ধামাচাপা পড়ে গেছে ফ্যাসিস্ট ব্যবসায়ী নেতাদের প্রতিষ্ঠানের অর্থ পাচারের ঘটনা

সংগোপনে শিল্প প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছে আ’লীগ নেতারা


২০ নভেম্বর ২০২৫ ২২:৩১

॥ উসমান ফারুক॥
ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বিজিএমইএ সাবেক সভাপতি এসএম মান্নান কচি জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর হামালা ও গুলি চালানোর নেতৃত্বে ছিলেন। আওয়ামী লীগের সভা-সমাভেশ ও জ্বালাও-পোড়াও কর্মসূচিতে জনবল সরবরাহ করেই মহানগর কমিটিতে ঠাঁই শ্রমিক নেতা থেকে ব্যবসায়ীতে রূপান্তরিত হওয়া মান্নান কচির। জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে আত্মগোপনে চলে গিয়ে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি পদ থেকে পদত্যাগ করেন। মামলা নিয়ে আত্মগোপনে থেকেই মিরপুরে অবস্থিত পোশাক কারখানা চালাচ্ছেন তিনি। জুলাই বিপ্লব চলাকালীন বাড্ডায় এলাকায় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালানোর মামলায় বতর্মানে কারাগারে আছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অর্থ ও পরিকল্পনা সম্পাদক টিপু মুনশি। তিনি ২০১৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন। এক হাজারের বেশি শ্রমিক নিয়ে পরিচালিত গাজীপুরের দাগের চলা সড়কে অবস্থিত সিপার্ল গ্রুপের মালিক তিনি। জ্যাকেট, প্যান্ট, মেয়েদের স্কার্ট রপ্তানি করা প্রতিষ্ঠানটি এখন চালাচ্ছেন জেলে বসেই। মোবাইল ফোনেও সাক্ষাতে যাওয়া ব্যক্তিদের দিচ্ছেন নির্দেশনা।
একইভাবে মণ্ডল গ্রুপ, টিম গ্রুপ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক ও সাবেক বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমানের স্টার্লিং গ্রুপ (গার্মেন্টস), সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলামের ইসলাম গ্রুপ, একে আজাদের হামিম গ্রুপসহ পোশাক খাতের শীর্ষ অন্তত অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান তার কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই চালাচ্ছে। স্থানীয় রাজনীতিবিদদের সঙ্গে অর্থের বিনিময়ে সমঝোতা করে জেলে ও বিদেশে বসেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে মদদ দিয়ে চলেছে প্রশাসনের একটি শ্রেণি।
জেলে ও বিদেশের পাশাপাশি আত্মগোপনে আওয়ামী ব্যবসায়ীরা : ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম ছিলেন বিজিএমইএ সাবেক সভাপতি। ইসলাম গ্রুপের এ কর্ণধার আওয়ামী ঘরানার রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার কারণেই মেয়র পদে মনোনয়নের পান। সরকার পতনের পর গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন তিনি। বিজিএমইএ সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। পটপরিবর্তনের পর তিনি গোপনে পালিয়ে এখন সিঙ্গাপুরে রয়েছেন।
বিজিএমইএ এর সাবেক আরেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন ওনুস গ্রুপের কর্ণধার। পোশাক খাতের এ বড় প্রতিষ্ঠানটি এখনো সচল রেখে চলেছেন জেলে বসেই। আরেক সাবেক সভাপতি ও বর্তমান বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম পারভেজ এখনো প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সময় সুযোগ পেলেই সরকারের সমালোচনা করে চলেছেন আওয়ামী সুবিধাভোগী এ ব্যক্তি। তার নামে এখনো কোনো মামলা না হওয়ায় প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলছেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। দেশের তৈরি পোশাক খাত নিয়ে মাঝে মধ্যেই ষড়যন্ত্র করে চলেছেন।
বিজিএমইএ সাবেক সভাপতি ও হামিম গ্রুপের কর্ণধার একে আজাদ সর্বশেষ ডামি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র হয়ে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। নির্বাচন শেষে শেখ হাসিনার সঙ্গে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা দেখা করতে গেলে তিনি ঘোষণা দেন, স্বতন্ত্র হলেও তিনি আওয়ামী লীগের লোক। ভারতীয় বিভিন্ন ব্যক্তিকে নিজের প্রতিষ্ঠানে চাকরি দিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা থাকা একে আজাদ এখনো প্রকাশ্যে চলাফেরা করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের পতনের পর পোশাক খাতের শ্রম অসন্তোষে তার মদদ ছিল বলে একাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে আসে।
বিজিএমইএ ও কারখানা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যবসার আড়ালে নানারকম সুবিধা নিয়ে চলা প্রতিষ্ঠানগুলো ফুলেফেঁপে বড় হয়েছে। সরকারের পতনের পর আওয়ামী ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত এসব ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগ আত্মগোপনে রয়েছেন। কেউ গ্রেপ্তার হয়ে জেলে বসে ও দেশ থেকে পালিয়ে গেলেও ঠিকই তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চলছে। নিচ্ছেন ব্যাংক সুবিধা।
