থেমে নেই অবৈধ পথে বিদেশযাত্রা
৬ নভেম্বর ২০২৫ ২০:৩১
স্টাফ রিপোর্টার : অবৈধপথে বেশি টাকা আয় করার জন্য বিদেশ যাচ্ছেন হাজার হাজার তরুণ। ইউরোপসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে পাড়ি জমান অনেক আশা নিয়ে। কিন্তু এদের অনেকেরই আশা পূরণ হয় না। উল্টো করুণ পরিণতি ঘটে; এমনকি অনেককে ফিরতে হচ্ছে লাশ হয়ে। ভবিষ্যৎ গড়তে যাওয়া এমন তরুণদের সমুদ্রের অথৈ জলে অথবা কোনো গহিন অরণ্যে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। এতকিছু স্বীকার করার পর কারও ঠাঁই হয় সেসব দেশে, আবার কেউ দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে অপেক্ষা করে। মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে দেশান্তরী হওয়ার এ মরণনেশা থেকে তরুণদের ফেরানো না গেলে ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়বে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের এক জরিপমতে, উন্নত দেশের জন্য বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৮২ শতাংশ তরুণ দেশ ছাড়তে চান। আবার জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্যমতে, ভূমধ্যসাগর দিয়ে যত মানুষ ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করেছে, সে তালিকায় বাংলাদেশিরা চতুর্থ। এ চেষ্টাকারীরা কেউ কেউ সফল হলেও বেশিরভাগই সব হারিয়ে দেশে ফিরছেন, কেউ ফিরছেন লাশ হয়ে। আবার অনেকর লাশ পাচ্ছেন না স্বজনরা।
বৈধ পথে বিদেশগামীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)। সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এক দশকে ৮০ লাখ ৪৪ হাজার ৬৫০ বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে বিদেশ গেছেন। সরকারি এ সংস্থার কাছে বিদেশগামীদের সংখ্যা থাকলেও কতজন ফিরে আসছেন, তার কোনো তথ্য নেই। তবে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড ও বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের তথ্যমতে, এ ১০ বছরে বিভিন্ন দেশ থেকে অবৈধ হয়ে আউটপাস নিয়ে ৬ লাখ ৭৩ হাজার ৫৭০ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। বৈধ পথে বিদেশ গিয়ে অবৈধ হয়ে ফিরে আসাদের এ সংখ্যা প্রতি বছরই বাড়ছে। এদের মধ্যে অবৈধ পথে যাওয়া শ্রমিকরাও রয়েছেন। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০১৫ সালে আউটপাস নিয়ে দেশে ফেরত আসেন ৫৬ হাজার ৬৭৪ বাংলাদেশি। পরের বছর সংখ্যাটি কমে ৪১ হাজার ৬২৬ জনে নেমে আসে। এরপর ২০১৭ সালে ৫০ হাজার ১৬৩, ২০১৮ সালে ৬৮ হাজার ৮১২, ২০১৯ সালে ৬৪ হাজার ৬৩৫ ও ২০২০ সালে ৪৫ হাজার ৯৮৪ জন বাংলাদেশি বিদেশ থেকে শূন্য হাতে ফিরেছিলেন। এ সংখ্যাটি অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায় গত কয়েক বছরে। ২০২১ সালে আউটপাস নিয়ে দেশে ফিরে আসেন ৭২ হাজার ৬০৯ জন কর্মী। ২০২২ সালে এ সংখ্যা বেড়ে হয় ৯৭ হাজার ৯১৩। সর্বশেষ ২০২৩ সালে ৮৬ হাজার ৬২১ ও ২০২৪ সালে ৮৮ হাজার ৮৬৮ জন বৈধ অভিবাসী শ্রমিক অবৈধ হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন।
ইতালি ফেরত পাঠিয়েছে ১২০ জনকে
