এলপিজি গ্যাস সঙ্কটের কারণ সিন্ডিকেট


১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৩০

॥ আবু জায়েদ আনসারী ॥
শহর ও নগরে রান্নার অত্যাবশ্যকীয় জ¦ালানি পণ্য এলপিজি (লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) গ্যাস। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে প্রান্তিক পর্যায়ে পণ্যটির ব্যবহার বেড়েছে। দেশের শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ধরে রাখতেও গ্যাসের বিকল্প আপাতত নেই। অর্থনীতির চাকা সচল রাখা কিংবা দৈনন্দিন জীবন নির্বাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যটি। তবে সরকারের ব্যবস্থাপনার ত্রুটি ও সিন্ডিকেটের কারণে পণ্যটির সহজলভ্যতাকে কঠিন করে তোলা হয়,যার ফলে জনদুর্ভোগ বাড়ার পাশাপাশি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভোক্তা ও রাষ্ট্র।
বর্তমানে দেশের এলপিজি চাহিদা বার্ষিক প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টনের বেশি। বিপুল চাহিদার বিপরীতে দেশে এলপিজি গ্যাসের চাহিদার উৎপাদন কম, সরকারি ও বেসরকারি প্ল্যান্টের মাধ্যমে মাত্র ২ শতাংশ উৎপাদন করা হয়। ফলে বাকি ৯৮ শতাংশই আমদানিনির্ভর। চাহিদার ঘাটতি পূরণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশ থেকে আমদানি করা হয়ে থাকে। এতে করে আমদানিকারকদের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়ে যায়। সিন্ডিকেটও মাথাচাড়া দেয়ার সুযোগ পায়।
এলপিজি গ্যাসের চাহিদা পূরণে দেশ যখন আমদানিরনির্ভর, ঠিক তখনই বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) থেকে নতুন করে এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য সমন্বয়ের দাবিতে গত বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড। পরদিন গত ৯ জানুয়ারি বুধবার সন্ধ্যায় সারা দেশের পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের জন্য এমন এক নোটিশ জারি করেছে ব্যবসায়ী সমিতি। এতে বলা হয়, সব কোম্পানির প্লান্ট থেকে এলপিজি উত্তোলনও বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়া হয়। এতে করে সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৩০৬ টাকার সিলিন্ডার গ্যাস ২ হাজার ২০০ টাকায় গিয়ে ঠেকে। তারপরও ক্রেতারা কাক্সিক্ষত গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে ব্যর্থ হন।
ব্যবসায়ীদের এমন ঘোষণার পর দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সরবরাহ সংকট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগ ও এলপিজি অপারেটরদের মধ্যে বৈঠকের পরও সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। এর আগে গত ৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজি এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ (জানুয়ারি মাসের জন্য) করেছে ১ হাজার ৩০৬ টাকা।
ক্রেতাদের অভিযোগ, দোকানে সিলিন্ডার মজুদ থাকা সত্ত্বেও প্রথমে গ্যাস নেই বলা হয়। পরে বেশি দাম দিতে রাজি হলে তখনই গ্যাসের সিলিন্ডার পাওয়া যায়। সরকার নির্ধারিত দামের কোনো তোয়াক্কা নেই।
এদিকে চলতি মাসের ৮ তারিখে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি সেলিম খান দাবি করে বলেন, ‘এলপিজি নিয়ে গত ২০ বছরেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। ২৭টা অপারেটরের মধ্যে মাত্র পাঁচটি গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে। বাজারে গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, সেটি কতটুকু আছে, তা পরিস্থিতিই বলে দিচ্ছে।’
দেশের এলপিজি আমদানির হিসাব অনুযায়ী, এক বছর আগেও দেশের অন্তত ২৭টি প্রতিষ্ঠান এলপিজি আমদানি করত। সেখানে বর্তমানে মূলত পাঁচটি অপারেটর এলপিজি আমদানি করছে বলে জানায় এলপি গ্যাস সমবায় ব্যবসায়ী সমিতি। দেশের বাজারে সাড়ে ৫ কোটি সিলিন্ডার থাকলেও বর্তমানে রিফিল হচ্ছে মাত্র ১ কোটি ২৫ লাখের মতো। সমিতির দেয়া হিসাব অনুযায়ী, অন্তত ৪ কোটি ২৫ লাখ সিলিন্ডার অব্যবহৃত পড়ে আছে। এ খালি সিলিন্ডারের বড় অংশ সেসব অপারেটরের যারা আর এলপিজি আমদানি করছেন না। এসব কোম্পানির এলপিজি আমদানি বন্ধ করা এ খাতে সংকট তৈরির অন্যতম কারণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এমন পরিসংখ্যান বড় ধরনের সিন্ডিকেটের ইঙ্গিত দেয় বলেও মত দেন তারা।
বাজার তদারকির ঘাটতি
