আলোকে তিমিরে

আসুন, ৭ নভেম্বরের আয়নায় আবার মুখ দেখি


৬ নভেম্বর ২০২৫ ১৯:৫৬

॥ মাহবুবুল হক ॥
২০২৪-এর ৫ আগস্টে দেশ ও জাতির যে অবিস্মরণীয় ও অচিন্তনীয় ঐতিহাসিক ‘উত্থান’ হয়, সেটাকে খুব গভীরতর মাত্রা ও স্তর থেকে পিন পয়েন্টেড মূল্যায়ন করা এখনো শুরু হয়নি। না হওয়ারই কথা। আরো কিছুটা সময় হয়তো লাগবে। এর মধ্যে সঠিক মূল্যায়নটি মাটি ফুঁড়ে অকস্মাৎ একদিন বেরিয়ে আসবে, ইনশাআল্লাহ। সে কারণে আজ এখানে বিপ্লব, গণবিপ্লব, অভ্যুত্থান, বিদ্রোহ, গণঅভ্যুত্থান, ছাত্র- জনতার অভ্যুত্থান- এসব অভিধা না করে আমরা খুব সন্তর্পণে শুধু ‘উত্থান’ বলেছি। যদিও গণঅভ্যুত্থান, অভ্যুত্থান, বিদ্রোহ ও উত্থান একই অর্থ বহন করে থাকে। বিপ্লবের বিষয়টি একটু উঁচু মার্গের বিষয় বলে চিহ্নিত করা হয়। যেমন ‘রুশ বিপ্লব’, ফরাসি বিপ্লব’ এবং সমসাময়িককালে ইসলামী আন্দোলনের তুলনায় ‘ইসলামী বিপ্লব’ শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে। বোধ করি, এ শব্দটি ব্যবহারের পেছনে বহু কষ্টকর প্রয়াস ও গবেষণা বিদ্যমান রয়েছে। যেমন ইসলামী বিপ্লব বললে সাথে সাথে দুনিয়াব্যাপী বর্তমান সময়ের শিক্ষিত মানুষ সাথে সাথেই ধরে নেবে আজ থেকে প্রায় ১৫০০ বছর আগে মক্কা-মদিনায় যে এক নতুন ধারার উদগম, উন্মেষ, উত্থান, অভ্যুত্থান বা বিপ্লব ঘটেছিল, তারই পুনরুত্থান বা পুনরাগমনের কথা বলা হচ্ছে। একেবারে নতুন কিছু নয়। নতুন বিষয় নয়। পুরনো বিষয়, যা ইতোমধ্যে ঢাকা পড়ে গেছে। মলিন হয়ে গেছে। আবর্জনার নিচে চাপা পড়ে গেছে। প্রাকৃতিক বা অপ্রাকৃতিক কারণে মহেঞ্জোদারোর মতো মাটিচাপা পড়ে গেছে। যেহেতু এটা মানবতার জন্য কল্যাণকর বিষয়, সেহেতু এ কল্যাণকর বিষয়-আসয়কে উদ্ধার করতে হবে। তবে একেবারে উদ্ধার নয়, পুনরুদ্ধার। উদ্ধার অভিযান এবং পুনরুদ্ধার অভিযান আবার সবসময় একরকম নয়। ইসলামী বিপ্লব বলুন, রুশ বিপ্লব বা ফরাসি বিপ্লব বলুন, এসব কথা উৎসারিত বা উদ্ভাসিত হলে সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান যুগের সম্মানিত আঁতেলগণ বলবেন, আর এসব তো নতুন কিছু নয়। সবই পুরনো। এসব থিসিস যুগে যুগে অ্যান্টিথিসিসের সাথে যুদ্ধে হেরে গিয়ে একেক সময় সিনথিসিসে পরিণত হয়েছিল। তাও ইসলাম ছাড়া বাকি আদর্শ বা মতবাদ সর্বোচ্চ ৭০ বছরের মধ্যে অনেকটাই বিলীন হয়ে গেছে। এ বিলীন হওয়া ভাঙাচুরা আদর্শ বা মতবাদকে কোনো রকমে মেরামত করে চালু করার বা চালু রাখার বিধি-ব্যবস্থাও মাঝে মাঝে ঝলক দিয়ে ওঠে। এটা আপনা-আপনি ঝলক সৃষ্টি করে না। অস্ত্র ও আন্তর্জাতিক ব্যবসাসহ কোনো কোনো কারণে পুরনো রাষ্ট্রীয় ও সরকারি ব্যবস্থাগুলো সামনে এসে দাঁড়ায়। কারো কারো স্বার্থ উদ্ধার হয়। এ কাজগুলো করে সাধারণত ইহুদিদের যুদাইযম ও যুনাইযমরা। সাথে সবসময় যোগ হয় নাসারাদের জাতীয়তাবাদী অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠী। লক্ষ করলে দেখা যাবে, এরা কখনো বলে না যে আমরা অমুক অমুক আদর্শ বা মতবাদের আলোকে রেনেসাঁর সৃষ্টি করব বা পুনরুত্থান ঘটাবো। তারা নতুন নতুন নানা নামে এবং নানা অভিধায় শুধু কাজ করে যায়। ঘুরেফিরে তাদের কাজগুলো মানবতার, মানবিকতার, ইসলামের বিরুদ্ধে বা মুসলিমদের বিরুদ্ধে চলে যায়।
