ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন : অনিশ্চয়তার কালো মেঘ

প্রয়োজন রাজনৈতিক সমঝোতা

নিজস্ব প্রতিবেদক
২১ আগস্ট ২০২৫ ১৫:০৭

॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
দেশ পরিচালনা করছে একটি অন্তর্বর্তী সরকার। সরকারটি নির্বাচিত নাকি অনির্বাচিত- এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়নি- এটা বলা যায়। তবে অনির্বাচিত বলতে পারছি না। কারণ এ সরকার জনগণের পরোক্ষ ভোটে নির্বাচিত না হলেও সরাসরি তথা প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতা তথা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দল-মত নির্বিশেষে তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়। তাদের কারো যোগ্যতা, কর্মক্ষমতা ও দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে, কিন্তু তাদের অধিকাংশই সৎ ও নিবেদিতপ্রাণ। বরং বলা যায়, অপেক্ষাকৃত সৎ ও যোগ্য একটি সরকার দেশ পরিচালনা করছে। সরকার পরিচালনায় তাদের ঘাটতি থাকতে পারে, কিন্তু একটি কাজ তারা করেছেন দেশ থেকে অর্থ পাচারটা প্রায় বন্ধ করেছেন। রাষ্ট্র পরিচালনার রুটিন কাজের পাশাপাশি এ সরকারের কাঁধে তিনটি দায়িত্ব- এক. রাষ্ট্র সংস্কার ও জুলাই সনদ, দুই. ফ্যাসিস্ট ও ফ্যাসিস্টদের দোসরদের বিচার; তিন. ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। কিন্তু এ তিনটি কাজ নিয়েই যেন এক অনিশ্চয়তার কালো মেঘ দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে এ আশঙ্কটা আরো বেশি। নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে বড় কয়েকটি রাজনৈতিক দল কিছু গ্রহণযোগ্য শর্ত ও দাবি করছে, যা জনগণেরও দাবি। কিন্তু কিছু কিছু সংবাদপত্র নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে বেশ আজগুবি রিপোর্ট প্রকাশ করছে। এতে করে নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে সাধারণ জনগণের মধ্যেও একটি নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হচ্ছে। আর এটা করা হচ্ছে নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাধা নয়, বরং সংস্কার, জুলাই সনদ ও বিচারকাজকে বাধাগ্রস্ত করতে।
সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা হচ্ছে রাষ্ট্র সংস্কার ও ফ্যাসিস্টদের বিচার শেষে জুলাই সনদের ভিত্তিতে একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কিন্তু রাজনৈতিক ময়দানে এ নিয়ে ঐকমত্যের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে বড় একটি রাজনৈতিক দল সংস্কার, জুলাই সনদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও বিচারের আগেই নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে চাপ দিচ্ছে। তাই অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার ও বিচারের কাজ সম্পাদনের আগেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের একটি সম্ভাব্য সময় ঘোষণা করেছেন। নির্বাচনের এ সময়কে টার্গেট করে নির্বাচন কমিশনও একটি রোডম্যাপ প্রকাশ করতে যাচ্ছে।
অবশ্য তারপরও জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ভোট নিয়ে একটি ধোঁয়াশা চলছে। রাজনৈতিক ময়দানে ভোট ও নির্বাচন নিয়ে একটি সন্দেহ-সংশয় তৈরি হয়েছে। অবশ্য অন্তর্বর্তী সরকার প্রধানের পক্ষ থেকে নির্বাচনের একটি ঘোষণা আসার পরও চলছে বিভিন্ন কথাবার্তা। বিশেষ করে সাধারণ জনগণের মধ্যে একটি নেতিবাচক ধারণা প্রবল হয়েছে যে, নির্বাচন সহসা হচ্ছে না ।
গত ১৬ আগস্ট শনিবার বাসস পরিবেশিত এক খবরে জানানো হয়েছে যে, বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, যারা সংসদ নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছে, তারা গণতন্ত্রের শত্রু।
