সমাজ ধ্বংসের কারণ ও তার প্রতিকার
৭ আগস্ট ২০২৫ ১৪:২৩
॥ মনসুর আহমদ ॥
অনন্ত কোটি গ্রহ-নক্ষত্রের বিরাট বিচরণক্ষেত্র পৃথিবী নামে যে গ্রহটি, তার যাত্রা শুরু করেছিল কয়েকশত কোটি বছর আগে, তখন তার বুকে মানব জীবনের স্পন্দন ছিল না। বিশ্ব সৃষ্টির বেশ পরে এক শুভক্ষণে পৃথিবীর পৃষ্ঠে এলো মানব শিশু অসীম সভ্যতার সম্ভাবনা বুকে নিয়ে। কালের প্রবাহে বহু সমাজ সভ্যতার উত্থান-পতন ঘটে চলছে এ মাটির ধরণীতে।
পৃথিবীর জমিনে জোয়ার-ভাটা হয় চন্দ্র সূর্যের কারণে, এটি স্রষ্টার বিধান। সমাজ সভ্যতার সৃষ্টি ও লয় ঘটে মানুষের কর্ম, ন্যায়-অন্যায়, ইহসান ও জুলুমের অনিবার্য ফলে। সামাজিক ও নৈতিক জীবনের উত্থান-পতনের ইতিহাস আমাদের তারই ইঙ্গিত প্রদান করে। একটি জনপদের ধ্বংসের ইতিহাস ও কারণের দিক ইঙ্গিত করে কুরআনে ঘোষণা এসেছে, ‘কত অত্যাচারী জনবসতিই এমনি আছে যেগুলোকে আমরা পিষে চূর্ণ করে দিয়েছি এবং তাদের পরে আমরা অন্য কোনো জাতিকে উত্থিত করেছি। তারা যখন আমাদের আজাব অনুভব করতে পারল তখন তারা দ্রুত দৌড়াতে লাগল। (বলা হলো) পলায়ন কর না, তোমরা যাও তোমাদের সেসব ঘরবাড়িতে আরাম-আয়েশের সরঞ্জামে যা নিয়ে তোমরা মহাআরামে নিমগ্ন হয়ে ছিলে; সম্ভবত তোমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ (১)
তারা বলতে লাগল, ‘হায়! আমাদের দুর্ভাগ্য! নিঃসন্দেহে আমরা অপরাধী ছিলাম (ইন্না কুন্না জলেমিন)। অতঃপর তারা এ চিৎকারই করতে লাগলো, যতক্ষণ না আমি তাদের কাটা ফসল ছাইভস্মে পরিণত করেছি।” (সয়রা আম্বিয়া : ১৪-১৫)। (২)
একটি জনপদের ধ্বংসের কারণ ও তার থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় সংক্ষিপ্তভাবে বলে দেয়া হয়েছে কুরআনের এ আয়াত দুটিতে। এ আয়াতের ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে আস্ সুয়ুতী আরব ইতিহাসের কয়েকটি নির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ করেছেন। উহাদের মধ্যে একটি ঘটনার বরাত দিয়ে ইবনে আবু হাতিম বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন যে, ইয়ামনে দুটি শহর ছিল। উহাদের অধিবাসীরা এত উদ্ধত হয়েছিল এবং এমন আরাম-আয়েশে বাস করতো যে, তারা তাদের দরজা অভাবী ও দরিদ্র লোকদের সামনে বন্ধ করে রাখতো। যখন তারা এরূপ উদ্ধত ও অহঙ্কারী হয়েছিল, তখন আল্লাহ তাদের নিকট ন্যায় প্রচারের জন্য একজন রাসূল প্রেরণ করেন। যখন তিনি তাদের ন্যায় কাজে আহ্বান করলেন, তারা তাকে হত্যা করল। তখন আল্লাহ নেবুচাঁদ নেজারের মনে উহাদের আক্রমণের ইচ্ছা জাগিয়ে দেন এবং নেবুচাঁদ নেজার ইহাদের শায়েস্তা করার জন্য একটি সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করেন, কিন্তু শহর দুটির অধিবাসী আক্রমণকারীদিগ পরাজিত করে। নেবুচাঁদ নেজার উহাদের বিরূদ্ধে দ্বিতীয়বার আক্রমণ চালালেন এবং এ আক্রমণেরও একই দশা হলো। অবশেষে নেবুচাঁদ নেজার নিজেই উহাদের বিরুদ্ধে সৈন্য নিয়ে অগ্রসর হয়ে তাদের পরাজিত করেন। ফলে তারা শহর ছেড়ে পালিয়ে যায় আশ্রয়ের জন্য অন্য কোনো স্থানে। (৩)
