নোট অব ডিসেন্ট : ভোট অব ডিসেন্ট
২৮ নভেম্বর ২০২৫ ১০:৪২
॥ মুহাম্মদ ওয়াছিয়ার রহমান ॥
৫ আগস্ট ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকার জয় বাংলা হওয়ার পর দেশবাসীর কাছে সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন- তিনটি ইস্যু সামনে আসে। ৮ আগস্ট প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার গঠন করার পর তিনি জনআকাক্সক্ষা অনুসারে সংস্কারকাজে হাত দেন। বেশ কয়েকটি সংস্কার কমিশন ও একটি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করেন। বড় একটি দলের দাদাগিরিতে অন্যসব সংস্কার কমিশনের কাজ মুখ থুবড়ে পড়েছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছিল, কিন্তু সেটা এখন হাসপাতালে ভর্তি হতে যাচ্ছে। অবস্থা এখন এমন পর্যায়ে যাচ্ছে, রাগ করে যদি প্রফেসর ইউনূস চলে যান দেশ একটা মহাসংকটে পড়বে। সবচেয়ে লাভবান হবে পতিত সরকার। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম চলাকালে রাজনীতিবিদদের বক্তব্য ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে কয়েকটি বিষয় মনে হয়েছে, তা হলো-
রাজনীতিতে ক্যান্সার : আমাদের দেশে রাজনীতিতে ব্যক্তিতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র, দলতন্ত্র, ছবিতন্ত্র, এলাকাতন্ত্র, অর্থতন্ত্র, জুলুমতন্ত্র ও সিন্ডিকেটতন্ত্রের মতো ইস্যু রাজনীতিকে কুরে কুরে খাচ্ছে। অধিকাংশ দলের মধ্যে ব্যক্তিতন্ত্রের দৌরাত্ম্য বিরাজমান। মনে হয় দলের মধ্যে উনি ছাড়া আর কোনো যোগ্য লোক নেই। তার অনুপস্থিতিতে তার পরিবারের সদস্য দায়িত্বে আসছে বা আসার প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এজন্য বেশকিছু দল একক ব্যক্তির নেতৃত্বে চলছে। সেক্ষেত্রে দলের চেয়ে ব্যক্তি গুরুত্ব অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। ঐ ব্যক্তি মরার আগ পর্যন্ত দলের দায়িত্বে তিনি ছাড়া অন্য কেউ আসতে পারছে না। গত কয়েকদিন আগে শেখ হাসিনার বক্তব্যে কিন্তু একটু ভিন্ন সুর পাওয়া গেছে। আওয়ামী লীগ কিন্তু ব্যক্তি ও পরিবারতন্ত্র থেকে বের হয়ে আসার পথে। দেখা যাচ্ছে সংগঠনের কেন্দ্রীয় অফিস থাকার পরও সভাপতি, চেয়ারম্যান বা চেয়ারপারসনের অফিস আলাদা থাকছে এবং কেন্দ্রীয় অফিসের চেয়ে ঐ অফিস গুরুত্ব কম পাচ্ছে। এজন্য বড় বড় দলের দলীয় নির্বাচনে প্রার্থী থাকে একজন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় রাজনীতিক জিয়াউর রহমান খুন হয়েছেন, শেখ মুজিব খুন হয়েছেন, খালেদা জিয়া বড় অপরাধ না করেও জেল খেটেছেন, তারেক রহমানের হাড় ভেঙেছে। রাজনীতিবিদদের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেবে- এটাই দেশবাসীর কামনা।
নোট অব ডিসেন্ট : জাতীয় ঐকমত্য কমিশন দীর্ঘ প্রায় ৮০ দিনের কাছাকাছি প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়ে একটা পর্যায়ে পৌঁছায়। বেশ কয়েকটি বিষয় বিএনপিসহ কয়েকটি দল নোট অব ডিসেন্ট দেয়। যেগুলো নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়। নোট অব ডিসেন্ট কোনো অন্যায় বিষয় নয়; বরং এটি কোনো দলের একমত না হওয়ার প্রতিচ্ছবি। দুনিয়ার যেকোনো সভায় ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংগঠন বা সংসদে দ্বিমত পোষণ করে নোট অব ডিসেন্ট দেয়ার রীতি আছে। নোট অব ডিসেন্ট দেয়ার পরও বেশিরভাগের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং সভায় উপস্থিত সবাইকে তা মেনে নিতে হয়। তবে নোট অব ডিসেন্টগুলো রেকর্ডে থাকে। এর বেশি কিছু নয়। বাংলাদেশে নোট অব ডিসেন্টের নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হচ্ছে। নোট অব ডিসেন্ট দেয়ার পর অধিকাংশের মতামত অনুসারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলে সেটা সবাইকে মেনে নিতে হয়। সেই নোট অব ডিসেন্ট নিয়ে আর কোনো উচ্চবাচ্য হয় না। