গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নির্বাচন গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম পরীক্ষা


২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:৩৯

সরদার আবদুর রহমান
বহুল প্রতীক্ষিত ও আলোচিত জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আর কয়েকটি দিন বাকি। দেড় দশক পর জাতি সত্যিকারের অবাধ ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচনের জন্য অপেক্ষমান। তবে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী আসন্ন নির্বাচন যে গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রথম পরীক্ষা, সেটিও সত্য। এর সঙ্গে সম্পৃক্ত পক্ষগুলো; যেমন- সরকার, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ জনগণের দায়-দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ যে সকল নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসীন হয়েছে, তার সবকটিই নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। বলতে গেলে পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাকেই তারা ধ্বংস করে ফেলেছিল। তবে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে সেই পরিস্থিতির অবসানের পথ খুলে গেছে বলে মনে করলেও প্রকৃতপক্ষে এর ভেতরের বিষবাষ্প যেন এখনো দূর হয়নি। একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের ক্ষেত্রে প্রথমেই একটা বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থার সিঁড়িগুলো অতিক্রম করতে হবে। সেটা করতে ব্যর্থ হলে গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ভূলুণ্ঠিত হয়ে পড়বে। আর এ নির্বাচন ব্যবস্থাকে সার্বিকভাবে সফল করতে চাইলে কেবল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওপর কিংবা নির্বাচন কমিশনের ওপর ভরসা করলেই চলবে না, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ জনগণেরও করণীয় রয়েছে। এটি তাদের জন্য ‘পরীক্ষা’ ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে!
আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত টানা তিনটি জাতীয় নির্বাচনই ছিল বিতর্কিত। এসব নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল কম, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল সীমিত কিংবা অনুপস্থিত, আর প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল প্রবল। ফলে নির্বাচন গণতন্ত্রের উৎসব না হয়ে পরিণত হয়েছিল আনুষ্ঠানিকতায়। এ প্রেক্ষাপটে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি যদি সত্যিই সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সর্বজনীন অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়, তবে তা গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশ পুনরুদ্ধারে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হতে পারে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরীক্ষা
আসন্ন নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য দায়িত্ব পালনের বেলায় সর্বাগ্রে যাদের নাম আসে, তারা হলো- ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বরাবরই বলে আসছেন, এ নির্বাচন কেমন হওয়া উচিত। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ‘নতুন বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ’ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেছেন, ‘এই নির্বাচনকে সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের মাধ্যমে স্মরণীয় করে রাখতে হবে।’
