লাল জুলাইয়ের গল্প
৩১ জুলাই ২০২৫ ১৫:০৯
॥ জাকির আবু জাফর ॥
একটি বিপ্লবের গল্প আমাদের জানতেই হবে। কেননা এ বিপ্লবটি আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। দেশের জন্য যেমন, দেশের মানুষের জন্য তেমনই।
এতক্ষণে তোমাদের মনে বড় জিজ্ঞাসা দাঁড়িয়ে গেছে- সেটি হলো, কোন বিপ্লবের গল্প আমরা জানবো? ও হ্যাঁ তাই তো! বিপ্লবের নামই তো বলা হয়নি! শোনো তবে বলছি, সে বিপ্লবের নাম হলো- ৩৬ জুলাইয়ের বিপ্লব!
৩৬ জুলাই! শুনে তোমাদের চোখ তো কপালে উঠে গেছে জানি। কারণ ৩৬ জুলাই আবার কেমন জুলাই? জুলাই মাস তো একত্রিশ দিনের। তাহলে ছত্রিশ জুলাই কেন হবে! পৃথিবীতে কোনো মাস কি ৩৬ দিনে হয়? না, কখনো হয় না। তাহলে বিপ্লবের জুলাই কেন হবে ৩৬?
হ্যাঁ, এটি একটি মজার গল্প বটে। গল্প হলেও একদম সত্যি। তবে শোনা যাক সে গল্পটি।
আসলে বিপ্লবটি শুরু হয়েছিলো জুলাই মাসে। শেষ হয়েছে আগস্টের ৫ তারিখ। অর্থাৎ বিজয় এসেছে আগস্টের ৫ তারিখে।
কিন্তু আন্দোলনকারী বিপ্লবীরা নতুন একটি উচ্চারণ সামনে আনলো, সেটি হলো- ১ আগস্টকে বলা হলো ৩২ জুলাই। ২ আগস্টকে ৩৩ জুলাই। এভাবেই ৫ আগস্টকে বলা হলো ৩৬ জুলাই। এ ৩৬ জুলাইয়ের দিন- দুপুরের আগেই ভারতে পালিয়ে গেলো শেখ হাসিনা। তাই এ বিপ্লবের নাম হলো ৩৬ জুলাইয়ের বিপ্লব। অবশ্য এর আরও একটি নাম আছে, সেটি হলো বর্ষা বিপ্লব। যেহেতু বিপ্লবটি হয়েছে বর্ষা ঋতুতে, তাই একে বর্ষা বিপ্লবও বলা হয়।
৩৬ জুলাইয়ের গল্পটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য গল্প। এদিনটি বাংলাদেশের নতুন বিপ্লবের দিন। নতুন বিজয়ের দিন। নতুন স্বাধীনতার দিনও বলা যায়।
হয়তো প্রশ্ন হতে পারে নতুন স্বাধীনতা কেন? আমরা তো ১৯৭১-এ স্বাধীনতা পেয়েছি। হ্যাঁ এ কথাটি সত্যি। কিন্তু সেই সাথে এটিও সত্যি যে, গত সাড়ে পনেরো বছর আমরা সত্যিকার স্বাধীনতা পাইনি। কারণ বাংলাদেশ তার নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারছিলো না। অন্য একটি দেশ আমাদের সব বিষয়ে বাধা দিতো। ফলে বাংলাদেশের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়ে কোনো স্বাধীনতা ছিলো না। এ জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে আমরা আমাদের দেশের নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়ার ব্যাপারে স্বাধীনতা পেয়েছি। তাই একে নতুন স্বাধীনতা নাম দেয়া হয়েছে।
আচ্ছা এবার আসি জুলাই বিপ্লব কেন হয়েছে, সে গল্পে। তোমরা সবাই জানো, শেখ মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হলো। কিন্তু শেখ হাসিনা হয়ে উঠলো একজন অত্যাচারী শাসক। জুলুমবাজ শাসক। আবার একজন দুর্নীতিবাজ শাসক। একদিকে দেশের সম্পদ লুট করেছে, চুরি করেছে। অন্যদিকে চুরি করে সে সম্পদ বিদেশে পাচার করেছে। না, শেখ হাসিনা শুধু একা চুরি করেনি। তার সঙ্গে তার দলের ক্ষমতাবান যারা, তারা সবাই ছিলো চোরের সাথে। তারাও দেশের সম্পদ চুরি করে বিদেশে পাচার করেছে।