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় বিএনপিসহ আর ২-৪টি দল এ নোট অব ডিসেন্ট নিয়ে নানাবিধ অপ্রচার চালাচ্ছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে বিশ্বাস ভঙ্গের অভিযোগ করছে তারা। সারা দুনিয়ার রীতি উপেক্ষা করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন বিএনপির নোট অব ডিসেন্টগুলো গ্রহণ করতে পারে? তাছাড়া নোট অব ডিসেন্টগুলো তো জুলাই সনদে থাকছেই।
গণভোট কখন হওয়া উচিত : জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করতে গণভোটের প্রশ্ন আসে। গণভোট ও তার প্রক্রিয়া নিয়ে নানা মত আসছে। যেহেতু জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কোনো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নয় এবং দেশের এ ৩০ বা ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোট জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না, তাই এ কমিশনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গণভোটের প্রয়োজন আছে। কীভাবে হবে গণভোট? একাধিক মতামত এলেও অধিকাংশ সদস্যদের মতের বিপক্ষে যারা মত দিয়েছেন বা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন, তাদের ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্টগুলো গণভোটে দিলে জনগণই প্রকৃত রায় দিবে। গণভোট কখন হবে- এ প্রশ্নটি বিরাট ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নির্বাচনের আগে অনেক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে। নির্বাচন ঘনিয়ে এলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব বা মতভেদ বাড়ে। তার ফলে তখন দেশের রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। এমনকি হানাহানি ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে। সুতরাং নির্বাচনের সাথে গণভোট হলে হানাহানির আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। প্রাণহানি অবশ্যই গণভোটের চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সব মিলিয়ে নভেম্বরের মধ্যে গণভোট হলে হানাহানি ও প্রাণহানি কমানো সম্ভব হতে পারে। এ রকম ঘটনা ঘটলে গণভোট আস্থাহীন হতে পারে। নির্বাচন নিয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপিত হলে গণভোটও একই সাথে প্রশ্নের মুখোমুখি হবে। যারা গণভোট চান না, তারা এটি কাজে লাগিয়ে গোলযোগ সৃষ্টি করতে পারেন। এমনকি যারা নির্বাচন চান না বা নির্বাচনে জিততে পারবেন না, তারাও এটি কাজে লাগিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারেন। সুতরাং বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পৃথক দিনে হওয়াই যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয়। নির্বাচনের সময় অনেক স্থানে গোলযোগ হয়। এমনকি ভোটগ্রহণ বন্ধ বা স্থগিত হয়। এরকম ঘটনা ঘটলে গণভোটের হালহকিকত খারাপ হতে পারে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় গণভোটের ক্যাম্পেইনিং হলে দল বা ব্যক্তির বক্তব্যে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হবে, তাতে হানাহানির ঘটনা বৃদ্ধি পেতে পারে। এমনকি নির্বাচনের সাথে গণভোট হলে যে প্রাণহানির ঘটনার আশঙ্কা আছে তার দায় কে নেবে?
