দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়তে চাই সৎ ও যোগ্য নেতা
৩০ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:২৬
॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে সৃষ্টি তারপর দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন দুনিয়ায় শান্তি কায়েম করে আখিরাতে সীমাহীন জান্নাতে যাওয়ার জন্য। আল্লাহর সৃষ্টি ছোট পিঁপড়া থেকে শুরু করে পানিতে তিমির মতো বিশাল প্রাণী সৃষ্টি করেছেন, যা সবই মানুষের উপকারে আসে। ছোট-বড় সব প্রাণীর খাবারের ব্যবস্থা মহান আল্লাহই করে থাকেন। শুধুমাত্র মানুষের খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও আব্রু ঢাকার জন্য কাপড় সবই মানুষকে বুদ্ধি দিয়েছেন নিজে কামাই করার জন্য। মানুষই একমাত্র জীব, যার ভালো কাজের জন্য রয়েছে দুনিয়ায় শান্তি এবং আখিরাতে মুক্তির দিশা। আর মন্দ কাজের জন্য রয়েছে দুনিয়ায় গ্লানি আর আখিরাতে সীমাহীন আগুনের লেলিহান শিখা। যার মধ্যে চিরদিনের জন্য কষ্টে থাকতে হবে, যার শেষ নেই। মহান আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে নবী-রাসূল পাঠিয়ে মানুষের ভালো কাজ ও মন্দ কাজের পথ বাতলিয়ে দিয়েছেন- যাতে করে মানুষ মন্দ পথ পরিহার করে ভালো পথে চলতে পারে। মানুষের বড় পাওনা তার বিবেক। বিবেক সবসময় মানুষকে সঠিক পথের দিশা দেয়। কিন্তু শয়তানের ওয়াসওয়াসায় মানুষ খারাপ পথে চলে যায় এবং না শুকরিয়া করতে থাকে। তাই সে দুনিয়াতেই দুঃখ ভোগ করে আর আখিরাতে ভোগ করবে দুঃখ আর দুঃখ, যার শেষ নেই।
বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৫৪ বছরে দেশের শাসকগোষ্ঠীও তার বিবেককে কাজে লাগিয়ে মানুষের উপকার করতে পারেনি। শেখ মুজিবের বাকশাল থেকে শুরু করে এরশাদের স্বৈরশাসন আর শেখ হাসিনার একনায়কত্বে জনগণের দুঃখের নাভিশ্বাস উঠে পড়েছিল। মাঝখানে শহীদ জিয়াউর রহমান ও তার স্ত্রী বেগম জিয়া কিছুটা হলেও ডান-বাম দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের জন্য কিছু ভালো উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ফলে জিয়াউর রহমান দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের কারণে শহীদ হয়েছেন।
শেখ হাসিনা তার বাপের মৃত্যুর বদলা নিতে গিয়ে দেশের মানুষের ভাত, কাপড়, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা সর্বক্ষেত্রে অরাজকতা, নিয়োগ-বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি, দলপ্রীতিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতিতে দেশ ছেয়ে গিয়েছিল। দুর্নীতিতে শেখ হাসিনা ও তার পরিবার, তার দলের লোকেরা জনগণের টাকা যাচ্ছেতাই ব্যবহার করে ব্যাংক লুট করে বিদেশে পাচার করে দেশের অর্থনীতি পথে বসিয়ে দিয়েছিল। তারা দেশের টাকা লুট করে বিদেশে বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য খুলে আরামে বসবাস করার ব্যবস্থা করেছিল।
দীর্ঘদিন বৈষম্য আর অর্থনীতির খারাপ প্রভাবে ছাত্র-জনতা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল। ফলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ছাত্র-জনতার এক দফা আন্দোলনে পরিণত হয়ে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব সংঘটিত হয়। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার রোষানলে পড়ে শেখ হাসিনা দুপুরের খাবার টেবিলে ফেলে রেখে লুট করা টাকার ব্যাগগুলো সাথে নিয়ে তার দাদার বাড়িতে পালিয়ে আশ্রয় নেয়। শুধু সেই পালায়নি, তার অনুসারী জনগণের শত্রুভাবাপন্ন গ্রামের মেম্বার, চেয়ারম্যান, কমিশনার, মেয়র, এমপি-মন্ত্রী, আমলা, সামরিক ও বেসামরিক পদস্থ ও সাধারণ কর্মচারীরাও পালিয়েছে। কিছু জেলে অবস্থান করছে। শুধু তাই নয়, ফ্যাসিস্ট হাসিনার সরাসরি নির্দেশে লগি-বৈঠা দিয়ে ২৮ অক্টোবর ২০০৬ সালে পল্টনে দিনে-দুপুরে ৬ জন নেতাকর্মীকে মেরে তার ওপর নৃত্য করেছিল, তারও আমরা বিচার চাই।