বিশ্লেষকরা বলে আসছেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এক জটিল ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে। একদিকে রাষ্ট্রকে একটি সংঘাতমুক্ত ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে নিয়ে যাওয়ার ঐতিহাসিক দায়িত্ব; অন্যদিকে দুর্নীতি, মব-সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা এবং পুরনো স্বৈরাচারী ব্যবস্থার সুবিধাভোগীদের পুনরুত্থান- এ বহুমুখী চাপ সরকারের ওপর রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশে ফিরিয়ে আনা এবং আন্তর্জাতিক আস্থা পুনর্গঠনের জন্য প্রশংসা অর্জন করলেও কিছু দুর্বলতাও রয়ে গেছে এ সরকারের কর্মকাণ্ডে। বিশেষত প্রশাসন ও গণমাধ্যমে হাসিনা আমলের দাপুটেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় থাকা এবং দুর্নীতি পরিস্থিতির উন্নয়নে ব্যর্থতা দেশবাসীর উদ্বেগকে আরো ঘনীভূত করেছে। এমন বাস্তবতায় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে হলে অন্তর্বর্তী সরকারকে গতানুগতিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে কিছু নতুন, দৃশ্যমান ও সাহসী উদ্যোগ নিতে হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ, যা কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রশ্ন নয় বরং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ও জনআস্থার পরীক্ষাও। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপড়েনের প্রেক্ষাপটে এ নির্বাচন ঘিরে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা ও আলোচনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে সশস্ত্র বাহিনী প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জাতীয় সংকট ও শান্তিরক্ষা মিশনে পেশাদারিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে। নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীর দায়িত্ব রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ নয়, বরং সংবিধান ও আইনের আলোকে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করা। তাদের উপস্থিতি ভোটারদের নিরাপত্তাবোধ বাড়ায় এবং সহিংসতার আশঙ্কা কমাতে সহায়ক হয়। তবে এ ভূমিকা অবশ্যই নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। কোনো পক্ষ যদি বাহিনীকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করে, তবে তা নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করতে পারে।
ডিজিটাল গুজব ও অপপ্রচারের এ সময়ে মাঠপর্যায়ে শান্তি বজায় রাখা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেয়া সশস্ত্র বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক পরিসরেও নির্বাচনের সময় বাহিনীর আচরণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারলে তা দেশের ভাবমূর্তি ও কূটনৈতিক আস্থাকে শক্তিশালী করবে। সর্বোপরি সশস্ত্র বাহিনীকে জনগণের বাহিনী হিসেবে সংবিধান ও রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যে অটল থাকতে হবে। সংযত, সহায়ক ও দায়িত্বশীল ভূমিকার মাধ্যমেই তারা নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতাকে সুদৃঢ় করতে পারে। সব মিলিয়ে নির্বাচনসংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোকে সরকার যাতে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে, সে বিষয়ে কোনো দুর্বলতা থাকবে না বলেই মনে করা যেতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের পরীক্ষা
সরকারের দায়িত্ব পালনের বিষয় আলোচনার পরপরই আসে নির্বাচন কমিশনের কথা। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন একইসঙ্গে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশন (ইসি) দায়িত্ব নেয়ার তেরো মাস অতিবাহিত হয়েছে। এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রতি কতটা আস্থা অর্জনে সফল হয়েছে। মূলত একই দিনে একইসঙ্গে এ নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজনে সক্ষম কি-না, তার চূড়ান্ত পরীক্ষা হবে এ কমিশনের।
