নতুন প্রজন্ম দায়িত্বশীল বিকল্প খুঁজছে


৩০ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:২৮

॥ সরদার আবদুর রহমান ॥
২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে যেন একটা ঝড়ো হাওয়া বয়ে গেল। যেটি কারো কাছে অনুভূত হলো মৃদুমন্দ সমীরণের মতো, আবার কারো কাছে বজ্রাঘাতের মতো। তবে সার্বিক বিচারে প্রায় চার সপ্তাহব্যাপী চলমান এ ‘হাওয়া’ দেশকে একটি বিশেষ ‘পাঠ’ দিয়ে গেল। সার্বিক অর্থে যা ছিল বেজায় রকম ইতিবাচক। চারটি প্রথমসারির বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যেন নতুন এক বার্তা পেল বাংলাদেশের মানুষ।
দেশের প্রধান যে চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ছাত্র সংসদ নির্বাচন, সেগুলো হলো- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ডাকসু’, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জাকসু’, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘চাকসু’ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘রাকসু’। এ নির্বাচন রাজনৈতিক মহল ছাড়াও সচেতন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মহলে বিশেষভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় গত ৯ সেপ্টেম্বর এবং জাকসু নির্বাচন হয় ১১ সেপ্টেম্বর। আর চাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৫ অক্টোবর এবং রাকসু ও হল সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৬ অক্টোবর। এসব নির্বাচনে দু-চারটি পদ ছাড়া প্রায় পূর্ণ প্যানেলেই বিজয়ী হয় ইসলামী ছাত্রশিবির। এসব নির্বাচনের ফলাফল অনেক মহলের জন্য ‘চক্ষুচড়ক’ হওয়ার মতো অবস্থার সৃষ্টি করে। কেননা এসব নির্বাচনে একটানা বিজয় কেবল একটি ছাত্র সংগঠনের পক্ষেই যায়- সেটি হলো বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল। অতীতের বিভিন্ন সময়ে; বিশেষ করে আশি-নব্বইয়ের দশকে ছাত্র সংসদগুলোয় শিবিরের প্যানেল আংশিক বিজয় পায়। কিন্তু গত দেড় দশকের আওয়ামী রেজিমের দমন-পীড়নের মধ্যে ছাত্রশিবিরকে ক্যাম্পাসগুলোয় দাঁড়াতেই দেয়া হয়নি।
সরকারের জন্য এসিড টেস্ট!
প্রায় দেড় দশক ধরে জাতির কাঁধে চেপে বসা ফ্যাসিবাদী আওয়ামী আমলে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে একরকম বিরোধীদের জন্য ‘টর্চার সেল’ বানিয়ে রেখেছিল। তাদের পতনের পর চেপে রাখা দীর্ঘশ্বাস একসঙ্গে মুক্ত হতে থাকায় কিছুটা এলোমেলো পরিস্থিতি তৈরি করে। এর মধ্যে জাতীয় সংসদের নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হওয়ায় রাজনীতি একটা নির্দিষ্ট গতিমুখ লাভ করে। এমতাবস্থায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে। বলতে গেলে এটি হলো সরকারের জন্য এসিড টেস্টের মতো। এ যাবত উল্লেখযোগ্য চারটি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকারের সামর্থ্য যাচাই করা হলো বলেও অনেকে মনে করেন। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও এ থেকে ‘পাঠ’ গ্রহণের সুযোগ হলো বলে বিজ্ঞজনেরা মনে করেন।
অতীতের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক যেসব অরাজক ও অন্যায্য পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, তা ছিল এককথায় ভয়াবহ। বিশেষত উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস ও ছাত্রাবাসগুলো হয়ে ওঠে বিরুদ্ধ মতকে নিপীড়নের মাধ্যমে দমন করার একেকটি দুর্গ। কেবল একতরফা আধিপত্য প্রতিষ্ঠাই নয়, নানা প্রকার অসামাজিক কার্যকলাপের অবাধ আঙিনায় পরিণত হয় এসব উচ্চ শিক্ষাকেন্দ্র। কেবল সংগঠন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই নয়, সাধারণ শিক্ষার্থী সমাজও এ নিপীড়নের শিকার হয়েছে। এসব ছিল ক্যাম্পাস প্রশাসনের নাকের ডগায়।