এ যুগে এখনো যারা ইসলামী বিপ্লবের কথা বলছেন, তারা কিন্তু পরিষ্কারভাবে ইসলামী রেনেসাঁর কথা বলছেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে, বিপ্লবের সঙ্গে একটা পরম্পরা যুক্ত আছে। একটা ধারাবাহিকতা বা পুরনো ঐতিহ্য সংশ্লিষ্ট আছে। একটা ‘লেগাছি অব দি পাস্ট’ সংযুক্ত আছে। এখন যেমন দেখা যাচ্ছে নাৎসিবাদ ও নাজিবাদ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। পূর্বে জার্মানি একপর্যায়ে মাইনোরিটি ইহুদিদের হত্যা করেছিল। ফ্যাসিবাদের সঙ্গে মাইনোরিটি নিশ্চিহ্ন করার বিষয় সংযুক্ত। এখন নাৎসিবাদ যদি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তাহলে তো জার্মানরা এখন মুসলিমদের মারবে। ইতালির মুসোলিনি যে ফ্যাসিবাদ সৃষ্টি করেছিলেন, তারও তো মূল লক্ষ্য ছিল বিরোধীদল ও মাইনোরিটিকে উৎখাত করা।
বাংলাদেশে যে ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছিল, তারও প্রথম লক্ষ্য ছিল সংখ্যালঘুদের নির্মূল করা। এখানে সংখ্যালঘু বলতে অন্য ধর্মের বা বর্ণের মানুষকে চিহ্নিত করা হয়নি। মোটাদাগে প্রথমে চিহ্নিত করা হয়েছে বিরোধীদলকে। বাংলাদেশে প্রথমে বিরোধীদল ছিল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। এর প্রধান ও প্রাণপুরুষ ছিলেন সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব.) এমএ জলিল। তিনি মূলত খাঁটি মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার সিপাহসালার ছিলেন। তিনি ভারতীয় সৈন্যসহ ব্যবসায়ী ও লুটপাটকারীদের বেসুমার লুটপাট বন্ধ করার সাহসী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। এতে ভারতীয়রা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ক্ষতি ভারত সহজভাবে নিতে পারেনি। তারা বাংলাদেশের সরকারের কান ভারী করতে থাকে। এদিকে মেজর জলিল ইহুদিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য বাংলাদেশ থেকে সৈন্য ও সহযোগী হিসেবে কিছু লোক মধ্যপ্রাচ্যে প্রেরণ করতে সক্ষম হওয়ায় ইসরাইলের মোসাদ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ভারতের ‘র’ পূর্ব থেকেই রাগান্বিত থাকায় ‘র’ ও ‘মোসাদ’ মিলে মেজর জলিল ও জাসদকে প্রথম শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে। ফলে জাসদের প্রায় ২৭ হাজার তরুণকে হতাহত ও নির্মূল করা হয়। হতাহত ও নির্মূল করার তালিকায় সিরাজ শিকদারের দলসহ অন্যান্য সর্বহারা পার্টির সদস্যরাও ছিল। যারা নাকি মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে মুক্তিযুদ্ধের নামে ধনী লোকদের হত্যা ও তাদের সম্পত্তি লুটপাটে অংশগ্রহণ করেছিল।
দ্বিতীয় মাইনোরিটি ঠিক করা হয় যারা মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে, তাদের। সে কারণে প্রথম থেকেই তাদের নামকরণ করা হয়েছে- ‘রাজাকার, আলবদর নির্মূল কমিটি’, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী নির্মূল কমিটি’ ইত্যাদি ইত্যাদি। মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার পক্ষের নেতাকর্মীরা সবসময় তাদের ভাষণে বলতেন, উৎখাত, নির্মূল ও নিশ্চিহ্ন করতে হবে। স্বাধীনতার চেতনার কথাই তারা সর্বক্ষণ বলে আসছেন। কখনো দেশবাসীর ঐক্যের কথা বলেননি। বলেছেন বিভক্তির কথা। বিভাজনের কথা। অনৈক্যের কথা। বলেছেন দেশের মিত্র হলো মুক্তিযোদ্ধারা। আর শত্রু হলো রাজাকাররা। এভাবেই