ ওসমান হাদিকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলিবর্ষণসহ জুলাইযোদ্ধাদের টার্গেট করে হুমকি প্রদান, প্রকাশ্য দিবালোকে মানুষ হত্যা এবং ভারত থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টিভি-টকশোতে পতিত ফ্যাসিস্ট শক্তির আস্ফালন সামগ্রিক পরিস্থিতিতে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। এই সন্ত্রাসী দৌরাত্ম্য দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে তা আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে।
ভারতের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন
বরাবরের মতো এবারেও বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারতের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তারা তাদের অনুগত দলকে বাংলাদেশের শাসনক্ষমতায় দেখতে পছন্দ করে। আর তাদের পছন্দ যে ইসলামপন্থিরা হবে না, সেটি একবাক্যেই বলা যায়। তবে তাদের পছন্দের বিকল্পও যে আছে সেটি লুকোছাপার কিছু নেই।
এই মানসিকতার সাম্প্রতিক প্রকাশ হলো ভারতের সাবেক কূটনীতিক হর্ষবর্ধন শ্রীংলার একটি বক্তব্য। তিনি এবারের নির্বাচনে অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘কেউ তাদের আগে (সম্মুখভাগে) নিয়ে আসছে। তারপরও নির্বাচনে অনিয়ম হলেই তারা (ক্ষমতায়) আসতে পারবে। নয়তো আসা অসম্ভব।’ ভারতের সাবেক এই কূটনীতিক বলেন, ‘ভারতের পক্ষ থেকে দেয়া বিবৃতি আপনারা দেখেছেন। আমরা বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন চাই, যেখানে সব দল অংশগ্রহণ করতে পারবে। তবে তেমন পরিস্থিতি আমি দেখিনি। নির্বাচন হবে কি না, সেটিও জানি না। সেখানে নিরাপত্তার উদ্বেগ রয়েছে। আর নির্বাচন হলেও কী পরিস্থিতিতে হবে, সেটিও দেখতে হবে। অনেক অনিশ্চয়তা রয়েছে, প্রশ্ন রয়েছে।’ (দৈনিক আমাদের সময়, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬)।
উল্লেখ্য, এ ব্যক্তি শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তার এ কথায় বোঝা যাচ্ছে নির্বাচন নিয়ে ভারত অলরেডি মাঠের পরিস্থিতি বুঝতে পারছে এবং আগে থেকেই পরিকল্পিত ন্যারেটিভ তৈরি করছে। যাতে জামায়াত জিতলে ‘নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে’ এমন কথা বলে প্রোপাগান্ডা চালাতে পারবে। তারা এটি ভারতীয় মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচার করবে। এর আগে তারা শারীরিকভাবে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের নির্বাচনকে নিজেদের পছন্দের দলকে ক্ষমতায় নিয়ে আসতে থাকে। এখন সেই পরিস্থিতি না থাকায় আগাম ‘বয়ান’ তৈরি করে রাখছে।
আওয়ামী বয়ান ছাড়তে হবে
বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যে যত যাই করুন, ভারত-সমর্থিত আওয়ামী বয়ান ও কৌশল অবলম্বন করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবে না। এই উপলব্ধি যত দ্রুত হবে, ততই মঙ্গল।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কোন পথে এবং কোন ধারায় অগ্রসর হওয়া উচিত, তার একটা পথনির্দেশিকা পরপর অনুষ্ঠিত দুটি নিরীহ অথচ গুরুগম্ভীর বৃহদাকার জনসমাবেশ থেকে পাওয়া গেছে। এর একটি ছিল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শরীফ ওসমান হাদির জানাযা। আরেকটি ছিল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বেগম খালেদা জিয়ার জানাযা।
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এই দুটি জানাযা নীরবে এবং সরবে এই রায় জানিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কী হওয়া উচিত। আর জনগণের ঐক্যবদ্ধতাও এর মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে।
আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে প্রধান দুটি জোট গঠিত হয়েছে, মোটাদাগে এই দুটি জোটই বলতে গেলে জাতীয় ঐক্য ও সংহতির প্রধান প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে। তারা পরস্পরের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্যবদ্ধতার প্রতীক হয়ে উঠবে বলে জাতি আশা করে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি ন্যূনতম জাতীয় সমঝোতা প্রদর্শিত না হয়, তাহলে পরিস্থিতির সুযোগ নেয়ার জন্য ওত পেতে আছে পলাতক শক্তি। তা নির্বাচন বানচাল করার জন্য হোক অথবা সরকার গঠনের ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করে হোক- তারা ফণা তুলে রেখেছে।
জাতীয় ঐক্যের মূল ইস্যুগুলো খুব বিস্তৃত নয়। এগুলো হতে পারে এরকম :
১. প্রতিবেশী দেশের সাথে সম্পর্কের মাত্রা নিরূপণ,
২. ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অবস্থান নির্ণয়ের ভিত্তি নির্ধারণ,
৩. ভূখণ্ডগত ও সীমান্তের নিরাপত্তা নীতিনির্ধারণ এবং
৪. প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বাংলাদেশের একান্ত নিজস্ব মডেলে সজ্জিত করা।
সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো ছাড় নেই