৩৬ দিনের আন্দোলনে শেখ হাসিনার নির্দেশে প্রায় ১৫০০ ছাত্র-জনতার লাশ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। আবার তার দলীয় গুণ্ডা বাহিনী ও সামরিক-বেসামরিক লোকদের গুলির আঘাতে প্রায় ৩০ হাজার ছাত্র-জনতা আহত হয়েছে। কারো পা নেই, চোখ নেই, হাত নেই। ধুঁকে ধুঁকে দিন কাটাচ্ছে। আবার বিচারের আওতায় সামরিক-বেসামরিক আমলা; এমনকি মন্ত্রীদের বিচার শুরু হয়েছে। যারা বিদেশে পালিয়েছে, তাদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। আবার লুট করা টাকা জব্দ করে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
গত বছর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। প্রায় ১৫ মাস তারা চেষ্টা করে অর্থনীতির চাকা অচল থেকে সচল করার চেষ্টা করছে। সর্বক্ষেত্রেই নতুন নতুন প্রকল্প নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খুঁজছে। উপদেষ্টারা অধিকাংশই এনজিও গ্রুপ থেকে আসা, যার ফলে রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাবে যতদূর এগোনো উচিত ছিল, তা হয়নি।
ঘরে-বাইরের ষড়যন্ত্রের ফলে হত্যার বিচার, সংস্কার ও নির্বাচনের কাজ সঠিকভাবে আঞ্জাম দেয়া সম্ভব হয়নি। তারপরও চেষ্টা চলছে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার। জুজুর ভয় আমাদের অনেকটা পেয়ে বসেছে। প্রতিবেশী ভারতের আগ্রাসনের কারণে আমাদের অরাজনৈতিক উপদেষ্টাদের কাজ এগিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু ভেবে দেখা দরকার ভারতের খপ্পর থেকে বাঁচার জন্য ৩৬ জুলাই ছাত্র-জনতার উত্তাল তরঙ্গ সব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেশ নতুন স্বাধীনতার পথ খুঁজে বের করেছে। কেউ শেখ হাসিনা ও তার দোসরদের রক্ষা করতে পারেনি। ঈমানের বলে বলীয়ান হয়ে কাজ করলে মহান আল্লাহর সাহায্য আসতে দেরি হয় না। আগেও বলেছি, আবারও বলছি, আমাদের পাশের একটি ছোট দেশ মালদ্বীপ। জনসংখ্যাও খুবই কম। তারপরও জনাব মইজ্জু আল্লাহর নামে শপথ করে ভারতের সৈন্য তাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে নির্বাচন করে জিতে গিয়েই ভারতের সৈন্য তাড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের অর্থনীতি ভালোর দিকে। কোনো অসুবিধায় পড়তে হয়নি।
তাই বলব, ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে ৯২% এক আল্লাহয় বিশ্বাসী। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমরা যদি জনগণের উন্নতি-অগ্রগতির জন্য নিজেরা দুর্নীতিমুক্ত থেকে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়তে চাই, তবে আল্লাহর সাহায্য আমাদের জন্য আসবেই, ইনশাআল্লাহ। দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরানোর জন্য বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স আসা সন্তোষজনক। আমাদের দেশপ্রেমিক বিদেশে কর্মরত ভাইয়েরা কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠিয়ে দেশ দরদের বড় নজির সৃষ্টি করেছে। তাই তো জামায়াতের আমীর বিদেশে অবস্থানরত ভাইদের নির্বাচনে শরিক করার জন্য তাদের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করার ওপর জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন। বিবেকের বশবর্তী হয়ে আমাদের ভালো কাজের পথেই এগোতে হবে। দেশ ও বিদেশের কুমন্ত্রে জনগণকে আর পরীক্ষা নেয়া যাবে না। বিএনপির ভাইদের বলব, আপনারা শহীদ জিয়া ও বেগম জিয়ার রাজনীতিতে ফিরে আসেন। ছাত্রদলের সভাপতি-সেক্রেটারিগণ তাদের ভূমিকা সঠিকভাবে প্রয়োগ করুন মূল দলে। আমার অনেকের সাথেই ভালো সম্পর্ক আছে। কয়েকদিন আগেই ড. রিপন ভাইয়ের সাথে কথা হলো। রিজভী ভাই তো আমার বাসায় একাধিকবার এসেছেন। জেলখানায়ও তার সাথে একাধিকবার দেখা হয়েছে। বিএনপি নেতা শিমুল বিশ্বাস, হাবিবুর রহমান হাবিব, সেলিম রেজা হাবিব আমার এলাকার লোক। তাদেরকেও বলেছি, আপনারা শহীদ জিয়ার আদর্শে ফিরে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট নির্বাচনে বেগম জিয়া থেকে শুরু করে অনেক নেতার সাথেই মিটিং-সিটিং করার সুযোগ হয়েছে। তাই বলি, দেশের জন্য, উন্নয়নের জন্য কাজ করতে দুর্নীতিমুক্ত এবং চাঁদাবাজদের বাদ দিয়ে আপনাদের চিন্তা করতে হবে। জনগণ আপনাদের ভোট দিয়ে জেতালে সরকার গঠন করবেন। না হলে বিরোধীদলে থেকেও দেশের জন্য কল্যাণমূলক কাজ করা যায়।
