যাকিউল হক জাকী : সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব তৈরির কারিগর
২১ নভেম্বর ২০২৫ ১১:১৯
॥ আফসার নিজাম ॥
প্রথম বয়ান : যাকিউল হক জাকী সম্পর্কে আলাপ তোলা প্রয়োজন এজন্য যে, একজন সাংস্কৃতিক সংগঠক তার কাবিলা কীভাবে নির্মাণ করে, তার চিত্র হাজির করা- যাতে করে পরবর্তীতে সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব তৈরি হওয়ার সময় সাংস্কৃতি নেতৃত্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া যায়, যা পাঠের মাধ্যমে তরুণ নেতৃত্ব নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পারে। আমরা যুগে যুগে সাংস্কৃতিক সংগঠকের ভূমিকা দেখতে পাই। তারা কীভাবে একটি সমাজকে পুনর্নির্মাণের নিয়ামক হয়ে ওঠে, তার তালাশ আমাদের রাখা প্রয়োজন। নিজে একজন সংস্কৃতজন হয়ে ওঠার সাথে সাথে তার অনুসারী বা সহকারী তার মতোই তৈরি করার ইরাদাকে আমলে রূপান্তর করতে পারা যায়। যার ফলে নিজে সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি পরবর্তী কওমের কাছে নেতৃত্বকে পৌঁছে দেয়া সহজ হয়। নেতৃত্ব তৈরির বিষয়টি আমরা নবী ও রাসূলদের মাঝে দেখতে পাই। আমাদের জাতির পিতা ইবরাহীম আ. তার পুত্র ইসমাইল আ., ইয়াকুব আ. তার পুত্র ইউসুফ আ., মুহাম্মদ সা. তাঁর সাথী আবু বকর, ওমর, আলী রা.কে দেখি। অপরদিকে সক্রেটিস তার সাথী প্লেটো, প্লেটো তার সাথী এরিস্টটল। হাদীস সংগ্রাহক ইমাম বুখারী তার ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেন ইমাম মুসলিম, ইমাম তিরমিযী এবং ইমাম নাসাঈ। লেলিনের উত্তরসূরি স্টালিন, ফিদের কাস্তোর উত্তরসূরি চেগুয়েভারা। এরকম ব্যক্তিত্ব তার রেপলিকা তৈরির করে। যে নেতৃত্ব নিজের রেপলিকা তৈরির করতে ব্যর্থ সে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি তার কওমও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হাল আমলে আমরা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সংস্কৃতজন প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম, তার সহযোদ্ধা অধ্যাপক শাহেদ আলী, অধ্যাপক আবদুল গফুরকে সামনে রাখতে পারি। আমরা সামনে রাখতে পারি সংস্কৃতি সাধক আবদুল মান্নান তালিব, যার সহযোদ্ধা শাহ আবদুল হান্নান, অধ্যাপক মুহাম্মদ মতিউর রহমান, মোহাম্মদ আবদুল মান্নান, মাহবুবুল হক প্রমুখ। পাকিস্তান আমল থেকেই তারা সংস্কৃতিকে উপস্থাপনের সাথে সাথে সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব তৈরির করতে সদা তৎপর ছিলেন। যার সিলসিলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিয়া মুহাম্মদ আইউব তার উত্তরসূরি কবি হাসান আলীম, মতিউর রহমান মল্লিক। মল্লিক তার সাংস্কৃতিক জীবনে শুদ্ধ সংস্কৃতিকে বাংলাদেশের প্রান্তিক অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে ক্রমাগত চেষ্টা করে গেছেন। যে কজন মানুষ জীবনে সফল হয়েছে, তাদের মধ্যে মল্লিকের নাম গণ্য হবে বলে আমি মনে করি। মল্লিক প্রান্তিক জনপদে সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে তার নেতৃত্ব দেয়ার মতো মানুষ তৈরির কারখানা খুলে বসে। সেই কারখানার একজন সংস্কৃতজন যাকিউল হক জাকী। পরবর্তীতে সে নিজেই একজন সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব তৈরির কারিগরে উপনিত হন।
