রাজপথে তীব্র বিরোধিতা তবুও কেন ভোটে জাপা?
৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৭:৪১
॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কবে হচ্ছে, তা জানা যাবে আগামী ৭ ডিসেম্বরের পর। গত ২ ডিসেম্বর মঙ্গলবার এক নির্বাচন কমিশনার এমন তথ্য জানিয়েছেন। অর্থাৎ জাতীয় নির্বাচনের সব প্রস্তুতি একেবারেই শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচন কমিশনের প্রধান অংশীজন হচ্ছে রাজনৈতিক দল। দেশে এখন রাজনৈতিক মাঠে সক্রিয় বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বেশ কয়েকটি দল নির্বাচনী প্রচারেও রয়েছে। ছাত্র-জনতার দাবির মুখে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় দলটি ভোটে অংশ নিতে পারছে নাÑ এটা মোটামুটি নিশ্চিত। কিন্তু আওয়ামী লীগের মিত্ররা নির্বাচনে ঠিকই অংশ নিচ্ছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় মিত্র এবং সুবিধাভোগী জাতীয় পার্টি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে থাকা অনেক দলই ভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভায় থাকা এবং নৌকা প্রতীকে ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর দল জাতীয় পার্টি (জেপি) শুধু নির্বাচনে আসছে না, বরং জোট বন্ধ হয়ে ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে প্রস্তুতি নিয়েছেন। এছাড়া গোলাম মোহাম্মদ কাদেরের (জিএম কাদের) নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির বাইরে থাকা পার্টির অন্য প্রভাবশালী নেতারা নির্বাচনী জোট করার সব প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। সম্ভাব্য এ জোট আগামী ৭ ডিসেম্বর ঢাকার একটি হোটেলে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ হতে যাচ্ছে। অর্থাৎ ভোটের মাঠে শুধু ফ্যাসিবাদবিরোধীরাই নন, ফ্যাসিবাদের দোসররাও থাকছে। আর এ ফ্যাসিবাদের দোসরদের মূল টার্গেট হচ্ছে আওয়ামী লীগের ভোটকে নিজের ঘরে তোলা।
জিএম কাদেরের জাতীয় পার্টি কী করছে?
অতীতের সব ভোটের আগে জাতীয় পার্টিকে নানা নাটক মঞ্চায়ন করতে দেখা গেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা সা-রে-গা-মা ঠিকই রেখেছে। সর্বমহলে পরিচিত একটি প্রবাদবাক্য রয়েছে যে, ‘জাতে মাতাল-কিন্তু তালে ঠিক’। অর্থাৎ তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নিজেদের মধ্যে অভ্যন্তণীর দ্বন্দ্ব মঞ্চায়ন করে, কিন্তু পরে দেখা যায় ভেতরে ভেতরে তারা একঘাটে পানি খাচ্ছে। গ্রাম্য ভাষায় অনেকে বলে ‘রসুনের মূল এক জায়গায়’। অর্থাৎ জাতীয় পার্টি নিজেদের মধ্যে অভ্যন্তণীর দ্বন্দ্বে ডিসপ্লে (প্রদর্শন) করলেও সেটি অনেকটাই অবাস্তব। এবারও দলীয় কাউন্সিল নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়ায় জাতীয় পার্টি। জিএম কাদেরের নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জ করে বিকল্প কমিটি ঘোষণা দেয় দলটি। এ নতুন জাতীয় পার্টির ব্যানারে লাগানো হচ্ছে দলটির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ নতুন এ দলের সভাপতি। তিনি আওয়ামী লীগের সময় শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন, ভোটারবিহীন নির্বাচন এবং ডামি নির্বাচনখ্যাত নির্বাচনে সংসদ সদস্য মনোনীত হয়েছিলেন। তাকে সামনে রেখে বলয় শক্তিশালী করছে জাতীয় পার্টি এবং আওয়ামী দোসররা। অন্যদিকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে জাতীয় পার্টির তত্ত্বাবধানে ১৪ দলীয় জোটের সবাই ভোটের মাঠে আসার ছক আঁকছে।
জাপাসহ ১৪ দল নিষিদ্ধ দাবি, তবুও কেন তারা নির্বাচনে?