ঐদিন নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক দোয়া মাহফিলের পূর্বে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভায় তিনি বলেন, ‘আজকে যারা গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকমের বক্তব্য দিয়ে নির্বাচনের বিষয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছে, তারা গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তি নয়, তারা বাংলাদেশের মানুষের পক্ষের শক্তি নয়। তারা হয়তো কোনো না কোনো কারণে নিজের কথাগুলোই ইনিয়ে-বিনিয়ে বলছেন- যাতে করে নির্বাচনকে বিলম্বিত করা যায় অথবা বানচাল করা যায় অথবা নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হোক, সেটা চায়।’
সালাহউদ্দিন বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ। বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্রের জন্য, ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য সংকল্পবদ্ধ। এর বিপক্ষে যারাই ইনিয়ে-বিনিয়ে কোনো ধরনের বক্তব্য দেবে, বিভিন্ন রকমের কুযুক্তি উত্থাপন করে গণতন্ত্রের এ যাত্রাপথকে কণ্টকাকীর্ণ করতে চাইবে তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ রুখে দাঁড়াবে।’
এদিকে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারী এক অনুষ্ঠানে ঘোষণা দেন, ফেব্রুয়ারিতে দেশে কোনো নির্বাচন হবে না। তার এ বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া গেছে দলটির অন্য নেতৃবৃন্দের আলোচনাতেও। তারাও বলছেন, জুলাই সনদ ছাড়া নির্বাচন হবে না।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সংস্কার ছাড়া নির্বাচন হলে তা হবে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা। ইসলামী আন্দোলনও নির্বাচন কমিশনে গিয়ে বেশকিছু দাবি দফা উপস্থাপন করে এসেছে।
গত ১৯ আগস্ট মঙ্গলবার বিকালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে ঐকমত্য কমিশন কর্তৃক সরবরাহকৃত জুলাই জাতীয় সনদের ওপর বিশদ আলোচনা করা হয়। আলোচনার পর জুলাই জাতীয় সনদের কিছু বিষয়ে ঐকমত্য কমিশনের সাথে আলোচনায় বসার সিদ্ধান্ত হয়।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের পক্ষ থেকে জুলাই জাতীয় সনদের আইনি ভিত্তি প্রদানের লক্ষ্যে প্রেসিডেন্সিয়াল প্রোক্লামেশন অথবা গণভোট অনুষ্ঠানের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়। সেই সাথে গণতন্ত্রের পথে উত্তরণের লক্ষ্যে জুলাই জাতীয় সনদের আইনি ভিত্তি কার্যকর করা এবং এর ভিত্তিতেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জোর দাবি জানানো হয়।
বিগত পঞ্চাশ বছর একটি পুরাতন বন্দোবস্তের কারণেই বাংলাদেশে বার বার ফ্যাসিস্ট তৈরি হয় এবং ফ্যাসিবাদী শাসনের নিগড়ে বন্দী হয়ে পড়ে। তাই ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর আপামর জনগণের প্রত্যাশা হচ্ছে পুরনো বন্দোবস্ত বাতিল করতে রাষ্ট্র সংস্কার করতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের একটি বড় রাজনৈতিক দল সংস্কার না করেই পুরনো বন্দোবস্তের আলোকেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে চাচ্ছে। আর পুরনো বন্দোবস্ত রেখে নির্বাচনের পর আবারও ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম হবে। তাই দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলনসহ দেশের সুশীল সমাজের অধিকাংশই চাচ্ছে নির্বাচনের আগে জুলাই সনদকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও সংস্কার করা হোক।
সংস্কার নিয়ে বাংলাদেশের ডাকসাইটে আমলা আকবর আলি খান তার ‘পরার্থপরতার অর্থনীতি’ বইয়ের ‘সংস্কারের রাজনৈতিক অর্থনীতি’ অধ্যায়ে বলেছেন, ‘সংস্কার শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো, পতিত অবস্থা থেকে মুক্তি। বিবর্তনের সাথে সাথে যে রাষ্ট ব্যবস্থায় পরিবর্তন হয় না, সেখানেই অধঃপতন দেখা দেয়।
প্রখ্যাত দার্শনিক এডমুন্ড বার্ক যথার্থই বলেছেন, A state without the means of some change is without its means of conversion. অর্থাৎ যে রাষ্ট্রে কোনো পরিবর্তনের ব্যবস্থা নেই, তার সংরক্ষণের কোনো উপায় নেই।
পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যর্থতাকে মার্কিন অর্থনীতিবিদ মনসুর অলসন একটি সামাজিক ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এ রোগের তিনি নাম দিয়েছেন, institutional sclerosis . অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক কঠিনীভবন। কঠিনীভবন রোগে অঙ্গ-প্রতঙ্গ কঠিন হওয়ার ফলে বিকল হয়ে যায়। তেমনি প্রাতিষ্ঠানিক কঠিনীভবন হলে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বিভিন্ন কর্মকাণ্ড অচল হয়ে পড়ে। অলসনের ভাষায় প্রাতিষ্ঠানিক কঠিনীভবনের চিহ্ন হলো That slows its adoption to changing circumstances and technologies. অর্থাৎ যা পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি ও প্রযুক্তির সাথে রাষ্ট্র কাঠামোর সমন্বয় বিলম্বিত করে।’ তাই বাংলাদেশের জনগণের মুক্তির লক্ষ্যেই সংস্কার করতে হবে।
এদিকে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে তারা শিগগির নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করবে। গত ১৮ আগস্ট সোমবার নির্বাচন ভবনে মাসিক সভা শেষে ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন সামনে রেখে এর রোডম্যাপের খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে। কমিশনের অনুমোদনের পর তার প্রকাশ করার আশা করছি।
তিনি বলেন, কর্মপরিকল্পনার ব্যাপারে আমি বলেছিলাম, আমরা এই সপ্তাহে এটা করবো। হ্যাঁ, এটা কো-অর্ডিনেট করা হচ্ছে। কর্মপরিকল্পনার তো আন্তঃঅনুবিভাগ সম্পর্কিত এবং অন্য প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো নিয়ে ড্রাফটটা করা হয়েছে। ড্রাফটটা এখন কমিশনে দিয়ে আমরা এপ্রুভ করবো। আমার বিশ্বাস যে, এটা আমরা এ সপ্তাহের ভেতরে আপনাদের দিতে পারবো। ইসির নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণার মধ্যেই বোঝা যাচ্ছে নির্বাচনটি পিআর পদ্ধতিতে হচ্ছে না।
এছাড়া বিএনপির একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ঠেকানো বা বানচাল করার কোনো শক্তি বাংলাদেশে নেই। তাই ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবেই। বিএনপি সংস্কার ও বিচার কতটুকু হলো, সেদিকে কোনো খেয়াল নেই; বরং তাদের এক দাবি ফেব্রুয়ারির মধ্যেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিতে হবে।
বিএনপি সংস্কার ও বিচার ছাড়াই ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন চাচ্ছে। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলনসহ দেশপ্রেমিক অধিকাংশ রাজনৈতিক দল জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি, সংস্কার ও বিচারের পরই পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন চাচ্ছে। এ বিষয়ে দুই পক্ষের দ্বিমত ও বিরোধ প্রকাশ্যেই পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাই পর্যবেক্ষকমহল মনে করেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে ঘরে-বাইরে রাজনৈতিক ময়দানে যত কথাবার্তা হোক না কেন, তার জন্য প্রয়োজন উভয় পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা। আর এ সমঝোতা হতে হবে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র মধ্যে। জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি, সংস্কার, বিচার ও পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন নিয়ে বিএনপির সাথে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের মতবিরোধ চলছে। উভয়পক্ষের মধ্যে কোনো ধরনের সমঝোতা ছাড়া যদি এ বিরোধ অব্যাহত থাকে, তাহলে সংস্কার ও বিচারসহ নির্বাচন নিয়ে একটি অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি যদি সংস্কার, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার ঘোষণা দেয়, তাহলে নির্বাচন ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হওয়া নিয়ে একটি অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। তাই সংস্কার ও বিচার করে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা প্রয়োজন।