জানাজা শেষে স্বামীর সমাধির পাশে দাফন
১ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:২৮
স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা গত ৩১ ডিসেম্বর বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। জানাজা শেষে স্বামী বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সমাধির পাশে তাকে দাফন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গত মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বিএনপির মিডিয়া সেলের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে এক মহাকাব্যময় জীবনের সমাপ্তি ঘটলো।
অন্যদিকে বিএনপির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে বলা হয়েছে, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গত ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ সকাল ৬টায় ফজরের ঠিক পরে ইন্তেকাল করেছেন। আমরা তার রূহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং সকলের নিকট তার বিদেহী আত্মার জন্য দোয়া চাচ্ছি।’
বিএনপি চেয়ারপারসন গত ২৩ নভেম্বর থেকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। তার শারীরিক জটিলতার মধ্যে ডায়াবেটিস, কিডনি, হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের সমস্যা ওঠানামা করছিল।
লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণে খালেদা জিয়ার জানাজা
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা সম্পন্ন হয়েছে। গত বুধবার বিকাল ৩টায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জানাজায় ইমামতি করেন বায়তুল মোকাররমের খতিব মাওলানা আব্দুল মালেক। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জানাজায় অংশ নেয় লাখ লাখ মানুষ। এর আগে খালেদা জিয়ার লাশবাহী কফিন জানাজাস্থলে নিয়ে আসা হয়। বিকাল পৌনে ৩টার দিকে জানাজা শুরুর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। গত বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) দুপুর ২টায় তার নামাজে জানাজা হওয়ার কথা থাকলেও আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় পৌনে ৩টার দিকে। বিকাল ৩টায় জানাজা শুরু হয়। সেখানে প্রথমে খালেদা জিয়ার জীবনের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। তিনি জানান, ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনে ৪১ বছরই বলিষ্ঠ হাতে দলের নেতৃত্ব দেন। জনগণের কল্যাণে করেছেন কাজ। খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, প্রধান বিচারপতি, খালেদা জিয়ার পুত্র ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তাবেক রহমান, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান, সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, নাগরিক সমাজের ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও কয়েক লাখ জনতা।
জানাজায় অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা
বিএনপি চেয়ারপারমসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজার নামাজে অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার এবং আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা। তাদের মধ্যে যাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়া গেছে তারা হলেন- নেদারল্যান্ডস রাষ্ট্রদূত জোরিস ফ্রানসিস্কাস জেরারডাস ভ্যান বোমেল, লিবিয়ার রাষ্ট্রদূত আবদুল মোত্তালিব এস.এম. সোলাইমান, অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার স্যুজন রাইল, রাশিয়ার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত একাতেরিনা সেমেনোভা, ফিলিপাইন রাষ্ট্রদূত নিনা পাডিলা কেইনগলে, সিঙ্গাপুরের হাইকমিশনার মিচেল লি, প্যালেস্টাইনের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত জিয়াদ এম. হামাদ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার, দক্ষিণ কোরিয়ার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত জিনহি ব্যাক, ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারা ক্যাথরিন কুক, মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত ইউ. আং কিয়াও মো, চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত রেটো সিগফ্রিড রেংগ্লি, ইটালি রাষ্ট্রদূত আলেসান্দ্রো এ্যান্টোনিও, কানাডার হাইকমিশনার অজিত সিং, জাপান রাষ্ট্রদূত সায়দা শিঞ্চি, সুইডেন রাষ্ট্রদূত নিকোলাস লিনাস রাগনার উইক্স, স্পেনের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত লারা ডে লা পেনা ফেরান্দেজ, ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূত হেরু হারতান্তো সুবলো, নরওয়ে রাষ্ট্রদূত হাকন অ্যারাল্ড গুলব্রানসেন, ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত পাওলো ফার্নান্দো ডিয়াস ফেরেস, মরক্কো রাষ্ট্রদূত মজিদ হালিম, ইরানের রাষ্ট্রদূত মানসোলর ছাভোশি, আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত আব্দেল উহাব সাইদানি, ব্রুনাই হাইকমিশনার হাজি হ্যারিস বিন ওসমান, থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত থিটিপর্ন চিরাসাওয়াডিয়ুপ, কাতারের রাষ্ট্রদূত সারায়া আলি এম.এস. আল-কাহতানি, মার্কিন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত মেগান বোল্ডিন, ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার, বিমসটেকের মহাসচিব ইন্দ্রা মনি পান্ডে, মালয়েশিয়ার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত আমির ফারিদ আবু হাসান এবং ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামের ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ সিমোন লরসন পারচম উপস্থিত রয়েছেন। এছাড়া ইসলামিক ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর রফিকুল ইসলাম জানাজায় অংশ নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান। এছাড়া সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে শেষ শ্রদ্ধা জানান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তানের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিকসহ ভুটান, নেপাল, মালদ্বীপ সরকারের প্রতিনিধিরাও।
