আধুনিক আরবি সাহিত্যের ঐতিহ্যবাহী কবি-সাহিত্যিকগণ


২১ নভেম্বর ২০২৫ ১১:১৪

॥ মুহাম্মদ নূরে আলম ॥
আধুনিক আরবি সাহিত্য বলতে সাধারণত ১৮ শতকের শেষের দিক থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে শুরু হওয়া আল-নাহদা বা রেনেসাঁ যুগের সাহিত্যকে বোঝানো হয়। এ সময়ের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো ইউরোপীয় এবং ফরাসি সাহিত্যের প্রভাব থেকে মুক্তি পেয়ে নিজস্ব আরবীয় পরিচয় তৈরি করা। এ সময়ে নাটক, ছোটগল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধের মতো নতুন সাহিত্যধারাগুলো বিকশিত হয় এবং মিশরের মতো দেশগুলো আধুনিক সাহিত্যের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এ ধারার সর্বশ্রেষ্ঠ কবিদের মধ্যে একজন হলেন আহমদ শাওকি, যিনি ‘কবিদের রাজপুত্র’ নামেও পরিচিত। ঊনবিংশ শতাব্দীর সূচনাতে মিশর এবং অন্যান্য আরব দেশগুলোয় আধুনিক আরবি সাহিত্যের সূচনা হয়। সাহিত্যকে গণমানুষের জীবনঘনিষ্ঠ করতে তথ্য, তত্ত্ব, যুক্তি-প্রমাণাদির অবতারণা সাহিত্য কর্মকে উচ্চমানের সৃষ্টি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। তখন থেকে আরব দেশগুলো পাশ্চাত্য, পাশ্চাত্যের অধিবাসী, তাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাথে নিজেদের আষ্ঠেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। তবে এটাও সত্য যে, আরবগণ পাশ্চাত্যের সাথে নিজেদের ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে ফেললেও তারা তাদের সোনালি অতীত, বর্ণাঢ্য ঐতিহ্য, সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে একেবারে ভুলে যায়নি। উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত আরবি সাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডারকে তারা পুনর্জীবিত করেন। পুরাতন সাহিত্য এবং আধুনিক সাহিত্যের উত্তম দিকগুলো বিবেচনায় রেখে, দুই সংস্কৃতির মধ্যে সমন্বয় সাধন করে উন্নত সাহিত্য সৃষ্টির চেষ্টা করে। আধুনিক আরবি সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে রয়েছেন মিশরীয় কবি আহমাদ শাওকি (‘কবিদের রাজপুত্র’ হিসেবে পরিচিত), ফিলিস্তিনি কবি মাহমুদ দারবিশ, নাট্যকার তৌফিক আল-হাকিম, এবং সাহিত্যিক ত্বাহা হোসাইন। এছাড়া হাফিজ ইব্রাহিম, আহমাদ মুহাররম এবং জরজি যায়দান এ ধারার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।
আল-নাহদা : আল-নাহদা বা রেনেসাঁ যুগই আরবি সাহিত্যের আধুনিক যুগ হিসেবে কোনো কোনো ঐতিহাসিকের কাছে চিহ্নিত এবং ফরাসি বিপ্লবকেই এ যুগের সূচনাকাল বলে তাঁরা ধরেছেন। ১৯ শতকে বিশেষ করে মিশরে আধুনিক আরবি সাহিত্যের চর্চা শুরু হয় যা মূলত ফরাসি সাহিত্যকর্মের অনুকরণে লেখা হতো। বিংশ শতাব্দী নাগাদ সাহিত্য কেবল অনুকরণ থেকে বেরিয়ে এসে নিজস্ব আরব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধারণ করতে শুরু করে। সাধারণত ১৭৯৮ থেকে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে আরবি সাহিত্যের রেনেসাঁ যুগ বলা হয় এবং ১৯২০ খ্রিস্টাব্দ হতে বর্তমান যুগ পর্যন্ত সময়কে আরবি সাহিত্যের আধুনিক যুগ বলা হয়। মূলত অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দ হতে বর্তমান যুগ পর্যন্ত সময়ই হলো আধুনিক আরবি সাহিত্যের যুগ। নেপোলিয়ন বোনাপার্টীর মিশর ও ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে ফরাসী সমর নেতা নিকটপ্রাচ্য আক্রমণের ফলে সমগ্র আরব জগতে এক চেতনা সঞ্চারিত হয়। তাছাড়া ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ফরাসি শক্তি মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিদায় নেবার পর পশ্চিমী দেশসমূহের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের এক সুনিবিড় সম্পর্ক স্থাপিত হয়। তখন পশ্চিমী প্রভাবের তেজোদীপ্ত আলোক মধ্যপ্রাচ্যের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক জীবনে প্রাণবন্যা বইয়ে দেয়। পাশ্চাত্য ভাবধারাসংবলিত নতুন নতুন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপিত হতে থাকে। এ প্রসঙ্গে মিশরীয় পণ্ডিত হাসান আল-আররার (মৃ. ১৮৩৪ খ্রী.)-এর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান দার আল-উলুম’-এর নাম করা যায়। ইউরোপীয় পণ্ডিতবর্গ এখানে সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক ব্যাখ্যা করে জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা প্রদান করতেন। লেবাননের প্রখ্যাত পণ্ডিত বুতরুস আল-বুস্তানী (১৮১৯-১৮৮৩) প্রতিষ্ঠিত প্রথম আরবি সাময়িক পত্রিকা ‘আল-জিনান’-এর ভূমিকাও এ প্রসঙ্গে স্মরণযোগ্য। সাংস্কৃতিক বিনিময়ও আরবি সাহিত্যে ফলপ্রসূ কিয়া সাধিত করার পক্ষে পরম সহায়ক হয়। পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রবাহ যখন আরবদের মধ্যে বৈতে শুরু করে, তখন আরবদের জীবনঘনিষ্ঠ প্রাচীন ঐতিহ্য আরবি সাহিত্যের সয়লাব প্রচণ্ডভাবে নতুন সভ্যতার ওপর যদি আছড়ে পড়ে, তাতে বিস্মিত হওয়ারও কোনো কারণ নেই। তবে লক্ষ করার বিষয় হলো আরব বিশ্বের সাহিত্যিকগণ প্রায় দীর্ঘ এক যুগ পর্যন্ত এ দুটি ধারায় প্রভাবান্বিত হওয়ার ক্ষেত্রে কিন্তু এক রকম ছিলেন না। সাহিত্যিকদের একদল নিজেদের সভ্যতা- সংস্কৃতি, পরিবেশ, স্বতন্ত্র সামাজিক বিধিবিধান ও উপায় উপকরণ এবং জীবনযাপনের পৃথক রীতিনীতির যুক্তিকে প্রাধান্য দিয়ে আরবি সাহিত্যের প্রাচীন ধারার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছেন। ভাব, খেয়াল, বিষয়বস্তু, পদ্ধতি এবং উপস্থাপন রীতিনীতি ইত্যাদির ক্ষেত্রে প্রাচীন আরবি সাহিত্যের প্রভাবই তাদের ওপর অধিক মাত্রা ছিল। এতদ সত্ত্বেও নতুন সভ্যতার বহুল প্রচলিত চিন্তা-ভাবনা এবং পাশ্চাত্যের বিভিন্ন প্রকারের সাহিত্যকর্ম অনুবাদ হয়ে আরবিপত্র-পত্রিকা ও শিক্ষাকেন্দ্রগুলোয় প্রকাশিত হওয়ার ফলে তারাও পশ্চিমা সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রভাব বলয় থেকে পরিপূর্ণভাবে মুক্ত থাকতে সক্ষম হননি। কোনো কোনো সাহিত্যিকের ওপরে পশ্চিমা সংস্কৃতি ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলে। তাদের