এখনকার যুবক ও তরুণদের চোখের ভাষা বুঝতে হবে। তারা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো ছাড় দিতে রাজি হবে না। বিশ্লেষকরা এ কথা বলে আসছেন যে, কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রদের নানাভাবে বৃহত্তর আন্দোলন থেকে বিরত রাখার জন্য সরকারি এজেন্সিগুলো তাদের প্রলোভন দেখায়, তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালায়। কিন্তু তারপরও তারা লক্ষ্য অর্জনে ইস্পাতকঠিন দৃঢ় ঐক্য বজায় রাখে। একপর্যায়ে ছাত্রদের আন্দোলনে দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল এবং জনগণ সম্পৃক্ত হয়। ফলে সরকারের পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। আন্দোলনের মাধ্যমে ছাত্রদের মধ্যে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে উঠেছিল এবং শেষ পর্যন্ত তা বহাল ছিল বলেই দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এর মাধ্যমে আবারো প্রমাণ হয়, যে কোনো লক্ষ্য অর্জনের জন্য জনগণের বৃহত্তর ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। ঐক্যবদ্ধ জাতি কখনোই পরাজিত বা লক্ষ্যচুত হয় না। একটি দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার জন্যও জনগণের মধ্যে সুদৃঢ় ঐক্যের বন্ধন গড়ে তোলা একান্ত প্রয়োজন।
পর্যবেক্ষকদের অভিমত, বর্তমান সময়ে জাতীয় ঐক্যই বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির প্রধান শর্ত। রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও নানামুখী ষড়যন্ত্রের এ সংবেদনশীল প্রেক্ষাপটে জাতীয় ঐক্য এখন কেবল একটি রাজনৈতিক আদর্শ নয়, এটি জাতির অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জুলাই বিপ্লবের পর দেশজুড়ে যে ঐক্যের চেতনা সৃষ্টি হয়েছিল, তা জনগণের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত আশার প্রতিফলন ছিল। আশা ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক, সুশাসিত ও স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন। কিন্তু এই চেতনা ক্রমে ম্লান হয়ে গেলে সেই বিপ্লবের অর্থই হারিয়ে যাবে। ঐক্য কেবল রাজনৈতিক জোটের সমীকরণ নয়; এটি নৈতিক শক্তি, জাতীয় আত্মবিশ্বাসের প্রতীক, যা জাতিকে নতুন পথে এগিয়ে নিতে পারে। তাই এ ঐক্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
এটিও সত্য যে, দেশ যাতে গণতান্ত্রিক অবস্থায় ফিরে আসতে না পারে, সেজন্য বিভিন্ন জায়গায় ষড়যন্ত্র চলছে। ষড়যন্ত্র চলছে আগামী জাতীয় নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু না হয়, সেজন্যও। সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পরিকল্পনা করতে হবে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা যাতে বাস্তবায়ন না হয়, ভণ্ডুল হয়ে যায়Ñ সেজন্য ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে পতিত স্বৈরাচারের দোসররা। সকল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থেকে এসব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে হবে।
একমাত্র বিকল্প ‘ঐক্যবদ্ধতা’
ভারতের এজেন্ডা যেখানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থাকে বিভাজিত করা, তাহলে এর বিপরীত পদক্ষেপ নিশ্চয়ই হওয়া উচিত ‘ঐক্যবদ্ধতা’। চলমান নির্বাচনী পরিস্থিতিতে কিছু অনাকাক্সিক্ষত অবস্থার উদ্ভব হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে এর বাইরে একান্ত কাম্য হওয়া উচিত হবে জাতীয় ঐক্য ধরে রাখার মতো মানসিক প্রস্তুতি থাকা। কেবল গণতন্ত্রকে বিকশিত করতে এবং একে স্থায়ী রূপ দিতে হলে কাম্য বিষয় হবে নির্বাচনের ফলাফল যেন জাতীয় ঐক্যকে বিভাজিত না করে। রাজনীতি এমন একটি নীতি- যাতে রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিরোধ থাকলেও তা পরিচালিত হতে হয় সহনশীলতা ও ধৈর্যের অপরিসীম পরীক্ষার মধ্য দিয়ে। এটি ব্যক্তি ও দলের স্থান নির্ধারিত হয় নির্বাচন নামক প্রক্রিয়ায়।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, জুলাই সনদে স্বাক্ষর করার ব্যাপারে বিএনপির মতো একটি উল্লেখযোগ্য দল প্রথমে ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ টাইপের অবস্থান নিলেও পরে ঠিকই স্বাক্ষর করে। তেমনি এর পক্ষে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলার বিপরীতে অবস্থান নিলেও পরে তা থেকে সরে আসে। মূলত জুলাই সনদের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে আগামী রাজনীতিতে টিকে থাকার কোনো সুযোগ দেখা যাচ্ছে না। হয়তো এ উপলব্ধি তাদের হয়েছে। রাজনীতির মাঠে একটি ধারণা চাউর হতে চলেছিল যে বিএনপি বোধ হয় জুলাই-এর পরিবর্তনকে স্বীকৃতি দিতে চায় না। এটি হলে নির্বাচন ও আগামী রাজনীতিতে বিএনপির অবস্থান দুর্বল হয়ে যাবে। একই সঙ্গে এটি মনে রাখতে হবে যে, সময় ও মানুষের মননে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। এখনকার যুবক ও তরুণদের চোখের ভাষা বুঝতে হবে। বুঝতে হবে, তারা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো ছাড় দিতে রাজি হবে না।