তথ্যমতে, গত নভেম্বরে দেশে এলপিজি আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫ হাজার টন। ডিসেম্বরে এ আমদানির পরিমাণ বেড়ে ১ লাখ ২৭ হাজার টন হয়েছে। আমদানি বৃদ্ধির পরও কেন বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে, তা তদন্তের দাবি রাখে। যেহেতু অনেকে বিশ্ববাজারের মূল্য সূচকের তথ্য থেকে এলপিজির দাম এক মাস আগে থেকে জানতে পারেন। যে কারণে পরিবেশক ও ডিলারদের বড় একটি অংশ বেশি দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রির সুযোগ নেন।
দেশে এলপিজি গ্যাসের দামের আকাশ-পাতাল ব্যবধানের পছনে খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের কারসাজিকে দায়ী করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। গত মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় ও অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সারা দেশে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান এ উপদেষ্টা।
উপদেষ্টা জানান, এলপিজির দাম কিছুটা বাড়ানোর বিইআরসির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু এ দাম বাড়ার আশঙ্কাকে পুঁজি করে একদল অসাধু ব্যবসায়ী আগেভাগেই সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন এবং বাজারে অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। ‘এলপিজির দামে এ ধরনের অস্বাভাবিকতা হওয়ার কোনো বাস্তব কারণ নেই। এটি সম্পূর্ণভাবে কারসাজির ফল।’
সিন্ডিকেট ভাঙতে উদ্যোগ নগণ্য
বাজারে এলপি গ্যাসের সিন্ডিকেট ভাঙতে ও অসাধু ব্যবসায়ীদের বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ অভিযানে নামে। তাদের অভিযানে উঠে আসে যে, ১ হাজার ৩০৬ টাকার ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি করছেন কোনো কোনো ব্যবসায়ী। তবে সরকারের বাজার নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা ও ভোক্তা অধিদফতের নিয়মিত অভিযান না থাকায় অসাধু চক্রের হাতে ক্রেতারা জিম্মি থাকছেন। ভোক্তা অধিদপ্তর রাজধানীর মিরপুরে অভিযানকালে এক খুচরা ব্যবসায়ী দাবি করেন তিনি সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে কিনেছেন। কিন্তু কর্মকর্তাকে তিনি সেই ক্রয় ভাউচার দেখাতে পারেননি।
পাবনার বাসিন্দা সবুজ। ভাড়া থাকেন খিলগাঁওয়ের একটি ফ্ল্যাটে। তিনি জানান, গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে তিনি চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। কয়েকটি দোকান ঘুরে তিনি গ্যাস পাননি। অবশেষে নিরুপায় হয়ে ১২ কেজির এলপিজির সিলিন্ডার তিনি ৩২০০ টাকায় কিনেছেন। এমন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন আরও অনেকে।
দেশে এলপি গ্যাসের চলমান সংকটের বিষয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সদস্য মিজানুর রহমান সোনার বাংলাকে বলেন, অপারেটররা ইতোমধ্যে ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। তবে তিনি জানান নভেম্বরের তুলনায় ডিসেম্বরে গ্যাস আমদানি বেশি হয়েছে।
তিনি জানান, আন্তর্জাতিকভাবে জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকায় আমাদের আমদানির দুটি জাহাজ দেশে ঢুকতে পারেনি। এটিও প্রভাব ফেলেছে। ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের প্রশ্নে তিনি বলেন, তারা যেহেতু ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, আমার মনে হয় সিন্ডিকেট নেই। তবে তা খতিয়ে দেখবেন বলে জানান এ কর্মকর্তা।
আমদানিনির্ভরতা কমাতে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির সংকট
দেশে গ্যাসের চাহিদা পূরণে আমদানিনির্ভরতা কমাতে সরকারের উদ্যোগ নগণ্য। ফলে সহসা এর সমাধান হচ্ছে না। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভিসি, ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) ভিসি অধ্যাপক ম. তামিম এক নিবন্ধে উল্লেখ করেন, পেট্রোবাংলা ও বাপেক্স বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়েছে। একসময় ৫৮টি কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও বর্তমানে ১০৮টি কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসবের ফলে মোট উৎপাদন বৃদ্ধির বদলে আমরা যে আংশিক সাফল্য পাচ্ছি, তা টেকসই হচ্ছে না। এর মানে হতে পারে- যেটা মজুদ বলা হচ্ছে, বাস্তবে তার তুলনায় কম থাকতে পারে অথবা মজুদ থাকলেও আমরা সেই মজুদ থেকে স্থায়ীভাবে উৎপাদন বাড়াতে ব্যর্থ হচ্ছি। তার মতে, এর পেছনে মূলত তিনটি ঘাটতি কাজ করছে- বিনিয়োগের অভাব, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং জ্ঞান ও দক্ষতার অভাব। বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং ও অপারেশনাল ক্ষেত্রে আমাদের অভিজ্ঞতার ঘাটতি স্পষ্ট।