‘নবান্ন’ আবহমান বাংলার হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি


১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৬:৪০

॥ সুলতান মাহমুদ সরকার ॥
বাংলার শান্ত, সবুজ, নিভৃত প্রান্তরের দিকে তাকালে আজও মনে হয় এটি কোনো স্বর্গীয় ভূমি। মেঘলা আকাশের নিচে দিগন্তজোড়া ক্ষেত, শীতের নিঃশব্দ সকাল, পাতায় পাতায় শিশির আর গাঁয়ের উঠোনে ভোরের আগুনজ্বলা চুলার ধোঁয়া যেন এক অপ্রকাশিত কবিতার মতো ভেসে ওঠে। এ নান্দনিক বাংলার পরিচিতি আদিকাল থেকেই উৎসব, ঋতুচক্র এবং কৃষি জীবনের অনুপম সঙ্গতে গঠিত। এরই ভেতর জন্ম নিয়েছে বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্য ‘নবান্ন’; নব অন্নের আগমনে সৃষ্ট আনন্দ, সমৃদ্ধি ও সামাজিকতার এক অতুলনীয় উৎসব।
নবান্ন শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, এটি ছিল বাংলার কৃষিজ প্রধানতার প্রাণস্পন্দন; ছিল প্রকৃতি, মানুষ, মাটির ত্রিধারায় গাঁথা এক গভীর আনন্দময় প্রকাশ। যখন নতুন ধান ঘরে ওঠে, তখন কৃষকের হৃদয়ে যে স্বস্তির ঢেউ বয়ে যায়, তা কেবল অর্থনৈতিক নয়; বরং এটি অস্তিত্বের নিশ্চয়তা, বছরের চরম পরিশ্রমের প্রাপ্তি, মাটির সন্তানের মুখে প্রথম হাসি। এ হাসিতে শীতের হিমেল বাতাসও যেন অন্যরকম উষ্ণতা পায়। বাংলার গ্রামবাসী বহু শতাব্দী ধরে কৃষিকেন্দ্রিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত। সেই কারণে তাদের উৎসব, গান, গাঁথা, লোকাচার সবকিছুই আবর্তিত হয়েছে কৃষিকাজকে কেন্দ্র করে। বীজ বপন থেকে শুরু করে ধান কাটা, মাড়াই, গোলায় তোলা প্রতিটি ধাপেই ছিল আলাদা উৎসব, আলাদা উল্লাস। তার মধ্যে নবান্ন ছিল সবচেয়ে মহিমান্বিত। কারণ এটি নতুন অন্নের সূচনা, জীবনের ধারাবাহিকতার প্রতীক। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তাই লিখেছিলেন-
‘নব ফলেছে ধান, হৃদয়ে লাগে টান;
মাটির গন্ধে ভরে ওঠে প্রাণ।’
নবান্ন হতো শীতের শুরুর পরপরই, যখন মাঠে গিয়ে দাঁড়ালে শুষ্ক বাতাসে ধান কাটা গন্ধ ঘুরে বেড়াত। কৃষান-কৃষানির প্রতিদিনের ক্লান্ত শরীরে তখন নতুন উচ্ছলতা। ঘরে ঘরে চলত মাড়াইয়ের শব্দ, হাটে উঠত নতুন ধান, আর শত কষ্ট ভুলে মানুষ বলত ‘মাটি এবার তার ঋণ শোধ করেছে।’ নবান্ন কেবল কৃষকের নয়, পুরো গ্রামের সম্পদ। ধানের প্রথম ভাগ সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে উৎসর্গ করার রেওয়াজ ছিল; বাংলার প্রত্যেক অঞ্চলে এ রীতি ভিন্ন নাম, ভিন্ন আচার নিয়ে গড়ে উঠেছিল।
