মরো মুসলিমদের স্বাধীন ভূখণ্ড এখন সময়ের দাবি
৩০ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:২৪
॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
বিশ্বজুড়ে ফিলিস্তিনি, রোহিঙ্গা, কাশ্মীরি, উইঘুর, পাতানি ইত্যাদি মুসলিম জাতিগোষ্ঠীগুলোর যে অধিকার সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে, তার মধ্যে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অথচ প্রায় অবহেলিত অধ্যায় হলো ফিলিপাইনের মরো মুসলিম সংগ্রাম। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপদেশ ফিলিপাইনে বসবাসরত মুসলিম জাতিগোষ্ঠী ‘মরো’ নিজেদের স্বতন্ত্র ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক পরিচয় নিয়ে টিকে থাকার জন্য দীর্ঘদিন ধরে যে সশস্ত্র ও রাজনৈতিক সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে, তা শুধু একটি জাতিগত সংগ্রাম নয়; বরং এটি একটি ইসলামী আত্মপরিচয় ও অধিকার রক্ষার জন্য সংগঠিত ন্যায়সঙ্গত সংগ্রাম।
মরো মুসলিমদের রাজনৈতিক ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয়
ইবেরিয়া মুসলিম তথা ‘মুর’ বলে অভিহিত করা হতো স্পেন ও পর্তুগালের মুসলমানদের। ইন্ডিয়ান মুসলিমদের প্রায় ৭০০ বছর ইন্ডিয়া শাসনের মতো মুর মুসলিমরা ৭৮১ বছর ধরে স্পেন শাসন করেছে। ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে ফিলিপাইনে উপনিবেশ স্থাপন করে স্পেনীয়রা। এ সময় তারা দক্ষিণ ফিলিপাইনের মুসলিম জাতিগোষ্ঠীগুলোকে ‘মরো’ নামে ডাকতে শুরু করে। পরবর্তীকালে ফিলিপাইনের মুসলমান মরো নামে বিশ্বে পরিচিতি লাভ করে। মরো আসলে একটি সামগ্রিক জাতিগত নাম- ১৭টি ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী এর অন্তর্গত। এর মধ্যে আছে সামা, বাজাও, জামা মাপুন, তাউসুগ, সুলুক, ইরানুন, কালাগান, মারানাও, মাগিন্দানাও, পালাওয়ানন, মলবগ, সাঙ্গিল, ইয়াকান, সুবানন, কালিবুগান, বাঙ্গিঙ্গি ও সাঙ্গির। এ জাতিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ভাষাগত ভিন্নতাও রয়েছে। ফিলিপিনো, আরবিসহ বিভিন্ন স্থানীয় ভাষায় কথা বলে মরোরা।
মরো মুসলিমদের ইতিহাস
মরো মুসলিমদের ইতিহাস বহু পুরনো। স্পেন, আমেরিকা ও জাপানিদের বিরুদ্ধে ৪০০ বছরের লড়াইয়ের ইতিহাস রয়েছে তাদের। ফিলিপাইন স্বাধীন হওয়ার পরও এ লড়াই অব্যাহত রয়েছে। বহু বছর ঔপনিবেশিক শক্তির সাথে লড়াই এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফিলিপাইন সরকারের সাথে লড়াই করতে হয়েছে তাদের। রক্তাক্ত পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে তারা পেয়েছে স্বায়ত্তশাসন। গঠিত হয়েছে বাংসামরো অটোনোমাস রিজিওন ইন মুসলিম মিন্দানাও। মিন্দানাও, পালাওয়ান, সেলোসহ কয়েকটি দ্বীপে বসবাস মরোদের। ঔপনিবেশিক যুগে মরো অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোয় অন্য জাতির লোকদের এনে বসতি গড়ে তোলা হয়েছে। অনেক জায়গা থেকে মরোদের বিতাড়িতও করা হয়েছে। অনেক মরো নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে দেশ ছেড়েছেন। ফলে মিন্দানাওয়ের কিছু এলাকায় মরোদের চেয়ে খ্রিস্টানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। তবে স্বায়ত্তশাসন ঘোষিত অঞ্চলে মুসলিমরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। সেখানে আছে অল্পকিছু লুমাড ও খ্রিস্টান।
শাসক থেকে সংখ্যালঘু মরো মুসলিম