সাহিত্যকর্ম পাঠকালে পাঠকগণের মনে হবে, তারা যেন ফরাসি কিংবা ইংরেজ সাহিত্যিকদের লেখা আরবি ভাষায় পাঠ করছে। তৃতীয় আরেক দল সাহিত্যিক পুরাতন ও নতুন সাহিত্যের মধ্যে সমন্বয় করে সাহিত্যজগৎকে একটি সমন্বিত ধারার সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। তারা একদিকে প্রাচীন সাহিত্যের বলিষ্ঠ লেখনপদ্ধতি, প্রাঞ্জল ভাষা ও সুস্পষ্ট বিষয়গুলোকে অনুসরণ করেছেন। অপরদিকে আধুনিক সাহিত্যের সুন্দর উপস্থাপনা এবং অভিনব ও মৌলিক বিষয়বস্তুকেও গ্রহণ করেছেন। তবে চিন্তা, ভাব ও খেয়ালের ক্ষেত্রে কখনো প্রাচীন সাহিত্যের আবার কখনো নতুন সাহিত্যের অনুসরণ করেছেন। এ সকল কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে মাহমুদ সামী আল বারুদী (১৮৩৭-১৯০৪ ঈ.) অন্যতম। প্রকৃত পক্ষে তিনি আরবি কবিতাকে বিপর্যস্তের কবল থেকে মুক্ত করেছেন। তিনি আরবি কবিতাকে ধ্বংসের হাত থেকে উদ্ধার করে এর পুনর্জন্ম দিয়েছেন। এজন্যই তাকে আধুনিক আরবি সাহিত্যের রেনেসাঁর জনক বলা হয়। অপরদিকে পশ্চিমা সাহিত্যের প্রভাববলয় সৃষ্টির শেষ সময়গুলোয় কতিপয় সাহিত্যিক ইউরোপের জাতিগুলোর জীবন ও সভ্যতার উন্নতির ভিত্তিতে এবং তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক কারণে গড়ে ওঠা বিভিন্ন সাহিত্য দর্শন ও মতবাদ (Schools of Literature) এর অনুকরণে সাহিত্য রচনার চেষ্টা করেন। তাদের এ চেষ্টার উদ্দেশ্য বিশেষ কোনো সাহিত্য সৃষ্টি ছিল না। নিছক নতুনত্বের প্রতি প্রবল আকাক্সক্ষা এবং পশ্চিমা সাহিত্যের অনুকরণের অভিপ্রায়ই তাদের মধ্যে প্রবল ছিল। আধুনিক সাহিত্যে কবিতার পাশাপাশি গদ্যেরও উন্নতি সাধিত হয়েছে। বিগত শতাব্দীগুলোর কৃত্রিমতা নির্ভর ও সাহিত্যের মৌলিকত্ববিবর্জিত গদ্যসাহিত্যের অক্টোপাস থেকে গদ্য সাহিত্য বেরিয়ে আসার সুযোগ পায়। আধুনিক যুগে গদ্য মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ এবং বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে নানা সমস্যা সম্ভাবনা ও নানা সামাজিক বিষয়াদি নিয়ে রচিত হতে শুরু করে। দীর্ঘ দিনের দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মাযলুম মানবতাকে রক্ষা করা, শোষিত বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, শুরা ভিত্তিক শাসন পদ্ধতির দিকে আহ্বান করা, উপনিবেশ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধাচরণ এবং গণমানুষকে সচেতন করা, সমাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় রোধ করা, সমাজসংস্কার করা, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, সুষম বণ্টন, সামাজিক সুবিচার ইত্যাদি বিষয়ের ওপর গদ্য রচিত হয়। সুতরাং গদ্যের উল্লেখযোগ্য বিষয়বস্তু হলো সমাজ, রাজনীতি এবং সাহিত্য ইত্যাদি। এ বিষয়বস্তুগুলোর প্রত্যেকটির পৃথক পৃথক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সামাজিক গদ্যের ভাষা বাক্য যেমন বিশুদ্ধ হওয়া অপরিহার্য, অনুরূপভাবে তা হতে হয় কৃত্রিমতা ও অলংকারমুক্ত। যথার্থ ও স্পষ্ট মর্মার্থ ও তত্ত্বসমৃদ্ধ, যুক্তি ও প্রমাণনির্ভর। অপরদিকে সংবাদপত্র ও রাজনীতি বিষয়ক গদ্যের ভাষা ও ভাব উভয়ই হতে হয় সহজ, প্রাঞ্জল ও সুস্পষ্ট। কেননা এ ধরনের লেখার পাঠকদের মধ্যে সাধারণ ও কম শিক্ষিত পাঠক থাকেন। এসব লেখাতে অকাট্য যুক্তি, বাস্তব প্রমাণাদি ও তাত্ত্বিক কথার চেয়ে সাধারণ জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ ও আত্মতৃপ্তিমূলক কথাই মুখ্য বিষয় থাকে। তবে গদ্য সাহিত্যের ক্ষেত্রে শব্দ চয়ন, নির্বাচিত গাঁথুনী, বাক্য রীতির সুর ও ঝংকার অত্যাবশ্যক। যাতে করে পাঠকের মনে আবেগ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। পাঠকের নিকট তা সুখপাঠ বলে অনুভূত হয়। আধুনিক গদ্যের উল্লেখযোগ্য প্রকার হলো গল্প, নাটক, উপন্যাস ও প্রবন্ধ ইত্যাদি। এগুলোর ওপরও পাশ্চাত্যের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। যাইহোক, আধুনিক গদ্য সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য পথিকৃৎ হলেন শায়খ জামাল উদ্দিন আফগানী, শায়খ মুহাম্মাদ আব্দুহু, আব্দুল্লাহ নাদীম, আদীব ইসহাক ও কাসিম আমীন প্রমুখ। তাছাড়া আধুনিক আরবি সাহিত্যের উন্নতি ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে প্রাচ্যবিদদেরও একটি ভূমিকা রয়েছে। বস্তুত আরববিশ্ব যখন শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান- বিজ্ঞান, দর্শন ও সভ্যতা-সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ ছিল তখন পশ্চিমা দেশ থেকে অনেকেই প্রাচ্যে শিক্ষার্জন করতে আসেন। এভাবে আরবগণ ইউরোপীয় সভ্যতা নির্মাণে বিরাট অবদান রাখেন। কিন্তু আরবদের সঙ্গে ইউরোপের যোগাযোগ কিছুদিন বিচ্ছিন্ন থাকলেও ক্রুসেড যুদ্ধের পর তারা আবার আরব বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপন করে। ততদিনে ইউরোপ জ্ঞান-বিজ্ঞান সাহিত্য ইত্যাদি বিষয়ে মানবতার জন্য অনুকরণীয় হয়ে ওঠে।
আধুনিক আরবি সাহিত্যের সাহিত্যিকগণ : আহমাদ শাওকি আধুনিক আরবি কবিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, যিনি ‘কবিদের রাজপুত্র’ নামে পরিচিত এবং কাব্যিক নাটকেরও পথিকৃৎ ছিলেন। মাহমুদ দারবিশ ফিলিস্তিনি জনগণের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি, যিনি তার কবিতার মাধ্যমে ফিলিস্তিনি জনগণের আবেগ ও সংগ্রামের কথা তুলে ধরেছেন। হাফিজ ইব্রাহিম আধুনিক আরবি সাহিত্যের পুনর্জাগরণ আন্দোলনের একজন প্রভাবশালী কবি। আহমাদ মুহাররম আধুনিক আরবি সাহিত্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি, যিনি পাশ্চাত্য ভাবধারার সাথে পরিচিত ছিলেন। নাট্যকার তৌফিক আল-হাকিম মিশরীয় লেখক এবং আধুনিক আরবি উপন্যাস ও নাটকের অন্যতম পথিকৃৎ। ত্বাহা হোসাইন বিখ্যাত লেখক, যিনি আধুনিক আরবি সাহিত্যের বিকাশ ও নিরীক্ষামূলক ধারায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। আব্বাস মাহমুদ আল-আকাদ শিল্পবোদ্ধা এবং সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত। জরজি যায়দান আরবি সাহিত্যের আধুনিক যুগের একজন গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক।
