নিরপেক্ষ-অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন জাতিকে সামনের দিকে নিয়ে যাবে
৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৪:২৩
॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
জাতি দীর্ঘদিন নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখেনি। যখনই যার যার মতো ক্ষমতা ব্যবহার করে তার দলের জন্য যেনতেনভাবে ভোট করে তার দলের পক্ষে নিয়ে দেশকে আমরা-মামুরাই দেশের শাসন ক্ষমতা আমলা, সরকারি ও বেসরকারি প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া বাংলাদেশকে বসবাসের অনুপযোগী করে তুলেছিল। ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে দুর্নীতির রানি হাসিনা দেশ থেকে পালিয়ে তার প্রায়শ্চিত্ত করছে। তার দলের লোকেরাও দেশ থেকে পালিয়েছে। লুট করা টাকা ও ভিন্ন দেশের পরামর্শে দেশে আবার বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা করছে। নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করার জন্য দেশের নির্বাচন কমিশনকে দায়িত্ব দিয়েছে। তারা নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে নির্বাচনের যাবতীয় কাজ আঞ্জাম দিচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনের দিনই ‘জুলাই সনদের’ ওপর গণভোটের আয়োজন করেছে। জাতীয় নির্বাচনের ব্যালট হবে সাদা। প্রার্থীদের নামের সাথে মার্কাও থাকবে। আপনার পছন্দের প্রার্থীর মার্কার ওপর সিল মারতে হবে। আর গণভোটের জন্য থাকবে রঙিন কাগজে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোট দেয়ার ব্যবস্থা। আপনাকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের জন্য পাশে টিক চিহ্ন দিতে হবে। উল্লেখ থাকে যে, প্রত্যেক ভোটার তার ভোটার নম্বর উল্লেখ করে মাতার নামসহ ভোটের অফিসারকে বললেই আপনাকে ২টি ভোটার স্লিপ দেবে। আপনি গোপন রুমে গিয়ে আপনার পছন্দের জায়গায় ভোট দিয়ে কাগজ ভাঁজ করে ভোটের বাক্সে ফেলতে হবে।
আপনি সকাল সকাল ভোটকেন্দ্রে যাবেন, সাথে বাড়ির ছোট-বড় যারাই ভোটার, তাদের সাথে নিয়ে যাবেন। ভোট দিয়ে এসে যারা এখনো ভোটকেন্দ্রে আসেনি, তাদের ভোটকেন্দ্রে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। ভোট দেয়া শেষ হলে ভোটকেন্দ্রের বাইরে অবস্থান নিতে হবে। ভেতরে ভোটগণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাইরে অবস্থান নিতে হবে। আপনাদের এজেন্টকে বলতে হবে, ভোটগণনার পর ভোটের রেজাল্ট সিটে প্রিজাইডিং অফিসারের স্বাক্ষর নিয়ে ভোটকেন্দ্র ত্যাগ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আপনার পরিচিত কেউ ভোট দেওয়ার বাকি আছে কিনা? পাশের বাড়ির সবাইকে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আপনার একটি ভোট জাতির গতি পরিবর্তনে সহযোগিতা করতে পারে।
ভোটে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সরকার, নির্বাচন কমিশন, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের ভূমিকা রাখতে হবে। কোনোভাবেই বিশৃঙ্খলা করা যাবে না। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে জনগণকে ভোটে আগ্রহী করতে হবে। কারণ গত নির্বাচনগুলোয় জনগণের অংশগ্রহণ ছিল না বললেই চলে। এবার আরো লক্ষণীয় বিষয় হলো, প্রায় সাড়ে ৪ কোটি ভোটার তরুণ। মোট ১২ কোটি ভোটারের মধ্যে ৩/১ ভাগ ভোটার নতুন ভোট দেবে। তাদের অভিজ্ঞতার অভাব থাকতে পারে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কর্মীদের ভোটদানের পদ্ধতি ভোটারদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আরো বলতে চাই, ভোটার কার্ড অর্থাৎ ভোটার লিস্টে আপনার নাম কত নম্বরে আছে, তা এখন থেকেই প্রার্থীদের কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে দিয়ে আসছে। আপনার ও পরিবারের লোকদের নম্বরগুলো আগে থেকেই সংগ্রহ করতে হবে। দুঃখের বিষয় ইতোমধ্যেই বিভিন্ন জায়গায় প্রার্থীদের কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতি, মারামারি পর্যন্ত হচ্ছে, যা আদৌ কাম্য নয়। সেদিন