ইন্ডিয়া ও স্পেনের মতো ফিলিপাইন দীর্ঘসময় মুসলিম শাসনের অধীনে ছিল। ‘মিরীকাই’, ‘সুলু’, ‘মাগিনদানিউ’ নামক তিনটি মুসলিম সালতানাতে স্বাধীন ছিল বর্তমানের ফিলিপাইন দেশটি। স্বাধীন মিরীকাই সালতানাতের সর্বশেষ মুসলিম শাসক ছিলেন; ধার্মিক সোলায়মান। ১৫২১ সালে স্পেনীয় নাবিক ম্যাগিলান ভারত মহাসাগর হয়ে মিরীকাই পাড়ি জমান। তাকে অনুসরণ করে বহু ইউরোপীয় সুখী ও সমৃদ্ধ এ অঞ্চলে আসতে থাকে। বছরের শেষদিকে পর্তুগিজ অভিযাত্রী ফের্দিনান্দ ম্যাগিলান স্পেনের পক্ষে মিরীকাই নামক দ্বীপের সালতানাত দাবি করে। অবৈধ এ দাবির অজুহাতে ১৫৬৫ সালে স্পেনীয়দের সঙ্গে যুদ্ধ হয়। সে যুদ্ধে সুলতান সোলায়মান পরাজিত হন। তৎকালীণ সাম্রাজ্যবাদী স্পেনের রাজা ফিলিপ ‘মিরীকাই’ দখল করে নেয়। দ্রুত সময়ে স্পেন পাশ্ববর্তী স্বাধীন সালতানাত সুলু এবং মাগিনদানিউ কুক্ষিগত করে। স্পেনীয় বণিকরা মিরীকাইকে কেন্দ্র ধরে তিনটি সালতানাতকে একত্রিত করে। স্পেনীয় বণিকরা রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের নামে দেশটির নামকরণ করে ফিলিপাইন এবং মিরীকাইয়ের নাম পরির্বতন করে ম্যানিলা রাখে, যা বর্তমানে ফিলিপাইনের রাজধানী।
১৮৯৮ সালে স্পেন-মার্কিন যুদ্ধে মার্কিনিরা ম্যানিলা উপসাগরে স্পেনীয় নৌবহরকে পরাজিত করে। এমন সময়ে চীনা বংশোদ্ভূত ফিলিপিনো নেতা এমিলিও আগিনালদো ১৮৯৮ সালের ১২ জুন ফিলিপাইনকে স্পেন থেকে স্বাধীন ঘোষণা করেন। সাত হাজার একশত দ্বীপের সমন্বিত দ্বীপদেশ ফিলিপাইন ১৮৯৯ সালে স্পেনের অধিকার থেকে কথিত প্যারিস শান্তিচুক্তির ক্ষমতা বলে যুক্তরাষ্ট্রের দখলে চলে যায়। ঐ বছরেই মার্কিন শাসনের বিরুদ্ধে ফিলিপিনোরা বিদ্রোহ শুরু করে কিন্তু ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত দেশটি আমেরিকার অধীনেই ছিল। স্পেনীয়-আমেরিকা ও ফিলিপিনোদের শাসনামলে ব্যাপক গণহত্যা চলে মুসলিম আদিবাসীদের (Indigenous People of Muslim) ওপর। ১৯৩৫ সালের তথাকথিত ‘Resettlement Policy’ অনুসারে, মিন্দানাও অঞ্চলে উত্তর ফিলিপাইনের খ্রিস্টান জনগণকে পুনর্বাসন দেওয়া শুরু হয়। ফলে মুসলিমরা তাদের পূর্বপুরুষদের জমি হারায়। অল্প কিছু দশকের মধ্যেই মুসলমানরা তাদের নিজ ভূমিতেই সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়। যে মুসলিম জাতি কয়েকশ বছর আগেও দেশটিকে শাসন করত। ১৬ শতকে স্পেনীয়দের আগমনের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলে খ্রিস্টান ধর্মের প্রাধান্য শুরু হয়। খ্রিস্টান মিশনারিদের ক্রমাগত আগ্রাসনের ফলে দ্রুতই এ অঞ্চলে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকে। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিটি ক্ষেত্রেই খ্রিস্টান আধিপত্য গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে মুসলিমরা সংখ্যালঘু হয়ে পড়ে। তবে মুসলিমদের হারানো ভূখণ্ড উদ্ধার করা বর্তমান মুসলিম উম্মাহর কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত।
মরো মুসলিম সংস্কৃতি
লড়াকু জাতি হিসেবে পরিচিত থাকলেও মরোরা অতিথিপরায়ণ আর সংস্কৃতি প্রিয়। কয়েকশো বছর ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকলেও তারা ভুলে যায়নি নিজস্ব সংস্কৃতি-ঐতিহ্য। শৈশবেই ধর্মীয় শিক্ষা দেয়া পরিবার থেকে। সামাজিকভাবেও মক্তবসহ বিভিন্ন ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষা সংস্কৃতিতে এগিয়ে যাচ্ছে মরো মুসলিমরা। প্রতি বছর অনেক মরো পরিবারের সন্তান এখন মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া কিংবা ইউরোপ-আমেরিকায় উচ্চশিক্ষা নিতে যাচ্ছে।
মরো মুসলিম অস্তিত্ব
খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের আগ্রাসনের মাধ্যমে মরো মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সীমিত করে দেয়া হয়, শরিয়া আদালতের ক্ষমতা খর্ব করা হয় এবং ইসলামিক সংস্কৃতিকে প্রকাশ্যে পালন করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থাকে মোরো মুসলিমরা কেবল বৈষম্য নয়, বরং ‘অস্তিত্ব সংকট’ (existential crisis) হিসেবে দেখেছে।
মরো মুসলিম সংগ্রামের প্রাথমিক প্রক্রিয়া