দ্বিতীয় বায়ান : সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব একটি সমাজের চিন্তা, মনন, মূল্যবোধ, ধর্ম, সংস্কৃতি ও জীবন প্রণালীকে সঠিক অভিমুখে চালিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। এ নেতৃত্ব কেবল প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনার দক্ষতা নয়, বরং এটি জীবন প্রাণালী পরিচালনার জন্য শিল্প হিসেবে বিবেচিত। এ সংস্কৃতজনের বা নেতার প্রধান কাজ হলো উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়িত করার জন্য কর্মীদের উৎসাহিত ও পরিচালনা করা। পাশাপাশি দক্ষ ও সৃজনশীলন নেতৃত্ব তৈরির জন্য নিবেদিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে হাজির করা। সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়াকে ‘কারিগর’ শব্দের রূপকে ব্যাখ্যা করা যায়। কারণ এটি এমন একটি সক্রিয়, দীর্ঘমেয়াদি এবং সৃজনশীল প্রক্রিয়া, যা সমাজের আদর্শগত কাঠামোকে নতুন নকশায় উপস্থাপন করে। বিদ্যমান প্রক্রিয়াকে প্রশ্ন করে চলমান পথের সম্পর্কে ত্বরান্বিত করে। ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখিত সংস্কৃতিজনরা সাহিত্য, দর্শন ও কর্মের মাধ্যমে সমাজ ও সংস্কৃতির নকশা প্রণয়ন করেছেন। তারা কেবল নেতা ছিলেন না, তারা ছিলেন সেই কারিগর, যিনি জ্ঞান, মূল্যবোধ এবং প্রেষণার মতো উপাদানগুলোকে একত্রিত করে সমাজের নতুন কাঠামো তৈরির করে গেছেন। সংস্কৃতির কারিগর কখনোই নিজের স্বার্থকে সংগঠনের স্বার্থের ওপরে স্থাপন করেন না। সাংস্কৃতিক কারিগরের কাজ হলো ব্যক্তিগত লোভ, দাম্ভিকতা এবং অযোগ্যতা পরিহার করে দূরদৃষ্টির মাধ্যমে নেতৃত্ব তৈরির ভিত্তি স্থাপন করা, যা একটি নৈতিক ভিত্তি তৈরির করে। এ নৈতিক স্থাপত্যই প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের স্থিতিশীলতা ও সাফল্যকে মজবুত করে। নয়া কাঠামোর সংস্কৃতিকে মজবুত এবং নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টির মাধ্যমে নিজের অসমাপ্ত কার্যক্রমকে সামনের এগিয়ে নিতে সহায়তা করে।
মানুষের অর্জিত জ্ঞান, বিশ্বাস, শিল্পকলা, নৈতিকতা, আইন, রীতিনীতি এবং অন্য যেকোনো দক্ষতা ও অভ্যাসের জটিল সমষ্টির পরিবর্তন ও উৎকর্ষ সাধনের লক্ষ্যে কাজ করে। সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব মূলত প্রতীকী ও মূল্যবোধকেন্দ্রিক পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে সমাজের মূল্যবোধ, মানবিক কল্যাণ এবং আচরণের পরিবর্তনকে প্রভাবিত করে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব মোকাবিলা করার জন্য নিজেদের মধ্যে সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব তৈরি করার প্রয়াস যারি রাখে। যে যতো বেশি অনুসারী তৈরি করে এবং তার অনুসারীদের নেতৃত্ব দেয়ার জন্য নতুন নেতৃত্ব তৈরি করে সেই প্রকৃত সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব তৈরির কারিগর। জাকীর গুণাবলি মধ্যে সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব তৈরির গুণাবলি প্রকট ছিলো।