শীতের সকালের স্বাদ তখন ছিল অনন্য। উঠোনে আগুন জ্বালিয়ে মা, দাদি-নানির হাতে তৈরি হতো পিঠা- চিতই, ভাপা, পাটিসাপ্টা, আর নতুন চালের গুঁড়া দিয়ে বানানো দুধপোড়া। খেজুরের রসের উষ্ণতা যেন ভোরের কুয়াশাকে সরিয়ে দিত। টিনের মগে ঢেলে দেওয়া রসের মিষ্টি ঘ্রাণে উঠে আসত শৈশবের গা-ছমছমে আনন্দ। গুড়ের বড় পাত্র উল্টে দিলে ঝরঝর করে পড়া সেই সোনালি রং যেন বাংলার মানচিত্রই রাঙিয়ে দিত। এ সবকিছুই ছিল নবান্ন উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বাঙালিরা সবসময়ই নিমন্ত্রণপ্রিয়, সামাজিকতামুখর এক জাতি। নতুন চালের ভাত, পায়েশ কিংবা পিঠা দিয়ে আপনজন, প্রতিবেশী, দূর সম্পর্কের আত্মীয়কে আপ্যায়ন করা ছিল নবান্নের সবচেয়ে সুন্দর রীতি। গ্রাম্য বাড়ির চালে লাল-হলুদ রঙিন কাগজে বানানো বাতাসি দুলত, উঠোনে বসত সবার মিলনমেলা। একদিকে ছিল কৃষকের সারা বছরের অবসাদ মোচনের হাসি, অন্যদিকে ছিল আত্মীয়তার বন্ধন আরও দৃঢ় করার সুযোগ। নজরুল তাই লিখেছিলেন-
‘সুখের ঘ্রাণে ভরে ওঠে ঘর,
নবধানের হাসিতে ম্লান হয় না কোনো পর।’
নবান্ন উৎসবের ভেতরে লুকিয়ে ছিল বাংলার লোকায়ত জীবন, কষ্ট, সুখ, গান, গাঁথা, গল্প। মাঠে কাজ করতে করতে কৃষাণরা গাইত-
‘ধান কাটি রে ভাই, ধান কাটি,
নতুন ধানের গন্ধে বউ কথা কয় খুশিতে ভাটি।’
এ গানগুলো কেবল গানই ছিল না, ছিল শ্রমের কাছে স্বস্তির প্রার্থনা। কৃষকের কঠোর জীবন, বছরে সারা বেলা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে লড়াই করে যে অন্ন ফলানোÑ নবান্ন সেই সংগ্রামের পুরস্কার।
তবে সময়ের স্রোত বদলে গেছে। একসময় যে বাংলার পরিচয় ছিল মাটি, জল, ধানক্ষেত, পাখির ডাক, এখন সেসব অনেকটাই ইতিহাসের পাতা। শহরমুখী মানুষের ভিড়ে গ্রাম হয়েছে অবহেলিত, সংস্কৃতি হয়েছে ক্ষয়িষ্ণু। আধুনিক সভ্যতার জঞ্জাল, প্রযুক্তির একঘেয়ে দুনিয়া, ব্যস্ত নগরজীবনের কোলাহলে আমরা ভুলে যাচ্ছি সেই শৈশব, সেই পিঠা-রসের ভোর, সেই ধানের গান। কংক্রিটের শহরে নতুন ধানের ঘ্রাণ নেই, নেই উঠোনের হাসি-আড্ডা, নেই নিমন্ত্রণের সেই আন্তরিকতা।
আজকের প্রজন্মের অনেকেই জানে না, নবান্ন কী! তারা জানে না, নতুন চালের ভাতের সুমিষ্ট স্বাদ কেমন! জানে না, খেজুরের রসের ঢাল দেখলে বয়স্করা কেন চোখে পানি আনে। জানে না, পাড়ায় পাড়ায় দলবেঁধে যাওয়ার সেই ছোট ছোট আনন্দ জানে না, মাঠে ধান কাটা দেখার যে রোমাঞ্চ। এটি ভুলে যাওয়া মানে কেবল একটি উৎসবের মৃত্যু নয়, একটি জাতির সংস্কৃতি, শিকড়, আত্মা হারিয়ে ফেলা। যে বাঙালির পূর্বপুরুষরা মাটির গায়ে হাত রেখে জীবনের গান গেয়েছে, আজ সে বাঙালি মাটির গন্ধই ভুলতে বসেছে।
নবান্নের ভেতরে ছিল এক অনন্য সামাজিক নন্দনশাস্ত্র। মানুষ মানুষকে চিনত, সম্পর্ক লালন করত, পরস্পরের প্রয়োজনে ছুটে যেত। নবান্ন ছিল মানুষকে মানুষ বানানোর উৎসব। ঘরে বানানো খাবার ভাগ করে খাওয়ার সেই মমত্ববোধ হারিয়ে গেছে আজ। এখন খাবার রেস্টুরেন্টে খাওয়া যায়, অ্যাপে অর্ডার করা যায়, কিন্তু যে আন্তরিকতা, যে গ্রামীণ উষ্ণতা, যে বাড়ির রান্নার মানবিক গন্ধ তা আর পাওয়া যায় না।