চলতি বছর ১২০ জনেরও বেশি অবৈধ বাংলাদেশি নাগরিককে ফেরত পাঠিয়েছে ইতালি। গত ৩ নভেম্বর সোমবার ঢাকাস্থ ইতালি দূতাবাস এ তথ্য জানিয়েছে। দূতাবাস জানায়, গত ৩১ অক্টোবর ইতালি কর্তৃপক্ষ ৪ বাংলাদেশি নাগরিককে ইতালি থেকে ফিরিয়ে আনে। এদের ইতালি থাকার অনুমতি ছিল না। এদের মধ্যে ২ জন মাত্র এক মাস আগে ভিসা ছাড়াই লিবিয়া থেকে এসেছিলেন। অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইতালির প্রতিশ্রুতির কাঠামোর মধ্যে ২০২৫ সালে ১২০ জনেরও বেশি বাংলাদেশি নাগরিককে ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করা হয়েছে। দূতাবাস আরও জানায়, সঠিক ভিসা ছাড়া অথবা জাল ভিসা নিয়ে পাচারকারী ও দালালদের ইতালিতে প্রবেশের জন্য অর্থ দেওয়া অবৈধ এবং এর ফলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া শুরু হবে।
শাহজালালে আটকালো ২২ শ্রমিক
কাজের অনুমতি না থাকায় শ্রমিক ভিসায় শ্রীলঙ্কায় যাওয়ার সময় ২২ জনকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটকে দিয়েছে ইমিগ্রেশন পুলিশ। চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিসি ইসিসি) মাধ্যমে দলটি শ্রীলঙ্কায় কাজের জন্য যাচ্ছিল। গত ১ নভেম্বর শনিবার রাত ৮টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিসিইসিসি) সূত্রে জানা গেছে, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে দুই বছর মেয়াদি একটি প্রকল্পে কাজের জন্য বাংলাদেশি শ্রমিকদের ৩০ জনের একটি দল শ্রীলঙ্কা যাচ্ছিল। ঘটনার দিন রাত ৮টা ১০মিনিটে ইন্ডিগো এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজে করে চেন্নাই হয়ে তাদের শ্রীলঙ্কা যাওয়ার কথা ছিল। তবে ভিসা জটিলতার কারণ দেখিয়ে দলটির ২২ জনকে আটকে দিয়েছে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ। তাদের স্পেশাল ব্রাঞ্চের হেড অফিস থেকে ছাড়পত্র আনতে বলা হয়েছে।
মালয়েশিয়ায় আটক ৬৭ বাংলাদেশি শ্রমিক
মালয়েশিয়ার কেলান্তানের অভিবাসন বিভাগের এক অভিযানে ৭৫ অননুমোদিত অভিবাসী শ্রমিক গ্রেফতার হয়েছেন। এদের মধ্যে সাতজন স্বীকার করেছেন তারা থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়া সীমান্তের সুংগাই গোলোক নদীপথে অবৈধভাবে দেশটিতে প্রবেশ করেছেন। জেআইএম কেলান্তানের পরিচালক মোহাম্মদ ইউসুফ খান মোহাম্মদ হাসান জানান, গ্রেফতার ব্যক্তিদের বয়স ২৩ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। তাদের মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশি, একজন ভারতীয় এবং একজন মিয়ানমারের নাগরিক। মোহাম্মদ ইউসুফ আরও জানান, গোয়েন্দা তথ্য ও জনসাধারণের সহযোগিতায় পরিচালিত যৌথ অভিযানে কোটা বারু ও পাশির মাস এলাকার নির্মাণস্থলগুলোয় অভিযান চালানো হয়। অভিযানে মোট ৭৫ বিদেশি নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়েছেÑ এর মধ্যে ৬৭ জন বাংলাদেশি পুরুষ, চারজন ইন্দোনেশিয়ান পুরুষ, দুজন ইন্দোনেশিয়ান নারী, একজন ভারতীয় ও একজন মিয়ানমারের নাগরিক। তিনি বলেন, তাদের সবাইকে তদন্তের জন্য তানাহ মেরাহ অভিবাসন আটক কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে তারা ইমিগ্রেশন অ্যাক্ট ১৯৫৯/৬৩-এর ধারা ৬(১)(সি) ও ১৫(১)(সি), এবং ইমিগ্রেশন রেগুলেশন ১৯৬৩-এর রুল ৩৯ (বি) লঙ্ঘনের অভিযোগে তদন্তাধীন।
রোমে ১৬ বাংলাদেশি উদ্ধার