১৯৬৮ সালে ফিলিপাইনের জাতীয় সেনাবাহিনী মরো মুসলিমদের ওপর গণহত্যা চালায়। এই অবস্থা থেকেই ১৯৭০-এর দশকে শুরু হয় সুসংগঠিত সশস্ত্র প্রতিরোধ। প্রথমে গঠিত হয় Muslim Independence Movement (MIM),পরে তা রূপান্তরিত হয় Moro National Liberation Front (MNLF)-এ। এর নেতৃত্বে ছিলেন ফিলিপাইনের বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক নুর মিসুয়ারি, যিনি ছিলেন প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবী। MNLF শুরুতে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে লড়াই চালায়। পরবর্তীতে কিছুটা সমঝোতার পথ ধরে তারা ১৯৯৬ সালে ফিলিপাইন সরকারের সাথে শান্তিচুক্তি করে এবং ‘স্বায়ত্তশাসিত মুসলিম অঞ্চল ARMM’ গঠিত হয়। কিন্তু অধিকাংশ মুসলমান এ চুক্তিতে সন্তুষ্ট ছিল না কারণ এটি শরিয়াভিত্তিক বা পূর্ণ ইসলামিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেয়নি। ফলে জন্ম হয় Moro Islamic Liberation Front (MILF)-এর, যাদের লক্ষ্য ছিল ইসলামিক শরিয়াভিত্তিক একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গঠন। তারা রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে শক্তিশালী সংগঠন এবং জনগণের মাঝে বেশি জনপ্রিয়তা পায় যেটি মুসলিমদের জন্য স্বাধীন মিন্দানাও গঠনের সহায়ক।
মরো মুসলিম সংগ্রাম
ফিলিপাইন সেনাবাহিনী কর্তৃক মরো মুসলিমদের ওপর গণহত্যার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই সরকারি সেনাবাহিনী এবং মরো মুসলিম স্বাধীনতাকামীদের মধ্যে ধারাবাহিক সংঘাত শুরু হয়। দেশটির আদিবাসী মরো মুসলিমরা ১৯৭০-এর দশকে মুক্তির সংগ্রাম শুরু করে। সরকার ক্ষমতা জিইয়ে রাখতে মুসলিম প্রধান মিন্দানাও, জুলু ও পাহলোয়ান দ্বীপপুঞ্জের ১৪টি প্রদেশে ইহুদি-ইসরাইলের মতো খ্রিস্টান বসতি গড়ে তোলে। মরো মুসলিমরা মিন্দানাও ও ভিসাইয়াস অঞ্চলে স্বতন্ত্র ইসলামী প্রদেশ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালায়। বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৬ সালে ফিলিপাইন স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতার পরপরই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে একটি পৃথক ভূখণ্ড গঠনের দাবি করে মরোরা। মরোদের দীর্ঘ সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয় Moro Islamic Liberation Front (MILF), Moro National Liberation Front (MNLF) এবং Abu Sayyat নামক অন্যতম স্বাধীনতাকামী সংগঠন। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর অবশেষে ২০১৯ সালে এক গণভোটের মাধ্যমে অঞ্চলটিতে স্বায়ত্তশাসন কার্যকর হয়, যা স্বাধীন মুসলিম ভূখণ্ডের দিকে ধাবমান করবে বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা যায়। মরোদের একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অঞ্চলটির দায়িত্বভার গ্রহণ করে তবে উপগোষ্ঠী আবু সায়েত (Abu Sayyat) এখনো সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে স্বাধীন ভূখণ্ডের জন্য। মরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্টের প্রতিষ্ঠাতা মুরাদ ইব্রাহিমই বর্তমানে ট্রানজিশন অথরিটির চিফ মিনিস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
মার্কিন সেনাঘাঁটি
২০০২ সালের জানুয়ারি মাস থেকে মুসলিম স্বাধীনতাকামী গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে ফিলিপাইন সেনাবাহিনীকে সহায়তা করার জন্য দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে মার্কিন সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে। ফিলিপাইন সরকার মুসলমানদের স্বায়ত্তশাসন দিলেও মুসলিম অধ্যুষিত দক্ষিণ ফিলিপাইনে বিরাজ করছে জটিল এক পরিস্থিতি। শুধু মুসলামনরাই নয়, বহু ফিলিপিনো নাগরিক তাদের দেশে আমেরিকান সেনাবাহিনীর উপস্থিতির বিরোধিতা করেছে। কারণ এটা তাদের দেশে আমেরিকান উপনিবেশবাদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
মরো সংকট নিরসনে মুসলিম বিশ্বের ভূমিকা
