পারমাণবিক অস্ত্র ও ইমিগ্রেশন
১৩ নভেম্বর ২০২৫ ১৭:৫০
॥ মাহবুবুল হক ॥
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিএবিএসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে ১৫০ বার পৃথিবীকে উড়িয়ে দেওয়া যাবে। গত ৩ নভেম্বর সোমবার টিআরটি ওয়ার্ল্ড খবরটি প্রকাশ করেছে। খবরে আরো বলা হয়েছে, তিনি বেশ কিছুদিন পূর্বে নির্দেশ দিয়েছিলেন, যেসব পারমাণবিক অস্ত্র গত ৩০ বছর যাবত পড়ে আছে, সেগুলোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে। কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন, আপনি অস্ত্র বানালেন, ব্যবহার করলেন না। গুদামে ফেলে রাখলেন। সেগুলোর কার্যকারিতা রয়েছে কিনা, সেগুলো তো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, পৃথিবীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র দেশ- যারা অস্ত্র বানায়, কিন্তু পরবর্তীতে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখে না, বানানো অস্ত্রের কার্যকারিতা বহাল আছে কিনা। তাঁর ধারণা, অন্য যেসব দেশ পারমাণবিক অস্ত্র বানায় বা তৈরি করে, তারা ঠিকই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, শুধু উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র বানায় না, অন্যরাও বানায়। কিন্তু অন্যরা কেউ কোনো খবর দেয় না। কোনো হিসাব দেয় না। সবাই চুপি চুপি পারমাণবিক অস্ত্র বানায়। তিনি উল্লেখ করেন, পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবার ওপরে আছে। এরপরের অবস্থান রাশিয়ার। রাশিয়া সবসময় দ্বিতীয় স্থানে। তারপরের অবস্থান চীনের। তবে তারা আমাদের অবস্থানে আসার জন্য খুব চেষ্টা করছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তারাও হয়তো আমাদের সমকক্ষ হয়ে যেতে পারে।
এখন আমরা যদি সিরিয়াসলি বিষয়টি পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখা যায়, শুধু একটি দেশ যদি ১৫০ বার পৃথিবী ধ্বংসের ক্ষমতা রাখে, তাহলে শুধু তিন দেশই তো অন্তত পাঁচশ’ বার পৃথিবী ধ্বংস করতে পারবে। ৪৫০-এর জায়গায় পাঁচশ’ বললাম এ কারণে যে, বড় তিনটি দেশ ছাড়া আরো তো অনেক দেশ আছে, যারা পারমাণবিক অস্ত্র বানায়। উত্তর কোরিয়া, ইরান, পাকিস্তান, ইন্ডিয়াসহ আরো কত দেশ পারমাণবিক অস্ত্র বানায়, যারা কোনোদিন উত্তর কোরিয়ার মত গলা বাড়িয়ে কথা বলে না।
ট্রাম্পের কথা যদি সত্য হয়, তাহলে তো বোঝাই যায় তারা সবসময় পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে এবং বিক্রিও করছে। তাদের হিসাব-নিকাশ বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার মতো সময় নেই। তারা তো পরিষ্কার বলেছেন, পৃথিবীতে তারাই একমাত্র দেশ, যারা পূর্বে তৈরি করা বা গুদামজাত করা অস্ত্রশস্ত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই বেচা বিক্রি করে। অর্থাৎ এর অন্য অর্থ দাঁড়ায়Ñ অস্ত্রশস্ত্র তৈরির ব্যাপারে তারা খুবই বিশ্বস্ত। যে সমস্ত দেশ তাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র ক্রয় করে, তারা কখনো নিরীক্ষা করে ক্রয় করে না। তারা শুধু অর্ডার দেয়। যুক্তরাষ্ট্র শুধু সরবরাহ করে। মাঝে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোনো প্রশ্ন ওঠে না। সরাসরি বিক্রি হয়ে যায়। এর জন্য কোনো মার্কেটিংয়েরও প্রয়োজন হয় না। এই যদি অবস্থা হয় এবং বহুকাল ধরেই তো এ অবস্থা রয়েছে, সেটা তো বিশ্ববাসী ভালো করেই জানে। তো এবার কেন ট্রাম্প নিজেই বলছেন, তাদের অস্ত্রশস্ত্রগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা দরকার, সেগুলো কার্যকর রয়েছে কিনা। এ কথা বলে তিনি বিশ্ববাসীর সামনে একজন সৎ ব্যবসায়ীর ভাবমূর্তি উদ্ভাসিত করেছেন। এটা হয়তো প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। একদিকে