এ ঐতিহাসিক পটভূমিকে সামনে রেখে কুরআনের বক্তব্যের প্রতি তাকালে প্রথমেই দেখা যায় যে, কোনো বসতির ধ্বংসের প্রথম কারণই হলো ঐ জনপদের অধিবাসীরা ‘জালেম’ হয়ে থাকে। এই ‘জুলুম’ শব্দ দ্বারা সমাজের সাধারণ অন্যায়-অবিচার বুঝায় না। প্রত্যেক সমাজেই কিছু কিছু অন্যায় সাধারণভাবে বিরাজ করে থাকে। কিন্তু যখন অন্যায়-অবিচার এমন এক স্তরে পৌঁছে যে, জনগোষ্ঠীর এক অংশের অবিচার অপর অংশের ওপর নির্যাতন রূপ ধারণ করে তখনই ঐ জনগোষ্ঠী এ জুলুমের কারণে নিশ্চিহ্ন হওয়ার উপযুক্ত হয়ে পড়ে। এই অত্যাচারিত (মজলুম) জনপদের পক্ষে দাঁড়ানো ন্যায় ও হক পন্থিদের দায়িত্ব হয়ে যায়।
উপর্যুক্ত আয়াতে ‘জালেম’ শব্দ দ্বারা অত্যাচারী ও নির্যাতনকারী বোঝানো হয়েছে। এর প্রমাণ কুরআনের অন্য আয়াতে মেলে। যেমন এরশাদ হয়েছে, ‘যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হচ্ছে তাদেরকেও যুদ্ধ করার অনুমতি দেয়া হচ্ছে। কেননা তাদের ওপর সত্যিই জুলুম করা হয়েছিলো; (বি আন্নাহুম জুলেমু)।’ (৪)
এ ‘জুলুম’ শব্দ দ্বারা সাধারণভাবে কোনো অবিচারের কথা বলা হয়নি। বরং চরমভাবে নির্যাতনের কথাকে ‘জুলুম’ শব্দ দ্বারা বুঝানো হয়েছে। এভাবে ‘জুলুম’ শব্দ কুরআনের বিভিন্ন স্থানে নির্যাতন অর্থে এসেছে। যেমন- ‘তোমাদের কী হলো যে তোমরা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করছ না, অথচ অসহায় অবস্থায় পতিত কত পুরুষ নারী ও শিশু আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে বলছে, হে প্রভু! এ জনপদ থেকে আমাদেকে উদ্ধার কর। এখানকার অধিবাসীরা জালেম। আমাদের জন্য তোমার পক্ষ থেকে একজন উদ্ধারকারী ও সাহায্যকারী পাঠিয়ে দাও।’ (৫)
এ আয়াতসমূহ বলে দিচ্ছে যে, একটি সমাজের অবক্ষয় ও ধ্বংসের জন্য বিশেষভাবে দায়ী অবিচার-অত্যাচার ও জুলুম। যখন একটি জনপদ এসব ধরনের অন্যায়ে ডুবে যায়, তখন তারা উপনীত হয় ধ্বংসের মুখে। তখন তারা চিৎকার দিয়ে অন্যায়কারী হওয়ার অপরাধে আফসোস করতে থাকে। এ ব্যাপারে এরশাদ হচ্ছে, ‘কতই না জনপদ ও শহর আমি ধ্বংস করে দিয়েছি যাদের ওপর আমার শাস্তি এসেছিল রাতে (যখন তারা ঘুমিয়ে থাকতো) কিংবা (আসতো) দুুপুরে যখন তারা বিশ্রাম করতো। আর যখন তাদের ওপর আজাব আসত, তখন তাদের মুখ থেকে শুধু এ কথাই বের হতো, ‘অবশ্যই আমরা জুলুম করেছি।’ (ইন্না কুন্না জালেমীন)। (৬)
এ অন্যায় বা জুলুম দ্বারা শুধুমাত্র মুশরিকি ধ্যানধারণা ও আচার-অচরণকেই বোঝায় না, যদিও কুরআনে শিরককে ‘জুলমুন আজীম’ বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। যদি কোনো জনগোষ্ঠী আকিদাগত দিক দিয়ে শিরকে বিশ্বাসী হয় কিন্তু আচার অচরণে তারা পরস্পরের প্রতি সদাচারী হয় ও সামাজিক ন্যায়বিচার অনুসারী হয়, তাহলে শিরক ও কুফরি সেখানে আসমানি গজব ডেকে নিয়ে আসে না। ইমাম রাজী এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ক্ষমতা ও আধিপত্য এক যোগে অবিশ্বাস ও পৌত্তলিকতা বা কুফরির সথে চলতে পারে কিন্তু অত্যাচার ও অবিচারের সাথে সহাবস্থান করতে পারে না।’