মিন্দানাওয়ে স্বায়ত্তশাসন অর্জনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে মরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্ট (এমআইএলএফ)। ফ্রন্টটি বাংসামরো ইসলামিক আর্মড ফোর্সেস (বিআইএএফ) নামেও পরিচিত। ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এমআইএলএফের নেতা মুরাদ ইবরাহিম। স্বাধীনতাকামী এ সশস্ত্র সংগঠনটির সৈন্য সংখ্যা ৩০ থেকে ৪০ হাজার। মরো মুসলিমদের এসব আন্দোলন সংগ্রামে লিবিয়ার মুয়াম্মার আল গাদ্দাফির সরকারের সহযোগিতা অবিস্মরণীয়। মালয়েশিয়াসহ দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার অন্য মুসলিম দেশগুলোও তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন সময়।
মুসলিম উম্মাহর নীরবতা
ফিলিপাইনের মুসলমানরা দীন ও অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সংগ্রাম করছিল, সেখানে মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্র নীরব ছিল। কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন OIC মাঝেমধ্যে বিবৃতি দিলেও বা আলোচনা করলেও তারা বাস্তবভিত্তিক চাপ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। এ অবস্থা আমাদের উম্মাহর ভ্রাতৃত্ববোধ ও দায়িত্ববোধের অবক্ষয়কে প্রতিফলিত করে।
বাংসামোরো শান্তিচুক্তি
২০১৪ সালে MILF-এর সঙ্গে ফিলিপাইন সরকারের ‘Bangsamoro Basic Law’ স্বাক্ষরিত হয় এবং তার ভিত্তিতে গঠিত হয় Bangsamoro Autonomous Region in Muslim Mindanao (BARMM)। বাংসামোরোয় শরিয়া আদালতের কিছু সীমিত ক্ষমতা থাকলেও তা এখনো ফিলিপাইন সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণাধীন। তাই ইসলামিক ন্যায়বিচার সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠা পায়নি। তবে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য ফিলিপাইন নিয়ন্ত্রণমুক্ত মুসলিম স্বাধীন ভূখণ্ড মিন্দানাও বাস্তবায়ন জরুরি।
স্বাধীন রাষ্ট্র মিন্দানাও
সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ মরো মুসলিমদের সমর্থনে দক্ষিণ ফিলিপাইন সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান হিসেবে অঞ্চলটির পূর্ণ স্বাধীনতার পক্ষে মত দেয়। বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৬ সালে ফিলিপাইন স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতার পরপরই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে একটি পৃথক ভূখণ্ড গঠনের দাবি করে মরোরা। বাংসামরো অঞ্চলটি মুসলিম প্রধান। অফিসিয়াল নাম বাংসামরো অটোনোমাস রিজিয়ন অব মুসলিম মিন্দানাও। ফিলিপাইন সরকারের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল এটি। বর্তমানে অঞ্চলটির দায়িত্বে রয়েছে একটি ট্রানজিশন অথরিটি বা ক্ষমতা হস্তান্তর কর্তৃপক্ষ। ট্রানজিশন অথরিটির শীর্ষ পদ ওয়ালি। এ পদটি অনেকটা মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারের প্রেসিডেন্টের পদের মতো। সরকার পরিচালিত হবে একজন চিফ মিনিস্টারের নেতৃত্বে। অঞ্চলটির বর্তমান ট্রানজিশন অথরিটির ওয়ালি খলিফা ওসমান নানদু ও চিফ মিনিস্টার মুরাদ ইবরাহিম।
মরো মুসলিমদের ইতিহাস শুধু একটি জাতির ইতিহাস নয়, বরং এটি মুসলিম উম্মাহর একটি অনন্য অধ্যায়- একটি জাতি যারা ইসলামী চেতনাকে হারাতে দেয়নি, যারা নিপীড়নের মধ্যেও আল্লাহর প্রতি ঈমান ও নিজেদের অধিকার রক্ষার সংগ্রামে অটল থেকেছে। এই সংগ্রাম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যদি আমরা ইসলামী ঐক্য ও সচেতনতা হারিয়ে ফেলি, তবে আমাদের অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়ে। মরো মুসলিমদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা, মুসলিমদের হৃত ভূখণ্ড ফিলিপাইন পুনরায় উদ্ধার করতে এবং মিন্দানাও অঞ্চলে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য মরো মুসলিমদের জন্য স্বাধীন ভূখণ্ড এখন সময়ের দাবি।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
alhelaljudu@gmail.com