শুধু সম্পদ চুরি করে বসে থাকেনি শেখ হাসিনা। সে সাধারণ মানুষের ওপর ভীষণ জুলুম করতো, অনেক নির্যাতন করতো। যদি কেউ হাসিনার অত্যাচার আর জুলুমের প্রতিবাদ করতো, অমনি তাকে খুন করা হতো। না হয় গুম করে ফেলতো। শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের বিরুদ্ধে কেউ কোনো কথা বলতেই পারতো না। বললেই গুম করা হতো। খুন করা হতো। ভয়াবহ নির্যাতন চালাতো।
সারা বাংলাদেশে হাসিনা এবং তার সমর্থক গোষ্ঠী ভয় দেখিয়ে সবাইকে চুপ করিয়ে রাখতো। ঘরে ঘরে গিয়ে ধরে নিয়ে আসতো হাসিনাবিরোধীদের। ফলে সারা দেশে হাজার হাজার যুবক, তরুণ বছরের পর বছর নিজেদের ঘরে থাকতে পারেনি। নিজের বাসায় ঘুমাতে পারেনি।
এসব তরুণ-যুবক লুকিয়ে থাকতো বনে-জঙ্গলে, নদীর কিনারে, ধানক্ষেতে অথবা পাটক্ষেতে! হাসিনার গুণ্ডাবাহিনী টের পেলে এসব জায়গা থেকেও ধরে নিয়ে নির্যাতন করতো। কঠিন নির্যাতনের জন্য হাসিনার বাহিনী ‘আয়নাঘর’ বানিয়েছিলো। আয়নাঘর ছিলো ভয়ংকর অত্যাচার আর নির্যাতনের ঘর। এখানে বছরের পর বছর গুম করে রাখতো লোকদের। রেখে ভয়াবহ নির্যাতন করতো তারা। তখন এসব অত্যাচার-নির্যাতনের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস করতো না।
এ অবস্থায় গত বছর জুলাই মাসে শুরু হলো একটি আন্দোলন। এ আন্দোলনটি শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা। আন্দোলনটি শুরু হলো- কোটা সংস্কারের দাবিতে। কিছুদিন পর আন্দোলনের নাম হলো- বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন। তারও কিছুদিন পর আন্দোলনের নাম হয়ে গেলো- সরকারবিরোধী আন্দোলন। সে আন্দোলনই একসময় রূপ নিল এক দফার আন্দোলনে। অর্থাৎ শেখ হাসিনা পতনের আন্দোলন।
ঢাকা থেকে শুরু করে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়লো সে আন্দোলনের ঢেউ। এ আন্দোলন ঠেকানোর জন্য শেখ হাসিনা পুলিশ বাহিনী, বিজিবি, সেনাবাহিনীসহ আরও আরও বাহিনী দিয়ে আক্রমণ করালো আন্দোলনকারীদের। আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীদের মিছিলের ওপর গুলি করে ওরা। এভাবে গুলি শুরু হলে ১৬ জুলাই রংপুরে গুলিতে শহীদ হলো আবু সাঈদ।
আবু সাঈদ শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর অনন্য বীর
এবার তবে শোনো আবু সাঈদের গল্প- আবু সাঈদের বাড়ি রংপুরে। লেখাপড়াও করতো রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। গরিব ঘরের সন্তান। লেখাপড়া করে চাকরি নিয়ে বাবা-মা’র এবং সংসারের অভাব দূর করবে। কিন্তু লেখাপড়া শেষ করলেও চাকরির তো কোনো গ্যারান্টি নেই। তাই কোটা সংস্কার আন্দোলনে শরিক হলো সেও।
কোটা আন্দোলনের একজন খুব সক্রিয় কর্মী আবু সাঈদ। প্রতিটি মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিতো সবার আগে। এভাবেই এলো ১৬ জুলাই। সারা দেশের মতো রংপুরেও হচ্ছিলো মিছিল প্রতিবাদ। রংপুরের সে মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের পুলিশ তাড়া করছিলো। এক সময় আবু সাঈদ একা হয়ে যায়। তখনো পুলিশ বন্দুক উঁচিয়ে আন্দোলনকারীদের তাড়াতে চেষ্টা করছে। কিন্তু আবু সাঈদ দৌড়ে পালায়নি। এমনকি রাজপথ থেকে সরেও যায়নি। বরং তিনি দুঃসাহসে পুলিশের গুলির সামনে বুক টানটান করে দাঁড়িয়ে গেলো। দু’হাত দুদিকে প্রসারিত করে বুক উঁচিয়ে দাঁড়ালো। ঠিক তখনই সেই বুকেই গুলি করলো পুলিশ। গুলি করলো খুব ঠাণ্ডামাথায়। আবু সাঈদের ডান হাতে ছোট্ট একটি বাঁশের লাঠি ছিলো। কিন্তু সে লাঠি দিয়ে কাউকে আঘাত করেনি। পুলিশের দিকে তেড়েও যায়নি। এমনকি একটি ইটের টুকরাও ছুড়ে মারেনি পুলিশের দিকে। তখন সেখানে আন্দোলনকারীদের তেমন উপস্থিতিও ছিলো না। এককথায় অতি ঠাণ্ডামাথায় পুলিশ গুলি করলো আবু সাঈদকে।
