ভোটের আগে পাঁচ ঝুঁকিতে অর্থনীতি


২০ নভেম্বর ২০২৫ ২২:৪৫

॥ জিয়াউল হক সবুজ ॥
গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের মাঝারি এক পোশাক কারখানার মালিক রাকিব মিয়া। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে কারখানায় নতুন একটি ইউনিট খোলার জন্য জমি ও যন্ত্রপাতি রেডি করেছিলেন। কিন্তু জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে ডলারের উচ্চ বিনিময় হার এবং ঋণের উচ্চ সুদের কারণে হোঁচট খায় তাঁর বিনিয়োগ পরিকল্পনা। অনিশ্চয়তায় পড়ে পাঁচ শতাধিক মানুষের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ। রাকিব মিয়ার মতো এমন হাজারো উদ্যোক্তা এখন হাত গুটিয়ে রেখেছেন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নীতির ধারাবাহিকতা অব্যাহত না থাকার আশঙ্কায়।
কর্মসংস্থান বা বিনিয়োগে স্থবিরতা শুধু নয়, মূল্যস্ফীতির উচ্চহার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান এবং রাজস্ব আয়ে মন্দা ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার শঙ্কাসহ পাঁচটি প্রধান ঝুঁকিতে পড়েছে দেশের আর্থিক খাত। ভোটের আগে তৈরি হওয়া গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি সংকটে অর্থনীতির কপালে দুশ্চিন্তার ছাপ। নির্বাচন-পূর্ব এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি তুঙ্গে উঠলেও উদ্বেগ-অনিশ্চয়তা দূর হচ্ছে না দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মাঝে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই চাপ বাড়ছে অর্থনীতিতে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক ‘মাল্টিপল শক জোনে’ দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একেকটি সমস্যা অন্যটিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ঘিরে দেশের আর্থিক খাতে চরম অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি দাবি করেছেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সন্তোষজনক। অর্থনীতির পতন ঠেকানো গেছে এমন দাবি করলেও তিনি পলাতক স্বৈরাচার শেখ হাসিনার অর্থনৈতিক ক্ষত এখনো সারিয়ে তুলতে পারেননি। দুদিন আগে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফ এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, একদিকে বাজেট বাস্তবায়নের হার বাড়াতে না পারা; অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপসহ বেশ ক’টি সূচকে চাপ বেড়েছে। সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা ভোটের উত্তাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও বাড়তে পারে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এর অন্যতম কারণ।
পাঁচটি প্রধান রেড অ্যালার্ট
দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনা অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়ে গেছেন। এস আলমের মতো বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বা নজরুল ইসলাম মজুমদারের মতো ব্যাংকখেকো সাঙ্গ-পাঙ্গরা চরম লুটপাটের মধ্য দিয়ে ফাঁপা বেলুনে পরিণত করেছে আর্থিক খাত। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়াতে প্রাণপণ চেষ্টা চালালেও এখনো স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। একদিকে চরম মুদ্রাস্ফীতি; অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ার চাপ ভোটের হাওয়ায় বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে যেসব সূচকে সন্তোষজনক অগ্রগতি হওয়ার কথা ছিল, তা অনিশ্চয়তায় পড়েছে। এর মূল কারণ হলো নির্বাচনের আগে-পরে অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য আঘাতের আশঙ্কা। সরকার দেশকে নির্বাচনী ট্রেনে তুলে দেয়ায় উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নতুন কর্মসংস্থান, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর দিকে নজর দেয়ার সুযোগ পাবে খুবই কম। এ সুযোগে আগামী কয়েকটা মাস এসব সূচক আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। রাজনৈতিক পালাবদলের এ ডামাডোলের মধ্যে উপরোক্ত পাঁচটি ঝুঁকি অর্থনীতির জন্য সতর্ক সংকেত হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
মূল্যস্ফীতির জাঁতাকলে মানুষ
রাজধানীর বড় মগবাজারের বাসিন্দা রাজিব ঘোষ। পেশায় বেসরকারি কর্মচারী। গত এক বছরে তার বেতন বেড়েছে মাত্র ৫ শতাংশ। অথচ একই সময়ে বাজারে চাল, ডাল, তেল ও মাছ-মাংসের দাম বেড়েছে ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ। কয়দিনের ব্যবধানে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে পেঁয়াজের দর। পেঁয়াজের দাম সেঞ্চুরি হাঁকানোয় আরেক দফা চাপে পড়েছে ভোক্তারা। ৭০ টাকার পেঁয়াজের কেজি এখনো ১১০ থেকে ১২০ টাকা। খরচের তুলনায় আয় না বাড়ায় মাসিক বাজারের তালিকা থেকে এখন অনেক প্রয়োজনীয় জিনিস বাদ দিতে হচ্ছে রাজিবকে। সব মিলিয়ে নাভিশ্বাস রাজিবের মতো শত শত ভোক্তার জীবন।
