পিঠার গন্ধে পরীর নাচ
৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৭:৫১
বিচিত্র কুমার
হেমন্তের সোনালি রোদে ভরে গেছে গ্রাম। সকালবেলার কুয়াশা তখনো কিছুটা জমে আছে খালের ধারে, আর ঘাসের ডগায় ছোট ছোট শিশিরবিন্দু ঝিকমিক করছে। বাতাসে মাটির গন্ধ, ধানের ক্ষেত পেকে উঠেছে, আর তার মাঝেই বাজছে দূরের ঢোলের আওয়াজ- ‘আজ নাকি পিঠা উৎসব হবে!’
খোকা দৌড়াতে দৌড়াতে গেল দাদির ঘরে। দাদি তখন চুলোর পাশে বসে, ধোঁয়া উঠছে ধীরে ধীরে। পিঠার মিশ্রণ তৈরি হচ্ছে বড় এক মাটির বাটিতে। নারিকেল কুরানো, গুড়, চালের গুঁড়া- সব একসাথে মিশে এমন এক গন্ধ ছড়াচ্ছে যে মনে হচ্ছে গোটা আকাশটাই মিষ্টি হয়ে গেছে।
খোকা বলল, ‘দাদি, আজ আমি সব পিঠা সাজিয়ে দেব, ঠিক রাজা-রানির মতো!’
দাদি হেসে বললেন, ‘তুই সাজাস, আমি ভাজি। তবে সাবধানে, গরম তেলটা যেন না ছোঁয়।’
চুলোর ধারে বসে খোকা যখন পিঠার গন্ধ নিচ্ছিল, তখন এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। ধোঁয়ার ভেতর থেকে যেন আলোর ঝলক দেখা গেল। তারপর সেই আলো রং বদলে ধীরে ধীরে তৈরি হলো একদল ছোট ছোট পরী! তাদের পাখা সোনালি, চোখে হাসি, আর পোশাকে শিশিরের ঝিলিক।
খোকা অবাক হয়ে বলল, ‘তোমরা কে?’
এক পরী মিষ্টি গলায় বলল, ‘আমরা হেমন্তপরীর দল! প্রতি বছর যখন প্রথম পিঠার গন্ধ ওঠে, তখন আমরা নেমে আসি নাচতে।’
দাদি কিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন না, শুধু হালকা বাতাসে তার আঁচল উড়ছিল। কিন্তু খোকা দেখছিল সেই পরীদের গোল হয়ে নাচ- চুলোর ধোঁয়ার ভিতর ঘুরছে, পিঠার গন্ধে তাদের নাচ আরও মধুর হয়ে উঠছে। তারা ঘুরছে, হাসছে, আর একসময় খোকার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে বলল, ‘তুমি ভালো ছেলে, তোমার পিঠার গন্ধেই আমাদের ডাকে।’
খোকা তখন গর্বে গরগর করছে। সে বলল, ‘তোমরা চাইলে আমি আরও পিঠা বানাব!’
পরীরা হেসে বলল, ‘না, না, বেশি বানালে গন্ধে আকাশ ভরে যাবে, তখন আমরা পথ খুঁজে পাব না!’
তারপর তারা একে একে চুলোর ধোঁয়ার ভেতর মিলিয়ে গেল। শুধু বাতাসে রয়ে গেল তাদের হাসির শব্দ আর মিষ্টি পিঠার গন্ধ।
দাদি অবাক হয়ে বললেন, ‘এই যে তুই হাসছিস একলা একলা, কী দেখলি?’
খোকা মুচকি হেসে বলল, ‘কিছু না দাদি, হেমন্ত পরীরা এসেছে নাচতে।’
দাদি হেসে মাথা নাড়লেন, ‘তাই বুঝি, এজন্যই পিঠাগুলোর গন্ধ এত মিষ্টি আজ!’
বিকেলে খোকা দৌড় দিল খেতের ধারে। আকাশ তখন রং বদলে যাচ্ছেÑ সূর্য লাল, বাতাসে ঠাণ্ডা। খোকা মনে মনে ভাবল, আগামী বছর আবার যখন দাদি পিঠা ভাজবেন, তখন সে জানালার পাশে বসে থাকবে। হয়তো তখন আবার সেই পরীরা আসবে- পিঠার গন্ধে, ধোঁয়ার আলোর ফাঁকে, নেচে যাবে হেমন্তের সোনালি সন্ধ্যায়।
আর তখন হয়তো সে সত্যিই দেখতে পাবে- হেমন্তের পরীরা কেমন করে হাসে, কেমন করে নাচে, যখন মাটির চুলায় উঠে প্রথম পিঠার গন্ধ।