তৃতীয় বয়ান : আমাদের আলাপ সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব তৈরি করার ফজিলত বয়ান করা। যাকে নিয়ে এ আলাপের সূত্রপাত তাকে একটু জেনে নিই। তিনি আমাদের সময়ে একজন অল্প সময়ের সফর করা সংস্কৃতিজন। প্রকৃতপক্ষে অধিক সৃজনশীল ও মননশীল ব্যক্তিরা অল্প সময়ে অধিক সময়ের কাজ সম্পাদন করে পৃথিবী ত্যাগ করেন। যাকিউল হক জাকীও তেমনি একজন সংস্কৃতজন। অল্প সময়ে পৃথিবীর সফর শেষ করেছেন। তিনি বাংলাদেশের আদর্শভিত্তিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক বহুমুখী ও প্রভাবশালী সংস্কৃতজন। তার সৃজনশীল কাজ সমাজে উপস্থাপিত না হলেও তিনি সৃজনশীলদের সৃজন উপস্থাপনের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। মানে একজন সফল সংগঠন হিসেবে সমাজে হাজির থেকেছেন। সংস্কৃতিসেবীদের সাথে থাকতে হলে নিজেও সৃজনশীল মানুষ হতে হয়। জাকী তার সৃজনশীলতার সাক্ষর রেখেছেন কবিতায়, সংগীতে, সাংবাদিকতায় সর্বোপরি একজন সুসংগঠিত সাংস্কৃতিক নেতা হিসেবে। জাকী সর্বশেষ সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের দায়িত্ব পালন করেছেন ‘সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্রে’র সভাপতি হিসেবে। তার ‘স্বপ্নচারী ও সম্মোহনী’ ব্যক্তিত্ব আদর্শকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক ধারাকে কেবল সৃজনশীল প্রেরণা দেয়নি, বরং তাকে একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক রূপ দিয়েছে। তাঁর এ সমন্বিত পরিচয় তাঁর নেতৃত্বের বহুমাত্রিক প্রকৃতির ইঙ্গিত হাজির করেছে। আমরা জাকীর ব্যক্তিগত সৃজনশীলতা, সাংগঠনিক দূরদর্শিতা এবং আদর্শিক সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর সুদূরপ্রসারী প্রভাবকে আমরা হাজির করতে চেষ্টা করবো। এটা তার প্রতি আলাপের প্রথম ধাপ হিসেবে দেখতে পারি। সময়ের সাথে সাথে তার প্রতি পূর্ণ আলাপ হাজির হবে এটা আমরা বিশ্বাস করি। জাকী জন্মগ্রহণ করেন বগুড়া জেলার সোনাতলা গ্রামে ১৯৮৩ সালের ৩ জানুয়ারি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কিডনি ও হৃদরোগসহ জটিল রোগ নিয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইবনে সিনা হাসপাতালে ৩১ মে ২০২৫ শনিবার রাত ১০টায় ইন্তেকাল করেন। ১ জুন সকাল সাড়ে ৮টায় নিজ জন্মভূমি বগুড়ায় দ্বিতীয় জানাজা ও বেলা সাড়ে ১০টায় পৈতৃক ভূমি জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে তৃতীয় জানাজা শেষে পৈতৃক গোরস্তানে মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হয়।
একাডেমিক লেখাপড়া মানুষকে প্রকৃত মানুষ করে গড়ে তোলে না। আবার একজন মানুষকে সৃজনশীল ও মননশীল জনবান্ধব নেতা হিসেবেও গড়ে তোলে না। তার পরিবেশ, প্রতিবেশ সর্বোপরি তার পরিবার যে আদর্শ চিন্তা মননে ধারণ করে তাকে সম্বল করে তার পথ নির্মাণ হয়। মাঝে মাঝে মানুষ সে পথ থেকে দূরে সরে যায়। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষক বা নেতা যখন তার স্খলন অবলোকন করে, তখন তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। সেই ফিরিয়ে আনার কাজটি জাকী সারা জীবন করেছন এবং তার মতো এমন নেতা তৈরি করতে কারিগরের কাজটি করে গেছেন। একাডেমির কথা আলাপ করছিলাম। একাডেমিও মানুষে তার পথ বাতলে দেয়ার কাজটি করে। তার জন্য তাকে বিদ্যালয়ের চৌকাঠ পাড়ি দিতে হয়। জাকী যে বিদ্যালয়ের চৌকাঠ পাড়ি দিয়েছেন, তা হলো তা’মীরুল মিল্লাত এবং ঢাকা আলিয়া মাদরাসা। মাদরাসাকেন্দ্রিক শিক্ষাজীবন তাঁর আদর্শিক অবস্থানের একটি শক্তিশালী ও সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে তুলেছিল। আদর্শভিত্তিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উৎস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি কেবল ধর্মীয় জ্ঞান সরবরাহ করে না, বরং একটি নির্দিষ্ট জীবনাদৃষ্টি এবং বৃহত্তর সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরি করে। জাকীর ক্ষেত্রে এ বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে। তার কাছে শিল্প ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম নিছক বিনোদনের মাধ্যম হাজির হয় না, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম তার কাছে একটি মূল্যবোধ-সংরক্ষণের মিশন বা বৃহত্তর আদর্শিক লক্ষ্য হিসেবে হাজির ছিলো। এটিই তাঁর স্বপ্নচারী নেতৃত্বের মূল প্রেরণা ছিলো বলে আমাদের কাছে প্রতিয়মান হয়।
চতুর্থ বয়ান : ঢাকা আলিয়ায় পাঠের সময়ই তিনি ছাত্র রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন। সে সময় তার রাজনৈতিক আদর্শকে সৃজনশীলভাবে উপস্থাপনের জন্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে কাজ শুরু করেন। এ সময় জাকী উপলব্ধি করেন রাজনৈতিক কার্যক্রমে মানুষ যত সহজে সম্পৃক্ত হয়, সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে তত সহজে সম্পৃক্ত হয় না। রাজনৈতিক কর্মী তৈরি হওয়া যত সহজ, সাংস্কৃতিক কর্মী তৈয়ার হওয়া তত সহজ না। কর্মী তৈরি হইলেও নেতা তৈরি হতে বেশ সময় নেয় বা নেতা হয়ে ওঠার আগেই তার ছাত্রজীবন শেষ হয়ে যায়। তিনি আর সংস্কৃতির বৃহৎ ময়দানের হাজির থাকে না। আবার রাজনৈতিক নেতারা যতটা ব্যক্তিগতভাবে উদার সাংস্কৃতিক নেতারা ততটাই জটিল। তারা চিন্তার জটিলতায় ঘুরপাক খায়। যেমন আল্লাহ সূরা আশ শুয়ারায় বলেন, ‘তোমরা কী দেখো না তারা উপত্যকায় উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায়। আর তারা যা বলে তা করে না।’ এই চরিত্র অনেক আদর্শবাদী সংস্কৃতজনদের মধ্যেও বিরাজ করে। কারণ রাষ্ট্রের রন্দ্রে রন্দ্রে প্রবেশ করে আছে জাহেলি জীবনধারার অনুষঙ্গ। তার থেকে তারাও মুক্ত থাকতে পারছে না। সেই প্রেক্ষিতে তিনি তার কার্যক্রম সাংস্কৃতিক কর্মী না হয়ে সাংস্কৃতিক নেতা হওয়ার দিকে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন এবং নিজে নেতা হওয়ার সাথে সাথে নেতা তৈরি করার কারিগরের কাজটি বেছে নিয়েছেন। এজন্য তিনি নিজে শিল্পী, কবি ও সাংবাদিকতার ব্যক্তিগত উৎকর্ষ সাধন না করে সামষ্টিক উৎকর্ষ সাধনে মনোনিবেশ করেছেন।
আলিয়ার পরবর্তীতে জাকী বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী’র সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ দায়িত্ব পালনকালে জাকী প্রথমেই তাঁর শক্তিশালী সাংগঠনিক দক্ষতা এবং আদর্শিক প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে সংগঠনকে বিশ্বব্যাপী প্রচারের কাজে হাত দেন। তিনি ইসলামী সংস্কৃতির আধুনিক উপস্থাপনা; বিশেষ করে অডিও-ভিজুয়াল প্রকাশনার ক্ষেত্রে সংগঠনটির অগ্রগতিকে সহজ করার কাজে যুক্ত হন। সাইমুমের অভিজ্ঞতাই সাংস্কৃতিক উৎপাদনকে একটি আদর্শিক লক্ষ্যের দিকে চালিত করার শক্তি অর্জন করেন। তার ভেতরকার দুর্বলতার প্রশ্নবিদ্ধ না করে তার থেকে শক্তি সঞ্চয় করে পরবর্তী সুযোগের অপেক্ষা করেন এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষমতা তার আওতায় আসার সাথে সাথেই তা প্রয়োগ করেন।
