বিপুল জনমত উপেক্ষা করে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করেন খায়রুল হক
৩১ জুলাই ২০২৫ ১৪:৫০
॥ সরদার আবদুর রহমান ॥
এক বিপুল জনমত পক্ষে নিয়ে দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা’। উচ্চ বিচারালয়ের ঘরে আর বারান্দায়ও প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার পক্ষের আওয়াজ। কিন্তু বিচারপতি খায়রুল হক গং তাকে উপেক্ষা করলেন। বিচারকের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে ব্যবহার করে তা বাতিল করেই ছাড়লেন। এ পদ্ধতিগত কৌশলকে ব্যবহার করে শেখ হাসিনা সংসদেও তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে আজীবন ক্ষমতায় থাকার ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করলেন।
১৭ সেপ্টেম্বর ২০১২ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। রায়ে বিচারপতিদের মতভিন্নতায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুরোপরি বাতিল হয়ে যায়। এ সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পক্ষে সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের সঙ্গে একমত পোষণ করেন তিন বিচারপতি। তারা হলেন বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেন, এস কে সিনহা ও সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। বিপক্ষে মত দেন দুজন বিচারপতি- আবদুল ওয়াহাব মিঞা ও নাজমুন আরা সুলতানা। তারা বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানসম্মত, গণতান্ত্রিক এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয়। এছাড়া বিচারপতি ইমান আলী আপিল নিষ্পত্তি করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য জাতীয় সংসদের ওপর ছেড়ে দেয়ার পক্ষে মত দেন। তিনি মনে করেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অবৈধ নয়, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ধ্বংস করেনি। কিন্তু রাষ্ট্রপতি অযথাযথভাবে তার ক্ষমতা প্রয়োগের কারণে এ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং এর ফলে ২০০৭ সালে সংবিধানে বিচ্যুতি ঘটে।’
এদিকে এ রায়কে কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল বিল উত্থাপন ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুবিধায় তা পাস করে নেয়। এর আগে ২৬ জুন এ সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনের বিল সংসদে উত্থাপন করা হয়।
বিপুল ঐকমত্য উপেক্ষা
শুরু থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির অবস্থান পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বরাবরই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রতি বিপুল ঐকমত্য সাধিত হয়েছে। কী রাজনৈতিক, কী আইনগত আর কী বুদ্ধিবৃত্তিকÑ সকল দিক দিয়েই এর প্রতি বিপুল জনসর্মথন বিদ্যমান। রাজনৈতিকভাবে দেখা যায়, ১৯৯৬ সালে দেশে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দলমত-নির্বিশেষে একটি রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে উঠেছিল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোট, জামায়াতসহ ইসলামপন্থি দলসমূহ, এরশাদের জাতীয় পার্টি প্রভৃতি সকল দল এ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য রাজপথের বিপুল আন্দোলনসহ সর্বময় কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। এর ফলে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপিও এর সঙ্গে একাত্ম হয়ে সংসদে আইন প্রণয়নে উদ্যোগী হয়েছে। ফলে এ ব্যবস্থার বিপক্ষে কথা বলার কোনো সুযোগ অবশিষ্ট ছিল না।
শীর্ষ আইনবিদরাও ছিলেন পক্ষে
দেশের শীর্ষ আইনবিদরাও এর পক্ষে একমত ছিলেন। দেখা যায়, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাসংবলিত ত্রয়োদশ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে কয়েকজন আইনজীবী ১৯৯৯ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। ওই আবেদনের ওপর শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল জারি করেন। পরে রুলের শুনানি গ্রহণ করে হাইকোর্টের তিন বিচারপতির বৃহত্তর বেঞ্চ ২০০৪ সালের ২৪ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বৈধ ঘোষণা করে রায় প্রদান করেন। বিচারপতিরা হলেন- মো. জয়নুল আবেদীন, বিচারপতি মো. আওলাদ আলী ও বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার। বিচারপতি জয়নুল আবেদীন মূল রায় লেখেন। অন্য দুই বিচারপতিও তার সাথে একমত পোষণ করে রায় লেখেন। রায়ে হাইকোর্ট বলেছিলেন, ১৯৯৬ সালের ত্রয়োদশ সংশোধনী বৈধ ও সংবিধানসম্মত। এ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের প্রস্তাবনা ৪৮ ও ৫৬ অনুচ্ছেদে কোনো সংশোধন আনা হয়নি। সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীকে বৈধ ঘোষণা করে এ রায়ে বলা হয়, ‘১৯৯৬ সালের ত্রয়োদশ সংশোধনী সংবিধানসম্মত।’ এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে আপিলকারী ও রাষ্ট্রপক্ষ ছাড়াও শুনানিতে অ্যামিকাস কিউরি (আদালতের আইনি সহায়তাকারী) হিসেবে শীর্ষস্থানীয় ৮ আইনজীবীকে বক্তব্য প্রদানের সুযোগ দেয়া হয়। এদের মধ্যে ৭ জনই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত দেন।