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধে প্রথম জোরালো দাবি তোলেন এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলীয় সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ। পরে সেই আন্দোলন সাংগঠনিক রূপ নেয়। একপর্যায়ে সব দলের লোকেরা একত্রিত হয়ে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি তোলে। ফলে সরকার অনেকটা বাধ্য হয়ে দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত করে। একইভাবে জাতীয় পার্টিসহ ১৪ দলীয় জোট শরিকদের নিষিদ্ধে রাজপথে দাবি ওঠে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ আট দলীয় জোট, নাগরিক অধিকার পার্টি এবং জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলই চাচ্ছে জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হোক। একইসঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটকেও নিষিদ্ধ করা হোক। জামায়াত, এনসিপি ও তাদের সমমনা আরও ছয়টি দল যেসব দাবিতে আন্দোলনের মাঠে রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম দাবিটি হচ্ছে জাতীয় পার্টি (জাপা) ও ১৪ দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা। ১৪ দলের একমাত্র উল্লেখযোগ্য দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম ইতোমধ্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাকি দলগুলোর মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ ছাড়া কারও নাম মনে করতে পারবে এমন রাজনীতি সচেতন ব্যক্তির সংখ্যা খুবই কম। এ দুটি দলের দুই শীর্ষনেতা ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন ও জাসদের হাসানুল হক ইনু এখন জেলে। ফলে ফ্যাসিবাদের দোসরদের মধ্যে বাকি রইল একমাত্র জাতীয় পার্টি। সন্দেহাতীতভাবে সত্য যে, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের করা তিনটি নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়ার দায় জাতীয় পার্টিকে নিতে হবে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বড় বড় দলগুলো যখন আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচেন না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সরকারি সুবিধাভোগী জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগকে নির্বাচনী তরী পার হতে সর্বোচ্চ সহায়তা করেছে। ফলে এখন যারা জাতীয় পার্টি এবং ১৪ দলের বাকি শরিকদের নিষিদ্ধ করার দাবির যুক্তি রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো সূত্র বলছে, সরকারে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা রয়েছেন, তারা চাচ্ছেন না আর কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হোক। তারা চান আওয়ামী লীগ ছাড়া বাকিরা নির্বাচনী মাঠে আসুক, সকলে মিলে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হোক।
ব্যারিস্টার আনিসুলের নেতৃত্বে আসছে ১৬ দলীয় জোট
ভেঙে বিভিন্ন খণ্ডে ভাগ হওয়া জাতীয় পার্টির কয়েকটি খণ্ডাংশ ও অন্য কয়েকটি দল মিলে নতুন একটি নির্বাচনী জোট শিগগিরই আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। এ জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি থেকে বের হয়ে নবগঠিত জাতীয় পার্টির সভাপতি ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। অবশ্য জাতীয় পার্টি এ অংশটি মূল জাতীয় পার্টির দাবিদার এবং আনিসুল ইসলাম মাহমুদ দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। জাপার এ অংশে দলটির সাবেক একাধিক মহাসচিব ও অধিকাংশ প্রেসিডিয়াম সদস্য রয়েছেন। ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ আসছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি (জেপি) সহ বেশকিছু দল নিয়ে নতুন একটি নির্বাচনী জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। আগামী ৭ ডিসেম্বর এ জোট আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। অর্থাৎ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই এ জোটের আত্মপ্রকাশ হতে যাচ্ছে। উদ্যোক্তারা চেষ্টা করছেন সম্ভাব্য জোটকে বৃহত্তর একটি জোটে রূপ দিতে। এ বিষয়ে জাতীয় পার্টির (জেপি) সভাপতি আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এ প্রতিবেদককে বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে একটি রাজনৈতিক জোট গঠন হচ্ছে, এটি