পূরণ করতে পারবে কি কল্যাণরাষ্ট্রের প্রত্যাশা
২০ নভেম্বর ২০২৫ ২১:৫৪
॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া॥
গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বিশেষ পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। সেটা হচ্ছে নতুন নতুন রাজনৈতিক দল গঠন ও নিবন্ধন। ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারের পতনের পর বিগত ১৫ মাসে বাংলাদেশে নতুন নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ এবং নির্বাচন কমিশন থেকে বেশকিছু নতুন দলের নিবন্ধনও হয়েছে। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ও বিকাশ একটি দেশের জন্য কল্যাণকরই বটে। নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগ যেমন একটি রাষ্ট্রের অপরিহার্য অঙ্গ; তেমনিভাবে আধুনিক বিশ্বে রাজনৈতিক দলগুলোও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে কাজ করে। তাই কোনো রাষ্ট্রে দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলের বিকাশ অবশ্যই ইতিবাচক। তবে নামকাওয়াস্তে রাজনৈতিক দল বা হীনউদ্দেশ্যে রাজনৈতিক দল গঠন দেশের জন্য কল্যাণকর নয়, বরং ক্ষতিকর।
বাংলাদেশ বহুদলীয় গণতন্ত্রের দেশ এবং গণতন্ত্রে বহু ফুল ফুটতে দেয়ার নীতিমালাই অনুসরণ করে। বহু ফুল ফুটতে দেয়ার নীতিমালার আওতায়ই বাংলাদেশে বহু রাজনৈতিক দলের বিকাশ ঘটছে। উন্নত দেশগুলোয় দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতৃত্বে গঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমেই দেশগুলো এগিয়েছে। যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও জার্মানিসহ অনেক দেশ তার জ¦লন্ত উদাহরণ।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ জেনিংস বলেছেন, ‘এখন কেউ যদি ইংল্যান্ডে কীভাবে শাসন চলে তা বর্ণনা করতে চান, তবে তাকে আদিতে ও অন্তে রাজনৈতিক দলের কথা বলতে হবে এবং মধ্যভাগেও তার বিশদ ব্যাখ্যা করতে হবে।’ সুতরাং ইংল্যান্ডে গণতন্ত্রের ইতিহাসের সাথে রাজনৈতিক দলের ইতিহাস নিবিড়ভাবে জড়িত রয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক দলের উৎপত্তি হয়েছিল দেশটির সংবিধান প্রণয়নের সাত বছর পরে। কিন্তু তার ভূমিকা সেখানে এতই গুরুত্বপূর্ণ যে রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অপরিহার্য অঙ্গরূপে গড়ে উঠেছে।
কিন্তু বাংলাদেশের এসব রাজনৈতিক দলগুলো কি রাষ্ট্রের অঙ্গরূপে গড়ে উঠবে, নাকি কিছু ব্যক্তি ও সাংগঠনিক স্বার্থেই কাজ করবে, তা একটি জটিল প্রশ্ন। তবে সাধারণ জনগণের আশাবাদ এসব দলগুলোর মধ্যে কয়েকটি দেশ ও জাতির কল্যাণে গড়ে উঠবে। তাই সাম্প্রতিক সময়ে গঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর কয়েকটির মধ্যে কিছু গুণগতমানের পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়েছে। এসব নতুন দলের নেতৃত্বে যেমন একেবারেই অখ্যাত লোকজন আছে, তেমনি উচ্চশিক্ষিত লোকজনও আছেন। যেমন এনপিবির চেয়ারম্যান প্রফেসর সিদ্দিক হোসাইন জাহাঙ্গীরনগর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন ও মাস্টার্স করে ঢাবির আইবিএর শিক্ষক ছিলেন। তারপর তিনি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করেছেন এবং তিনি ইস্টার্ন ইউনিভাসিটির ট্রেজারারের দায়িত্বও পালন করেছেন। অপরদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠন করেছেন গণঅভ্যুত্থানের নায়করা, যাদের বড় অংশই শিক্ষিত ও দেশপ্রেমিক নেতা।
এ বছরে নিবন্ধন পাওয়া নতুন একটি দল হচ্ছে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)। বিডিপির সভাপতি আনোয়ারুল ইসলাম একজন বিশিষ্ট আইনজীবী এবং সেক্রেটারিও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা। বিডিপি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন থেকে ২০২৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারিতে নিবন্ধন পায়। দলটির নিবন্ধন নাম্বার ৫৪ এবং প্রতীক ফুলকপি। এডভোকেট আনোয়ারুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ডেডেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) থেকে দলটি সভাপতি ও সেক্রেটারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অংশগ্রহণ করছেন। বিডিপির সভাপতি এডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহ-৯ আসন থেকে প্রার্থী হয়েছেন আর সেক্রেটারি কাজী নিজামুল হক প্রার্থী হয়েছেন ভোলা থেকে।
২৪-র গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতাদের একটি অংশের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে জাতীয় বিপ্লবী পরিষদ। জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছেন খোমেনি এহসান। তিনি ঢাবির ছাত্রনেতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। বিগত কয়েক দশক ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলনের তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা ছিল।
