জুলাই সনদ : বল বিএনপির কোর্টে
৬ নভেম্বর ২০২৫ ২০:১৩
॥ জামশেদ মেহদী॥
গত ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হয়। স্বাক্ষরদান করেন দেশের ২৪টি রাজনৈতিক দল এবং প্রধান উপদেষ্টা ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সমস্ত সদস্য। একদিন পর অর্থাৎ ১৯ অক্টোবর গণফোরাম স্বাক্ষরদান করে। এ নিয়ে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলের সংখ্যা দাঁড়ালো ২৫। বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে জনগণ একটি ধারণা পেয়েছিলেন যে, ২৫টি রাজনৈতিক দলের স্বাক্ষরের পর সংক্ষিপ্ততম সময়ের মধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হবে। তবে বাস্তবায়িত হওয়ার আগে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াটি নির্ধারণ করা দরকার। এ স্তরটি বাকি ছিলো। সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান এবং ঐকমত্য কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান প্রফেসর আলী রীয়াজ বলেছিলেন যে, ৩-৪ দিনের মধ্যেই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে তার কমিশন অর্থাৎ ঐকমত্য কমিশন প্রধান উপদেষ্টার কাছে একটি রিপোর্ট দেবে। ঐ রিপোর্টে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পরবর্তী স্তরগুলো সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। তারপর দিন যেতে থাকে। কিন্তু বাস্তবায়ন ক্রিয়া আর অগ্রসর হয়নি। কারণ জুলাই সনদে যে ৮৪টি সুপারিশ উল্লেখ রয়েছে, তার মধ্যে অন্তত ৬১টি সুপারিশ সর্বসম্মত হয়নি। অর্থাৎ ২৩টি সুপারিশে সব দলের ঐকমত্য হয়েছে এবং ৬১টি সুপারিশে বিভিন্ন দলের নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত বা আপত্তি রয়েছে।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে সকলের ধারণা জন্মে যে, ঐকমত্য কমিশন প্রধান উপদেষ্টা তথা সরকারের নিকট বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে একটি রিপোর্ট দাখিল করবে। এ রিপোর্ট মোতাবেক সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য একটি বিশেষ আদেশ জারি করবে। এটিকে বিশেষ আদেশ বললেও আসলে এটি হবে একটি সাংবিধানিক ফরমান। এ ফরমানকেই বলা হয়েছে আদেশ। আর সাংবিধানিক ফরমানকে বলা হয়েছে বিশেষ আদেশ। এখানে বিএনপির তরফ থেকে দুটি আপত্তি উত্থাপন করা হয়।
বিএনপির কঠোর অবস্থান হলো এই যে, অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ মোতাবেক সুপ্রিম কোর্টের মতামত নিয়ে গঠিত হয়েছে। বর্তমান সংবিধানে অন্তর্বর্তী সরকার বা উপদেষ্টা পরিষদের কোনো বিধান নাই। দ্বিতীয়ত, জুলাই বিপ্লব সাধিত হয়েছে সাংবিধানিক পথ অনুসরণ করে নয়। বিপ্লবের পর দেশে সরকার না থাকায় উড়পঃৎরহব ড়ভ হবপবংংরঃু মোতাবেক সুপ্রিম কোর্ট অন্তর্বর্তী সরকারের ধারণাকে বৈধতা দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের ১০৬ ধারা মোতাবেক গঠিত ইউনূস সরকার তাই সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় একটি সাংবিধানিক সরকার। বিএনপির দাবি হলো, একটি সাংবিধানকি সরকার কোনোদিন প্রভিশনাল কনস্টিটিউশন অর্ডার বা আলোচ্য ক্ষেত্রে বিশেষ আদেশ জারির ক্ষমতা রাখে না।
এতদ্বসত্ত্বেও যদি কোনো ধরনের প্রোক্লামেশন জারি করতে হয়, তাহলে সেটি জারি হবে প্রেসিডেন্টের নামে (যদিও সাংবিধানিক সরকারে প্রেসিডেন্টেরও এ ক্ষমতা নাই)।