আমাদের কৃষিকাজও বদলে গেছে। ধান কাটতে এখন কম্বাইন্ড হারভেস্টার, জমি চাষে ট্রাক্টর কিংবা পাওয়ার টিলার, পানির জন্য গভীর নলকূপ সবই প্রয়োজন, সবই উন্নতির প্রতীক। কিন্তু এ উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে সেই শ্রমের সৌন্দর্য, সম্মিলিত কাজের উৎসব। আগের দিনে সমগ্র গ্রামজুড়ে দল বেঁধে ধান কাটার যে উল্লাস ছিল, এখন তা দেখা যায় না বললেই চলে। তাই নবান্নের সাংস্কৃতিক আবেদন ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে।
কিন্তু তবুও এর সৌন্দর্য অটুট। বাংলার শীত এখনো ধানক্ষেতকে আদরে জড়িয়ে রাখে। কত গ্রামে আজও কিছু পরিবার নবান্ন করে, পিঠা বানায়, রস সংগ্রহ করে। গ্রামের ছোট্ট মেয়েরা এখনো গানের সুরে বলে- ‘নবধানের ভাত খাই, শীতের রোদে বসে গাই।’ নবান্ন শেষ হয়ে যায়নি, বরং পরিবর্তনের মাঝে তাকে নতুন করে নিরীক্ষা করতে হবে।
একটি জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয় তার অস্তিত্বের শিকড়। যদি শিকড় কেটে ফেলা হয়, বৃক্ষের সৌন্দর্য থাকে না। নবান্ন আমাদের সেই শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয় আমরা মাটির সন্তান, আমাদের সভ্যতা এসেছে কৃষির হাত ধরে। তাই নবান্নের পুনর্জাগরণ মানে কেবল একটি উৎসব ফিরিয়ে আনা নয়, বরং আমাদের হারিয়ে যাওয়া মানবিকতা, গ্রামীণ শান্তি, প্রকৃতির সাথে মিলনের গান ফিরিয়ে আনা।
নগর-জীবনে থেকেও নবান্নকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব। শহরের ছোট পরিবারেও নতুন চালের পায়েস রাঁধা যায়, বন্ধু বা আত্মীয়কে নিমন্ত্রণ করা যায়, শিশুদের বোঝানো যায় উৎসবের ইতিহাস। স্কুল-কলেজে নবান্ন মেলা করা যায়, যেখানে থাকবে পিঠাপুলির স্টল, লোকগান, লোকগাথা, কৃষি জীবনের ছবি। এতে শুধু একটি বাঙালি উৎসবই বাঁচবে না, বাঁচবে আমাদের সাংস্কৃতিক মনন।
অতীতকে অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু অতীতকে ধরে রাখার পথ সবসময় তৈরি হয় বর্তমানের ভালোবাসা দিয়ে। আমরা যদি চাই, নবান্ন আবারও বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে ফিরে আসতে পারে। আবারও শীতের সকাল হতে পারে খেজুরের রসের উষ্ণতায় ভরপুর, উঠোনে হতে পারে পিঠার ঘ্রাণে ভরা হাসির মিলন, আবারও কৃষকের মুখে ফিরতে পারে সেই পুরোনো হাসি। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়-
‘যা পেয়েছি আজ দেশ-মাটির কোলে,
তা হারাতে দেব কি তবে ভুলের দলে?’
না, আমাদের ভুলে গেলে চলবে না নবান্নকে। চলবে না এ উৎসবকে প্রান্তিক করে দেওয়ার শহরমুখী নির্বিকারতায়। নবান্নকে ফিরে পেতে হলে ফিরতে হবে শিকড়ে, ফিরতে হবে মাটির প্রতি, সম্পর্কের প্রতি, সেইসব রেখাপাতের প্রতি যেগুলো বাঙালিকে বাঙালি বানিয়েছে। নবান্ন হলো বাঙালির সমৃদ্ধির প্রতীক, হাসির প্রতীক, জীবনের পুনরাবিষ্কারের প্রতীক। এটি এমন এক উৎসব। যা আমাদের জানায়, যে জাতি তার মাটিকে ভালোবাসে, সেই জাতি কখনো নিঃস্ব হয় না।