২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে বর্তমান কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দেশবাসী তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। স্বাভাবিকভাবে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রধান শর্তই হলো অংশগ্রহণকারী সব দলের জন্য সমান সুযোগ বা ‘লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করা। বিভিন্ন সময়ে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও ইসলামী আন্দোলন নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড না থাকা, প্রশাসনের পক্ষপাত এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলেছে। কমিশনের কাজের মধ্য দিয়েই হতে হবে এ অভিযোগের প্রকৃত জবাব।
ইসি অবশ্য দাবি করছে, মনোনয়নপত্র জমা দেয়া থেকে শুরু করে এ যাবত মাঠের পরিবেশ অনুকূলেই রয়েছে। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচনী প্রচার শুরু হলে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হবে। কিন্তু আস্থা কেবল বক্তব্যে নয়, দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয়। আইন প্রয়োগে দৃঢ়তা, আচরণবিধি বাস্তবায়নে শূন্য সহনশীলতা এবং প্রশাসনকে নিরপেক্ষ রাখার সক্ষমতাই ইসির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসির প্রতিটি সিদ্ধান্ত হতে হবে স্বচ্ছ, দৃঢ় এবং আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন কমিশনের আত্মবিশ্বাস ও সক্ষমতা নিয়ে বিতর্কের সুযোগ করে দেয়।
রাজনৈতিক দলের পরীক্ষা
এ নির্বাচনের সবচেয়ে বড় অংশীদার হলো নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলসমূহ। এ নির্বাচন যাতে কোনোভাবে প্রশ্নবিদ্ধ না হয় সেটি নিশ্চিত করতে পারাই তাদের আসল পরীক্ষা। সাধারণভাবে যে সকল বিষয় অতীতে নির্বাচনগুলো কলুষিত করেছে, সেগুলো চিহ্নিত করা এবং সেগুলো প্রতিরোধ করা জরুরি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয় এখানে উল্লেখ করা হলো।
ভোটের দিন দলীয় পাণ্ডাদের দিয়ে যুদ্ধংদেহী অবস্থান গ্রহণ করে প্রতিপক্ষের জন্য ভীতিকর অবস্থা তৈরি করা হয়। প্রতিপক্ষের ভোটারদের নির্দিষ্ট ভোটকেন্দ্রে পৌঁছাতে বাধা প্রদান করা হয়। ডামি ভোটার দিয়ে লাইন দখল করা হয়। ভোটে কারচুপি করার লক্ষ্যে বিশেষ দল বা পক্ষের ‘ডামি’ এজেন্ট ও ভোটার ব্যবহার করা হয়। বুথে হয়তো দেখা যাবে সব প্রার্থীরই এজেন্ট রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে বেশিরভাগই বিশেষ একটি পক্ষের লোক। এরা ভুয়া পরিচয় নিয়ে পোলিং এজেন্ট সেজে ভোট পাহারা দেয়। বিরোধীপক্ষের ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে না দিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পর্যবেক্ষক, দেশি-বিদেশি সাংবাদিকসহ গণমাধ্যমের লোকজন আসলে তাদের দেখে ‘নিজেদের’ লোকজনকে লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখা হয় এবং ভোটার উপস্থিতির পরিমাণ জানান দেয়া হয়। কেন্দ্র্রে প্রতিপক্ষকে ভিড়তে দেয়া হয় না। ভোটের দিন ‘প্রতাপশালী’ প্রার্থীর ক্যাডাররা কেন্দ্রের আশপাশে সদর্পে মিছিল করে স্লোগান দেয়, অহেতুক ‘হুই’ তোলে। এর মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের ‘শক্তিমত্তা’ প্রদর্শন করে। এতে একদিকে সাধারণ ভোটাররা ভীতসন্ত্রস্ত হয়; অন্যদিকে নির্বাচনকর্মীরা আতঙ্কিত হয়। ভোট দিতে বাধা ও ব্যালট ছিনতাই করে সিল মারা হয়। ভোট শুরুর প্রাক্কালে ব্যালট বই নিয়ে বিশেষ প্রার্থীর প্রতীকে সিল মেরে ব্যালট বাক্সে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। কোনো কোনো স্থানে পুরো বইটাই একটি প্রতীকের সিলে ভরা থাকে। ভোটগ্রহণকারী ব্যক্তিরা স্বেচ্ছায় কিংবা ভীতির মুখে পড়ে এ কাজে সহযোগিতা করে থাকেন। ভোটের দিন প্রথমেই নজর দেয়া হয় ভোটার তালিকার প্রতি। এতে নাম থাকা মৃত ব্যক্তি, বিবাহ হওয়ায় অন্য স্থানে গমনকারী মহিলাগণ, প্রবাসীগণ, অন্যত্র চাকরিরত ব্যক্তিগণ, ভোটকেন্দ্রে যেতে অক্ষম