প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা-প্রাণহানি সড়ক যেন মৃত্যুপুরী
৩০ অক্টোবর ২০২৫ ১৭:৪২
স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীসহ দেশের সব সড়ক এখন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। এমন কোনো দিন পাওয়া যাচ্ছে না, যেদিন সড়কে প্রাণহানি ঘটছে না। গত ২৮ অক্টোবর মঙ্গলবার এ রিপোর্ট লেখার দিনেও রাজধানীর পোস্তগোলা ব্রিজে গাড়ির ধাক্কায় অজ্ঞাত এক নারীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আগের দিন ২৭ অক্টোবর সোমবার জামালপুরে কাভার্ডভ্যান-অটোরিকশা সংঘর্ষে মা-ছেলেসহ পাঁচজন নিহত হয়েছেন। ওই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত তিনজন। তার আগের দিন ২৬ অক্টোবর রোববার রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে সড়ক দুর্ঘটনায় ছাদেক খান (৫৮) নামে এক ব্যক্তি মারা গেছেন। ওইদিন দিবাগত রাত ৩টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দ্য ওয়ান রেস্টুরেন্টের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। আগের দিন ২৫ অক্টোবর শনিবার ছয় জেলায় পৃথক পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় বিএনপির এক নেতাসহ ১০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ১৬ জন। অর্থাৎ সড়কে প্রাণ যাওয়া এখন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কেন মারা যাচ্ছে, এ মৃত্যুর জন্য কে বা কারা দায়ী, তা শনাক্ত হচ্ছে না। দণ্ডও পেতে হচ্ছে না কাউকে।
গত ২৭ অক্টোবর দুপুরে জামালপুর সদর উপজেলার জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চলের সামনে জামালপুর-টাঙ্গাইল মহাসড়কে কাভার্ডভ্যান-অটোরিকশা সংঘর্ষে মা-ছেলেসহ পাঁচজন নিহতের ঘটনায় স্বজনদের হৃদয় ভাঙলেও এর জন্য দায়ী রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। ওই দুর্ঘটনায় নিহতের তিন জন হচ্ছেন- সরিষাবাড়ী উপজেলার সানাকৈর এলাকার হায়দার আলীর ছেলে রাশেদ (৩০), একই উপজেলার উচ্চগ্রাম এলাকার শরিফ আহমেদের স্ত্রী আরিফা আক্তার পলি (২৮) ও জামালপুর সদর উপজেলার নারায়ণপুর এলাকার মৃত ময়েজ উদ্দিনের ছেলে চান মিয়া (৬২)। ওই দুর্ঘটনার জন্য কারা দায়ী, কেন দুর্ঘটনা ঘটলো, কেন প্রাণহানি ঘটলো এ বিষয়ে কোনো তদন্ত কমিটি গঠনের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। হয়তো কয়েকদিন পর মানুষ এ দুর্ঘটনা ভুলে যাবে কিন্তু নিহতের স্বজনদের যে ক্ষতি হয়েছে তা কখনো পূরণ হবে?
২৮ অক্টোবর যাত্রাবাড়ীতে যে দুর্ঘটনা ঘটেছে রাত তিনটার দিকে। কীভাবে মারা গেলেন ছাদেক খান, কী ধরনের যানবাহন তাকে চাপা দিয়ে পালিয়ে গেল তারও কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। তবে যাত্রাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. নজরুল ইসলাম জানান, রাতে যাত্রাবাড়ী ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দ্য ওয়ান রেস্টুরেন্টের দক্ষিণ পাশে চট্টগ্রামগামী লেনে একটি দুর্ঘটনার খবর জানা যায়। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই ব্যক্তির রক্তাক্ত লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। তিনি জানান, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, রাতে কোনো এক যানবাহনের চাপায় ওই ব্যক্তি ঘটনাস্থলে মারা গেছেন। বিস্তারিত তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। প্রথমে ওই ব্যক্তিকে অজ্ঞাত হিসেবে পাওয়া যায়। তবে রাতেই সিআইডির ফরেনসিক টিমের সহযোগিতায় ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে তাঁর নাম-পরিচয় জানা যায়। ওই ব্যক্তির নাম ছাদেক খান (৫৮)। তাঁর বাড়ি মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলার দিয়াপাড়া গ্রামে। বাবার নাম রওশান আলী খান। উত্তর যাত্রাবাড়ী এলাকায় থাকতেন তিনি।
২৫ অক্টোবর দেশের ৬ জেলায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় বিএনপির এক নেতাসহ ১০ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া আহত হয়েছে আরও ১৬ জন। নিহতদের মধ্যে ঝালকাঠির রাজাপুরে একজন, নওগাঁর ধামইরহাটে ২ জন, ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে ২ জন, লালমনিরহাটের আদিতমারীতে ২ জন, ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে ২ জন এবং কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের একজন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন সেপ্টেম্বর মাসের সড়ক দুর্ঘটনার যে তথ্য দিয়েছে তাতে দেখা গেছে, সেপ্টেম্বর মাসে সারা দেশে ৪৪৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪১৭ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৬৮২ জন। নিহতদের মধ্যে ৬৩ জন নারী ও ৪৭ জন শিশু রয়েছে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরে ১৫১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৪৩ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ৩৪.২৯ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ছিল ৩৩.৮৫ শতাংশ। এছাড়া দুর্ঘটনায় ১১২ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ২৬.৮৫ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৫৬ জন, যা মোট নিহতের ১৩.৪২ শতাংশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ৪৯ জন শিক্ষার্থী, ১৮ জন ব্যবসায়ী, ৯ জন বিক্রয় প্রতিনিধি, ৭ জন শিক্ষক, ৬ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী-ইউপি সদস্য এবং ৩ জন সাংবাদিক ছিলেন। বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা। এ বিভাগে ১২৮টি দুর্ঘটনায় ১২৪ জন নিহত হয়েছেন। চট্টগ্রাম বিভাগে ২৪ শতাংশ এবং রাজশাহী বিভাগে ১৮.৮৩ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে। সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে বরিশাল বিভাগে ১৪ জন নিহত।
এদিকে সড়ক দুর্ঘটনার পাশাপাশি ১৭টি নৌদুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত ও নিখোঁজ রয়েছেন ৬ জন। পাশাপাশি ২৯টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ২৭ জন নিহত ও ১৩ জন আহত হওয়ার তথ্যও দিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। প্রতিবেদনে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য ১১টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন এবং খারাপ সড়ক। বেপরোয়া গতি এবং চালকদের অদক্ষতা। চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা অনির্দিষ্ট থাকা। মহাসড়কে স্বল্পগতির যান চলাচল। ট্রাফিক আইন অমান্য ও দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। দুর্ঘটনা রোধে ফাউন্ডেশন বেশকিছু সুপারিশ করেছে। সেগুলো হলো- দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ, চালকদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও বেতন নিশ্চিত করা, মহাসড়কে সার্ভিস রোড তৈরি, রোড ডিভাইডার নির্মাণ ও গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করা।