আরবি কবিতায় আধুনিক চিন্তাধারা প্রবর্তনের প্রচেষ্টা : আররি কবিতায় আধুনিক চিন্তাধারা প্রবর্তনের প্রচেষ্টা ব্যাপকভাবে শুরু হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ থেকে। অতঃপর বিংশ শতাব্দীতে বিশ্বযুদ্ধের ফলে আরবজগতের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কবিতার ক্ষেত্রে যথেষ্ট পরিবর্তন সাধিত হয়। কবিতার বর্ণনাকৌশল, উপমা, আঙ্গিক-গঠন সবক্ষেত্রেই নতুন চিন্তাধারার সমাবেশ ঘটতে লাগলো। পুরাতন যুগের কস্বীদা, গযল ও গানের পরিবর্তে রচিত হতে থাকে। ট্রিওলেট, সনেট এবং সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকের খণ্ড কবিতা। আরবি কবিতার এত পরিবর্তন এবং উন্নতি সত্ত্বেও শব্দবিন্যাসের দিক দিয়ে এর তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। বরং সেকেলে কাব্য ধারাকেই সে আঁকড়ে রেখেছে। মিশরীয়দের মধ্য থেকে সর্বপ্রথম যাঁরা আররি সাহিত্য আধুনিকীকরণে আত্মনিয়োগ করেন তাঁদের নামের তালিকা নিম্নে দেয়া হলোÑ শেখ হাসান আক্তার (মৃত ১৮৩৩), সাইয়েদ আলী দারবীশ (মৃ. ১৮৫৩), আব্দুল্লাহ পাশা ফিকরী (মৃ. ১৮৮৯), আইশা তাইমুর (১৯৪০-১৯০২), মুহাম্মদ তাইমুর-(জন্ম-১৮৯২), মাহমুদ সামী আল বারুদী (১৮৩৯-১৯০৪), খলীল মাতৃরান (১৮৭২-১৯৪৯), আহমদ শাওকী (১৮৬৬-১৯০৪), আল আখরাস (১৮০৫-১৮৭৩), নাসিফ ইয়ামিজী (১৮০০-১৮৭১)। পাশ্চাত্যের অনুকরণে আরবি সাহিত্যের ক্ষেত্রে আমরা কতিপয় সাহিত্য দর্শন, মতবাদ ও স্কুল এর আবির্ভাব লক্ষ্য করি। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ১. আরবি সাহিত্যের নবজাগরণ স্কুল (মাদরাসাতুল ইহইয়া) : ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত আরবি সাহিত্য তার স্বকীয়তা নিয়ে দাঁড়াতে পারিনি। এ সাহিত্যের ওপর কৃত্রিমতা ও অলংকার শাস্ত্রের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়ে ছিল। এ সময়ের সাহিত্য তখন রীতিমতো একটি অধপতিত সাহিত্য। এ যুগের মাঝামাঝির আগমন হতে না হতেই আরবি সাহিত্যে পরিবর্তনের আবহাওয়া লাগতে থাকে। একদল সচেতন আরব সাহিত্যিক জাহিলী যুগের কবিতার দিকে গভীরভাবে লক্ষ করে দেখেন যে, প্রচীন কবিতাই তো স্বাভাবিক কবিতা। এখানে অকৃত্রিমভাবে মানুষের জীবনের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। এখানে কৃত্রিমতার কোন ছাপ নাই। জাহিলী যুগের ইমরুউল কায়েস, উমাইয়া যুগের জারীর, আববাসীয় যুগের আল মুতানাববীসহ অসংখ্য কবিগণ কত সুন্দরভাবে তাদের সমাজ, পরিবেশ, মানুষ ও তাদের জীবনের চিত্র তুলে ধরেছেন কবিতার মাধ্যমে। অলংকার শাস্ত্রের জগদ্দল পাথর থেকে তাদের কবিতা মুক্ত। কবি ‘আলী লাইছী, আব্দুল্লাহ ফিকরী এবং আয়েশা তাইমুরিয়্যাহদের মতো কবিগণের মাধ্যমে এ ধারার পরিবর্তন হতে শুরু করলেও তারাও কৃত্রিমতা থেকে পুরোপুরি বের হয়ে আসতে পারেননি। মূলত আবরি সাহিত্য তার পতন অবস্থা থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হয়েছে মাহমুদ সামী আল বারুদীর হাতে। এ কারণে সাহিত্যিক