পরিসংখ্যান বলছে, গত সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। সেপ্টেম্বরে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৬। সেটা অক্টোবরে কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনো বাড়তি। সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কম মনে হলেও এখনো সহনীয় পর্যায়ে নামেনি, যা অর্থনীতিতে; বিশেষ করে সাধারণ ভোক্তাদের মাঝে অস্বস্তির অন্যতম কারণ।
কয়েকদিন আগে খাদ্য পরিধারণ কমিটির বৈঠক শেষে খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার জানিয়েছেন, সরকার টিসিবির মাধ্যমে ওএমএস এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় সব মিলিয়ে প্রায় আড়াই কোটি অসচ্ছল মানুষকে ভর্তুকি মূল্যে চাল-ডালসহ নিত্যপণ্য সরবরাহ করবে। এভাবে বিভিন্ন পন্থায় সরকার নিম্ন-আয়ের মানুষকে কিছুটা রিলিফ দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও সব অসচ্ছল মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারছে না।
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে খরা
দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে হতাশার জায়গা বিনিয়োগ পরিস্থিতি। দেশি বা বিদেশি কোনো ধরনের বিনিয়োগেই তেমন গতি নেই। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় হাত গুটিয়ে রেখেছেন বিনিয়োগকারীরা। ঢাকঢোল পিটিয়ে রোডশো এবং বিদেশিদের দেশে এনে সভা-সেমিনার করা হলেও বিদেশি বিনিয়োগে এখনো চরম মন্দা চলছে।
কোভিডের অর্থবছর বাদ দিলে দেশে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমেছে গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। বিনিয়োগও প্রায় এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, মব সন্ত্রাসের মতো ঘটনায় বেসরকারি খাত এখনো আস্থাহীন। অর্থনীতির গতি মন্থর বা শ্লথ হয়ে যাওয়ায় বিনিয়োগ নেমেছে গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। নতুন বিনিয়োগ স্থবিরতা বজায় থাকায় কর্মসংস্থানেও গতি ফিরছে না। এ নিয়ে সম্প্রতি বিস্ময় প্রকাশ করেছেন শ্রম উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, ‘এখন সবাই মন খুলে কথা বলতে পারছে। কাউকে গুম, খুন করা হচ্ছে না। তাহলে বিনিয়োগ বা কর্মসংস্থান কেন বাড়ছে না?’ সেই প্রশ্ন তোলেন।
বিনিয়োগ বৃদ্ধি না হওয়ার জন্য সরকারের নীতির ধারাবাহিকতার অভাবসহ গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটকে দায়ী করেন ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকরা। বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল জানান, ট্রাস্টের ঘাটতির কারণে বিনিয়োগ বাড়ছে না। তাঁর ভাষায়, ‘সরকারের এক বছরেও জাদুকরী কিছু দেখা যায়নি। ব্যাংক থেকে টাকা লোপাট ও পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে এখনো পর্যন্ত কাউকেও দৃষ্টান্তমূলক সাজা দেয়া যায়নি। ফেরত আনা যায়নি পাচারকৃত অর্থের ছিটেফোঁটাও। তাই দেশটা ঠিকঠাক করতে চাইলে নীতি সংস্কারের পাশাপাশি হুটহাট নীতি পরিবর্তন না আনার তাগিদ দেন বস্ত্র খাতের সংগঠন-বিটিএমএ সভাপতি।
পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন-বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, প্রতিনিয়ত নীরবে পোশাক কারখানা বন্ধ হচ্ছে। এর বড় প্রমাণ, শুধু বিজিএমইএর সদস্য ৭ হাজার ২০০ থেকে এখন ৩ হাজারে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিসহ সার্বিক নীতির কারণে এসব কারখানা বন্ধ হচ্ছে। তাই ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন না করে দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রণয়নের তাগিদ দেন তিনি। ভোটপূর্ব অর্থনীতিতে সেসব সংকট বা অশনিসংকেত দেখা যাচ্ছে, সেই বিষয়ে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দেন আলোচকরা।
কর্মসংস্থানে ভাটার টান
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী, দেশে স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ। ২০২৪ সালে দেশে বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে ৩.৬৬ শতাংশে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের সর্বশেষ পরিস্থিতি এখন খুবই উদ্বেগজনক। বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২১.২% হয়েছে। কিন্তু উল্টো চিত্র কর্মসংস্থানে। পুরুষদের তুলনায় নারী কর্মসংস্থান ব্যাপকভাবে কমেছে। ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার এখন প্রায় ১২ শতাংশের কাছাকাছি।
বেকারত্বের বিপরীতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে অর্থনীতিতে। বেকারত্ব বৃদ্ধির এ হারকে ‘জরুরি অবস্থা’র সাথে তুলনা করছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ প্রায় সবাই এখন জাতীয় নির্বাচনের অপেক্ষায়। সবারই প্রত্যাশা ফেব্রুয়ারিতে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসবে। এর আগে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না অর্থনীতি বিশ্লেষক ও বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।
স্বস্তি-অস্বস্তির রিজার্ভ পরিস্থিতি