দেশের শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করা হয়। ভারতের ‘র’ ও ইসরাইলের মোসাদের তৎপরতায় যখন রাজাকার নির্মূলের কাজ শুরু হলো, সে সময়টায় একপর্যায়ে চীন ও মুসলিম দেশগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়, রাজাকার শুধু মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রায় সব রাজনৈতিক দলের মধ্যেই রাজাকার ও স্বাধীনতাবিরোধী রয়েছে। চীন দোষ দিল মূলত রাশিয়াকে। আর রাশিয়া মূলত দোষ দিল চীনকে। রাশিয়া বলেছিল, বাংলাদেশের কমিউনিস্টদের মধ্যে যারা রুশপন্থী ছিল, তাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল ভারতপন্থী। তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পক্ষে ছিল। আর যারা চীনপন্থী ছিল, তারা ছিল দুভাগে বিভক্ত। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে যেসব রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী ছিল, তারা একদিকে যেমন পাকিস্তানের বিরোধী ছিল, অন্যদিকে তারা ভারতেরও বিরোধী ছিল। বিশেষ করে মওলানা ভাসানী বাংলাদেশকে ভারতের করদরাজ্যে পরিণত করতে একদম চাননি। তিনি চেয়েছিলেন একদম পরিষ্কার স্বাধীন এক বাংলাদেশ। যার সঙ্গে যুক্ত থাকবে আসাম ও ত্রিপুরা। অর্থাৎ ১৯০৫ সালের ব্রিটিশ বাংলা বা পূর্ব বাংলা। এ কারণে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মওলানা ভাসানীকে ইন্ডিয়া একবার কিছুদিনের জন্য বন্দি করে রেখেছিল। ১৯৭১ সালের মধ্যে এবং পরে মওলানা ভাসানীর সাথে অন্যদের তুলনায় সর্বক্ষণ সম্পর্ক বজায় রাখেন তমুদ্দুন মজলিসের ডানপন্থী অংশের প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ রাজনীতিক ও শিক্ষাবিদগণ। এর ফলে আর কিছু না হলেও তার নামে একটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় টাঙ্গাইলে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর তৎকালীন মুসলিম বাংলা স্লোগান, আসাম, ত্রিপুরা ও ইসলামপ্রীতি বামপন্থীদের পছন্দ না হওয়ায় তার দল ও নানারকম গোষ্ঠী ভেঙে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। তার সাপ্তাহিক ‘হক কথা’ ১৯৭২ থেকে অনেক বছর দুর্দান্তভাবে জনপ্রিয়তাসহ প্রকাশিত হয়। এতে ভারত বিরোধিতা ছিল প্রথম এবং প্রধান বিষয়। তিনি আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যের মেহনতি মানুষের মুক্তি চেয়েছিলেন।
এদিকে ভারত বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামকে তাদের অঙ্গীভূত করার নানা ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে। প্রায় ১২-১৩টি উপজাতি অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষকে তারা আদিবাসী ও ভূমিপুত্র বলে তকমা দেয়। তাদের স্বাধীন হওয়ার প্রচণ্ড উৎসাহ প্রদান করে। ভারতের উসকানিতে বাংলাদেশ সরকার এখানেও কিছু বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী খুঁজে পায়। কিন্তু তারা কখনো ভারতের পক্ষে ছিল না বা নতুন স্বাধীনতার নামে ভারতের করদ রাজ্যে পরিণত হতে একদম রাজি ছিল না। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার উৎকুণ্ঠিত না থাকলেও বাংলাদেশের সেনাবাহিনী সদাসর্বদা পেরেশান ছিল। এখানে যে ভারত একটা বড় ষড়যন্ত্র বিস্তার করে আছে, এ বিষয়ে আমাদের সেনাবাহিনী সতর্ক ও সাবধান ছিল এবং এখনো সেভাবেই আছে। ভারত কোনোসময় এ বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখেনি। আমাদের সেনাবাহিনীর কারণে ভারত সেখানে সঠিকভাবে শিকড় প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