সমালোচকগণ তাকে ‘আরবি সাহিত্যের নবজাগরণ স্কুলের’ প্রতিষ্ঠাতা বলে অভিহিত করেছেন। তার অনুসরণে তার ছাত্রগণ এ ধারাকে গতিশীল করেছেন এবং স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছেন। মূলত তারা আরবি সাহিত্যকে তার প্রাচীন সোনালি যুগের দিকে ফিরেয়ে দিয়েছেন এবং এর সাথে নতুনত্বের প্রলেপ দিয়ে আরবি সাহিত্যকে আরো অধিক সমৃদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে এ স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা মাহমুদ সামী আল বারুদী আরবি সাহিত্যের প্রাণ এবং এর স্বকীয়তা ফিরিয়ে দিয়েছেন। দুর্বল পদ্ধতির শোচনীয় অবস্থা থেকে আরবি সাহিত্যকে পরিত্রাণ দিয়েছেন।
আধুনিক আরবি সাহিত্য সৃষ্টির পিছনে যে কারণগুলো : আধুনিক আরবি সাহিত্য সৃষ্টির পিছনে যে কারণগুলো সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ১. উচ্চশিক্ষার জন্য পাশ্চাত্যে গমন, ২. অনুবাদ কর্ম, ৩. পশ্চিমী প্রভাবের আধুনিক শিক্ষার প্রসার আরব দেশগুলোতে, ৪. সংবাদপত্রের উন্নতি। এছাড়াও মাহমুদ আল বারুদীর কবিতার মধ্যে যে প্রাচীন ও আধুনিক সাহিত্য ও কবিতার বৈশিষ্ট্যের সমাহার ঘটেছে। নিম্নের আলোচনা থেকে তা পরিস্কারভাবে ফুটে উঠে : (ক) আল বারুদীর কবিতায় প্রাচীন বৈশিষ্ট্যÑ ১. মাহমুদ আল বারুদী কবিতার বিষয়বস্তুতে কোনো নতুনত্ব উদ্ভাবন করেননি। তিনি আববাসীয় যুগের কবিতার বিষয়বস্তুর অনুসরণে কবিতা রচনা করেছেন। যেমন : স্তুতি কবিতা, বর্ণনামূলক কবিতা, তিরস্কার ও ভর্ৎসনামূলক কবিতা, শোকগাথা কবিতা, গৌরবময় কবিতা, প্রেম কবিতা ইত্যাদি। তার কবিতা পাঠে মনে হয়, তিনি আববাসীয় যুগের কবি হিসেবে কবিতা লেখছেন। প্রাচীন কবিদের মতো বন্ধুর বাড়ি ঘরের ধ্বংসাবশেষের সম্মুখে দাঁড়িয়ে তার বর্ণনা দিয়ে কবিতার সূচনা করা। জাহিলী যুগের কবিতার তত্ত্ব, অর্থ, খেয়াল, অবয়ব ও বাহ্যিক গঠন প্রকৃতি, সকল দিক মিল রেখে কবিতা রচনা করেছেন। সেই যুগের কবি না হয়েও তিনি যে তাদের ভঙ্গিতে কবিতা রচনা করতে পারতেন সে স্বাক্ষর রেখেছেন। রাজনৈতিক কবিতা প্রাচীন সাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়বস্তু। আধুনিক আরবি সাহিত্যেও এ বিষয়বস্তুর ওপর কবিতা লেখা হয়েছে। প্রাচীন সাহিত্যের বিষয়বস্তুতে নতুনত্বের প্রলেপ জড়িয়ে আধুনিক সাহিত্যে সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর সবটুকু কৃতিত্ব মাহমুদ আল বারুদীর। আলবারুদীর রাজনৈতিক কবিতায় যুলুম নির্যাতন ও সর্বপ্রকার নিপীড়নের বিরুদ্ধে একদিকে তার প্রচণ্ড ক্ষোভ ও বিদ্রোহাত্মক মনোভাব; অপরদিকে মানুষের মধ্যে ন্যায়, ইনসাফ, সুবিচার এবং সাম্য প্রতিষ্ঠার তীব্র আবেগ অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। এ কারণে তাকে কারাবরণ করতে হয় এবং দীর্ঘদিন পর্যন্ত নির্বাসনে জীবন, যৌবন, শক্তি, সামর্থ্য, কর্মস্পৃহা সবকিছু হারাতে হয়।