কিন্তু এনসিপির দাবি ছিলোÑ এ বিশেষ আদেশ প্রধান উপদেষ্টার নামে জারি করা হোক, প্রেসিডেন্টের নামে নয়। এনসিপির মতেÑ প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিন চুপ্পু হলেন শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসন তথা স্বৈরাচারী সরকারের ভুয়া পার্লামেন্টের প্রোডাক্ট। অথচ জুলাই বিপ্লব সাধিত হয়েছে স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে এবং মুজিববাদী সংবিধানের বিরুদ্ধে। পক্ষান্তরে ড. ইউনূস হলেন বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থানের প্রোডাক্ট। ছাত্রনেতৃত্ব গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছে। ১৮ কোটি মানুষের ঐ অভ্যুত্থানকালে নেতা ছিলেন ১০-১২ জন ছাত্র। তারাই ড. ইউনূসকে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকার হিসেবে সিলেক্ট করেছেন। সেই অর্থে ড. ইউনূস অভ্যুত্থানের প্রতিভূ। জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার মূর্ত প্রকাশ হলো জুলাই সনদ। সুতরাং জুলাই সনদ প্রকাশ করার যোগ্য ব্যক্তি হলেন বিপ্লবোত্তর সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বিএনপির এটি প্রথম বাধা। একই সাথে তারা এ কথাও বলে যে, যেহেতু এটি একটি সাংবিধানিক সরকার, তাই এ সরকারের সাংবিধানিক আদেশ দেওয়ার কোনো ক্ষমতাই নেই। কিন্তু এনসিপি, জামায়াত এবং আরো ৬টি ইসলামী দল মনে করে যে, যেহেতু ইউনূস সরকার জুলাই বিপ্লবের ফসল, তাই এ সরকারের সাংবিধানিক ফরমান জারির পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে।
জামায়াত এবং এনসিপির এ অবস্থানের সাথে সহমত ঐকমত্য কমিশন। তাই তারা সুপারিশ করেছে যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তরফ থেকে ঐ বিশেষ আদেশ জারি করা হোক। তারা আরো সুপারিশ করেছে যে, ঐ বিশেষ আদেশের অধীনে থাকবে একটি অধ্যাদেশ। সেই অধ্যাদেশ মোতাবেক দেশে একটি গণভোট হবে। এ গণভোটে যদি জুলাই সনদ অনুমোদিত হয়, তাহলে যে নির্বাচন হবে সেই নির্বাচিত পার্লামেন্ট গণভোটকে র্যাটিফাই করবে এবং সেই র্যাটিফিকেশন মোতাবেক জুলাই সনদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে গণভোটে ঢুকে যাবে। যদি পার্লামেন্ট ২৭০ কর্মদিবস বা ৯ মাসের মধ্যে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সনদ স্বয়ংক্রিভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে। অতঃপর জাতীয় সংসদের দ্বৈত ভূমিকা বা ডুয়াল রোলের অবসান হবে। এরপর থেকে জাতীয় সংসদ পার্লামেন্ট হিসেবে কাজ করতে থাকবে।
এখানে আরো উল্লেখ করা যেতে পারে যে, প্রধান উপদেষ্টার ঐ বিশেষ আদেশে জাতীয় সংসদকে প্রথম ৯ মাসের জন্য দেওয়া হবে কনস্টিটুয়েন্ট পাওয়ার, যার বাংলা করা হয়েছে গাঠনিক ক্ষমতা। আমরা আসলে এতদিন ধরে এটিকে জেনে এসেছি সাংবিধানিক ক্ষমতা হিসেবে। যে ৯ মাস জাতীয় সংসদ সংবিধান সংস্কারের কাজ করবে, তখন সেটিকে বলা হবে সংবিধান সভা। আমরা এতদিন সংবিধান সভাকে জেনে এসেছি গণপরিষদ হিসেবে। বিএনপি এ সংবিধান সভা, গাঠনিক ক্ষমতা এবং ২৭০ কর্মদিবসের বিধানকে নাকচ করে দিয়েছে।
বিশেষ আদেশের অধীনে যে অধ্যাদেশ প্রণীত হবে, সেই অধ্যাদেশে বর্ণিত থাকবে কীভাবে গণভোট হবে। এখানেও বিএনপির দুটি বিরোধিতা রয়েছে। প্রথমত, তারা জুলাই সনদের ওপর কোনো গণভোটে রাজি হয়নি। কিন্তু যখন তারা দেখলো যে, ৩৩টি রাজনৈতিক দলের প্রায় সবাই গণভোটের পক্ষে তখন তারাও গণভোট অনুষ্ঠানে সম্মত হতে বাধ্য হয়। কিন্তু তারা সাথে একটা শর্ত জুড়ে দেয় যে, এ গণভোট হতে হবে একই দিন, অর্থাৎ যেদিন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, সেই দিন। এখানে জামায়াত এবং অন্যান্য ইসলামী দলের সাথে বিএনপির মতভিন্নতা হয়। জামায়াত সহ অন্যান্য ইসলামী দল দাবি করে যে, নির্বাচনের দিনে যদি গণভোট হয়, তাহলে গণভোট অর্থহীন হয়ে পড়বে, না হয় সংসদ নির্বাচন অর্থহীন হয়ে পড়বে। সুতরাং তারা দাবি করে যে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোট অনুষ্ঠিত হোক।