রাজনীতিকদের অতীত খতিয়ান : আমরা ৭ মার্চ ১৯৭৩ সালের নির্বাচন ও হাওয়াই জাহাজে ভোট পরিবহন দেখেছি। জিয়াউর রহমানের হ্যাঁ/না ভোট দেখেছি। ৩ মার্চ ১৯৮৮ সালে এরশাদের সংসদ নির্বাচন দেখেছি। ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সালে খালেদার নির্বাচন দেখেছি। বয়স বাড়িয়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি কে.এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান বানানোর ন্যুচ দেখেছি। ৫ জানুয়ারি ২০১৪ সালে রকিব মার্কা নির্বাচন দেখেছি। ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ সালে নূরুল হুদা মার্কা পূর্বের রাতের নির্বাচন দেখেছি। ৭ জানুয়ারি ২০২৪ সালে কাজী হাবিবুলের আমি-ডামি মার্কা নির্বাচন দেখেছে। এরশাদের বিরুদ্ধে ৯ বছর বহু আন্দোলন ও প্রাণহানির শেষে কেয়ারটেকার সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের পর ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর কেয়ারটেকার বিধান সংবিধানে সংযোজন প্রশ্নে বিএনপির আমলনামা দেখেছি। তার জন্য ১৯৯৩-৯৬ মেয়াদে অনেক প্রাণহানি হয়েছে। ২০১১ সালে কেয়ারটেকার সরকার বিধান সংবিধান থেকে উঠিয়ে দেয়া সবই রাজনীতিকদের আমলনামা। আজকে সাংবিধানিক পদগুলোয় নিয়োগ নিয়ে বিএনপির দাবি, একই ব্যক্তি দলীয় প্রধান ও সরকারপ্রধান করার প্রস্তাব, গণভোট এবং পিআর নিয়ে বিতর্ক বিএনপির সংস্কার নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। ডাকসু থেকে রাকসু নির্বাচনের ফলাফলের কারণে গণভোট নিয়ে বিএনপির আতঙ্ক দৃশ্যমান।
রাজনীতিতে দাদাগিরি অচল : এদেশের মানুষ ৪৭-এ সংগ্রাম করেছে, ৫২-তে সংগ্রাম করেছে, ৬৯-এ সংগ্রাম করেছে, ৭১-এ ৯ মাসে দেশ স্বাধীন করেছে, ৯ বছরে এরশাদকে তাড়িয়েছে, ১৯৯৬ সালে খালেদা জিয়াকে দেড় মাসে প্যাভিলিয়নে পাঠিয়েছে এবং ২০২৪ সালে রাজনৈতিক দলের সক্রিয় অংশ গ্রহণ ছাড়া লৌহমানবী শেখ হাসিনাকে জয় বাংলা করেছে। জনগণ এখন রাস্তায় নামতে শিখেছে। সুতরাং কোনো অপশক্তি সংস্কারকে বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না। ব্যাংক খেকোদের যারা প্রশ্রয় দিচ্ছে, স্বৈরাচারকে যারা পুনর্বাসন করতে চাচ্ছে জনগণই নোট অব ডিসেন্টধারীদের ভোট অব ডিসেন্ট দিয়ে ছাড়বে। জনগণের তিন দাবি সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন এটা তারা আদায় করেই ছাড়বে। আমাদের বান্ধবী রাষ্ট্র ভারত, কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় দারাগিরি দেখাতে গিয়ে জয় বাংলা হয়েছে। সুতরাং রাজনীতিবিদরা অত্যন্ত হিসাব করে পদক্ষেপ নেবেন বলে আশা রাখি। জনগণ যেহেতু রাস্তায় নেমেছে, প্রাণ দিতে শিখেছে। সুতরাং রাজনীতিতে দাদাগিরি এখন অচল।