মাহমুদ আল বারুদী কর্তৃক অনুসৃত পদ্ধতি পরবর্তীতে ‘Shool of revival of Arabic Literature’ বা ‘আরবি সাহিত্যের পুনর্জাগরণ স্কুল’ বলে প্রতিষ্ঠিত হয়। আধুনিক আরবি সাহিত্যের প্রসিদ্ধ কবি সাহিত্যিকদের অনেকে এ মতবাদের অনুসারী ছিলেন। যেমন : আহমাদ শাওকী, হাফিয ইবরাহীম ও তাওফীক আমীনসহ অনেকে। এসব কবি সাহিত্যিকদের অধিকাংশই পাশ্চাত্য ভাবধারার সাথে রীতিমতো পরিচিত। যেমন : আহমাদ শাওকী, আহমাদ মুহাররমসহ আরো অনেকে। নীলনদের কবি বলে খ্যাত হাফিজ ইবরাহীম পাশ্চাত্যের দ্বারা ততটা প্রভাবান্বিত না হলেও তিনি যুগ ও সময়ের চাহিদার প্রতি উদাসীন ছিলেন না, বরং বলা যায় তিনি স্বজাতির দাবি ও যুগের চাহিদার প্রতি বেশি সশ্রদ্ধ ছিলেন। অপরদিকে ইসলামের পক্ষেও আপসহীন ছিলেন। ইসলাম ও আরবি ভাষার প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালন করেছেন। তাকে অনুসরণ করেছেন সৌদি আরবের মুহাম্মাদ বিন উসাইমীন, ইরাকের মা’রুফ রাসাফী, সিরিয়ার উমার আবু রীশাহ এবং লেবানন ও মিশরে খালীল মাতরান প্রমুখ। এ মতাদর্শের সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো : প্রাচীন আরবি কবিতার অনুকরণ, আরবি সাহিত্যের অধঃপতিত অবস্থা থেকে পুনরুদ্ধার, শক্তিশালী পদ্ধতি, ভাষাগত ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে মুক্ত করা, প্রাচীন কবিতার ‘আদলে ওযন, শব্দ ও ছন্দের মিল, বিষয়বস্তু ইত্যাদিতে প্রাচীন কবিদের অনুসরণ করা। এর সাথে যুগের চাহিদাকেও সমন্বিত করা হয়েছে। এ স্কুলের কবিগণও কবিতাকে বাস্তব জীবন ও সমাজের সাথে মিলিয়ে এর সমস্যা সমাধান ও সম্ভাবনাকেও তুলে ধরেছেন। ইউরোপ ও পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবান্বিত হলেও তারা তাদের অন্ধঅনুকরণ করেননি, বরং তাদের লেখাগুলোকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করে সেখান থেকে ভাব নিয়ে নিজেরা নিজেদের মতো করে লেখার চেষ্টা করেছেন। যেমন : আব্দুর রহমান শুকরী, ইবরাহীম আব্দুল কাদির আল মাযিনী ও মাহমুদ আববাস আল ‘আক্কাদ প্রমুখ কবি ও সাহিত্যিক এ স্কুলের অনুসারী। কবিতার শৈল্পিক, সামাজিক এবং বাস্তবতার দিক থেকে কবিতার মান বৃদ্ধি এ মতবাদের অন্যতম লক্ষ্য। এ দর্শনের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিরা হলেন : ইবরাহীম নাজী, ‘আলী মাহমুদ ত্বয়াহা, মাহমুদ হাসান ইসমাঈল, মুহাম্মাদ আব্দুল মু’তী আল হামসারী প্রমুখ।
তথ্যসূত্র ১. ফীল আদাবিল হাদীছ, ওমার আদ দাসূকী ২. ইত্তিজাহাতুশ শি‘রিল হাদীছাহ, ড. ইবরাহীম নাজী ৩. ইন্টারনেট, www. almassrawy.com, ৪. সাহিত্য পত্রিকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৮৬ সংখ্যা, ১৯৯৯ সালের সংখ্যা, ১৯৯০ সালের সংখ্যা, ৫. সাহিত্য পত্রিকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঠড়ষ. ৩৩ ঘড়. ১ (১৯৮৯): সাহিত্য পত্রিকা: বর্ষ ৩৩ ॥ সংখ্যা ০১ ॥ কার্তিক ১৩৯৬ সনের সংখ্যা । ৬. আধুনিক আরবি কাব্যসাহিত্য কবিচরিত ও কাব্যমঞ্জুষা, লেখক: ড.যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হক। ৭. আধুনিক আরবী সাহিত্য, লেখক: আবদুল সাত্তার ৮. আধুনিক আরবি সাহিত্যের ইতিহাস (দিকপাল কবি ও লেখকগণ), লেখক : ড. মুহাম্মদ মেহেদী হাসান।