পঞ্চম বয়ান : সংস্কৃতিকে ভালোবাসার কারণে জাকী সংস্কৃতির বাইরের পেশাকে সচেতনভাবেই পরিহার করেছেন। আমরা আগেই বলেছি, সাংস্কৃতিক কর্মীর অভাব না হলেও সাংস্কৃতিক নেতার অভাব সর্বকালেই পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। সেই জায়গা পূরণের জন্য তিনি নিজেকে বৃহৎ ত্যাগের সামনে হাজির করেছেন। পেশাগত জীবনে মিডিয়ার কৌশলগত ব্যবহার করে জাকী ‘দিগন্ত টেলিভিশনের প্রযোজক ও আর্কাইভ ইনচার্জ’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। মূলধারার মিডিয়ায় এ ধরনের পেশাদার অভিজ্ঞতা অর্জন তাঁকে শিখিয়েছিলো কীভাবে উচ্চ পেশাদার মান বজায় রেখে ব্যাপকভাবে জনগণের কাছে সত্য বার্তা পৌঁছানো যায়। দিগন্ত টিভি বন্ধ হয়ে গেলে জাকী ‘সোনারগাঁও সমাচার’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে আদর্শিক ধারার প্রিন্ট মিডিয়ায় নেতৃত্ব দেয়। সাথে সাথে ‘আল মানার অডিও ভিজুয়াল সেন্টার’র সিইও দায়িত্ব পালন করে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে বৃহত্তর কিন্তু আদর্শিক ধারার প্রতি সহানুভূতিশীল প্ল্যাটফর্ম বলে সমাজে হাজির ছিলো। জাকী এ আদর্শবাদী সংগঠন চালাতেই নয় বরং আধুনিক মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট এবং সাংবাদিকতার কৌশলগত দিকগুলোর দক্ষতা অর্জন করে পরিচালনা করছেন। এ দক্ষতা তাঁকে আদর্শিক প্রকাশনাগুলোয় মানসম্পন্ন ব্যবস্থাপনার জন্য অপরিহার্য করে তোলে। এটি তাঁর ‘স্বপ্নচারী’ পরিচয়ের একটি ব্যবহারিক ও কার্যকর দিকও ছিলো।
ষষ্ঠ বয়ান : জাকীর সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব মূল্যবোধকে কেন্দ্র করেই আবর্তন করছিলো। তাঁর কর্মজীবনটি কেবল শিল্প সৃষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং শিল্পকে একটি সামাজিক ও আদর্শিক পরিবর্তন আনার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের স্বপ্নের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলো। তাঁর অনুসারী ও সহকর্মীরা সমাজে ন্যায়, সমতা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছেন। যারা আদর্শভিত্তিক সাংস্কৃতিক কার্যক্রম করে রাষ্ট্রকে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত করবে এটাই ছিলো তার মূল লক্ষ্য। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে শুধু কর্মী থাকলে চলতে পারে না। তার জন্য চাই প্রচুর নেতা, সাংস্কৃতিক নেতা। জাকী বিশ্বাস করতেন যদি সমাজে দশজন নেতা থাকে, তাদের সাথে কমপক্ষে একশজন কর্মী থাকবে। সেজন্য তার লক্ষ্য ছিলো নেতা তৈরি করার দিকে। জাকী জানতেন, সৃজনশীল ও মননশীল সংস্কৃতিজনরা স্বাধীনচেতা। তারা তাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ তারা পছন্দ করে না। সেই আলোকে জাকী তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতেন। যাতে করে কোনো সংস্কৃতজন তার থেকে বা আন্দোলন থেকে বিমুখ হয়ে না যায়। জাকী জানতেন, একজন সংস্কৃতজন নেতা নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলে তার সাথে আরো কুড়িজন নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। তখন সমাজের দুর্বল সাংস্কৃতিক নেতারা হাজির থাকবে। দুর্বল সৃজনশীল নেতৃত্ব মানে দুর্বল কর্মী আর দুর্বল কর্মী মানে দুর্বল সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এর ফলে একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক আন্দোলন পিছিয়ে পড়ে। এই উপলব্ধি জাকী আমৃত্যু লালন করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত সে সফল হয়েছেন। তার কারিগরি দক্ষতায় সর্বাধিক সাংস্কৃতি নেতৃত্ব তৈরি হয়েছে।
জাকী মনে করতেন, নেতৃত্বাধীন আদর্শভিত্তিক সাংস্কৃতিক ধারার গুণী শিল্পী-সাহিত্যিকদের যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে আন্দোলনকে সফল করা সম্ভব। এখানে সে কোনো ধরনের বৈষম্য তৈরির করতো না, বরং বৈষম্য নিরসন করার সম্ভব্য সকল পন্থাই অবলম্বন করতো। একটি নির্দিষ্ট আদর্শিক প্রেক্ষাপটে সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়ের দাবি তোলার ওপর গুরুত্বারোপ প্রমাণ করে যে জাকী এবং তাঁর বৃত্তের সংস্কৃতিজনরা শিল্পের সামাজিক দায়বদ্ধতায় কতটা অগ্রগামী ছিলো। জাকী তার সময়ে আদর্শভিত্তিক আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক চালিকাশক্তি হিসেবেই হাজির ছিলেন। তাঁকে একজন দূরদর্শী সংগঠক হিসেবেই জাতি চিরকাল মর্যাদার আসনে রাখবেন এটা আমরা হলফ করে বলতে পারি।
সপ্তম বয়ান : সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্রের দায়ত্ব পালন কালে জাকী সবচেয়ে সফলতা অর্জন করেছেন সাংস্কৃতিক কর্মীদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে। যেসকল সংস্কৃতজন উপত্যকায় বিচরণ করতো, তাদের একই উপ্যতকায় নিয়ে আসার কাজটি খুবই দক্ষতার সাথে আঞ্জাম দিয়েছেন। যেখানে সংস্কৃতজনরা বিভাজিত হয়ে থাকে, নেতৃত্বের হাল ছাড়তে অস্বীকার করে, সেখানে একজন কর্মীকে তার নেতৃত্বের গুণাবালি পাঠ করে তার যোগ্য দায়িত্ব দিয়ে আদর্শিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে সময়ের চেয়েও সামনে এগিয়ে দিতে কাজ করেছেন। তার দায়িত্ব পালনের সময়টি ছিলো বাংলাদেশে আদর্শচর্চার সবচেয়ে প্রতিকূল সময়। তথাপি সেই সময় সবচেয়ে বেশি সাংস্কৃতিক কর্মী সম্পৃক্ত হয়েছে তার আদর্শের সাথে। জাকী কি এই সকল কর্মীদের সম্পৃক্ত করেছেন। না, জাকী করেননি। জাকী ক্রমাগত নেতা তৈরি করার দিকে মনোযোগী হয়েছেন। যার মধ্যেই নেতৃত্বের গুণাবলি দেখেছেন তাকেই দায়িত্ব দিয়ে দিয়েছেন। এতে করে এক দিকে নেতা তৈরির হয়েছে; অন্যদিকে সাংস্কৃতিক কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। নিঃসন্দেহে আদর্শভিত্তিক, মূল্যবোধসম্পন্ন সংস্কৃতি বিকাশে তার কৌশল ছিলো সর্বোৎকৃষ্ট। তাঁর এই সাংগঠনিক প্রভাবের নেটওয়ার্ক প্রমাণ করে সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্র আদর্শিক কাঠামোর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উইং। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এই ব্যাপক সাংগঠনিক নেতৃত্বের সমাগম নির্দেশ করে যাকিউল হক জাকীর সাংস্কৃতিক ভিত্তি এবং রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যেকার একটি সেতুবন্ধ ছিলো ।