সনদ বাস্তবায়নের পথে তৃতীয় অন্তরায় হলো জুলাই সনদের ৮৪টি সুপারিশের মধ্যে ৬১টি সুপারিশেরই নোট অব ডিসেন্ট। ঐকমত্য কমিশন বলে যে নোট অব ডিসেনেটর ওপর কোনো গণভোট হয় না। তারা এও বলে যে, নোট অব ডিসেন্টসংবলিত কোনো প্রস্তাব বা সুপারিশ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার নজির পৃথিবীতে নেই। তাই গণভোটে কোনো নোট অব ডিসেন্ট থাকবে না। জামায়াত, এনসিপি এবং অন্যান্য ইসলামী দল ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশকে সমর্থন করে। অর্থাৎ গণভোটে বা সংবিধানে কোনো নোট অব ডিসেন্ট থাকবে না। পক্ষান্তরে বিএনপি বলে যে, নোট অব ডিসেন্ট গণভোটে থাকতেই হবে।
বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় বিএনপির এসব জটিল ও কঠোর আপত্তিতে সরকার বিব্রত হয় এবং বিপত্তিতে পড়ে। তখন মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য গত ৩ নভেম্বর সোমবার উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানান যে, যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে, সেসব ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোকেই একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে সরকার। সরকার আশা করে যে, রাজনৈতিক দলসমূহ নিজেরাই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করবে এবং তারা যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, সেটিকেই একটি দিকনির্দেশনা হিসেবে সরকার গ্রহণ করবে।
মধ্য ফেব্রুয়ারিতে ইলেকশন করতে গেলে আগামী ডিসেম্বর মাসের ১০ তারিখের মধ্যেই নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করতে হবে। ৭ নভেম্বর শুক্রবার। হাতে আছে আর মাত্র ১ মাস ৩ দিন। সময় বয়ে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে। তাই ৭ দিনের মধ্যেই (এই ৭ দিন শুরু হবে ৩ নভেম্বর থেকে) রাজনৈতিক দল গুলোকে তাদের সিদ্ধান্ত জানাতে হবে। সরকার এজন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করার পরামর্শ দিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি ঐকবদ্ধভাবে কোনো ফয়সালায় আসে, তাহলে সেটি সরকার নির্দেশনা হিসেবে মেনে নেবে। আর যদি রাজনৈতিক দলগুলো এক সপ্তাহের মধ্যে কোনো সিদ্ধান্ত জানাতে না পারে, তাহলে সরকার নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
বল এখন বিএনপির কোর্টে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বলটি বিএনপি কোর্টে ঠেলে দিয়েছেন। বিএনপিকেই এখন উদ্যোগ নিয়ে জামায়াতসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সাথে বৈঠকে বসতে হবে। এ উদ্যোগ বিএনপিকে নিতে হবে এজন্য যে, সরকারের এ সিদ্ধান্তের আগেও জামায়াত এসব সমস্যা নিয়ে বৈঠকের জন্য বিএনপির প্রতি আহবান জানিয়েছে। গত ৪ নভেম্বর মঙ্গলবার রাতে এই ভাষ্য লেখার সময় পর্যন্ত জামায়াতের আবেদনে বিএনপি সাড়া দিয়েছে বলে কোনো খবর পাওয়া যায়নি। বিগত ১৪ মাসে বিএনপি যা বলেছে, সরকার তাই মেনে নিয়েছে। তারপরও বিএনপি নিত্যনতুন অন্তরায় সৃষ্টি করেছে। জামায়াত খোলা মনে বিএনপিকে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। এরপরও যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়নে কোনো বড় সমস্যার সৃষ্টি হয় এবং তার ফলে দেশে সাচ্চা গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে কোনো বাধার সৃষ্টি হয়, তাহলে তার জন্য সম্পূর্ণ দায়ী থাকবে বিএনপি।
Emai:[email protected]