একটি বাস্তবতা। তিনি জানান, এ জোটের মূল উদ্যোক্তা হচ্ছেন ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এবং জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার। তিনি জানান, শুধু বিভিন্ন সময় ভাগ হওয়া জাতীয় পার্টিগুলো নিয়ে জোট নয়, অন্য আরও বেশ কয়েকটি দল সম্ভাব্য এ জোটে আসতে পারে। জানা গেছে, সম্ভাব্য নতুন জোটের মুখপাত্রের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারকে। রুহুল আমিন হাওলাদারের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হলে তিনি বলেন, আমরা নির্বাচন সামনে রেখে বৃহত্তর জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছি। এ জোটে ইতোমধ্যে নিবন্ধিত ৫ দল অংশ নিচ্ছে, বাকিরা অনিবন্ধিত। আমরা জোটের মাধ্যমে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি।
কেন সামনে রাখা হচ্ছে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলামকে
জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার জন্য জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা দলগুলো সরকারকে চাপে রেখেছে। কিন্তু সরকার এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। রাজনৈতিক চাপের কারণে জিএম কাদেরকে সামনে আনা যাচ্ছে না; অন্যদিকে সরকার চাচ্ছে সম্ভাব্য জাতীয় নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক দেখাতে, সেক্ষেত্রে যত বেশি দল নির্বাচনে অংশ নেবে, তত বেশি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলা যাবে, আর এ চিন্তাকে মাথায় রেখে নির্বাচনে ফ্যাসিবাদবিরোধীদেরও সুযোগ দিচ্ছে সরকার। অন্যদিকে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ সামনে রেখে নতুন জোট গঠনের প্রক্রিয়া কেন? জনমনে এমন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্যারিস্টার আনিসুলের একজন ঘনিষ্ঠবন্ধু সরকারের একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা, উপদেষ্টা পরিষদের আরও বেশ কয়েকজন এমন রয়েছেন যাদের সঙ্গে আনিসুল ইসলাম মাহমুদের সম্পর্ক ভালো। অন্যদিকে বিএনপির টপ থ্রিতে থাকা একজন প্রভাবশালী নেতার আনিসুল ইসলাম মাহমুদের বন্ধু এবং আনিসুল ইসলাম নিজেও এক সময় বিএনপির টিকিটে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। এ কারণে তাকে সামনে রেখে এগোচ্ছে জাতীয় পার্টিÑ এতে সুবিধা হচ্ছে সরকার থেকে চাপ আসবে না; অন্যদিকে বিএনপি থেকে সাপোর্ট পাওয়া যাবে। নির্বাচনে এমন নানা হিসাব নিকাশ দৃশ্যপটে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ।
বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান মনে করেন, জাতীয় পার্টিসহ ১৪ দলের বাকি শরীকদেরও নিষিদ্ধ করা হোক। তার যুক্তি হচ্ছে, গত বছরের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গুলি চালানোর সিদ্ধান্ত হয় ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে। আর আওয়ামী লীগ যে সাড়ে ১৫ বছর রাজত্ব করতে পেয়েছে তার কৃতিত্ব জাতীয় পার্টি এবং ১৪ দলের। ফলে এদেরও নিষিদ্ধ করা সর্বস্তরের মানুষের দাবি। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মোহাম্মদ কামারুজ্জামান, মির কাসেম আলী মিন্টু, আবদুল কাদের মোল্লা এবং সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ অনেক নেতাকে আওয়ামী লীগ মিথ্যা মামলায় ফাঁসি দিয়ে হত্যা করেছে। বিনা অপরাধে বছরের পর বছর বন্দী করে রাখা হয়েছিল খালেদা জিয়াকে, মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে। এসবই আওয়ামী লীগ করতে পেরেছে জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের শরিকদের কারণে। ফ্যাসিবাদের এ দোসররা আবার সংসদে গেলে তারা ফ্যাসিবাদকেই পুনরায় প্রতিষ্ঠা করতে চাইবে এবং এরা বিপ্লবীদের ঝুঁকিতে ফেলবে। মোস্তাফিজুর রহমান ইরানের দাবি এদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে দ্রুত গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনা উচিত।
বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ছাত্র-সংগঠন, বাংলাদেশ ছাত্রসমাজের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেছেন, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখানোর জন্য ফ্যাসিস্টদের দোসরদের ভোটে আনার কোনো যৌক্তিকতা নেই। বরং তারা গণহত্যার সহযোগী ছিল তাদের বিচারের আওতায় আনা জরুরি।