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাযায় অংশগ্রহণকারী জামায়াতে ইসলামীর অন্য নেতৃবৃন্দের মধ্যে নায়েবে আমীর, সাবেক এমপি মাওলানা আনম শামসুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম, মাওলানা আবদুল হালিম ও এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর নূরুল ইসলাম বুলবুল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য, ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মোঃ সেলিম উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য, ঢাকা মহানগরী উত্তরের নায়েবে আমীর আবদুর রহমান মুসা, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি ডা. ফখরুদ্দিন মানিক, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি কামাল হোসেনসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগরী নেতৃবৃন্দ।
বেগম খালেদা জিয়ার সংক্ষিপ্ত জীবনী
বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ও মা তৈয়বা মজুমদার। শৈশবে তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় এবং পরবর্তীতে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৬০ সালে তিনি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন তিনি ফার্স্টলেডি হিসেবে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন।
১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবরণের পর দলের সংকটময় মুহূর্তে তিনি রাজনীতিতে পদার্পণ করেন। ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়। এরপর ১৯৮৩ সালে তিনি দলের ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালে চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
আশির দশকে তৎকালীন সামরিক স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দেন। আপসহীন সংগ্রামের কারণে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। এ দীর্ঘ আন্দোলনে তিনি সাত দলীয় জোট গঠন করেন এবং স্বৈরাচারের পতন না হওয়া পর্যন্ত কোনো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার দৃঢ় ঘোষণা দেন। এ দীর্ঘ লড়াইয়ে তাকে ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সাতবার আটক ও গৃহবন্দী করা হয়েছিল।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে জয়লাভ করে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তার সময়েই দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি শিক্ষা খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন; যার মধ্যে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা এবং উপবৃত্তি কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য। এছাড়া তিনি সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২৭ থেকে ৩০ বছরে উন্নীত করেন। ১৯৯৬ সালের জুন মাসের নির্বাচনে বিএনপি পরাজিত হলেও তিনি ১১৬টি আসন নিয়ে সংসদে বৃহত্তম বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৯ সালে তিনি চারদলীয় জোট গঠন করেন এবং ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় নিয়ে আবারও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ২০০৫ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন তাকে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় ২৯ নম্বরে স্থান দেয়।
বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে কোনো আসনেই পরাজিত না হওয়ার অনন্য রেকর্ডের অধিকারী। তিনি ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনে যে কয়টি আসনে দাঁড়িয়েছেন, তার সবকটিতেই জয়লাভ করেছেন। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি স্টেট সিনেট গণতন্ত্রের প্রতি তার অবদানের জন্য তাঁকে ‘গণতন্ত্রের যোদ্ধা’ উপাধিতে ভূষিত করে।
গত ৩১ ডিসেম্বর বুধবার ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জানাজা শেষে সংসদ ভবন এলাকার পাশে অবস্থিত জিয়া উদ্যানে তার স্বামী ও বাংলাদেশের মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে খালেদা জিয়াকে দাফন করা হয়।
এই শোক, এই ক্ষতি অপূরণীয় : মির্জা ফখরুল
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘এই শোক, এই ক্ষতি অপূরণীয়, যা এই জাতি কখনো পূরণ করতে পারবে না।’ গত ৩০ ডিসেম্বর মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির পক্ষ থেকে প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন তিনি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে একটা বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি হলো বলে মন্তব্য করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি হলো। শুধু তাই নয়, পৃথিবীর গণতান্ত্রিক আন্দোলনে একটা বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি হলো।’ বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘যে নেত্রী তার সারাটা জীবন জনগণের জন্য, কল্যাণের জন্য তার সমগ্র জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন, সেই নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাদের মাঝে নেই। আমরা যারা তার রাজনৈতিক কর্মী এবং সহকর্মী, আমরা এটা ভাবতেও পারি না।’