একটি বুলেট ঢুকে গেলো সাঈদের বুকে। সাথে সাথে রাস্তায় পড়ে গেলো আবু সাঈদ। কিন্তু পড়ে গিয়েও উঠে দাঁড়ালো সে। আবার দু’হাত দুদিকে খুলে আগের মতোই দাঁড়িয়ে গেলো। ঠিক এসময় আরেকটি বুলেট ঢুকে গেলো তার বুকে। বুলেটের প্রচণ্ডতায় কেঁপে উঠে আবার পড়ে গেলো আবু সাঈদ। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে আবারও উঠে দাঁড়ালো সে।
কিন্তু দাঁড়ানোর পর তৃতীয় গুলিটি গিয়ে ঢুকে গেলো সাঈদের সাহসী বুকে। সাথে সাথে আবার পড়ে গেলো সাঈদ। সে যে লুটিয়ে পড়লো আর উঠতে পারলো না। শহীদ হয়ে গেলো আবু সাঈদ। আবু সাঈদ শহীদ হবার সাথে সাথে আন্দোলন আগুনের গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়লো সারা দেশে। এ সময় ছাত্রী-ছাত্রীদের সাথে মিছিলে যোগ দিলো সকল শ্রেণির মানুষ। অর্থাৎ শিক্ষক, সাংবাদিক, কবি সাহিত্যিক, শিল্পী, ব্যবসায়ী, সাবেক সেনাবাহিনীর অফিসার এবং সাধারণ মানুষ সবাই। তখন সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবিসহ যারা শেখ হাসিনার কথামতো চলতো, তারা আন্দোলনকারীদের আরও বেশি গুলি চালাতে শুরু করলো। এমনই গুলি চালালো, হাজার হাজার রাউন্ড গুলি চললো। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় হলো, আন্দোলনকারীরা কিছুতেই পিছু হটেনি। গায়ে, পায়ে, বুকে, পাঁজরে; এমনকি মাথায়ও গুলি করলো। তবুও কেউ আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ায়নি। পুলিশ অবাক হয়ে তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বললো, ‘স্যার একটাকে গুলি করলে একটাই পড়ে, বাকিরা দাঁড়িয়ে থাকে, পালায় না।’
জুলাই আন্দোলনের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- এ আন্দোলনে তোমাদের মতো শিশু-কিশোররাও অংশ নিয়েছে। তারাও সঙ্গী হয়েছে রাজপথের মিছিলে। অনেক শিশু মায়ের কোলে বসেই মিছিলে অংশ নেয়। কেউ বাবার কোলে ছিলো। আবার অনেকে এসেছিলো মা বাবার হাত ধরে।
জুলাই বিপ্লবে একসময় গ্রাফিতি আঁকতে থাকে বিপ্লবীরা। ওয়ালে, দেয়ালে, টিনের চালায়, দোকানের শাটারে; এমনকি রাজপথেও। এসব গ্রাফিতি আঁকায় শতশত শিশু অংশ নিয়েছে। মা-বাবা, ভাই-বোনের সাথে শিশুরা রাজপথে গ্রাফিতি এঁকেছে। তারাও স্লোগান ধরেছে। তাই অনেক শিশুও শহীদ হয়েছে জুলাই আন্দোলনে।
জুলাই বিপ্লবের গল্পটি একদিকে আনন্দের; অন্যদিকে বেদনার। আনন্দের এজন্য, এদিন আমরা নতুন করে স্বাধীনতা পেয়েছি। আর বেদনার এ কারণে, আমরা আমাদের হাজার হাজার ভাই-বোনকে হারিয়েছি এ আন্দোলনে।
সবকিছু মিলিয়ে জুলাই বিপ্লব আমাদের বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লব। যে বিপ্লব আমাদের সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে দিয়েছে। আমরা ফিরে পেয়েছি আমাদের প্রিয় স্বাধীনতা!