ডাকসু, জাকসু, চাকসু ও রাকসু নির্বাচনে প্রমাণ হয়েছে দেশের শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা কেমন নেতৃত্ব চায়। দুর্নীতিমুক্ত সেবাধর্মী নেতারাই সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে। তাই কোনো ট্যাগ লাগিয়ে এদেশের ছাত্র-জনতাকে আর বিপথে নেয়া যাবে না। ফ্যাসিস্ট হাসিনা জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষনেতাদের ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়েছে। জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামের ফাঁসির রায় থেকে বেকসুর খালাস পেয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের ফুল বেঞ্চ থেকে। শুধু তাই নয়, তারা পর্যবেক্ষণে বলেছেন, এ রায় ছিল আদালতের জন্য অপমানজনক। তাই দুর্নীতিমুক্ত সৎ, যোগ্য প্রার্থীদেরই আগামী নির্বাচনে দেশের মানুষ ভোট দেবে। কোনো ষড়যন্ত্রই কাজে লাগবে না। দেশের মানুষ এখন অনেক সচেতন এবং খোঁজখবর রাখে। আর দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেমেয়েরা তো গোটা দেশ থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছে। তারা গোটা দেশে নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, ইনশাআল্লাহ। সত্যের সাফল্য আসবেই। জামায়াত-শিবির দীর্ঘদিন তাদের কারখানায় সৎ, যোগ্য ও দুর্নীতিমুক্ত নেতা তৈরি করে দেশে এবং বিদেশে সরবরাহ করেছে। যার ফল এখন আমরা দেশ ও বিদেশ থেকে পাচ্ছি। তাই সব দলেরই উচিত গ্রাম থেকে শুরু করে এমপি পর্যন্ত নেতা নির্বাচনে সৎ, যোগ্য ও দুর্নীতিমুক্ত লোককেই বাছাই করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। উপদেষ্টাদের একটি বড় কাজ ছিল জুলাই সনদ ও সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করা। দীর্ঘদিন অনেক পরিশ্রম করে দেশের প্রায় ৩০টি রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে জুলাই সনদ ও সংস্কার প্রস্তাবে সবাই একমত হয়েছে; কিছুটা ভিন্নমত থাকলেও। তাই আর দেরি না করে গণভোটের মাধ্যমে বিষয়টির চূড়ান্ত রূপ দেয়া প্রয়োজন। নির্বাচনের পর যারা নির্বাচিত হয়ে আসবেন আবার তারা দুই-তৃতীয়ংশ সিট পাবে কিনা, তা অনুমানের ওপর ছেড়ে দেয়া যাবে না। অতিসত্বর নির্বাচন কমিশন গণভোটের আয়োজন করুন। এতে নির্বাচন কমিশনেরও বাস্তব প্রশিক্ষণ হয়ে যাবে জাতীয় নির্বাচন করার। আবার জনগণও দীর্ঘদিন নির্বাচনে ভোট দেয়ার অধিকার বাস্তবে পাওয়ার পরীক্ষা হয়ে যাবে। জনগণ নির্বাচনমুখী হবে। টাকার চিন্তা না করে জনগণের সুবিধাই বড়। কত টাকা কত জায়গায় অপচয় করেছে আগের ফ্যাসিস্ট সরকার। ছাত্র-জনতার দাবি অতিসত্বর গণভোটের আয়োজন করা। এদেশে কয়েকবার গণভোট হয়েছে। তাই আর বিলম্ব না করে গণভোট আয়োজন করুন।
কয়েকদিন পূর্বে সর্বদলীয় একটি সেমিনারে সব দলের নেতারাই উপস্থিত ছিলেন। তারা এ গণভোটের ব্যাপারে তাদের মত পেশ করেছেন। দেশের স্বার্থে, দশের স্বার্থে আর কোনো ফ্যাসিস্ট সরকারের উত্থানের সুযোগ না দিয়ে গণভোট করে ফেলাই এখন জরুরি পদক্ষেপ।
জামায়াতে ইসলামীসহ সব দলের নেতা-কর্মীদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে দেশের আইনশৃঙ্খলা উন্নতির দিকে। ছোটখাটো বিষয়ে ঝগড়া-বিবাদে মানুষ মারা যাচ্ছে। কুরআনের অনুষ্ঠানে মসজিদে আক্রমণ হচ্ছে। এ কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়। ৩৫ বছর আগে আমি নিজে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। গোটা নর্থ বেঙ্গলের মধ্যে একটি নামকরা ও ভালোমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হঠাৎ করেই একদল হুট করে প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপালের রুমে হানা দেয়। যা গত ৩৫ বছরে কেউ সাহস পায়নি। এ ধরনের ঘটনা যাতে না হয়, তা সব দলের নেতাদেরই খেয়াল রাখতে হবে। আবার বলছি, জনগণ কিন্তু সচেতন হয়েছে। ভালো ও মন্দের বিচার করার অভিজ্ঞতা হয়েছে। ভালোর সাথে থাকুন, মন্দ পরিহার করুন। দুর্নীতিমুক্ত হয়েই দুর্নীতিমুক্ত দেশ ও সমাজ গঠন করা সম্ভব।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : rnabi1954@gmail.com