ইতালির রাজধানী রোমের ভিক্টোরিয়া এলাকায় পুলিশের অভিযানে একটি অবৈধ মেসবাসা থেকে ‘অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে’ বসবাসরত ১৬ বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা হয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যম পোসিতানো নোতিৎসিয়েতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এলাকার বাসিন্দারা দুর্গন্ধ ও সন্দেহজনক চলাফেরার অভিযোগ জানানোর পর রোম পুলিশ ওই ফ্ল্যাটে অভিযান চালায়। অভিযানে দেখা যায়, মাত্র তিনটি ছোট রুম ও একটি বাথরুমে ১৬ বাংলাদেশি গাদাগাদি করে বসবাস করছিলেন। পুলিশ জানায়, প্রতিটি বিছানার জন্য মাসে ১৭০ ইউরো বা দিনে ১০ ইউরো ভাড়া আদায় করা হতো। স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে বাইরে থেকে একজন প্রতিদিন এসে রান্না করতেন, যা পুরো পরিবেশকে আরও অস্বাস্থ্যকর করে তুলেছিল। অভিযানের পর পুলিশ পুরো ফ্ল্যাটটি বাজেয়াপ্ত করে এবং তিন বাংলাদেশি মালিকের বিরুদ্ধে অবৈধ ভাড়া প্রদান, স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরির অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকা যাওয়ার পথে ৩ জনের মৃত্যু
দালাল চক্রের মিথ্যা প্রলোভনে পড়ে একের পর এক বাংলাদেশি যুবকের প্রাণ যাচ্ছে আফ্রিকার পাহাড়-জঙ্গলে। নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে দক্ষিণ আফ্রিকা আসার পথে নাজমুল শিপু (২৫), আবেদ মিয়া (২০) এবং সাইফ উদ্দিন মো. রায়হান (২১) নামে তিন বাংলাদেশি যুবক জাম্বিয়ায় মারা যান। নিহত শিপু চাঁদপুর জেলার মতলব থানার বোয়ালিয়াবাড়ির বাসিন্দা। অপর নিহত আবেদ মিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সদর উপজেলার তালশাহার এলাকার বাসিন্দা। নিহতদের আত্মীয়দের মাধ্যমে জানা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের বাবু ও কামরুজ্জামান দিপু নামে দুই দালালের সঙ্গে নাজমুল শিপু ও আবেদের পরিবারের সরাসরি ফ্লাইটে ভিসা করে দক্ষিণ আফ্রিকা পাঠানোর কথা চূড়ান্ত হয়। গত সপ্তাহে ঢাকার একটি ট্রাভেলসের মালিক পুলকের কাছে নিয়ে এসে ইথিওপিয়া পর্যন্ত বিমানের টিকিট কেটে ফেলে। পরে দালালরা কথা পাল্টে তাদের ইথিওপিয়া এনে সড়কপথে মালাউই হয়ে জাম্বিয়া নিয়ে আসে। পথিমধ্যে তাদের অনাহারে রাখে সেখানকার একটি চক্র।
লিবিয়া থেকে ফিরলেন ৩০৯, ফিরছেন আরো ৬০০ অভিবাসী
বাংলাদেশ দূতাবাস, লিবিয়ার নিরলস পরিশ্রম ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলে এবং লিবিয়ার জাতীয় ঐকমত্যের সরকারের সার্বিক সহযোগিতা ও ব্যবস্থাপনায় ত্রিপলি থেকে স্বেচ্ছায় দেশে প্রত্যাবর্তনে আগ্রহী ৩০৯ বাংলাদেশি নাগরিককে গত ৯ অক্টোবর দেশে প্রত্যাবর্তন করা হয়েছে। প্রত্যাবর্তিত অভিবাসীরা ১০ অক্টোবর বেলা ১১টায় ফ্লাই ওইয়া এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন। এছাড়া অতি শিগগির আরও দুটি ফ্লাইটের মাধ্যমে ছয় শতাধিক অভিবাসীকে দেশে প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে। দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ও মিনিস্টার (পলিটিক্যাল) কাজী আসিফ আহমেদ প্রত্যাবর্তিত অভিবাসীদের দূতাবাস প্রাঙ্গণে বিদায় জানান। এ সময় দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) মো. রাসেল মিয়া এবং অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স অভিবাসীদের উদ্দেশে বলেন, তাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে দূতাবাস দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করেছে।