বিশ্ববাসী জানে, চীন একদিকে একটু হালকা অস্ত্র তৈরি করে, যার দাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থেকে তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ফলে চীনের কার্যকরী হালকা অস্ত্র ইতোমধ্যেই ক্রয়কারী দেশের সুনাম অর্জন করেছে। চীনের বেচা-বিক্রিও আগের তুলনায় অনেকগুণ বেড়েছে। এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হয়তো খুব চিন্তায় পড়ে গেছে, আগামীতে কী হবে? অস্ত্রের বিষয়ে তারা যদি পেছনে পড়ে যায়, তাহলে সবদিক থেকেই তো তাদের ক্ষতি হয়ে যাবে।
বিশ্বের বাজারে তো নানারকম খবর ভেসে বেড়ায়। পাশ্চাত্যে তো খবরের কাগজের ওপরে তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। গত বছরের শেষ দিকে ইসরাইল চুপিসারে অভিযোগ করেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রে পূর্বের মতো ভার আছে, কিন্তু ধার নেই। অর্থাৎ আগের তুলনায় ইসরাইলের খরচ অন্তত দ্বিগুণ বেড়ে গেছে।
এ প্রসঙ্গে একটু দেশের কথায় আসি। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় যেমন পুলিশ সদস্যরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে রিপোর্ট করেছিল, স্যার, একটার বেশি তো গুলি বের হয় না। একটা গুলিতে তো একজনই মরে।
ঠিক এ ধরনের না হলেও ইসরাইলের সৈন্যদের যে পরিকল্পনা ও প্রত্যাশা ছিল, তা তারা পরিকল্পনা অনুযায়ী অর্জন করতে পারেনি। ট্রাম্প এখন সেই সূত্র ধরেই নির্দেশ দিতে বাধ্য হয়েছেন- তাদের অস্ত্রের কার্যকারিতা ঠিক আছে কিনা, তা পরীক্ষা করে দেখতে। যদি পূর্বের মতো কার্যকারিতা না থাকে, তাহলে তো পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে দুনিয়ায় যত মিথ্যাচার হয়েছে আর কোনো বিষয় নিয়ে এত মিথ্যাচার হয়নি। তবুও গত শতাব্দীতে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের কথা বলে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোয় মাঝে মাঝে মিটিং-সিটিং হতো! মিটিংয়ের ফলাফল ছিল, শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো ছাড়া অন্য কোনো রাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্র রাখতে পারবে না এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার বিষয় চিন্তাও করতে পারবে না। প্রয়োজন হলে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে সহযোগিতা করে যাবে। যদিও এসব ছিল কথার কথা। এসব কথার মূল্য পৃথিবীর মানুষ কখনো দেখেনি।
নাইন ইলেভেনের পর পৃথিবী একদম মিথ্যার দিকে ছুটলো। বিশ্বব্যাপী সত্যের কিছু সাধারণ আমল ছিল, ধীরে ধীরে তা নিঃশেষ হয়ে গেল। জাতিসংঘ বলতে একটা সংস্থা তো ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ার ধ্বংস হওয়ার পর জাতিসংঘ নিজের অস্তিত্ব আর পূর্বের মতো বজায় রাখতে পারল না। সব দোষ এসে গেল ইসলাম, মুসলিম ও মুসলমান দেশগুলোর ওপর। একে একে ধ্বংস করা হলো আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন, ফিলিস্তিন ও লেবানন এবং রাজনৈতিকভাবে ধ্বংসের কিনারে নিয়ে গেল মিশর, পাকিস্তান, আলজেরিয়া, সুদান, তিউনিশিয়াসহ কত দেশকে।
জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদিতা, চরমপন্থা পারমাণবিক অস্ত্র সংরক্ষণ, ইসলামফোবিয়া, ইসলামীকরণ ইত্যাকার নানা অজুহাত তুলে আদর্শ হিসেবে ইসলাম, মুসলিম দেশ এবং সার্বিকভাবে মুসলমান নিধনের যুদ্ধটাই চলছে গত প্রায় ৩০ বছর যাবত।
নাইন ইলেভেনের পর থেকে এখন পর্যন্ত বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পাশ্চাত্য সভ্যতা যা বলছে, তা হলো ক্রাইসিস অব সিভিলাইজেশন চলছে। ইসলাম ছাড়া এবং মুসলিম ছাড়া বাদবাকি বিশ্ব মোটামুটি সিভিলাইজড, অর্থাৎ সভ্য। ইসলাম ও মুসলমান এবং মুসলিম দেশগুলো আন-সিভিলিজড। অর্থাৎ অসভ্য। সোজাসুজি বলা হচ্ছে, বিশ্ব এখন জড়িয়ে পড়েছে সভ্যতা ও অসভ্যতার দ্বন্দ্বে এবং লড়াইয়ে। তথাকথিত সভ্য দেশগুলো বলছে, পরমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও এ অসভ্যতা আরো মারাত্মক।