রোগী বা পঙ্গু ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হয়। ভোট শুরু হওয়ার সূচনা লগ্নেই কারচুপির জন্য নিয়োজিত ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে এসব ভোট কাস্ট করে ফেলা হয়। নির্বাচনী এলাকার যেসকল স্থানে ‘প্রতিপক্ষ’ শক্তিশালী সেসব এলাকায় উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়। এতে কখনো দলীয় ক্যাডার এবং ক্ষেত্রবিশেষে আইনপ্রয়োগে নিয়োজিত ব্যক্তিদের কাজে লাগানো হয়ে থাকে। এর ফলে সেসব স্থানের ভোটারগণ ভোটকেন্দ্রে যেতে সাহস পায় না। ভোটের দিন কেন্দ্রে আসার পথেও ভীতি সৃষ্টি করা হয়। মহল্লার ভোটারদের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র কেড়ে নেয়া হয়। বিশেষ প্রার্থীর ক্যাডাররা ভোটারদের বলে যায়, ‘তোমাদের ভোট পেয়ে গেছি, ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার দরকার নেই।’
দলীয় এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়। ভোটগণনা অবশ্যই প্রার্থী বা তার প্রতিনিধির সামনে হওয়ার বিধান আছে। কিন্তু কারচুপি করার সুবিধার জন্য এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়Ñ যাতে প্রার্থী বা তার প্রতিনিধি সেখানে উপস্থিত হতে বা থাকতে না পারে। প্রতিপক্ষের পোলিং এজেন্টদের বুথ থেকে বের করে দেয়া অতি সাধারণ ঘটনা। এর ফলে বিশেষ প্রার্থীর লোকেরা ইচ্ছেমতো ভোট কাস্ট ও গণনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ভোট দিতে গিয়ে ব্যালট পেপার গ্রহণ করার জন্য একেকজন হাতের ১০টি আঙুলের টিপ দিয়ে একসঙ্গে ১০টি ব্যালট পেপার সংগ্রহ করতে পারে। ভোট গ্রহণকারী ব্যক্তি বিশেষ কোনো প্রার্থীর পক্ষের লোক হলে তিনি এতে সহায়তা দিয়ে থাকেন। সাধারণ ভোটাদের কেন্দ্রে প্রবেশের পর হাতে কালি লাগিয়ে দিয়ে বলা হয় তাদের ‘ভোট দেয়া হয়ে গেছে’। ফলে ভোট না দিয়েই ওই ভোটারদের কেন্দ্র থেকে ফিরে আসতে হয়। বিগত সময়ে দলের একেকজন কর্মী ১শ’ থেকে সাড়ে ৪শ’ পর্যন্ত ভোট দেয়ার ‘গৌরব’ অর্জনের রেকর্ড গড়তে সক্ষম হয়। কোনো কোনো স্থানে পুরো একটি পরিবারের ভোট অন্যরা দিয়ে দেয়। নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিচয়পত্র প্রদানেও নানা কারসাজির আশ্রয় নেয়া হয়। সাংবাদিক-পর্যবেক্ষকদের কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দেয়া হয়। জাল ভোটের দৃশ্য ধারণ করলে ক্যামেরা ছিনিয়ে নেয়া হয়। ক্যামেরায় ধারণকৃত ছবি-ভিডিও নষ্ট করে ফেলা হয়। ভোটকেন্দ্রে বিশেষ পক্ষ কোনো কোনো ক্ষেত্রে এতটাই প্রতাপ বিস্তার করে যে, সেখানে পোলিং এজেন্টদের কোনো আপত্তিই আমলে নেয়া হয় না। কোনো পোলিং এজেন্ট কথা বললে তাদের প্রশাসনের ভয় দেখানো হয়। ফলে তারা একপ্রকার অসহায় অবস্থায় পতিত হয়।
জনগণের পরীক্ষা
জনসাধারণের পরীক্ষা এই কারণে যে, জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পালাবদলের কৃতিত্ব মূলত তাদের। আবার এর মূল বেনিফিশিয়ারি ও উপকারভোগীও হচ্ছে তারাই। ফলে নির্বাচন বানচাল করা, বাধাগ্রস্ত করা, বিবাদ সৃষ্টি করা প্রভৃতি বদ-আচরণ রুখে দেয়ার প্রধান দায়িত্ব তাদেরই ওপর বর্তায়। আন্তর্জাতিক মহল এ নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। বাংলাদেশ কি এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সত্যি সত্যি গণতন্ত্রকে স্থিতিশীল করতে জনগণ তাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করবে নাকি সেই গোঁজামিলের আবর্তে খাবি খাবে, সেটি দেখার বিষয়। আন্তর্জাতিক মহল থেকে এমনই মনোভাব প্রকাশ করে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ দীর্ঘদিন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন থেকে বঞ্চিত হয়েছে, আর আগামী নির্বাচন হবে হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশের জন্য একটি বড় পরীক্ষা।’ এ পরীক্ষা সর্বোপরি বাংলাদেশের জনসাধারণেরই বটে।