জনপদের ধ্বংসের কারণ ‘জুলুমে’ মানুষ কখন মেতে ওঠে তার প্রতি আল্লাহ ইঙ্গিত প্রদান করেছেন উপর্যুক্ত আয়াতসমূহে। অত্যাচারীদের প্রতি বিদ্রুপ করে বলা হয়েছে, ‘তোমরা পলায়ন কর না, (বরং) ফিরে যাও- (মা উৎরেফতুম ফিহী ওয়া মাসাকিনিকুম)-যেখানে তোমাদের ভোগ ও আয়েশের সম্পদ দেয়া হয়েছিল। (ফিরে যাও) তোমাদের ঘর বাড়িতে ও আরাম-আয়েশের সরঞ্জামে।’ (সূরা আম্বিয়া)।
‘ইতরাফ’ বা অমিতাচার ও বিলাসিতা জাতির মাঝে আলস্য প্রবণতা জন্ম দেয়। যখন কোনো সমাজে অমিতাচার ও বিলাসিতা প্রধান্য পায়, তখন তাদের মাঝ থেকে আধ্যাত্মিক নিয়ন্ত্রণশক্তি ও সামাজিক শৃঙ্খলাবোধ লোপ পেতে থাকে। ফলে তারা দাম্ভিকতায় ও আত্মপ্রতারণায় ডুবে যায়। ফলে সমাজ থেকে ন্যায়পরায়ণতা লোপ পেয়ে সেথায় অত্যাচার অবিচারের শিকড় গেড়ে বসে।
বিলাসিতার কারণে আধ্যাত্মিক নিয়ন্ত্রণ শক্তি লোপ পায়, ফলে মানুষের পক্ষে অন্যায়-অবিচার করা এবং দুর্বল এবং শক্তিহীনদের প্রতি অমানুষিক আচরণ ও অশ্রদ্ধার মনোভাব গ্রহণ করা সহজ হয়ে ওঠে।
বিলাসী জীবনযাপন পদ্ধতি সামাজিক অবক্ষয়ের সূচনা করে এবং পরিণতিতে সমাজের ধ্বংস ডেকে আনে। এ ব্যাপারে এরশাদ হচ্ছে, ‘যখন আমি কোনো জনপদকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করি, তখন তার অবস্থাসম্পন্ন লোকদের উদ্বুদ্ধ করি। অতঃপর তারা পাপাচারে মেতে ওঠে। তখন তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয় এবং তাদের সে জনপদকে নিপাত করে দেই। (৭)
এ আয়াত থেকে দেখা যায় যে, যারা আরাম আয়েশ ও প্রাচুর্যের মাঝে বাস করে তারা, আল্লাহর আদেশ মেনে চলার পরিবর্তে নৈতিক বন্ধনহীনতার কারণে দেশবাসীর প্রতি সদয় ব্যবহার না করে বিপরীত আচরণে মেতে ওঠে এবং সমাজে দুর্নীতি ছড়াতে থাকে। এ দুর্নীতি শুধু ধনীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং জনসাধারণ, বিত্তশালী ও শাসক শ্রেণির চরিত্র ও কর্মের দ্বারা প্রভাবিত হয়, ফলে সমগ্র জাতি ধীরে ধীরে কুকর্মপরায়ন হয়ে ওঠে। বিশ্বাস ও আচরণের বিকৃতি ব্যষ্টি পরিধি অতিক্রম করে সমষ্টির মধ্যে ব্যাপ্তি লাভ করে। এভাবে জাতির ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিক চেতনা সম্পূর্ণ বিগড়ে যায়। যার পরিণতিতে কল্যাণের বদলে সমাজে অকল্যাণ বিকাশ লাভ করতে থাকে এবং পরিণতিতে সে জাতি ধ্বংসের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায় ।
এসব আয়াত থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, যদি একটি জাতির প্রভাবশালী গোষ্ঠী বিলাসিতায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ে, তখন ধীরে ধীরে গোটা জাতি নৈতিক অবক্ষয়ে নিমজ্জিত হয়। ফলে সমাজে অত্যাচার, নির্যাতন ও অবিচার বৃদ্ধি পেয়ে সমাজ ধ্বংসের অতল গহ্বরে ডুবে যায়। এর পরিণতিত শুধু অত্যাচারী জালেমরাই ধ্বংস হয় না, বরং দায়িত্বহীনতার কারণে সমাজের প্রভাবশালী জনগোষ্ঠী ধ্বংসের উপযোগী হয়ে পড়ে। এ ব্যাপারে কুরআন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছে- ‘তোমাদের পূর্ববর্তী বংশের মধ্যে এমন সৎকর্মশীল কেন রইল না যারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে বাধা দিত; তবে ম্ুিষ্টমেয় লোক ছিল যাদের আমি তাদের মধ্য থেকে রক্ষা করেছি। কিন্তু অত্যাচারীদের যে সুখ-সম্পদ দেয়া হয়েছিল, তারা তাই উপভোগ করে যেতে লাগল এবং তারা গুনাহ্গার বা অপরাধী রয়ে গেল’। (৮)