এদিকে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্ররোচনায় শেখ মুজিব বাংলাদেশকে রাতারাতি একদলীয় ফ্যাসিস্ট দেশে পরিণত করে ফেলেন। গণতন্ত্র নির্মূল করেন। মানবাধিকার নিঃশেষ করেন। সকল রাজনৈতিক দলকে; এমনকি নিজের আওয়ামী লীগ দলকে নিশ্চিহ্ন করে একটিমাত্র সরকারি দল রাখেন, যার নামকরণ করা হয়; ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ সংক্ষেপে ‘বাকশাল’। এ বাকশাল করতে গিয়েই শেখ মুজিব দেশে কলঙ্কজনক দুর্ভিক্ষ ডেকে আনেন। ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষের কথা মানুষ একদম ভুলে গেছে। ৫০ পয়সা সেরের চাল হঠাৎ ১০ টাকায় পৌঁছে যাওয়ায় সারা বাংলাদেশে দারুণভাবে দুর্ভিক্ষ প্রতিষ্ঠিত হয়। না খেয়ে হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে। রাজধানী ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় অনাহারে মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। এ দৃশ্যের প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে লাখ লাখ লোক এখনো বেঁচে আছে। গোটা জাতি অন্তত একটি বছর দুঃসহ ও দুর্বহ জীবনযাপন করেছে। সাহায্য করার কেউ ছিল না। সেনাবাহিনীর মধ্যকার মুক্তিযোদ্ধার একটি অংশ পরাজিত বাহিনীর আত্মসমর্পণের বিষয়টি (১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১) থেকে শুরু করে শেখ মুজিবের সেনাবাহিনীর পাশাপাশি ‘মুজিব বাহিনী’ ‘লাল বাহিনী’ ও ‘রক্ষী বাহিনী’ গড়ে তোলার বিষয়গুলো কখনো সহজ-সরল বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেনি। সেনাবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা অংশটি বরাবর দেখে আসছিল, সেনাবাহিনীর জন্য বরাবর ব্যয়-বরাদ্দ কমিয়ে আনা হচ্ছে। অপরদিকে উপর্যুক্ত সরকারি বাহিনীগুলোর জন্য নানা ছলে-বলে-কৌশলে বাজেট-বরাদ্দ দিন দিন বাড়ানো হচ্ছে। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে কোনো কিছু ভাবা হচ্ছে না। তখনই হঠাৎ (১৫ আগস্ট ১৯৭৫) বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। পরিবার-পরিজনসহ শেখ মুজিব নিহত হন।
এরপরের ঘটনায় যাবো না। সেসব দেশবাসী ভালো করেই জানে। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হঠাৎ করে যে ঘটনা দেশবাসীর সামনে উদ্ভাসিত হয়, ঠিক সে ধরনের আকস্মিক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক আরো একটি ঘটনা ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর দেশবাসীর সামনে উপস্থিত হয়েছিল। সেনাবাহিনীর মধ্যকার মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতীয় অংশ, সেনাবাহিনীর উপপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে কয়েকদিন ধরে বন্দি করে রাখে। ইতোমধ্যে নভেম্বরের ৩ তারিখে জেলখানায় ঢুকে আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী ও কামরুজ্জামানকে হত্যা করা হয়। পরিবারসহ শেখ মুজিবকে সেনাবাহিনীর মুক্তিযুদ্ধের যে অংশটি হত্যা করে, তারা এ চারজন