রাজনৈতিক নেতাদের ভাষা ব্যবহারে সতর্কতা জরুরি
৬ নভেম্বর ২০২৫ ১৯:৪২
রাজনীতি কিন্তু রাজার নীতি নয়, নীতির রাজা। এখানে রাজা শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে শ্রেষ্ঠ বা সেরা অর্থে। প্রচলিত ক্ষমতাবান কোনো স্বৈরাচারী শাসক বোঝাতে নয়। শ্রেষ্ঠ বা সেরা নীতির চর্চা করবেন রাজনীতিবিদরা। তাদের আচার-আচরণ, কথাবার্তা হবে সাধারণ মানুষের জন্য আদর্শ। বিশেষ করে গণতান্ত্রিক রাজনীতির সৌন্দর্য হলো যুক্তিপূর্ণ যথাযথ সমালোচনা এবং পরমতসহিষ্ণুতা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার পালিয়ে যাওয়ার পর জনগণ প্রত্যাশা করেছিল রাজনীতিতে পরিবর্তন আসবে। পুরনো ধারার ঘুষ-দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজিনির্ভর সামন্তবাদী রাজনৈতিক বন্দোবস্ত থেকে বের হয়ে আসবে রাজনীতি। রাজনীতি মানে বিনা পুঁজির ব্যবসা করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া নয়। পুকুরচুরির লাইসেন্স নয়। রাজনীতি মানে নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো নিঃস্বার্থ দেশসেবা। কিন্তু এখনো জনগণের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক দূরে আছে দেশের রাজনৈতিক বন্দোবস্ত। সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি পুরনো ধারার ঠিকাদার সামন্তবাদী রাজনীতির ধারক-বাহক দুর্নীতিবাজ, দখলবাজ, চাঁদাবাজদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। তাদের অরাজনৈতিক ভাষায় আক্রমণে তিনি প্রতিনিয়ত আক্রান্ত হচ্ছেন। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর অনেক নেতাও স্বৈরাচারের ভাষায় কথা বলছেন। তারা অনেক ক্ষেত্রে শালীনতার সীমা অতিক্রম করছেন। আওয়ামী লীগের বয়ানের নতুন সংস্করণে পুরনো ক্যাসেট বাজাতে শুরু করেছেন। অনেক ক্ষেত্রেই তারা সীমা অতিক্রম করছেন; বিশেষ করে ফ্যাসিস্ট সরকারের নির্যাতনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে এমন সব ভিত্তিহীন মন্তব্য করছেন এবং বক্তব্য দিচ্ছেন, যা সত্যি দুঃখজনক। যে রাজনৈতিক দলের আমীরসহ শীর্ষনেতাদের মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগে জুডিশিয়াল কিলিং করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জামায়াতে ইসলামীর মজলুম নেতা জীবন্ত শহীদখ্যাত এটিএম আজহারুল ইসলাম সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে বেকুসর খালাস এবং মুক্তির পর জামায়াত নেতাদের বিচারের নামে হত্যার নির্মম সত্য প্রমাণ হয়েছে। তারপরও কথায় কথায় সেই ভিত্তিহীন ইস্যু তুলে গালিগালাজ করে বক্তব্য দেয়া ফ্যাসিস্ট চরিত্রেই বহিঃপ্রকাশ।
লন্ডনপ্রবাসী একজন লেখক এ প্রসঙ্গে একটি সহযোগী দৈনিকে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভাষার ব্যবহার এখন এক উদ্বেগজনক অবস্থায় পৌঁছেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্ব ও নেতৃবৃন্দের মুখ থেকে শালীন ও ভদ্র কথাবার্তার বদলে প্রতিনিয়ত শোনা যাচ্ছে আক্রমণাত্মক, বিদ্বেষমূলক এবং কখনো কখনো অশ্রাব্য কথন। এমন প্রবণতা কেবল রাজনৈতিক সৌজন্যকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং গণতন্ত্রের সুস্থ বিকাশকেও বাধাগ্রস্ত করছে। রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের কল্যাণ ও রাষ্ট্র পরিচালনার সুষ্ঠু পরিকল্পনা। কিন্তু যখন রাজনৈতিক ভাষা শালীনতা হারায়, তখন জনগণ রাজনীতিকে আর নীতি বা আদর্শ হিসেবে দেখে না, বরং দেখে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা আর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব হিসেবে। রাজনীতি আসলে এক ধরনের জনসেবার অঙ্গীকার। কিন্তু যখন ভাষা শিষ্টাচার হারায়, তখন রাজনীতির মূল উদ্দেশ্যই আড়াল হয়ে যায়। নেতাদের মনে রাখা উচিত, তাদের প্রতিটি বাক্য কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং জনগণের সামনে পুরো দলের মূল্যবোধের প্রতিফলন। তাই ভাষার দায়িত্বশীল ব্যবহারই গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের অন্যতম শর্ত।’
একজন প্রবাসীর দেশের রাজনীতি নিয়ে এমন মন্তব্য শুধু দুঃখজনক নয়, লজ্জারও। বিশেষ করে যারা দেশ ও জনগণের জন্য রাজনীতি করছেন, তাদের জন্য বিব্রতকর। তাই এ সমস্যার সমাধানও তাদেরই করতে হবে। যারা সীমালঙ্ঘন করবেন, তাদের সতর্ক করতে হবে। সতর্ক করার পর সংশোধন না হলে বয়কট করতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়।