কিন্তু প্রশাসন এ অপকর্ম দমনের জন্য কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ দূরে থাক, অভিযোগ আছে যে কোনো কোনো ঘটনায় তারা ছিল নিপীড়কদের সহায়কের ভূমিকায়। এসব ক্ষেত্রে শুধু যে আওয়ামী লীগের দলীয় পাণ্ডা ছাত্রলীগ জড়িত ছিল তা নয়। তারা ছিল নেতৃত্বে। আর এসবের সহযোগী ছিল বামপন্থি সংগঠনগুলো। যেহেতু এর প্রধান টার্গেট ছিল ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা, কর্মী, সমর্থকরা, সেহেতু তাতে সম্মতি দিয়ে যায় বামেরা। আর এ দমনমূলক ধারা অব্যাহত থাকে পতনের আগ পর্যন্ত। এরকম পরিস্থিতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে আওয়ামী-বাম জোট নীরবে অথবা সরবে সমর্থন জুগিয়ে গেছে বলে দেখা যায়। মুখে গণতন্ত্রের বুলি আওড়ালেও কাজে-কর্মে ফ্যাসিবাদের অনুশীলন চলেছে।
নির্বাচন যে বার্তা দিলো
ডাকসু, জাকসু, চাকসু ও রাকসুর নির্বাচনগুলো যে বার্তা দিলো, সেগুলোর মর্ম উপলব্ধি করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলাফল নিছক কতিপয়ের হার-জিত নয়, একটি সামগ্রিক শিক্ষণীয় ও অনুসরণযোগ্য বিষয়। ক্যাম্পাসগুলোয় ইসলামপন্থি সংগঠনগুলোকে বিশেষভাবে ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নানা প্রকার নেতিবাচক ‘ট্যাগ’ দিয়ে হেনস্তা করা হতো। তাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি, রাজাকার, ধর্ম ব্যবসায়ী ইত্যাদি শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হতো। কিন্তু ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলো এসবের কবর রচনা করেছে। এসব এখন গোরস্তানে চলে গেছে। গালাগালির শব্দগুলো মানুষ আর গ্রহণ করে না। অর্থাৎ ট্যাগ দেয়ার রাজনীতিও অচল হয়ে গেছে।
নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হওয়ার মধ্য দিয়ে নয়া প্রজন্ম বুঝিয়ে দিয়েছে যে, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, জাল ভোট- এসব তারা আর গ্রাহ্য করে না। আওয়ামী রাজনীতি-ব্যবসার উচ্ছিষ্ট দিয়ে এখনকার রাজনীতি চলবে না। মুক্তিযুদ্ধের নামে সর্বত্র চেতনার দোকান খুলে বসার দিনগুলোও আর ফিরিয়ে আনা যাবে না।
ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শিবির যে কোন মাত্রায় ভূমিকা ও অবদান রেখেছিল, সেটি প্রত্যক্ষ করেই সাধারণ শিক্ষার্থীরা তার প্রতিদান দিয়েছে। তারা জানিয়ে দিয়েছে, সমালোচনা থাকবে গঠনমূলক, আক্রমণাত্মক নয়। দলের প্রতি আবেগ থাকবে, কিন্তু সত্যটা মেনে নিতে হবে। তাতে যতই কষ্ট হোক। এটিই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। গণতন্ত্রের ওপর অটল থাকতে চাইলে সহাবস্থানের রীতিও মেনে চলতে হবে। উৎপীড়ন-নির্যাতন করে দমিয়ে রাখার দিন শেষ হয়ে গেছে। এসব নির্বাচনের মাধ্যমে সচ্চরিত্রের এবং সত্যের প্রতি অবিচল ব্যক্তিত্বকে পছন্দ করেছে শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে এটিও যুক্ত হয়েছে যে, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মূল পরিকল্পনা থেকে মাঠপর্যায়ের সব নেতৃত্বে ছাত্রশিবির ছিল, এমন নিশ্চয়তা সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিজেদের অভিজ্ঞতার মধ্যেই প্রতিফলিত হয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারকালে অন্য সংগঠনগুলোকে মূলত প্রথাগত রাজনৈতিক বক্তব্যেই আটকে থাকতে দেখা গেছে। গত দেড়-দুই দশকে তারা যেসব আক্রমণাত্মক স্লোগান দিয়ে ক্যাম্পাস গরম করে রাখতো, সেগুলোই আওড়ানোর চেষ্টা করে গেছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের সমস্যা, শিক্ষার পরিবেশ এবং তাদের ব্যক্তিগত সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে যে সংগঠন কথা বলেছে, তাদেরকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। আর ছাত্রশিবির শিক্ষার্থীদের এ মৌলিক চাহিদাগুলোয় নজর দিয়ে ব্যাপক গণসংযোগ করেছে, যা অন্যরা করতে পারেনি। ছাত্র সংসদ নির্বাচন প্রমাণ করেছে যে ছাত্র রাজনীতিতে শুধু তথাকথিত ‘জনপ্রিয়’ স্লোগান বা কথিত ‘অতীত গৌরবে’র দিন এখন শেষ হয়েছে। শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন করতে হলে সুসংগঠিত কার্যক্রম, কার্যকর নেতৃত্ব, ক্যাম্পাসের সমস্যাগুলোর প্রতি মনোযোগ দেয়া এবং সঠিক নির্বাচনী কৌশল গ্রহণ করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যরা এ জায়গাগুলোয় পিছিয়ে থাকায় তারা ব্যর্থতার বৃত্তে ঘুরপাক খেয়েছে। আর ছাত্রশিবির তাদের কৌশল পরিবর্তন ও সাংগঠনিক শক্তি ব্যবহার করে এ শূন্যস্থান পূরণ করে ভূমিধস জয় পেয়েছে।