আওয়ামী লীগের নেতাকেও হত্যা করে। এ সময় জিয়াউর রহমান হন বন্দি। সেনাবাহিনীর একপক্ষে ভারতপন্থী মুক্তিযোদ্ধা এবং অপরপক্ষে রয়েছেন বাংলাদেশপন্থী মুক্তিযোদ্ধা। ছিলেন আরেক পক্ষ। তারা সেনাবাহিনীর অফিসার ও সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত সৃষ্টি করে দেয়। কিন্তু সাধারণ সৈনিকরা এসবের ভেতরে প্রবেশ না করে কী করে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করবে, সেই বিবেচনা সামনে রেখে কৌশল অবলম্বন করতে থাকে। তাদের কৌশল ও প্রচেষ্টায় ৭ নভেম্বরে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বন্দিত্ব থেকে মুক্তি লাভ করেন। ঘটনাটি ছিল খুবই উদ্বেগজনক। যেকোনো মুহূর্তে জিয়াউর রহমানসহ সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের মৃত্যুর আশঙ্কা ছিল। দেশবাসী দারুণভাবে উৎকণ্ঠিত ছিল। কিন্তু আল্লাহর মেহেরবানিতে খুব অল্প ক্ষতিতে বিষয়টির আকস্মিক সুরাহা হয়ে যায়। ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থেকে ‘নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবার’ বলে বড় বড় কামান ও অস্ত্রশস্ত্রসহ ঢোল সহরত নিয়ে সৈনিকরা বেরিয়ে পড়ে। দেশের সব ক্যান্টনমেন্ট থেকে সাধারণ সৈনিকরা প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়ে যায়। ঢাকার আকাশে বিমানবাহিনীর বিমান আনন্দে উড়তে থাকে। ঢাকার আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হতে থাকে আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে। ঢাকার গুলিস্তান এলাকায় জড়ো হয় হাজার হাজার সৈনিক। তারা আকাশের দিকে ফায়ার করতে থাকে। ঘরবাড়ি থেকে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা গুলিস্তানের দিকে আসতে থাকে। অনেকের হাতেই ছিল খাবার-দাবার ও পানি।
আল্লাহু আকবার ধ্বনির সাথে ছিল বাংলাদেশ জিন্দাবাদ। সেনাবাহিনী জিন্দাবাদ। জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ। কামানের ওপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সৈনিকরা বক্তৃতা করছেন। কথা বলছেন। স্লোগান দিচ্ছেন। সাথে সাথে সাধারণ মানুষও কামানের পিঠে উঠে যে যা স্লোগান দিচ্ছেন। যে যা পারছেন, বক্তৃতা করছেন। মনে পড়ছে কয়েক দিন ধরে দোকানপাট বন্ধ ছিল। ১৪৪ ধারা জারি ছিল। কোথাও খাবার-দাবার ছিল না। কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যে সব ব্যবস্থাই আপনা-আপনি হয়ে যাচ্ছিল। কোনো আশঙ্কা ভয়ভীতি কোনো কিছুই ছিল না। সৈনিকদের সাথে সাধারণ মানুষ যেভাবে গলাগলি করছিল, যেভাবে মোলাকাত করছিল, যেভাবে বুকে বুক মেলাচ্ছিল এবং যেভাবে কোলাকুলি করছিল, এভাবে এর আগে এবং পরে আর কোনোদিন দেখিনি। আর হয়তো কোনোদিন দেখবও না।
সেদিন সবাই বলছিল, আজ যেন আমরা সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হয়েছি। স্বাধীনতার সুখ আমরা আজ প্রথম পেলাম। এর আগে আমরা স্বাধীনতা বলতে কিছুই বুঝিনি। ভারতের ভয়ে আমরা অস্থির ছিলাম। অস্থির ছিলাম শাসকের ভয়েতেও। আজ যেন কোনো ভয় নেই, শঙ্কা নেই, অস্বস্তি নেই। সবখানে আমরা। কোথাও আজ অন্য কেউ নেই। আমরাই আমরা।
২০২৪ সালের ৩৬ জুলাই তথা ৫ আগস্টে একই ছবি এবং একই চিত্র আমরা দেখেছি। আমাদের বিশ্বাস, এটাই আমাদের আসল রূপ। এটাই আমাদের আসল চেহারা।