মাঝখানে ধর্মীয় যুদ্ধের কথা অর্থাৎ ক্রুসেডের কথা উপস্থাপিত হয়েছিল। কিন্তু পুরনো কথার দিকে তারা আর যেতে চায়নি। গোটা বিষয়টিকে তুলে নিয়ে আসা হয়েছে সভ্যতা ও সংস্কৃতির দিকে। তাদের সোজা কথা ইসলাম থাকলে পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতি থাকবে না। দুনিয়াটা অসভ্যতায় পরিপূর্ণ হয়ে যাবে। যেকোনো মূল্যে একে ঠেকাতে হবে।
এই তো গত প্রায় দুই বছরে নানা অজুহাতে ফিলিস্তিন ও লেবাননে শিশু ও নারীসহ এক লাখের ওপর মুসলিম তারা নিধন করেছে। তাদের টার্গেট ছিল শিশু ও নারীদের নিশ্চিহ্ন করা। তাতে মুসলিম জনসংখ্যা পৃথিবীতে কমে যাবে। এটাই হবে তাদের বড় লাভ।
যে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়া বিদেশ থেকে লোক এনে তৈরি করা হলো। যাদের নিজস্ব আদিবাসী বলে তেমন কিছু ছিল না। আফ্রিকা, ইউরোপ ও মুসলিম দেশগুলো থেকে দরিদ্র লোকদের নিয়ে এসে যেসব শক্তিশালী দেশ গড়া হলো, আজ সেসব দেশ চরম অকৃতজ্ঞতার সাথে বলছে, বিদেশিদের অবশ্যই হটাতে হবে। আর বিদেশিদের নতুন করে ইমিগ্রেশন দেওয়া যাবে না। যারা একসময় ছিল বিদেশি, আজ তারা স্বদেশি হয়ে তাদের এ আত্মীয়-স্বজন ও দেশবাসীকে বলছে তোমাদের আর এসব সভ্য দেশে আনা যাবে না। আমরা একসময় তোমাদের মতো অসভ্য ছিলাম। আমরা গত ৪০০-৫০০ বছরে সভ্য হয়েছি। অথচ তোমরা এখনো অসভ্য। তোমরা বিদেশে এসেও নিজেদের অসভ্যতাকে এবং অপসংস্কৃতিকে ভুলতে পারছো না। বরং তোমাদের অসভ্যতা ও অপসংস্কৃতিকে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছ। শুধু চেষ্টা নয়, তোমরা সফলও হচ্ছো। তোমরা আমাদের গির্জাগুলো কিনে নিয়ে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ইত্যাদিতে মসজিদ তৈরি করছো। মাদরাসা তৈরি করছো। নিজেদের দেশের পোশাক-আশাক ব্যবহার করছো। নিজেদের খানাপিনা করছো। আমাদের কোন কিছু তোমরা স্পর্শ করছো না। তোমাদের জন্য তোমাদের দেশ থেকে আমাদের খাবার পোশাক পরিচ্ছদ কসমেটিক্স সবকিছু আমদানি করতে হয়।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, পুরনো ইমিগ্র্যান্টসরা নতুন ইমিগ্র্যান্টস বানাতে বাধার সৃষ্টি করছে। বিশ্ববাসী জানে, তথাকথিত সভ্য দেশ ও মহাদেশ গড়ার জন্য ইমিগ্রেন্ডসরা জাহাজ পাঠিয়ে নিজেদের আদি দেশ থেকে লোকজন এনে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ইত্যাদি তথাকথিত সভ্য দেশ তৈরি করা হয়েছিল। আজ তাদের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। সুতরাং এখন তাদের অধিকাংশকে তাড়িয়ে দিতে হবে এবং নতুন করে আর ইমিগ্রেশন বানানোর কোনো প্রয়োজন নেই।
ভেবে দেখা যেতে পারে এটা কত বড় অন্যায়, কত বড় অমানবিক এবং কত বড় মানবতাবিরোধী কর্মসূচি।
যেসব দেশ মূলত ইমিগ্র্যান্টস দ্বারা তৈরি, আজকে সেসব দেশ কি ইমিগ্রেশন বন্ধ করতে পারে? অবশ্যই পারে না। অবশ্যই আইনকানুন, নিয়মনীতি এবং নৈতিকতা ও মানবিকতা কোনো দিক দিয়েই পারে না।
তথাকথিত পাশ্চাত্য সভ্যতা এখন এ কাজটি করছে। মানবতা ও মনুষ্যত্বের বিরুদ্ধে তারা সবাই মিলে একাট্টা হয়ে নিজ নিজ দেশে লাখ লাখ লোকের সভা, মিছিল ইত্যাদির আয়োজন করছে। বিষয়টা বর্ণবাদের সাথেও যুক্ত। রেসিজম আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। দেশে দেশে নতুন করে হামলা-মামলা শুরু হয়ে গেছে।
এখন একদিকে যেমন জরুরি ভিত্তিতে পারমাণবিক অস্ত্র নিরস্ত্রিকরণ দরকার; অপরদিকে যাদের পারমাণবিক অস্ত্র নেই, নিরাপত্তার খাতিরে তাদেরও তা প্রদান করা দরকার। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে বা কারা?