নবু-হবুরা এখন রাজনীতি বোঝে
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:১৮
॥ আব্দুল হালীম খাঁ ॥
রাজনীতি এখন সংসদ ভবন থেকে পাড়াগাঁয়ের নবু মিয়ার চায়ের দোকানে নেমে এসেছে। নবু এখন কথায় কথায় রাজনৈতিক দলের নেতাদের রীতিমতো সমালোচনা করে। আমি ওর দোকানে বসে চা খাই। কোনো সময় ওর দু-এক কথায় একটু সায় দিয়ে হুঁ হুঁ করি। নবু তাতেই ভীষণ খুশি হয়। আমার কাপে চা-দুধ একটু বেশি ঢেলে দিয়ে চামিচ নাড়তে নাড়তে হেসে বলে, এই নিন ছার। আপনার মতো এতটুকু সবাই বোঝে নাÑ হি হি হি…
নবু চা-পান বিক্রি করলেও কখনো চা-পান খায় না। বলে, চা খেলে ক্ষুধা নষ্ট হয়। মুখের খাবার রুচি কমে যায়। পান খেলে দাঁতের ওপর ময়লা জমে। মুখের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়। তাই বউ আমাকে পান খেতে নিষেধ করেছে।
বললাম, নবু তুমি তোমার বউয়ের কথা মেনে চলছো।
ছার, হক কথা হলে আমার বউ কেন, শালির কথা মানতে রাজি।
নবু মিয়া একদিন কথায় কথায় বলে ফেলল- ছার, বিএনপি এখন উল্টা পথে হাঁটছে। জিজ্ঞেস করলাম, তুমি চায়ের দোকান থেকে রাজনীতির কী বুঝ? ছার, ঠাণ্ডা-গরম সবার মতো আমিও কিছু বুঝি। ভাত চাইড্ডা খাই তো। জিজ্ঞেস করলাম, নবু তুমি লেখাপড়া করেছো কিছু কি?
কয়দিন স্কুলে ঘোরাফেরা করেছি।
বইপত্র পড়তে জানো?
না, ছার।
টিভির খবর দেখো?
সময় পাই না ছার।
তাহলে রাজনৈতিক দলের খবর জানো কেমনে?
দলের নড়াচড়া দেখে কিছু বুঝি।
নবু দোকানে সবসময় ব্যস্ত থাকে। চা বানিয়ে সবার হাতে হাতে দিচ্ছে। পান বানিয়ে সবার হাতে হাতে দিচ্ছে। আর মুখে অবিরাম কথা বলে যাচ্ছে। ওর হাত আর মুখ সমানতালে চলে।
ওর কথা শুনে আমার মনে খুব কৌতূহল জাগলো। একদিন দুপুরের সময় গিয়ে বসলাম ওর দোকানে। এ সময়ে দোকানে লোকের ভিড় তেমন একটা থাকে না। ওর পেটের কথা বের করার জন্য জিজ্ঞেস করলামÑ নবু, তুমি বিএনপিকে ভালোবাসো না?
আগে ভালোবাসতাম। এখন ঐ দলের ওপর থেকে মনে উঠে গেছে ছার।
মন উঠে গেছে কেন?
দলটার আসল নীতি বদলে গেছে।
আমি এক কথা জিজ্ঞেস করলে নবু দশ কথা বলে। বলে ছার,
আপনারা শিক্ষিত মানুষ। আপনারা সবই তো জানেন।
না, আমি সব জানি না। আমি তোমার কথা জানতে চাই।
নবু বলতে লাগলো, ভারতের বিশ্বস্ত সহচর হাছিনা খাতুনকে হারিয়ে ভারত দিশেহারা হয়ে পড়েছে। তার চারদিকে বর্তমানে কোনো বন্ধু দেশ নেই। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারত নানারকম ষড়যন্ত্র করছে আর তার পাশাপাশি নতুন অনুচর হিসেবে বিএনপিকে কাছে টেনে নিয়েছে। বিএনপির মাধ্যমে পূর্বের মতো বাংলার মানুষের মাথার ওপর দিয়ে লাঠি ঘোরাতে চাচ্ছে আর ব্যবসা চালিয়ে যেতে চাচ্ছে। এতে দেশের সর্বনাশ হতে যাচ্ছে। বিএনপি এখন ভারতের পকেটের পোষা বিড়াল। ভারতপন্থী ও শাহবাগী আমলা এবং বুদ্ধিজীবীরা ছাত্র-জনতার বিপ্লবকে ব্যর্থ করতে উঠেপড়ে লেগেছে। তারা জাতীয় নির্বাচন চাচ্ছে। কিন্তু স্থানীয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বিরোধিতা করছে। বিএনপি বর্তমানে ভারতের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধকে সামনে নিয়ে এগিয়ে চলছে। যে ছাত্র-জনতা বাংলাদেশকে ফ্যাসিবাদ মনে করেছে, বিএনপি এখন প্রকাশ্যে তাদের বিরোধিতা করছে।
নবু, তুমি রাজনীতির এত খবর জানো কেমনে?