ছাত্রশিবিরের ওপর আস্থা
এ যাবত সম্পন্ন হওয়া নির্বাচনগুলোয় সাধারণ শিক্ষার্থীরা এ বিশ্বাস ফিরে পেয়েছে যে, ছাত্র সংসদে নির্বাচিতরা চাঁদাবাজি করবে না, প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করবে না, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করবে না, হলে সিট বাণিজ্য করবে না, ছাত্রীদের পোশাক-আশাক ও চলাফেরার স্বাধীনতা নিয়ে বাড়াবাড়ি আচরণ করবে না। আর এসব ইতিবাচক মনোভঙ্গি স্থায়ী হলে সে কারণে হয়তো তাদের বিজয় দীর্ঘস্থায়ীও হবে। এ বাস্তবতা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা।
শুধু পুরনো মুখ নয়, তরুণ নেতৃত্ব ও নতুন চিন্তার মানুষকে সামনে আনতে হবে। দায়িত্ব ও স্বচ্ছতার রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে হবে, যাতে ভোটাররা আবার বিশ্বাস করতে পারে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রা আর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ইত্যাদিকেই নির্বাচনী অঙ্গীকারের মূল সুর হিসেবে এগিয়ে নেবে। ছাত্র ও জাতীয় রাজনীতির গণতান্ত্রিক পুনরুত্থান নিশ্চিত করবে, যাতে নতুন নেতৃত্ব গড়ে উঠতে পারে। নিছক রাজনৈতিক ইস্যু বা এজেন্ডা নয়, ছাত্রশিবিরের অঙ্গীকার সাধারণ শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে এবং আস্থা তৈরি করতে পেরেছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এসব অঙ্গীকারের মধ্যে রয়েছে বহুমাত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল শিক্ষায় অগ্রাধিকার প্রদান, সামরিক ও শারীরিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, বাজেটে শিক্ষাকে অগ্রাধিকার প্রদান, উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক শিক্ষা আইন প্রণয়ন, নারী শিক্ষার প্রসারে উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, শিক্ষার্থীদের জন্য শতভাগ আবাসন নিশ্চিতকরণ, শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষাঙ্গন, গবেষণামুখী উচ্চশিক্ষা, কারিগরি শিক্ষার মান বৃদ্ধি, মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কার, ছাত্র রাজনীতির যথাযথ চর্চা ও নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজন, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে বেকারত্ব হ্রাস, উপজাতি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার উন্নয়ন ও সমান অধিকার নিশ্চিতকরণ ইত্যাদি। বাম ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা যে ‘অসাম্প্রদায়িক’ শিক্ষার কথা বলে শিবিরের প্যানেল তার জবাব দিয়েছে ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদের অবসান ঘটিয়ে। এটি কেবল শিক্ষাঙ্গনেই নয়, সার্বিক জাতীয় নীতি-কৌশলেও এটি অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক প্যানেল