শেরপুরে একজন নেতাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে, যা খুবই দুঃখজনক। আরও দুঃখজনক হলো জামিনে এলাকায় গিয়ে আবারও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করেছে। ৩০০ আসনের সব প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে তাদের কর্মীদের সজাগ করতে হবে- যেন পরিবেশ খারাপ না হয়। আপনারা সব জনগণের কাছে আপনাদের প্রার্থীর গুণাগুণ তুলে ধরেন। ভোটাররা যাকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবে, তারাই সংসদে গিয়ে আপনাদের কথা বলবে। এখানে উল্লেখ করতে চাই, ভোটের আগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে অনেক প্রার্থীর পক্ষে নগদ টাকা বিলির ঘটনা ঘটে থাকে। দয়া করে যারা টাকা বিতরণ করে বা যাদের নগদ টাকা দেয়া হয় উভয়ের কাজ দেশের জন্য কল্যাণকর নয়। এ ব্যাপারে প্রয়োজনে ভোটের পূর্বে এলাকায় যাতে এ জাতীয় কাজ না ঘটে, তার ব্যবস্থা গ্রহণে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের খেয়াল রাখতে হবে।
মনে রাখতে হবে, এখন ভোটাররা অনেক সচেতন। যিনি এমপি হবেন, তার চরিত্র মাধুর্য, চলাফেরা, আচার-আচরণ, লেনদেন, দুর্নীতির সাথে জড়িত কিনা, তা বিচার করেই ভোট দিতে হবে। ভোট পবিত্র আমানত। তাই যোগ্য লোকদেরই ভোট দিয়ে সংসদে পাঠাতে হবে, যাতে করে তারা সততার সাথে, যোগ্যতার সাথে এলাকায় উন্নতির জন্য কথা তুলে ধরতে পারে। নিজের স্বার্থের চেয়ে এলাকা এবং দেশের ভালোর জন্য ভূমিকা রাখার মতো লোককেই আপনার পবিত্র ভোটটা দিতে হবে। প্রায় মোট ভোটের অর্ধেক নারী ভোটার। তাই মেয়েদেরও ভোট সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। আপনারা যে যেখানে ভোটার, সেই এলাকায় অবস্থান করেই ভোট দিতে হবে। এবারে নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করেছে ভোটের আগে-পরে মোট ৩ দিন যাতায়াতের জন্য যানবাহন চলবে না। তাই শেষ সময়ে হলেও যারা আমরা বাইরে থাকি, তাদের এলাকায় যেতে হবে এবং ভোটার নম্বর জোগাড় করতে হবে।
সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের লোকদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে- যাতে করে এলাকায় কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে। ইতোমধ্যে সেনাপ্রধান, পুলিশপ্রধান তাদের অধীনস্থ লোকদের সতর্ক করেছেনÑ যাতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে জনগণ তাদের ভোট দিতে পারে। নির্বাচন কমিশনকেও নিশ্চিত করতে হবে যে, তাদের নিয়োজিত লোকেরা যাতে যথাসময়ে ভোটকেন্দ্রে যায় এবং ভোটের কাজে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পূর্বেই ভোটকেন্দ্রে পৌঁছে যায়। অনেক সময় ভোটের বাক্স রাতেই ভোট দিয়ে ভরে রাখা হয়েছে। এ ব্যাপারে প্রার্থীদের যারা এজেন্ট থাকবেন তারা সচেতনভাবে বুঝে নিতে হবে মোট কতটা ভোটের বাক্স ঐ কেন্দ্রে এলো এবং সেগুলো খালি কিনা, তা যাচাই করতে হবে এবং সবার সামনে ভোটের বাক্সটি খুলে দেখাতে হবে যে, ভোটের বাক্সে কিছু নেই। তাদের সামনেই ভোটের বাক্সগুলো তালা লাগাতে হবে। আবার ভোট দেয়া শেষ হলে ভোটের বাক্সের মুখ বন্ধ করে দিতে হবে। কতগুলো ভোটের বাক্স আনা হলো আর কতগুলো কাজে লাগলো, তার হিসাবও যারা ভোট নেবেন, তাদের রাখতে হবে এবং ভোটের এজেন্টের সামনে ভরাট ও খালি বাক্সগুলোর হিসাব লিপিবদ্ধ করবে। আমরা সবাই মিলেই এবারের ভোটপর্ব গ্রহণযোগ্য করতে চাই। যেহেতু এবার সরকারের লোকেরা কেউ প্রার্থী নেই, তাই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের ভোটকেন্দ্রের সার্বিক পরিস্থিতি ভোট নেয়ার মতো পরিবেশ রাখবেন। আবার বলতে চাই, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট হলে তবেই ভোটাররা বেশিরভাগ ভোটকেন্দ্রে আসবে। যত বেশি ভোটার উপস্থিত হয়ে মত দেবে, তত বেশি ভোটের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। আমরা চাই সবাই মিলে সব ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে এনে ভোট দেওয়াতে হবে। বিশেষ করে অসুস্থ ব্যক্তিদের বিশেষভাবে ভোটকেন্দ্রে আনতে হবে। তার মতামতও জাতিকে ভালো পথে নেয়ায় সাহায্য করবে।
