অদক্ষ ব্যবস্থাপনা আর হাতবদলে বাড়ছে পণ্যমূল্য
১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৫:৫৭
স্টাফ রিপোর্টার : সরকার ব্যস্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে। আর এ ফাঁকে নিত্যপণ্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় নেমেছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। প্রতিদিনই বাজারে কোনো না কোনো পণ্যমূল্য বাড়ছে। যে পণ্যের মূল্য একবার বাড়ছে, সেই পণ্যমূল্য আর কমার কোনো খবর নেই। যেমন- পৌষ মাসে সবজির ভরা মৌসুম। এ মৌসুমে বাজারে সব ধরনের সবজির সরবরাহ যথেষ্ট আছে, কিন্তু মূল্য বেশি। একইভাবে অন্য নিত্যপণ্যের মধ্যে চাল, পেঁয়াজ, সয়াবিন তেলসহ সম্প্রতি যেসব নিত্যপণ্যমূল্য বেড়েছে, তা আর কমেনি। এর কারণ কী? বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সরকারের বাণিজ্য, কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ে মধ্যে মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও নির্ধারণে সমন্বয় নেই। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অদক্ষ বাজার ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত কয়েক দফা হাতবদলে মূল্যবৃদ্ধি পায়। আর অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট তো আছেই। ফলে পণ্যের প্রকৃত মূল্য যা, তার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যে কিনতে হচ্ছে অসহায় ভোক্তাদের।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধানে সম্প্রতি গবেষণা পরিচালনা করে। ওই গবেষণার ফলাফল বলছে, কৃষকের কাছ থেকে ভোক্তার পাতে ওঠা পর্যন্ত হাতবদলের (উৎপাদন, পাইকারি, খুচরা পর্যায়) কারণে শুধু সরু চালের দাম বৃদ্ধি পায় ৩০৭ শতাংশ। একই অবস্থা স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদিত সব ধরনের নিত্যপণ্য যেমন মোটা চাল, পেঁয়াজ, আদা-রসুন, রুই মাছ, ডাল, আলু, কাঁচামরিচ, হলুদ ও শুকনা মরিচের দামের ক্ষেত্রে। অপেক্ষাকৃত কম দাম বাড়ে আমদানিনির্ভর পণ্য; যেমন- সয়াবিন তেল, গম, চিনি ও গুঁড়া দুধের। গবেষণার তথ্যমতে, এক কেজি ভালোমানের মোটা চাল উৎপাদনে কৃষক পর্যায়ে সর্বোচ্চ খরচ পড়ে ২৬ টাকা। সেই চাল কৃষক বিক্রি করে ৩২ টাকায়। ভোক্তাদের সেই মোটা চাল কিনতে হয় ৬০ টাকায়। অর্থাৎ শুধু হাত বদলে মোটা চালের দাম ২১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায় বা ২৮ টাকা। একইভাবে প্রতি কেজি সরু চালের দাম পার্থক্য প্রায় ৪০ টাকা, পেঁয়াজের ৪০ টাকা, রুই মাছের ১২০ টাকা, ডালে ৩০ টাকা। উৎপাদক থেকে সরাসরি ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বহু আগ থেকে শোনা গেলেও এর বাস্তবতা চোখে পড়েনি।
অন্যদিকে বিশ্ববাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে বাংলাদেশেও বাড়বে এবং বিশ্ববাজারে দাম কমলে বাংলাদেশেও কমবেÑ এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবতা হলো আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বাংলাদেশে বাড়ে, কিন্তু বিশ্ববাজারে দাম কমলে বাংলাদেশে কমে না। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের সময় বিশ্ববাজারে নিত্যপণ্য-চাল, অপরিশোধিত সয়াবিন, চিনি, জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির দাম বেড়ে গিয়েছিল অস্বাভাবিক হারে। দুই-আড়াই বছরে বিশ্ববাজারে এসব পণ্যের বেশিরভাগের দাম প্রায় অর্ধেকে নেমে এলেও বাংলাদেশের চিত্র ভিন্ন।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) ১৮ আগস্টের প্রতিবেদনে দেখা যায়, থাইল্যান্ডে এখন ৫ শতাংশ ভাঙা চালের মেট্রিক টনপ্রতি দর ৩৮১ মার্কিন ডলার (এফওবি মূল্য, অর্থাৎ জাহাজভাড়া ছাড়া), যা এক বছর আগে ছিল ৬১৬ ডলার। এক বছরে দাম কমেছে ৩৮ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশে চালের দাম বরাবরই বাড়তির দিকে। বাংলাদেশ গত জুন পর্যন্ত আগের এক বছরে ১৪ লাখ টন চাল আমদানি করেছে। তারপরও দাম কমছে না। টিসিবির তথ্যানুযায়ী গত মে মাসের শেষ দিকে ঢাকার বাজারে মোটা চালের দাম ছিল ৫২-৫৫ টাকা কেজি, যা এখন ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। আর এটাই হচ্ছে বাংলাদেশের বাস্তবতা।
বর্তমানে বাজারে দেখা গেছে, গত মৌসুমে উৎপাদিত প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ এখন ১৪০-১৫০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। আর বাজারে নতুন আসা মুড়িকাটা পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা কেজি দরে, কোথাও কোথাও অবশ্য ১৩০ টাকায়ও বিক্রি করতে দেখা গেছে। অন্যদিকে আমদানি করা পেঁয়াজ মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকায়। যদিও প্রতি কেজি ভারতীয় পেঁয়াজের দাম ১৫-১৬ রুপি, যা আমদানি করে আনলে দেশের বাজারে ৪০-৪৫ টাকার মধ্যে বিক্রি করা সম্ভব। অথচ এই আমদানি করা ভারতীয় পেঁয়াজ দেশের পাইকারি বাজারগুলোয় এখন ৯০-১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তিন-চারদিন আগে পেঁয়াজ আমদানির খবরে দেশের পাইকারি বাজারে পণ্যটির দাম কেজিপ্রতি ২০-৩০ টাকা কমেছিল। কিন্তু পরে আবার দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
খুচরা বাজারে মানভেদে প্রতি কেজি শিম বিক্রি হচ্ছে ৬০-৮০ টাকায়। গত সপ্তাহে ছিল ৮০ থেকে ১০০ টাকা। গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে ১০ টাকা কমে বরবটি, বেগুন ও করলা বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকায়। একইভাবে কেজিতে ঢ্যাঁড়শ ও পটোল বিক্রি হচ্ছে ৪০-৫০ টাকায়। অন্যদিকে ফুলকপি ও বাঁধাকপির দাম আরও কমেছে। মাঝারি আকারের এ দুটি সবজির প্রতিটি বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকায়।
এছাড়া বেশ কয়েক মাস নিম্নমুখী ডিম ও মুরগির বাজার। ফার্মের ডিম প্রতি ডজন বিক্রি হচ্ছে ১১৫-১২০ টাকায়। পাড়া-মহল্লার দোকানে বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ১৩০ টাকা দামে। বাজারে এখন ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৫০-১৬০ টাকার মধ্যে। আর সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২৫০-২৭০ টাকায়। পোলটি মুরগির বিক্রেতারা বলছেন, শীতে সবজির প্রচুর সরবরাহ থাকলে মুরগি ও ডিমের চাহিদা কিছুটা কমে যায়। এ কারণেই দাম কমেছে।