মা-বাবাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ
৯ অক্টোবর ২০২৫ ১৬:০৩
॥ মুহাম্মদ শাহাদাৎ হোসাইন ॥
মা-বাবাই সন্তানের কাছে সবচেয়ে বেশি সম্মানিত ও আপনজন। সন্তানের জন্য মা-বাবার চেয়ে বড় আপনজন পৃথিবীতে আর অবশ্যই কেউ নেই। কেননা জন্মের পর সর্বপ্রথম যে দোলনায় দুলে ছিলাম, তা মায়ের তুলতুলে দোলনা। চোখ খুলে প্রথমে যে আঁখি দেখেছিলাম, তা আমার মায়ের মায়াবি আঁখি। শুরুতে যে মোবারক চেহারা দেখেছিলাম, তা ছিলো আমার মায়ের পবিত্র চেহারা। প্রথমে যে ভাষায় কথা বলেছিলাম, সেই ভাষা ছিলো আমার মায়ের ভাষা। আকাশের নিচে আর জমিনের ওপর পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে দয়ালু, সোহাগী আমার মা-বাবা ছাড়া আর কেউ নেই। শিশুর মুখের পবিত্র হাসি মায়ের মনে সুখের ঢেউ তোলে। সন্তানের জন্মলাভ করার পর মানব সন্তানকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য মা-বাবা যে কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করেন, পৃথিবীর কোনো কিছু দিয়ে তার পরিমাপ করা যাবে না। প্রতি মুহূর্তে শিশুর সেবাশুশ্রুষা করতে মা-বাবাকে গলদর্ঘম হতে হয়। শিশুর অসুস্থতায় মায়ের ঘুমহীন রাত কাটে। এত কষ্টের পরও মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের থাকে স্বর্গীয় একটি সম্পর্ক। সন্তানের পড়া-লেখা, খাওয়া-দাওয়া, আর শালীনতার ওপর মা-বাবার কতই না গুরুত্ব। এসব কারণেই বুঝি মা-বাবা সন্তানের কাছে সবচেয়ে আপন। মা-বাবাই সন্তানের দুনিয়া ও আখিরাতের অনাবিল শান্তি। এ প্রসঙ্গে প্রিয়নবী (সা.) বলেছেন, পিতা-মাতাই সন্তানের জান্নাত ও জাহান্নাম। সত্যিই মা-বাবার সন্তুষ্টিই জান্নাত লাভের সহজ উপায়। আর তাদের অসুন্তুষ্টিই জাহান্নামের অধিবাসী করে দেয়। প্রিয়নবী (সা.) আরো বলেন, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত। সত্য কথা বলতে গেলে মা-বাবা সন্তানকে নিজের প্রাণের চাইতেও অনেক বেশি ভালোবাসেন। আর সন্তানকে মা-বাবাই শেখান লেখাপড়া, ভদ্রতা, শালীনতা ও শিষ্টাচার। সীমাহীন পরিশ্রম করেন সন্তানের প্রয়োজন মেটাতে। সন্তানের জামা-কাপড়, আসবাবপত্র সংগ্রহ ও শিক্ষা দেওয়ার জন্য কঠোর পরিশ্রম করে শরীরের ঘাম ঝরান। কিন্তু সন্তানরা তাঁদের চিনতে অনেক সময় মারত্মকভাবে ভুল করে থাকে। মা-বাবা যে কত বড় অমূল্য স্বর্গীয় সম্পদ, তা না জানার কারণেই যতসব বিভ্রান্তি আর ভুলে ভরা সন্তানের জগৎ সংসার। অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত থেকে সন্তানেরা অনেকেই বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি যে অন্যায় আচরণ করে যাচ্ছে, তা অবসানের জন্যই এ সংক্রান্ত জ্ঞানের আলো আজ বেশি প্রয়োজন।
মা-বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা, আদব, সম্মান, সদ্ব্যবহার ও আনুগত্য করা অবশ্যই কর্তব্য।
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের সূরা লুকমানের ১৪নং আয়াতে এরশাদ করেছেন, “আর আমি মানুষকে তার মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। সন্তানের দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। নির্দেশ দিয়েছি, আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও এবং মা-বাবার প্রতিও কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে।” পবিত্র কুরআনে অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে, “তোমরা সবাই আল্লাহর ইবাদত কর, তার সঙ্গে কাউকে শরিক করো না আর মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার কর।” (সূরা আন-নিসা : ৩৬)।