ভোটারদের লক্ষ রাখতে হবে- যারা প্রার্থী হয়েছে, তারা ব্যাংকের ঋণখেলাপি কিনা বা তারা দ্বৈত নাগরিক কিনা? কারণ নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছে, যারা ঋণখেলাপি বা দ্বৈত নাগরিক, তারা ভোটে জিতলেও পরে প্রমাণ হয় তারা ঋণখেলাপি বা দ্বৈত নাগরিক, তাদের প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে নির্বাচন কমিশন। তাই সজাগ থাকতে হবে। আরো মনে রাখতে হবে, যারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সময়মতো ফেরত দেয়নি, তারা কীভাবে দেশের আমানত রক্ষা করতে পারবে? তাই সাবধান ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের ভোট দেবেন না। ইতোমধ্যেই মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে কথিত বড় দলের ৫৯ জন প্রার্থী ঋণখেলাপি। চাঁদাবাজ, দুর্নীতিগ্রস্ত, দখলবাজরা আপনাদের চেনার মধ্যেই। যেহেতু তারা আপনার সাথেই বাস করে। তাদের আয়ের সাথে ব্যয়ের মিল আছে কিনা, তা আপনাদের বিবেচনায় এনেই আপনার পবিত্র ভোটটা যোগ্য প্রার্থীকে দেবেন। কথিত আছে অনেক মনোনয়ন বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রার্থী হয়েছে। চলার পথে সেদিন বেনাপোলের একজনের সাথে কথা হলো। তিনি বললেন, তার এলাকার মনোনয়ন হাইজ্যাক হয়েছে অনেক কোটি টাকার বিনিময়ে। খুবই দুঃখজনক। আমার মনে হয়, জনগণ পূর্বের তুলনায় অনেক সচেতন। তাই সঠিক জায়গায়ই তাদের ভোট প্রয়োগ করবেন।
মহান আল্লাহ তায়ালা স্বৈরাচার হাসিনাকে যেভাবে ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে বিদায় করেছেন। ছাত্র-জনতা দেশের আপামর জনতার বিপ্লব হয়েছে। সেই মহান আল্লাহ আমাদের সঠিকভাবে ভোট দেয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করে দেবেন। শুধু আমাদের চোখ-কান খোলা রাখতে হবে- যাতে করে দুষ্কৃতকারীরা আমাদের অধিকার ছিনিয়ে নিতে না পারে। যে শিক্ষিত ছাত্র-ছাত্রীরা ৫ আগস্টের বিপ্লব ঘটিয়ে তার ধারাবাহিকতায় সঠিকভাবে ভোট দিয়ে ডাকসু, জাকসু, রাকসু, চাকসু, জকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের যোগ্য প্রার্থীদের নির্বাচনে জিতিয়ে এনেছে, তারাই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। সৎ, যোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত লোকদের এমপি বানানোর যুদ্ধে। আমরা অবশ্যই আশা করব দেশের খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে ওপরতলার মানুষ সৎ নেতৃত্ব চাচ্ছে। রিকশাওয়ালা, ফেরিওয়ালা, ঠেলাওয়ালা থেকে শুরু করে দেশের বড় বড় ব্যবসায়ীরাও ভালো মানুষ খুঁজছে। কয়েকদিন পূর্বে হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে দেশের বড় বড় ব্যবসায়ীরা জড়ো হয়েছিল, জামায়াতের ব্যবসায়ী উইনিং-এর ডাকে।
জামায়াতের আমীর জ্ঞানগর্ভ বক্তব্যে বলেছেন, চাঁদাবাজি, দুর্নীতিকে আমরা আশ্রয়-প্রশ্রয় দেব না। ব্যবসায়ীদের সব সুযোগ-সুবিধা আমরা দেশের দায়িত্ব পেলে নিশ্চিত করব দ্বিধাহীনচিত্তে। তাই আগামী ১২ ফেব্রুয়ারিতে আমানতের হেফাজতকারীদেরই ভোট দেব এবং দেশ আগামীতে সুন্দর উন্নয়নের পথে নিয়ে যাবে।
দেশ চালাতে জনগণের ম্যান্ডেট নিতে হলে শুধু কথার ফুলঝুঁরি দিয়ে নয়, গুজব আর মিথ্যার আশ্বাসে নয়, আসুন জনগণের কাতারে নেমে আসি। বুলেটপ্রুফ গাড়ি নয়, রিকশায় চড়ারও অভ্যাস করি। জনতার কাতারে গিয়েই জনগণের সেবায় আত্মনিয়োগ করতে হবে। সঠিক জায়গায় ভোট দিয়ে যোগ্য, সৎ প্রার্থীকে আমরা এমপি বানাবো। সাথে সাথে হ্যাঁ ভোট দিয়ে আগামীর বাংলাদেশকে আর ফ্যাসিবাদে যাওয়ার সুযোগ চিরতরে বন্ধ করে দেব। তাই আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দলে দলে ছাত্র-জনতা, মা-বোনকে নিয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিই। সুখী-সমৃদ্ধশালী দেশ গড়ার জন্য জামায়াত জোটকেই বিজয়ী করব।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : [email protected]