এ আয়াতে অত্যাচারী (জালেম) শব্দের ব্যাখায় ইমাম রাজী (রহ.) তাদের অত্যাচারী বলেছেন, যারা অন্যায় কাজ ও দুর্নীতি দমনের কর্তব্য পাালনে ব্যর্থ হয়েছে।
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে কাসীর বলেছেন, ‘আল্লাহ এখানে জিজ্ঞাসা করেছেন যে, ‘এমনটি কেন হয়নি যে, অতীতের গর্ভে যেসব জাতি বিস্মৃত হয়ে গেছে, তাদের মধ্যে কেন অল্পসংখ্যক লোক জমিনে বিপর্যয় সৃষ্টি করা, উপদ্রব, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে বাধা দেয়ার চেষ্টা করেছিল। আল্লাহ বলেন যে, তাদের মধ্যে এরূপ লোকের সংখ্যা ছিল একান্ত কম’ (এবং যখন অবশেষে তাদের ওপর আল্লাহর শাস্তি এসেছিল, তখন শুধু এ অল্পসংখ্যক লোকই রেহাই পেয়ে ছিল। (৯)
তাই যদি কেউ সমাজে অন্যায়-অবিচার দেখে তা দূর করার চেষ্টা না করে পক্ষান্তরে নৈতিক উন্নতির শীর্ষে পৌঁছার জন্য যদি নিজকে খানকার মধ্যে আড়াল রেখে দিনরাত নফল ইবাদত বন্দিতে মশগুল রাখে, তাহলে তারাও ধ্বংসের হাত থেকে রেহাই পায় না। এরশাদ হচ্ছে, ‘সেই ফেতনাকে ভয় কর, যা শুধু তোমাদের মধ্যকার জালিম ও পাপাচারী লোকদেরই দুুর্যোগের মধ্যে নিক্ষেপ করবে না।’
ধ্বংসের এ নীতি সম্পর্কে কুরআনে অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘যখন তাদের এক দল বলেছিল যে, কেন ওই সম্প্রদায়কে উপদেশ দান করছ যাদেরকে আল্লাহ বিনাশ করবেন অথবা যাদের কঠোর শাস্তি প্রদান করবেন। জওয়াবে তারা বলেছিল, “এটি হচ্ছে তোমাদের প্রতিপালকের দরবারে (নিজেদের পক্ষে) ‘নির্দোষ থাকার একটি ওজর পেশ করা, আশা ছিল হয়তো তারা খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে পারে।” অতঃপর তারা যে উপদেশ প্রাপ্ত হয়েছিল তা যখন তারা ভুলে গেল, তখন যারা খারাপ কাজ হতে নিষেধ করেছিল, তাদেরকে নিকৃষ্টতম শাস্তি দ্বারা পাকড়াও করেছিলাম, যেহেতু তারা দুষ্কর্ম করেছিল।” (সূরা আরাফাত : ১৬৪-১৬৫। (১০)
কুরআনের এসব আয়াত থেকে সুস্পষ্ট যে, কোনো জনপদে যদি অসৎকাজ ছড়িয়ে পড়ে আর সে সমাজের কিছু লোক সামগ্রিক সংশোধন ও সংস্কারের চিন্তা না করে আত্মশুদ্ধি ও আত্মগঠনে নিজদের ব্যস্ত রাখে, তাহলে ওই সমাজের ভালো লোকগুলোও খারাপ লোকদের সাথে ধ্বংস হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহু সা. বলেন, ‘আল্লাহ বিশিষ্ট লোকদের কাজের জন্য সাধারণ লোকদের আজাব দেন না; কিন্তু তারা যখন নিজেদের সামনে দুষ্কৃতকে দেখতে থাকে এবং প্রতিরোধ করার শক্তি থাকতেও তাকে প্রতিরোধ করতে এগিয়ে আসে না, তখন বিশিষ্ট ও সাধারণ লোক সবাইকে আল্লাহ আজাবের কবলে নিক্ষেপ করেন। (১১)