এ বছরের ৯ মে ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশ (আপ বাংলাদেশ) নামে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের আত্মপ্রকাশ হয়েছে। এতে আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন আলী আহসান জুনায়েদ। নতুন এ রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আরেফিন মোহাম্মদ হিযবুল্লাহ। এছাড়া প্রধান সমন্বয়কারী রাফে সালমান রিফাত, প্রধান সংগঠক নাইম আহমেদ এবং মুখপাত্র হিসেবে রয়েছেন শাহরিন সুলতানা ইরা। আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানেই ৮২ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করেছেন আপ বাংলাদেশের নেতারা। তাদেরও একটি বড় অংশ বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির পরীক্ষিত ছাত্রনেতা।
গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ মাসে আত্মপ্রকাশ করা অন্য দলগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ ডেভেলপম্যান্ট পার্টি (বিডিপি), জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), আপ বাংলাদেশ, জাতীয় বিপ্লবী পরিষদ, জনতা পার্টি বাংলাদেশ, নিউক্লিয়াস পার্টি অব বাংলাদেশ (এনপিবি), ওয়ার্ল্ড মুসলিম কমিউনিটি, বাংলাদেশ জনপ্রিয় পার্টি (বিপিপি), সার্বভৌমত্ব আন্দোলন, বাংলাদেশ সংস্কারবাদী পার্টি (বিআরপি), বাংলাদেশ জাগ্রত পার্টি, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পার্টি, বাংলাদেশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (বিএসডিপি), বাংলাদেশ জন-অধিকার পার্টি, আমজনতার দল, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক শক্তি, দেশ জনতা পার্টি, জনতার দল, গণতান্ত্রিক নাগরিক শক্তি, ভাসানী জনশক্তি পার্টি, বাংলাদেশ নতুনধারা জনতার পার্টি, পিপলস পাওয়ার পার্টি, বাংলাদেশ রিপাবলিক পার্টি, জনতার বাংলাদেশ পার্টি, নতুন বাংলাদেশ পার্টি, বাংলাদেশ সমতা পার্টি, বাংলাদেশ আমজনগণ পার্টি এবং সর্বশেষ গত ২৮ অক্টোবর আত্মপ্রকাশ করা রাজনৈতিক দলটির নাম ‘বাংলাদেশ ইউনাইটেড পার্টি’।
নির্বাচন কমিশনে (ইসি) এখন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ৫৪টি। তবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত আছে। ইসি আরও তিনটি দলকে নিবন্ধন দিতে যাচ্ছে। এর মধ্যে নতুন ২৮টি দলের দুটি রয়েছে এনসিপি এবং বাংলাদেশ আমজনগণ পার্টি। নতুন দলগুলোর মধ্যে ১৯টি ইসিতে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছিল।
অধ্যাপক এমাজউদ্দীন তার রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কথা গ্রন্থের ‘রাজনৈতিক দল ও জনমত’ অধ্যায়ে রাজনৈতিক দলের ভূমিকা সম্পর্কে বলেছেন, ‘রাজনৈতিক দল জনশিক্ষার এক শ্রেষ্ঠ সংস্থা (An educative institution)। নির্বাচকমণ্ডলীর আলস্য ও ঔদাসীন্য ত্যাগ করিয়ে রাজনৈতিক দল জোর করে তাদের রাজনৈতিক কার্যাবলি ও ঘটনাবলি সম্বন্ধে সচেতন করে তুলে। রাজনৈতিক চেতনা সঞ্চার করে ভোটের মূল্য সম্বন্ধে তাদের সচেতন করে এবং দেশের সমস্যা সম্বন্ধে তাদের ভাবিয়ে তোলে। গণতন্ত্রকে যদি জনমতের শাসনব্যবস্থা বলা হয়, তবে রাজনৈতিক দলকে গণতন্ত্রের ভিত্তিমূল বলা যেতে পারে, কেননা রাজনৈতিক দলই জনমত সংগঠন করে।
এডমান্ড বার্কের মতে, A body of men united together for promoting by their joint endeavours the national interest upon some particulars principales on which they are all agreed. অর্থাৎ কতকগুলো লোক যখন তাদের সমবেত চেষ্টার দ্বারা সর্বজনীন স্বার্থ অর্জনের উদ্দেশ্যে কতকগুলো নীতি সম্বন্ধে একমত হয়ে সংঘবদ্ধ হয়, তখন রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। বার্কের মতে, জনসাধারণের কল্যাণ সাধনই রাজনৈতিক দলের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।’
অধ্যাপক লিকক (Leacock) বলেন, Far from being in conflict with the theory of democratic government, party government is the only thing which renders it feasible, অর্থাৎ রাজনৈতিক দল গণতন্ত্রের বিরোধী হওয়া তো দূরের কথা, দলীয় সরকার গণতন্ত্রকে সফলতা দান করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের নাগরিকদের অভিমত হচ্ছে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির মূল প্রতিবন্ধক হচ্ছে রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিক। রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলগুলো যদি দেশ ও জাতির জন্য আন্তরিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করে কাজ করেন, তাহলে রাষ্ট্রের অপর অঙ্গগুলো স্বাভাবিক গতিতে কাজ করতে বাধ্য হবে। তখন দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা লাভ করতো এবং দুর্নীতি বন্ধ হয়ে যেত। সাধারণ জনগণের অভিযোগ বাংলাদেশে ইতোপূর্বে যেসব রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল তাদের অধিকাংশের দ্বারাই দেশ ও জাতির উন্নয়নের পরিবর্তে বরং অপশাসন ও দুর্নীতিই বেড়েছে। তাই বাংলাদেশের জনগণ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ নয়া রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতিই আস্থা রেখেই আগামী নির্বাচনের ভোটদানের সিদ্ধান্ত নিতে চাচ্ছে। সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা আগামী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে নয়া রাজনৈতিক দলগুলো বিজয়ী হয়ে বাংলাদেশকে একটি কল্যাণরাষ্ট্রে রূপান্তর করবে। তাই নতুন রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব হোক বাংলাদেশের আগামী দিনের উন্নয়নের চালিকাশক্তি- এ প্রত্যাশা জনগণের।