“আমি মানুষকে নিজেদের মা-বাবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছি।” (সূরা আন-কাবুত)।
আর প্রিয়নবী (সা.) বলেছেন, “যথা সময়ে নামাজ আদায় করার পর সর্বোত্তম কাজ হচ্ছে পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ ও সদ্ব্যবহার করা।”
কার্ডিনাল মারমিলড বলেছেন, “মা হচ্ছেন তিনি যিনি অন্য সকলের স্থান পূরণ করতে পারেন, কিন্তু তার স্থান অন্য কেউ পূরণ করতে পারবে না।”
কবি রবার্ট ব্রাউনিং বলেছেন, মাতৃত্বই সকল ভালোবাসার শুরু এবং শেষ।
দক্ষিণ আফ্রিকার লেখক স্রেইনার বলেছেন, “এমন কোনো মহান ব্যক্তি ছিলেন না, যার একজন মহান মা ছিলো না।”
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন বলতেন, “যা কিছু তিনি হয়েছেন বা হবেন, তার জন্য তিনি তার মা এর কাছে ঋণী।”
মার্কিন কবি রালফ ওয়ালজে এমারসন বলেছেন, “মানুষ তাই যা তার মা তাকে বানায়।”
এক কথায় পৃথিবীর সকল ধর্মে মা-বাবার সঙ্গে উত্তম ব্যবহার ও যথাযোগ্য মর্যাদা দেখানোর নির্দেশ রয়েছে।
আমাদের সকলের মা-বাবা আছে। মা আমাদের আদর করেন। স্নেহ ভালোবাসা আর মায়া মমতা দিয়ে কোলে তুলে নেন। গাল ভরে চুমো খান। বাবা অতি সোহাগ করে আমাদের প্রতিপালন করেন, আমাদের উচিত মা-বাবার সঙ্গে হাসি মুখে কথা বলা। তাদের সর্বদা সম্মান করা। তাদের সঙ্গে আদৌ রাগ না করা, তাদের কথা মান্য করা। যেকোনো আদেশ মেনে নেয়া। কখনো তাদের অবাধ্য না হওয়া। মাকে আদর করে মায়াবি সুরে ডাকা এবং বাবাকে শ্রদ্ধা ভরে ডাকা। মা-বাবাকে পেলেই সালাম দেয়া। তাহলে কী হবে? বাবা-মা প্রাণ খুলে মন উজাড় করে সন্তানের জন্য দোয়া করবেন। আর আমরা সকলেই জানি, মা-বাবার দোয়া পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ দোয়া। হযরত খিজির (আ.), হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রা.) ও হযরত বায়েজিদ বোস্তামি (রা.) এদের ইতিহাস তো কম-বেশি আমরা সবাই জানি। এরা তো মা-বাবার দোয়ায় এই বিশ্বে ইতিহাস হয়ে আছেন। কিন্তু দুঃখজনক ও লজ্জাজনক হলো- আমরা কী রকম আচরণ করছি মা-বাবার সঙ্গে। প্রতিটি সন্তান মাত্রই তার মায়ের আদর, সোহাগ ও স্নেহ পায়, তা এক বাক্যে স্বীকার করতে হবে। কত রাত মায়ের নির্ঘুম কেটেছে। কত কষ্ট না জানি আমার বাবা করেছেন।
তাদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা, ভদ্র ও সুন্দর আচরণ করা প্রতিটি সন্তানের অবশ্যই দায়িত্ব। আর মুসলমান হিসেবে এটা আমাদের ঈমানী দায়িত্ব। তাই মহান আল্লাহ্ তায়ালা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন, “তিনি ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করো না ও মাতা-পিতার প্রতি ভালো ব্যবহার করো। তাদের একজন বা উভয়ই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে পৌঁছালে তাদের প্রতি ‘উফ’ তথা বিরক্তি, উপেক্ষা, অবজ্ঞা, ক্রোধ ও ঘৃণাসূচক কোনো কথা বলো না। মমতাদেশে তাদের প্রতি নম্রতার সঙ্গে ব্যবহার করো। আর তাঁদের জন্য মহান আল্লাহ্র নিকট দোয়া করো, “রাব্বির হা’মহুমা কামা রাব্বা ইয়ানী সাগিরা। অর্থাৎ- হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়ার আচরণ কর, যেভাবে তারা শৈশবে আমাকে প্রতিপালন করেছেন।” (সূরা বনি ইসরাইল: ২৩-২৪)। পরিশেষে বলতে হয় যে, আমরা জীবনের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত মা-বাবার সাথে ভালো ব্যবহার করবো এবং নম্র ভাষায় কথা বলবো। কখনো তাঁদের মনে কষ্ট পায় এমন কাজ করবো না। (ইন্টানেট থেকে সংকলিত)।