শানিত শিল্পের কবি মোশাররফ হোসেন খান


২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:১৪

॥ হেলাল আনওয়ার ॥
কবিতা একটি শিল্প। এ শিল্পকে যারা সুষমামণ্ডিত করেন, তারাই কবি। কবির অন্তরদৃষ্টি সাধারণের চাক্ষুষের চেয়েও আরো তীক্ষè, আরো গভীর। কবিরা কবিতা শিল্পকে শানিত করতে ভাবান্তরে হারিয়ে যান। চিন্তাশক্তিকে আপন প্রখরতায় ইপ্সিত করে তোলেন। তাই কবিতা জীবনের স্বরে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে।
কবি মোশাররফ হোসেন খান তেমনি একজন বহুমুখী ইপ্সিত শিল্পাচার্য। শব্দকে শৈল্পিকভাবে উপস্থাপন করতে অতিশয় কর্মদক্ষ তিনি। তাঁর কবিতাশিল্পের শব্দগুলো কাঁসার পাত্রের মতো অকৃত্রিমভাবে ঝনঝন করে বেজে ওঠে। পাঠকের হৃদয়ে দাগ কাটতে পারে যে শব্দ সঞ্চয়নে, তিনি অবলীলায় সে শব্দগুলোকে নান্দনিকভাবে সন্নিবেশন করেছেন কবিতার নিপুণ শরীরে।
আকাশের নীল ছাদ চুইয়ে তারকার আলো যেমন গড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর বুকে, তেমনি তার কবিতার ভাব বৈচিত্র্যের কম্পন দোলায়িত করে নিবিষ্ট পাঠকের তৃষিত আত্মায়। কবি মোশাররফ হোসেন খানের কবিতা সাহিত্যের উচ্চাসন স্পর্শ করে তা যেন আত্মার অলিন্দে গভীরতম রেখাপাত করে। এ মনোজগতের উদগ্রতাকে অবলম্বন করে যিনি শব্দের কালো ফিতায় বাঁধতে পারেন, তিনিই কেবল সার্থক শিল্পী, সফল কবি। কবি খান তেমনি একজন সমৃদ্ধ কবি।
বাংলা কবিতাকে শিল্পে রূপ দিতে নিবেদিত এই কবি বেশুমার শ্রম, সাধনা আর অধ্যবসায়ের আক্ষরিক স্মারক তাঁর কবিতার ছত্র থেকে ফিনকি দিয়ে ওঠে। সোনা তখনই মূল্যবান এবং অতুলনীয় হয়ে ওঠে, যখন তা অলংকারে পরিণত করা হয়। আবার মাটি দিয়ে ইট এবং ইট দিয়ে শৈল্পিক বালাখানা নির্মাণ করে আমরা আভিজাত্যের প্রমাণ করে থাকি। কবিতাশিল্পী তেমন করে সার্থক শব্দের নান্দনিক ব্যবহারে কবিতাশিল্পকে অনন্য মাত্রায় উত্তীর্ণ করে থাকেন। তখন সেটা কেবল কবিতা হয় না, বরং শিল্পের ছোঁয়ায় শিল্পকোষ হয়ে ওঠে।
কবি মোশাররফ হোসেন খান সেই দক্ষ শিল্পী এবং কবিতার নিপুণ কারিগর। উপমার ধুন্ধুমার ব্যবহার, যা সার্থক কবির জন্য আবক্ষ কোষ বলে মনে করি।
“হে বৈশাখ
তুমিই কেবল পারো ভীরুর বুকে পা রেখে
অসীম সাহসে গাইতে যুদ্ধের গান।”
কবিতার এ শিল্পগুণ কবি খানের কবিতার মাঝে শতভাগ পরিস্ফুটন হতে দেখি। কবিতার মাঝে কোমল শব্দ প্রয়োগ অথচ তা যেন রণাঙ্গনের ভয়াবহ যুদ্ধের বিভীষিকা। পড়তে সাবলীল অথচ শরীর বেয়ে যেন রেনেসাঁর সুগন্ধি লোবান ঝরে পড়ে এবং তা সহজেই হৃদয়কে স্পর্শ করে যায়।
ভাবের চরকীতে শব্দের সুতা কেটে তৈরি করেন কবিতা। এ কবিতার অনিবার্য উপকরণ মাটি, মানুষ এবং মানবতার জয়গান। চিরায়ত স্বাধীনতা বিলাসী মানুষের শৃঙ্খল ভাঙার অর্থবহ কৌশল। বাস্তবতা আর পরাবাস্তবতার মিশেলে কবি খানের কবিতাগুলো যেন অন্ধকারের বক্ষ বিদীর্ণ করে নবারুণের খোঁজে উন্মত্ত মানুষের সুগভীর উদ্দীপক।
“আমি শুধু দেখতে চাই
বুকের উপর গজিয়ে ওঠা সাদা গম্বুজ
যে গম্বুজের নিশান ছুঁতে পারে না কোনো
শকুন কিংবা কোনো বাজের নখর।”
কবি মোশাররফ হোসেন খানের বিশ্বায়ন চিন্তার মহিরুহ কেবল তাঁর নিগূঢ় বিশ্বাসের প্রতিফলন। স্বকাল, আগত কিংবা অনাগত; এমনকি তারপরেও তাঁর কবিতার অমিয় ধারা যাতে বহমান থাকে, সেজন্য তিনি কবিতাকে স্বতন্ত্রভাবে শিল্পগুণে সমৃদ্ধ করেছেন। শিল্পের কোমল ক্যানভাসে এই কবির প্রতিটা কবিতা যেন অবর্ণনীয় নকশিকাঁথার মতো শোভাময়।
কবিতার জন্য, শিল্পের জন্য, বাংলা কবিতাকে উপমাখচিত করার জন্য এই কবির দীর্ঘায়ু কামনা করি। কণ্টকাকীর্ণ এই স্বার্থপর পৃথিবীর অবহেলা আর উপেক্ষাকে জয় করে তিনি যেন নির্মাণ করতে পারেন কবিতার স্বতন্ত্র শিল্পকোণ, নান্দনিক কবিতাশিল্প।
লেখক : কবি।