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা স্বস্তিদায়ক হলেও এখনো কাক্সিক্ষত পর্যায়ে বাড়েনি। সর্বশেষ গত ৯ নভেম্বর এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নকে (আকু) বিল পরিশোধের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ আবার কমেছে। গত সপ্তাহে রিজার্ভ থেকে আকুর বিল বাবদ ১৬১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধ করা হয়। এরপর মোট রিজার্ভ কমে দাঁড়ায় ৩১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব পদ্ধতি বিপিএম৬ অনুযায়ী, ১০ নভেম্বর রিজার্ভ ছিল ২৬ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার, যা দিয়ে ৪ মাসের আমদানি চাহিদা মেটানো গেলেও রিজার্ভের এ অগ্রগতি সন্তোষজনক নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
রপ্তানি ও রেমিট্যান্সসহ অর্থনীতির কয়েকটি সূচক ইতিবাচক হলেও এখনো সংকটে অর্থনীতি। সবচেয়ে বেশি ভঙ্গুর অবস্থায় ব্যাংকিং খাত। এ খাতের বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ কুঁরে কুঁরে খাচ্ছে অর্থনীতি। সর্বশেষ জুন মাসের তথ্যে দেখা যায়, খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ২৭ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। সংকট কাটাতে সরকার আইএমএফের সাথে ঋণচুক্তি করেছে। বাজেট ঘাটতি পূরণে কর বৃদ্ধি এবং জ্বালানির দাম সমন্বয়ও করেছে। কিন্তু কাক্সিক্ষত অগ্রগতি হয়নি। দুর্বল ৫ ব্যাংককে একীভূত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেয়া উদ্যোগও এখনো সফলতার মুখ দেখেনি। ছোট-বড় মিলিয়ে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সেটি আবার আরও বড় দুর্বল ব্যাংকে পরিণত হয় কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অর্থনীতবিদরা।
রাজনৈতিক অস্থিরতার হাতছানি
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির খবর এখনো ইতিবাচক থাকায় সন্তুষ্ট ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকরা। কারণ তৈরি পোশাক শিল্পনির্ভর এ রপ্তানি খাতটি দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি। ইউরোপ ও আমেরিকায় ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কিছুটা ধীর হলেও প্রবৃদ্ধি এখনো আশাজাগানিয়া। ট্রাম্পের ঘোষণা করা ট্যারিফের কারণে ভারত তার রপ্তানিতে বড় হোঁচট খেলেও সুবিধাজনক অবস্থানে বাংলাদেশ।
রপ্তানি খাত বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে রপ্তানি আরেক দফা বাড়তে পারে। চীনের হারানো বাজারও আসতে পারে বাংলাদেশের কাছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনার আড়ালে এখনো শঙ্কার হাতছানি। বিশেষ করে দেশজুড়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। গণহত্যার দায়ে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায়ের খবরে দেশজুড়ে যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে সেটা অর্থনীতিকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে এ নিয়ে রাজপথে চলমান জ¦ালাও-পোড়াও কর্মসূচি আর্থিক খাতকে দুর্বল করে তুলতে পারে এমন শঙ্কা বিশ্লেষকদের।
সার্বিক বিবেচনায় এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আয় ও রিজার্ভের ঘাটতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে ভাটার টান এবং বেকারত্ব অর্থনীতির জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ খাত। সবকিছুকে ছাপিয়ে যায় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। এ অবস্থায় প্রায় সবকিছু নির্ভর করছে আগামী নির্বাচিত সরকারের ওপর। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকর্মীদের জানিয়েছেন, আইএমএফের দেয়া ঋণের ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে পাওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে যেসব সংস্কারে সরকার হাত দিয়েছে, তা পরবর্তী নির্বাচিত সরকার কতটা গুরুত্ব দেয়, তার ওপরই নির্ভর করবে আইএমএফের পরবর্তী কিস্তির অর্থছাড়। তবে যেসব সংস্কার তারা করেছেন, তা পরবর্তী সরকারের হাতে প্যাকেজ আকারে দিয়ে যাবেন বলে জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা। একইকারণে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য যে পে-স্কেল/পে-কমিশন করার কথা ছিল, সে ব্যাপারে অন্তর্র্বর্তী সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না। সবকিছু চূড়ান্ত করে দিলেও তা পরবর্তী সরকারের জন্য রেখে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অর্থনীতিতে এখন যেসব চ্যালেঞ্জ ও চাপ বিরাজ করছে, তা দূর করতে হলে সংস্কার ও নীতির ধারাবাহিকতা জরুরি। বিশেষ করে নির্বাচনের পরও যাতে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় থাকে এবং সংস্কারমূলক কাজগুলো সমানতালে এগিয়ে নেয়া যায়, তাহলেই দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে। স্বস্তি ফিরবে অর্থনীতিতে। আর তাই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সবার দৃষ্টি এখন জাতীয় নির্বাচনের দিকে।