টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে উত্তরাঞ্চলে বন্যার শঙ্কা


৯ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:৫৫

স্টাফ রিপোর্টার : উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিপাতে দ্রুত বাড়ছে তিস্তা নদীর পানি। এতে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমা ছুঁইছুঁই করছে। পানির এই বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে তিস্তা তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভারী বর্ষণ ও উজানের পাহাড়ি ঢলে নীলফামারী জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদীর পানি আবারো বৃদ্ধি পাওয়ায় তিস্তা তীরবর্তী এলাকায় রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। গত ৬ অক্টোবর সোমবার বেলা ৩টায় তিস্তা নদীর কাউনিয়া পয়েন্টের বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয় বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানিয়েছে। লালমনিরহাটে কয়েকদিনের টানা ভারী বৃষ্টি আর উজানের পাহাড়ি ঢলে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে তিস্তা নদীর পানি। টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে গাইবান্ধার সব নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে।
নীলফামারীতে রেড অ্যালার্ট জারি
ভারী বর্ষণ ও উজানের পাহাড়ি ঢলে নীলফামারী জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদীর পানি আবারও বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে তিস্তা তীরবর্তী এলাকায় রেড অ্যালার্ট জারি করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। গত ৫ অক্টোবর রোববার সকাল ৬টায় লালমনিরহাট জেলার দোয়ানীতে অবস্থিত তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ৭২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে সন্ধ্যা ৬টায় সেখানে ৮৫ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ওই পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি ছিল বিপৎসীমার ৫২ দশমিক ১৫ মিটার। সকাল ৬টায় প্রবাহিত হচ্ছিল ৫১ দশমিক ৪৩ মিটার দিয়ে। সন্ধ্যা ৬টায় সেখানে প্রবাহিত হচ্ছিল ৫২ দশমিক ২৮ মিটার দিয়ে। তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তিস্তার ডান তীরের বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। সেখানে বাশের পাইলিং করে বালির বস্তা নিক্ষেপ করছে পাউবো। তিস্তার তীরবর্তী ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই, পশ্চিম ছাতনাই, খগাখড়িবাড়ী, টেপাখড়িবাড়ী, গয়াবাড়ী, খালিশাচাপানী ও ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের ১৫টি গ্রাম এবং চরাঞ্চলের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বাড়িঘরে পানি উঠতে শুরু করেছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া ডিভিশনের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সূত্রমতে, গত ৫ অক্টোবর রোববার সকাল ৬টায় লালমনিরহাট জেলার দোয়ানীতে অবস্থিত তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি ৫১ দশমিক ৪৩ মিটার, সকাল ৯টায় ৫১ দশমিক ৪৮ মিটার, দুপুর ১২টায় ৫২ মিটার, বেলা ৩টায় ৫২ দশমিক ১৪ মিটার এবং সন্ধ্যা ৬টায় ৫২ দশমিক দশমিক ২৮ মিটার দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল তিস্তা নদীর পানি। পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, ভারী বর্ষণ ও উজানের পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ৫ অক্টোবর রোববার সকাল ছয়টায় বিপৎসীমার ৪৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও সন্ধ্যা ৬টায় ৮৫ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তিস্তা নদীর জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি কালীগঞ্জ নামের স্থানে তিস্তার ডান তীরের প্রধান বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। সেটির মেরামত কাজ চলছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ব্যারাজের সব কটি (৪৪ টি) জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। তিনি জানান, তিস্তা তীরবর্তী এলাকায় রেড অ্যালার্ট জারি করে সন্ধ্যায় মাইকিং করা হয়েছে।
কুড়িগ্রামে নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে
টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে কুড়িগ্রামে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ৬ অক্টোবর সোমবার বেলা ৩টায় তিস্তা নদীর কাউনিয়া পয়েন্টের বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়। অন্যদিকে ব্রহ্মপুত্র ও ধরলা দুধকুমারসহ অন্য নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেও বিপৎসীমার নিচে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে দুধকুমার, ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর দুই তীরের অববাহিকায় রোপা আমন, সবজি, মাসকলাইসহ বিভিন্ন ফসলি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এছাড়া বিভিন্ন খাল, ডোবা ও নিম্নাঞ্চল তলিয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে এ পর্যন্ত জেলায় মোট ১ হাজার ২২৭ হেক্টর ফসলি জমি পানির নিচে নিমজ্জিত হয়েছে। এর মধ্যে রোপা আমন ৯৮৭ হেক্টর, বিভিন্ন শাকসবজি ১ শত ৯১ হেক্টর, মাসকলাই ৪৯ হেক্টর পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি টানা বৃষ্টি ও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে সেক্ষেত্রে এ বছর রোপা আমনসহ বিভিন্ন ফসল নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়ে পড়বে। এতে করে কৃষকরা চরম ভোগান্তিতে পড়বে। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, ভারী বৃষ্টির কারণে কুড়িগ্রামে তিস্তা নদীর পানি বেড়ে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্রসহ অন্য নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা নেই। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল মতিন জানান, জেলায় পর্যাপ্ত পরিমাণ শুকনো খাবারসহ ৪২৪ টন চাল ও ১৪ লাখ টাকা রয়েছে। আমাদের খাদ্য পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। আপাতত কোনো সমস্যা হবে না।
লালমনিরহাটে বিপৎসীমার ওপরে নদীর পানি, প্লাবিত নিম্নাঞ্চল
লালমনিরহাটে কয়েকদিনের টানা ভারী বৃষ্টি আর উজানের পাহাড়ি ঢলে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে তিস্তা নদীর পানি। গত ৬ অক্টোবর সকাল ৬টায় দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে পানির প্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ২৫ মিটার, যা বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপরে। এর ফলে জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল ও সড়কসহ বহু এলাকার ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, গত কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলে তিস্তার পানি ক্রমাগত বাড়ছে। ৫ অক্টোবর রোববার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টায় পানি বেড়েছে প্রায় ৮০ সেন্টিমিটার। সন্ধ্যা ৬টা থেকে পানি বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হয়। ৬ অক্টোবর সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত একই পরিমাণ পানি ছিল। এতে নদী তীরবর্তী এলাকার বহু পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ডুবে গেছে মাছের খামার, রোপা আমন, শাকসবজির খেত ও চরাঞ্চলের রাস্তাঘাট। এখন নৌকা ও কলার ভেলায় চলাচল করছে পানিবন্দি এসব মানুষ।
গাইবান্ধায় সব নদীর পানি বাড়ছে
টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে গাইবান্ধার সব নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। এছাড়া জেলার ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট ও করতোয়া নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। তবে ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট ও করতোয়া নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ৬ অক্টোবর ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ৬ অক্টোবরের তথ্যানুযায়ী গাইবান্ধা পাউবোর নিয়ন্ত্রণকক্ষের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, তিস্তার পানি সুন্দরগঞ্জ উপজেলা সংলগ্ন কাউনিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় তিস্তার পানি ১১৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়ি উপজেলার তিস্তামুখঘাট পয়েন্টে ৭৫ সেন্টিমিটার, ঘাঘট নদীর পানি জেলা শহরের নতুন ব্রিজ পয়েন্টে ৬০ সেন্টিমিটার, করতোয়ার পানি গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার চকরহিমাপুর পয়েন্টে ৪৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুল হক বলেন, উজানের ঢলে ও ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। তবে করতোয়া, ঘাঘট ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপৎসীমার অনেক নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।