ছার, আমি তো কিছুই জানি না। আমার এখানে নেতাকর্মীরা চা খেতে এসে আলাপ করে। আমি তাদের মুখে এসব কথা শুনি।
শোনেন ছার।
আচ্ছা বলো।
জামায়াতে ইসলামীর মতো স্বচ্ছ-নির্মল একটি দলকে বিএনপি এখন আওয়ামী লীগের মতো তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য মনে করছে। ভারত নাকি বিএনপিকে বলে দিয়েছে সাফ কথা, তোমাদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামপন্থী কোনো লোক যেন না থাকে।
নবু, তুমি তো সব দলের সব দিকের খবর জানো দেখছি।
নবু আমার হাতে আরেক কাপ চা দিয়ে বলতে লাগলো- ছার, বিএনপি এখন ক্ষমতার নেশায় বেসামাল হয়ে বর্তমানের ইউনূস সরকারের বিদায় চাইছে। বাংলাদেশের সকল বৈষম্য দূর করতেই দ্ইু হাজার কিশোর শহীদ হয়েছে। আমার বড় ছেলেটা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।
তাই নাকি? ধন্য তুমি। আল্লাহ ওকে হেফাজত করেছেন। হাজার হাজার তরুণ পঙ্গুত্ববরণ করেছে। বিএনপি নেতারা কিশোরদের এ ত্যাগ-কুরবানিকে অসম্মান করে চলেছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক নেতা। তার যোগ্য উত্তরসূরি হচ্ছেন বেগম খালেদা জিয়া। শহীদ জিয়া এবং খালেদা জিয়া ভারত প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন। এত বড় একটা দলের ছাত্র সংগঠন মধ্যবয়স্ক বুড়োদের কমিটি করেছে। আর টেম্পুস্ট্যান্ড, বাসস্ট্যান্ড, নৌস্ট্যান্ড ও মিল-কারখানায় চাঁদাবাজি করে চলেছে। কেউ কেউ আমার দোকানে চা-পান খেয়ে টাকা না দিয়েই চলে যায়। লজ্জায় কিছু বলি না ছার।
থামো থামো। তোমার কথা আর শুনতে চাই না। এসব কথা বললে কিন্তু তোমার খুব ক্ষতি হবে। তোমার দোকানে হয়তো কেউ চা খেতে আসবে না। আবার নব্য সন্ত্রাসীরা দোকান পুড়িয়ে দিতে পারে।
ছার, আমার পক্ষেও কম লোক নেই। কেউ আমার গায়ে হাত দিতে পারবে না। এতদিন কানে তুলা দিয়ে আর মুখে তালা মেরেছিলাম। এখন আর মুখ বন্ধ করে রাখতে পারছি না। পেটের ফাঁপা কথাগুলো সারাদিন যার তার কাছে উগড়ে দিচ্ছি।
শোন নবু, সব কথা সবার মুখে মানায় না। আর সব কথা সবসময় বলাও ঠিক নয়। সময়মতো স্থান-পাত্র বুঝে কথা বলো।
ছার, দেশে এখন দুটি দলই আছে- বিএনপি আর জামায়াতে ইসলামী। মনে হচ্ছে, আওয়ামী লীগের মতো বিএনপিকে জনতা ঘৃণা করে ভোট দেবে না। তাকেও চেনা হয়ে গেল। এবার জনতার দৃষ্টি একমাত্র জামায়াতে ইসলামীর দিকে। জামায়াতে ইসলামীর ওপর দেশবাসীর একমাত্র আশা এবং ভরসা। সামনের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী দেশের নেতৃত্বের আসনে বসবে এবং কালেমার পতাকা উড়বে আকাশে।
নবু, তুমি শুধু চায়ের দোকানদার নও, তুমি এ দেশের ১৭ কোটি মানুষের মনের মানুষ, প্রিয় মানুষ। আল্লাহ তোমার আশা পূর্ণ করুন।
দোয়া করুন ছার।
লেখক : কবি।