আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর শাহাদাতবার্ষিকী ২২ নভেম্বর
২০ নভেম্বর ২০২৫ ২২:৩৮
সোনার বাংলা রিপোর্ট : “এই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যেন চালু থাকে, এখানে একদিন হাসিনারও বিচার হবে…”। হ্যাঁ, ঠিক দশ বছর আগে এ মন্তব্য করেছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। এ ট্রাইব্যুনালে সাজানো মামলায় ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর তার এবং জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার। উল্লেখ্য, একই ট্রাইবুনালে এবার আর সাজানো মামলা নয়, সদ্য সংঘটিত জুলাই-আগস্ট বিপ্লব ২০২৪-এ নৃশংসতায় হাসিনা ও তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সংশ্লিষ্টতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হওয়ার পর গত ১৭ নভেম্বর সোমবার তাদের ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন।
২২ নভেম্বর দুজন মানুষের শাহাদাতবার্ষিকী। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল ও মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর এই নশ্বর পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার ১০ বছর পূর্ণ হবে। ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের নির্বাহী আদেশে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির ইতিহাসে একটি সুপরিচিত নাম। বাংলাদেশের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা, জোটনির্ভর রাজনীতির প্রবর্তন এবং চারদলীয় জোট প্রতিষ্ঠায় ঐতিহাসিক অবদান রাখার জন্য আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ রাজনীতি সচেতন মানুষের নিকট একজন গ্রহণযোগ্য ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। জোটের রাজনীতির প্রবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। কেননা এর মাধ্যমে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ এবং ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে একই প্ল্যাটফর্মে আনা সম্ভব হয়েছে। এর পাশাপাশি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং কেয়ারটেকার সরকার প্রতিষ্ঠার গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও তিনি কার্যকর ভূমিকা পালন করেছেন। মন্ত্রী হিসেবেও তিনি একজন সৎ মানুষ হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন।
আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৮ সালের ১ জানুয়ারি। তিনি তার পিতা, প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা আব্দুল আলীর কাছে তার প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। একজন ধর্মীয় নেতা ও আধ্যাত্মিক পুরুষ হিসেবে মাওলানা আব্দুল আলীকে আজও ফরিদপুরসহ গোটা অঞ্চলের মানুষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। তিনি শুধু ধর্মীয় নেতাই ছিলেন না, বরং জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ১৯৬২-১৯৬৪ সাল পর্যন্ত প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যও (এমপিএ) নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ফরিদপুর ময়জুদ্দিন স্কুলে ভর্তি হন এবং পরে তিনি ফরিদপুর জেলা স্কুলে অধ্যয়ন করেন। মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনা সুসম্পন্ন করার পর তিনি ফরিদপুরে রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি হন। রাজেন্দ্র কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং স্নাতক ডিগ্রি শেষ করার পর তিনি ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় আগমন করেন। জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি মাত্র দুই-আড়াই মাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ক্লাস করার পর আর সেখানে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। পরে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন।
আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ তার পেশাগত জীবন শুরু করেছিলেন নারায়ণগঞ্জ আদর্শ স্কুলের অধ্যক্ষ হিসেবে। এর আগে ১৯৭৩-৭৭ সাল পর্যন্ত এই আদর্শ স্কুল প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ছাত্রজীবন শেষ করার পরপরই আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেছিলেন। তিনি ১৯৮২-৮৯ সাল পর্যন্ত ঢাকা মহানগরী জামায়াতের আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৮৯ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও লিয়াজোঁ কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০০ সালের ৮ ডিসেম্বর তিনি জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মনোনীত হয়েছিলেন এবং ইহলোক ত্যাগ করার পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ২০০১ সালের ১০ অক্টোবর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছিলেন এবং মন্ত্রী হিসেবে সফলতার সাথে ৫ বছরের মেয়াদ সম্পন্ন করেন।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালীন তিনি নিম্নোক্ত সরকারি কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কমিটিগুলো হচ্ছে, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ, নির্বাহী কমিটি-জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (একনেক), জাতীয় নারী উন্নয়ন কাউন্সিল, অর্থনীতি সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কমিটি, নারী উন্নয়ন এবং নারী অধিকার বিষয়ক জাতীয় কমিটি, কারা সংস্কার কমিটি, এসিড ও মাদক নিয়ন্ত্রণ জাতীয় কমিটি, ক্ষুদ্র ঋণ সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি, বয়স্কভাতা সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি এবং কিশোর অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি। সমাজকল্যাণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করাকালীন তিনি মাদারীপুর জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
নিঃস্বার্থ একজন সমাজসেবক হিসেবে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ব্যাপক সুনাম ও সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। দেশজুড়ে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং মসজিদ ও এতিমখানা বিনির্মাণে তার সক্রিয় ভূমিকা জাতি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। তার নিজ জেলা ফরিদপুরে তিনি ৫০টিরও বেশি মসজিদ নির্মাণে ভূমিকা পালন করেন। দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন দাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তিনি এই ব্যাপক সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করেন। মাদরাসাছাত্রদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তিনি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন।
আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার কারণে ২০০২ সালে তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকার ফাজিলকে বিএ সমমানের এবং কামিলকে মাস্টার্স মানে স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বিভিন্ন ধরনের আর্থসামাজিক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান নির্মাণেও তার ভূমিকা সক্রিয় ছিল। তার প্রচেষ্টা ও দায়িত্বশীল ভূমিকার কারণে ফরিদপুর ও মাদারীপুরের মতো অবহেলিত জেলা দুটিতে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। অগণিত রাস্তা, সড়ক ও মহাসড়ক, মাদরাসা, ব্রিজ, কালভার্ট ও মসজিদ এ সময় এ এলাকাগুলোয় নির্মিত হয়। তিনি মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলায় বিভাগীয় সমাজসেবা কেন্দ্র এবং হাজী শরীয়তুল্লাহ ব্রিজ উদ্বোধন করেন। মন্ত্রী থাকাকালীন আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ দেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তিনি নিয়মিতভাবেই তার মন্ত্রণালয়ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোয় সারপ্রাইজ ভিজিটে যেতেন। এর মাধ্যমে তিনি মন্ত্রণালয় ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকর্তাদের দুর্নীতি কমানোর চেষ্টা করেছেন এবং তাতে তিনি অনেকটা সফলও হয়েছেন। তার মেয়াদে তিনি বাংলাদেশের ৬৪টি জেলায় ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক শিশু সদন (সরকারি এতিমখানা) নির্মাণ করেন, যা সমাজের ভাগ্যাহত ও অনগ্রসর কিশোর-কিশোরীদের উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসতে ব্যাপকভাবে সাহায্য করে।
সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জন্ম ১৩ মার্চ ১৯৪৯ সালে। তিনি ছিলেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী একজন রাজনীতিবিদ এবং জাতীয় সংসদের চট্টগ্রাম-২ আসন থেকে ছয়বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি বাংলাদেশে জাতীয় সংসদের সংসদ ও আইন বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সদস্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।