অষ্টম বয়ান : যাকিউল হক জাকী সাংগঠনিক জীবনে এমন এক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিয়েছেন, যা সমাজে বৈষম্য নিরসন এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার আদর্শিক আহ্বানের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলো। মানুষের জীবনে সামাজিক ন্যায়ের চেতনা লালনের যে কথা বলা হয়েছে, জাকী সেই চেতনার ধারক ও বাহক ছিলেন এবং সেই ধারার নেতৃত্ব তৈরির কারিগরও ছিলেন। তার কার্যক্রমের মধ্যে আদর্শিক ধারার শিল্পীরা ফ্যাসিস্টধারার স্বীকৃতি বা পৃষ্ঠপোষকতা না পেলেও অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক কাঠামোর মাধ্যমে নিজেদের মূল্য প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলো। তার একমাত্র কারণ একই ধারার কর্মী ও নেতৃত্ব তৈরি করার ফল। এজন্যই তাঁর স্বপ্নচারী নেতৃত্ব সাংস্কৃতিক কর্মধারাকে সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর অবদানকে রাজনৈতিকভাবে এবং গুণীজনদের মাধ্যমে মূল্যায়িত হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয়, তিনি কেবল একজন শিল্পী ছিলেন না; তিনি একটি বৃহত্তর আদর্শিক আন্দোলনের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুখপাত্র হিসেবে হাজির ছিলেন। সর্বোপরি নেতাদের নেতা হিসেবে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিচরণ করেছেন।
নবম বয়ান : যাকিউল হক জাকীর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হলো তাঁর প্রতিষ্ঠিত সাংগঠনিক নেতৃত্ব তৈরির মডেল। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মাধ্যমে জাকী আদর্শভিত্তিক সাংস্কৃতিক আন্দোলন পরিচালনার জন্য একটি কার্যকর এবং পেশাদার মডেল প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। তার জন্য যোগ্য উত্তসূরিও রেখে যেতে পেরেছেন। এজন্য তার কর্মীদের মধ্যে নেতৃত্ব গ্রহণ করেছে শিল্পী, অভিনেতা, সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিক থেকে শুরু করে উপস্থাপন সংস্কৃতির সকল শাখা। জাকীর জীবন ও কর্ম বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাই তার ব্যক্তিত্ব যিনি সৃজনশীলতা এবং বাস্তব সাংগঠনিক দক্ষতা সফলভাবে একীভূত। তাঁর সম্মোহনী নেতৃত্ব একটি আদর্শভিত্তিক সাংস্কৃতিক ধারাকে কেবল সৃজনশীলভাবে উন্নত করেনি, বরং এটিকে সাংগঠনিক এবং ভৌগোলিকভাবেও সম্প্রসারিত করেছিলো। তাঁর সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব তৈরি ও নির্বাচন এবং তাঁর সাংগঠনিক মডেলের ওপর গভীর অধ্যয়ন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং তাঁর পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের সাংস্কৃতিক কর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা আবশ্যক। যাকিউল হক জাকী সাংস্কৃতিক কর্মীদের জন্য এক উদাহরণ রেখে গেলেন- আদর্শ ও পেশাদারি নেতৃত্বের সমন্বয়ের মাধ্যমে কীভাবে সংস্কৃতির শক্তিকে একটি বৃহত্তর সামাজিক লক্ষ্যে ব্যবহার করা যায়।