এবারের চারটি সংসদ নির্বাচনে বিশেষ আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্যানেল তৈরি হওয়া। অন্য ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের প্যানেলের প্রার্থী করে ছাত্রশিবির এ কথা জানান দিতে পেরেছে যে, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে ক্যাম্পাসে সকলের অধিকার নিশ্চিত করা যায়। কার্যনির্বাহী সদস্য পদে জয় পাওয়া ডাকসুর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের সর্ব মিত্র চাকমা কিংবা রাকসু নির্বাচনে সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থী সুজন চন্দ্র- এদের বক্তব্য-মন্তব্য ছাত্রশিবিরের পক্ষে ইতিবাচক ইমেজ তৈরিতে সহায়ক হয়েছে। যেমন রাকসুর সুজন চন্দ্রের ভাষ্য, ‘শিবিরের প্যানেলে আসার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল তাদের আদর্শ ও নীতিবোধ আমাকে সবসময় আকর্ষণ করে। ছাত্রশিবির সবসময় মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী এবং শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে শিক্ষাবান্ধব কার্যক্রমের মাধ্যমে এগিয়ে আছে। সেখান থেকে দাঁড়িয়ে আমি নির্বাচিত হয়েছি। তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।’
একই সঙ্গে নারীদের সরাসরি প্রতিনিধিত্ব রাখার ব্যাপারটিও বেশ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কেননা নির্বাচনের প্যানেল গঠনের প্রাক্কালে এ বিষয়টির প্রতিও সকলের বিশেষ নজর ছিল। তাই মূল প্যানেলে নারীদের যথাযথ স্থান দেয়া এবং পরিশেষে তাদের বিজয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবসান ঘটেছে।
নির্বাচিতদের প্রতি আশাবাদ
সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা এসব ছাত্র সংসদের নির্বাচিত দায়িত্বশীলদের প্রতি যে আশাবাদ পোষণ করছেন, সে বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি-দাওয়া, শিক্ষাকার্যক্রম এবং শিক্ষার যথাযথ পরিবেশ নিশ্চিত করতে তারা অন্য সকলের সাথে পরামর্শের ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। তারা এখন বিশেষ কোনো দলের প্রতিনিধিত্ব করছে না, বরং দল-মত নির্বিশেষে বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতিনিধিত্ব করছে। সংকীর্ণ দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি এবং আমিত্ববোধ যেন তাদের গ্রাস না করে। এমনও আশা করা হচ্ছে যে, তারা একটি সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব প্রদানের গুণগত যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জন করুক। তাদের হাত ধরে এদেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসুক।
কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করেন, এটি একান্তই শিক্ষার্থীদের বিষয় হলেও এটি জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাবক হিসেবেও উড়িয়ে দেয়া যায় না। এসব নির্বাচনের ফলাফল ও ভোটারের আচরণ বিশ্লেষণ করলে একটা বিষয় পরিষ্কার, তা হলো নতুন প্রজন্ম এখন দায়িত্বশীল বিকল্প খুঁজছে। এটি নতুন প্রজন্মের ভাবনা আমাদের সমাজ ও রাজনীতির মানসিক কাঠামোয় পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দেয়। রাজনৈতিক সচেতনতার আরেকটি ইতিবাচক রূপান্তর। সাধারণের মধ্যে যে ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ চেপে বসেছিল, সেটি কাটিয়ে ওঠা গেছে। এ প্রেক্ষাপটে ছাত্র নির্বাচন শুধু একটি প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম নয়, এটি নতুন প্রজন্মের পরিবর্তিত রাজনৈতিক মানসিকতার প্রতিফলন বলেও মনে করা যেতে পারে।
এ ছাত্র-প্রতিনিধি নির্বাচন দেখিয়ে দিয়েছে, তরুণরা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি অভিজ্ঞ, আত্মবিশ্বাসী ও যুক্তিবাদী। তারা খুঁজছে বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প। অনেকেই একে মাদকসেবী চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে সুস্থধারার রাজনীতির বিজয় বলে মনে করছেন। শিক্ষার্থীরা পছন্দ করেছেন শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ। কোনো প্রকার হুমকিমূলক ও জবরদস্তিমূলক আচরণ তারা পছন্দ করেননি। এমনকি এটা ভাবলেও ভুল হবে না যে, শিক্ষার্থী ও নারী সমাজ ইসলামী মূল্যবোধকে পছন্দ করছে এবং সেটি ভবিষ্যতে দেশের জন্য দিকনির্দেশক হবে। এভাবেই আগামীতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে উঠবে বলে আশা
করা যায়।