ক্ষমতায় থাকতে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের একাধিক অভিযোগ জমা পড়ে। রপ্তানির অর্থ দেশে না এনে বিদেশেই রেখেছেন অনেকে। এখন সেই অর্থ দিয়েই বিদেশে আয়েশি জীবনযাপন করছেন অনেকে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এক বছরের বেশি মেয়াদ হতে চললেও ধামা পড়ে আছে রপ্তানি ও আমদানির আড়ালে পাচার হওয়া অর্থের ঘটনা তদন্তের কার্যক্রম। শ্বেতপত্র ও যুক্তরাজ্যের সংবাদ মাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমস (এফটি) এর গবেষণা তথ্যানুযায়ী, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মেয়াদে দেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন বা দুই হাজার ৩৪০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ পাচার করেছেন শেখ হাসিনা ও তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা। স্থানীয় মুদ্রায় তা ২৮ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
দেশের ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে এসব অর্থ পাচার করা হয়েছে। দেশের অর্থনীতির ৮২ শতাংশ হচ্ছে পোশাক খাতের। আবার ব্যাংক ঋণের ৪০ শতাংশের বেশি যায় পোশাক খাতে। এ হিসেবে অর্থ পাচারের সিংহ ভাগই হয়েছে পোশাক খাতের হাত ধরে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির আড়ালে বেশিরভাগ অর্থ পাচার হওয়ার বিষয়টি দেখছেন বিশ্লেষকরা।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থ পাচারের বিষয়টি লাগাম টানলে উত্থানে থাকা মূলধনী যন্ত্রাংশ আমদানির প্রবৃদ্ধি হোচট খায়। মূলধনী যন্ত্রাংশ আমদানির প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হয়ে গেলেও রপ্তানি বেড়েছে দিন দিন। বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির পরিমাণ কমে যাওয়ার পরও পোশাক খাতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক থাকা প্রমাণ করে এখানে বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক মূলধনী যন্ত্রাংশ আমদানির হিসাব ডলারের হিসাবে প্রকাশ করে। সেই তথ্য তুলে ধরে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআইবি)-এর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখন যে পরিমাণ মূলধনী যন্ত্রাংশ আমদানি হচ্ছে, তাকে যদি আদর্শ ধরা হয়, তাহলে এখানে দুটি ঘটনা ঘটেছে। প্রথমত, আগে বেশি আমদানি হওয়া মানে একই পরিমাণ যন্ত্রাংশ বেশি এসেছে উচ্চ দামে। এখন তা কড়াকড়ি হওয়ায় বাজার দামে একই পরিমাণ যন্ত্রাংশ আসছে। এতে রপ্তানিপ্রবাহ ঠিক থেকেছে। আগে বেশি দাম দেখানোর আড়ালে মূলত অর্থ পাচার হয়ে গেছে।
কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ৪০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি খাতে প্রতিনিয়ত যন্ত্রাংশ বদল, সংযোজন ও নতুন আমদানি করতেই হয়। একটি মেশিনের মেয়াদ থাকে। মেয়াদ শেষে তা চালালে উৎপাদন সক্ষমতা কমে গিয়ে বিদ্যুৎ খরচ ও সময় বেশি নিবে। এতে প্রতিষ্ঠান লোকসানে চলে যাবে। তাই উৎপাদন খাতে যন্ত্রাংশ বদলানো নিয়মিত ও স্বাভাবিক কাজ। কোনো সময়েই এ প্রক্রিয়া বন্ধ থাকে না।
অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকরা বলছেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন মেয়াদে ব্যবসায়ীদের সকল সংগঠনের শীর্ষনেতারা সরকারের সঙ্গে মিলে মিশে কাজ করেছেন। সরকারের সকল কাজের বৈধতা ও আর্থিক জোগান দিয়েছে। এমনকি সরকার পতনের কয়েকদিন আগেও সাবেক চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ব্যবসায়ীক সমাবেশ আয়োজন করে শেখ হাসিনাকে আজীবন সমর্থন দেয়ার প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছিলেন। সরকার পতনের পরও তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। কেউ কেউ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সমঝোতা করে প্রতিষ্ঠান দেখভালের বিনিময়ে বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে সচল রাখছেন প্রতিষ্ঠান। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধা নিয়ে চলা এসব প্রতিষ্ঠানের অর্থ পাচারের ঘটনাগুলো তদন্ত করে পাচার করা ডলারগুলো দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত সরকারের।
অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক ঋণ পরিশোধ ও মালিকানা হস্তান্তরে জাতীয়করণ করা দরকার। এসব প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করলে, ভবিষ্যতে ব্যবসার আড়ালে অর্থ পাচারের মতো ঘটনা ঘটানোর আর দুঃসাহস করবে না। একইসঙ্গে বিদেশে পালিয়ে থাকা এসব ব্যক্তির ছবি ও তথ্য বাংলাদেশের সকল দূতাবাসের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের কাছে পাঠানো দরকার। এমন উদ্যোগ নিতে পারলে পালিয়ে থাকা ব্যক্তিরা সেসব দেশে নতুন কোনো সম্পদ কেনা ও ব্যবসা গড়তে পারবে না।