সমাজ ধ্বংসের আর একটি কারণ হলো- আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি কুফরি করা। এ ব্যাপারে এরশাদ হচ্ছে, ‘আল্লাহ দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন- একটি জনপদের, যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত তথায় প্রত্যেক যায়গা থেকে আসত প্রচুর জীবনোপকরণ। অতঃপর তারা আল্লাহর নিয়ামত অস্বীকার করলো। সুতরাং তাদের কৃতকার্যের (কুফরি) জন্য আল্লাহ তাদের দুর্ভিক্ষ ও ভয়ের স্বাদ গ্রহণ করান।’ (১২)
আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি অবিশ্বাস বলতে শুধু অবিশ্বাস বা অকৃতজ্ঞতাই বোঝায় না। বরং অকৃতজ্ঞতার সাথে ক্ষমতা ও অনুগ্রহের অপব্যবহারকে বোঝায়। ক্ষমতা ও অনুগ্রহের অপব্যবহারের কারণে যে নৈতিক মূল্যবোধ সমাজকে ধারণ করে থাকে তার প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে অন্য কোনো ব্যবস্থার প্রতি তাদের বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে যায়।
কুরআনের চূড়ান্ত বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, বিশ্বাসের পদ্ধতি ও তার ওপর নির্ভরশীল নৈতিক মূল্যবোধই মানুষ ও জাতিসমূহর ভবিষ্যৎ ভাগ্য নির্ধারণের প্রধান কারণ। ইতিহাসে দেখা যায় কীভাবে ধ্বংস হলো মিশরের ফেরাউনি বংশ- আরবের আদ ও সামুদ জাতি, ইরাকের কালদানি, ইরানের কিসরা, গ্রিসের দিগি¦জয়ী বীর, রোমের সম্রাট ও তাতারীয়দের জগৎ বিখ্যাত সেনাবাহিনী। এদের অধিকাংশ জাতি দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কোনো কোনোটির নাম নিশানা থাকলেও তারা তাদের শাসকের শাসনাধীনে পদানত হয়ে আছে। তাদের ধ্বংসের কারণ অত্যাচার নির্যাতন, বিলাসিতায় ডুবে থাকা ও আল্লাহর নিয়ামতের অপব্যবহার।
তাই প্রত্যেক জাতিকে ধ্বংসের হাত থকে বেঁচে থাকতে হলে জাতিকে হতে হবে আচার-আচরণে মার্জিত ও রুচিশীল। তাদের হতে হবে বিলাসিতা বিমুক্ত পরিশ্রমী। সাথে সথে ওই সমাজে থাকতে হবে চিন্তা ও বিশ্বাসকে পরিশুদ্ধ ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী করার মতো যোগ্য সংগঠন। থাকতে হবে ওই সমাজে ওহির আলোয় আলোকিত যোগ্য নেতৃত্ব, যারা মনুষকে খারাপ আচরণ ও সভ্যতা সংস্কৃতি থেকে বিরত রাখবে এবং অন্যায় পথে উপার্জন থেকে মানুষকে বিরত রেখে ন্যায় ও সৎ পথে প্রাচুর্য অর্জনের পথ দেখাবে ও ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবে।
আজ বিশ্বের চারদিকে রক্তের যে বন্যা বইছে, জাতিতে জাতিতে চলছে ধ্বংসের তাণ্ডবলীলা, দেশের অভ্যন্তরে চলছে গুম, হত্যা, নির্যাতন, শোষণের উৎসব। এসব থেকে জাতির মুক্তির জন্য বড়ই প্রয়োজন সৎ, খোদাভীরু ও যোগ্য নেতৃত্ব। যারা পার্থিব জীবনের মোকবিলায় পারলৌকিক জীবনকে অগ্রাধিকার দিতে পারে, তারাই পারে জাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে, বিশ্বে শান্তির বাতাস বইয়ে দিতে।
তথ্যসূত্র-
১. সূরা আল আম্বিয়া : ১৩, ২. সূরা আল আম্বিয়া : ১৪-১৫, ৩. কুরআনের ইতিহাস দর্শন, ৪. সূরা আল হজ, ৩৯, ৫. সূরা নিসা : ৭৫, ৬. সূরা আল আ’রাফ : ৪-৫, ৭. সূরা বনী ইসরাইল : ১৬, ৮. সূরা হুদ : ১১৬, ৯. তাফসীরে ইবনে কাসীর, ১০. সূরা আল আ’রাফ : ১৬৪-১৬৫, ১১. শরহে সুন্নাহ, ১২. সূরা আন নহল : ১১২।