এমনকি শুনানিকালে সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে বক্তব্য প্রদান করেন। রায়ের এ অবস্থানের বিষয়ে পর্যবেক্ষরা মনে করেন, হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারক এবং অ্যামিকাস কিউরিদের ৮ জনের মধ্যে ৭ জন এবং অ্যাটর্নি জেনারেল পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পক্ষে ছিলেন। এছাড়া এপ্রিল-মে-২০১১ মাসে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির উদ্যোগে যে সংলাপের আয়োজন করা হয়, সেখানেও রাজনৈতিক নেতা, আইনবিদ, অর্থনীতিবিদ, সাংবাদিক, পেশাজীবী প্রভৃতিসহ প্রায় সকলের পক্ষ থেকেই একবাক্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত ব্যক্ত করা হয়। এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রীও সংশোধিত আকারে এর পক্ষে বক্তব্য দেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আংশিক রায় ঘোষণার পর এ রায়ের প্রথম অংশকে পুঁজি করে পুরো ব্যবস্থাই সংবিধান থেকে তুলে দেয়া হয়। এমনকি এ সংশোধনী সংসদে পাস করতে গিয়েও নানা নাটকের আশ্রয় নিতে হয়েছিল। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ক্ষমতা পেয়ে এ ব্যবস্থাকে সংবিধান থেকে তুলে দেয়া বিপুল জনমতের সঙ্গে যুদ্ধ করারই শামিল হবে।
উচ্চ আদালতে যা ঘটেছিল
দেশের সর্বোচ্চ আদালতে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের বিষয়ে কার্যক্রম শুরু হলে সেখানেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পক্ষে সর্বসম্মত মত মেলেনি। উচ্চ আদালতের ৭ বিচারপতির মধ্যে ৪ বিচারপতি তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পক্ষে রায় দেন এবং ৩ জন ভিন্নমত পোষণ করেন। নিয়ম অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতির রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল বলে ঘোষিত হয়। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ও তাঁর সঙ্গে সহমত পোষণকারী অপর তিন বিচারপতির সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে বিচারপতি আবদুল ওয়াহাব মিঞা ১৭৮ পৃষ্ঠার অভিমত দেন। এতে বলা হয়, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার (ত্রয়োদশ সংশোধনী) সংবিধান পরিপন্থি বলে ঘোষণা করা হলে নিশ্চিতভাবেই দেশে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে, যেমনটি হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। এর ফলে দেশের অর্থনীতির ওপর প্রভাব পড়বে, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক রাজনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশ এগিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে পেছনে চলতে শুরু করবে। গত তিনটি সাধারণ নির্বাচনে এ ব্যবস্থা মানুষ ব্যাপকভাবে গ্রহণ করেছে। নির্দলীয় সরকারের অধীনেই তিনটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।’ বিচারপতি ওয়াহাবের অভিমতের সঙ্গে বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা একমত পোষণ করেন। আর বিচারপতি মো. ইমান আলী বিষয়টি সংসদের ওপর ছেড়ে দেন।
এ মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টের ৮ সিনিয়র আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি (আদালতের আইনি সহায়তাকারী) নিযুক্ত করা হয়। এরা হলেনÑ সাবেক বিচারপতি টি এইচ খান, সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. এম জহির, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দীন মাহমুদ এবং ব্যারিস্টার আজমালুল হক কিউসি।
এছাড়া সরকার পক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। একমাত্র ব্যারিস্টার আজমালুল হক ছাড়া অন্য সকলেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পক্ষে আইনি ও সাংবিধানিক ব্যাখ্যা আদালতের সামনে উপস্থাপন করেন। সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি বা বিচার বিভাগকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে জড়ানোর বিষয়ে তাদের কারো কারো আপত্তি ছিল। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণার সঙ্গে তাদের কোনো দ্বিমত বা আপত্তি ছিল না। এমনকি তাদের কেউ কেউ আপিল বিভাগের শুনানিতে বলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হলে দেশে রাজনৈতিক বিরোধ চরম আকার ধারণ করবে। এতে যেকোনো সময় রাজনৈতিক প্রলয়ও ঘটে যেতে পারে। আর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে যুক্তিপূর্ণ অভিমত তুলে ধরে বলেন, ‘অনির্বাচিত লোক গণতন্ত্রের চর্চা করলে গণতন্ত্রের স্পিরিট নষ্ট হবে- এটা ঠিক নয়।’ আপিল বিভাগের সাত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে নবম দিনের শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘জাতির একটি সন্ধিক্ষণে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী আনা হয়। বিতর্কমুক্ত একটি ভোটার তালিকা তৈরি, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং সর্বোপরি গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।’ তিনি বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমাদের প্রজাতন্ত্রের ধারাবাহিকতাকে নষ্ট করছে বলে যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তা সঠিক নয়। যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অবৈধ বলে মন্তব্য করছে, আমি তাদের সাথে দ্বিমত পোষণ করি।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই এটা করা জরুরি ছিল। কাজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা খারাপ নয়। তবে কিছু লোকের কারণে এটা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির রদবদল করতে হলে তা সংসদ করবে।’
হাসিনার পোয়াবারো
আপিল বিভাগের রায় হাতে পেয়ে যেন শেখ হাসিনার পোয়াবারো পেয়ে যায়। তিনি সর্বমহলের সর্বসম্মত এ সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে সমূলে উৎপাটনের চাবিকাঠি হাতে পেয়ে যান। সংবিধান সংশোধন কমিটির সদস্যরা এ বিপুল ঐকমত্য নিয়ে ২৭ এপ্রিল ২০১১ সালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জনগণ আর অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা দেখতে চায় না।’ ১০ মে কমিটি আবার বলে, ‘শর্তসাপেক্ষে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।’ ২৯ মে সংবিধান সংশোধনী কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রাখার পক্ষে সুপারিশ করে। এভাবে রাজনৈতিক নেতা, আইনবিদ, অর্থনীতিবিদ, সাংবাদিক, পেশাজীবী প্রমুখসহ প্রায় সকলের পক্ষ থেকেই একবাক্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত ব্যক্ত করা হয়। এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রীও সংশোধিত আকারে এর পক্ষে বক্তব্য দেন। ৩০ মে কমিটি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করলে সবকিছু উল্টে যায়, সবকিছু বদলে যায়। ২০ জুন কমিটি নতুন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের সুপারিশ করে। ২৫ জুন ২০১১ সালে তা ক্যাবিনেটে ও ৩০ জুন সংশোধনীতে তোলা হয়। এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট ও অস্থিতিশীলতার জন্য সংবিধানের ১৫তম সংশোধনী দায়ী। ১৫তম সংশোধনী সংসদীয় বিশেষ কমিটির সুপারিশে হয়নি। এটি হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর মনগড়া সিদ্ধান্তে। তাই এ সংশোধনী অসাংবিধানিক ও অবৈধ।’
শূন্যতার বিশাল গহ্বর
এ নিয়ে একজন কলামিস্ট যুক্তি দেখান, কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থার বিষয়ে উচ্চ আদালতের এসব রায় যদি আক্ষরিক অর্থে কার্যকর হয়, তাহলে সেদিন দূরে নয়, যেদিন ব্ল্যাকহোলের মতো বাংলাদেশ সাংবিধানিক শূন্যতার বিশাল গহ্বরে পতিত হবে এবং অন্তহীন নৈরাজ্য দেশকে গ্রাস করবে। কেয়ারটেকার অবৈধ হলে সব সরকারই অবৈধ। কেয়ারটেকার ব্যবস্থা যদি অবৈধ হয়ে থাকে, তাহলে সেই কেয়ারটেকারের অধীনে গঠিত সব সরকারই অবৈধ হয়ে যায়। সেই সরকার অর্থাৎ ১৯৯৮ সালে শেখ হাসিনার আমলে খায়রুল হক হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হন। এবার এ কেয়ারটেকারের অধীনে গঠিত হাসিনা সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হন। তাহলে তার নিয়োগও অবৈধ হয়। তার নিয়োগ যদি অবৈধ হয়ে থাকে, তাহলে তার দেয়া সবগুলো রায় অবৈধ।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে কাচের ঘরে বসে খায়রুল হক অন্যের কাঁচের প্রাসাদে ঢিল ছুড়েছেন। কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা যদি অবৈধ হয়ে থাকে, তাহলে এর অধীনে যেসব নির্বাচন হয়েছে তার সবগুলোই অবৈধ। ঐসব ইলেকশনের মাধ্যমে যেসব সরকার গঠিত হয়েছে তার সবগুলো সরকারই অবৈধ। তাহলে ১৯৯৬ সালে গঠিত হাসিনার সরকার, ২০০১ সালে গঠিত খালেদা জিয়ার সরকার এবং ২০০৯ সালে গঠিত শেখ হাসিনার দ্বিতীয় মেয়াদের সরকার- এই ৩টি সরকারই অবৈধ। ১৯৯৬ সাল থেকে বর্তমান (২০১২) পর্যন্ত এ ১৬ বছর ধরে বিস্তৃত ও বিরাজমান সবগুলো সরকার অবৈধ ঘোষিত হবে না কেন?”
পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিচারপতি খায়রুল হক ও তাঁর সহযোগীগণ দেশ-জাতি ও গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নেয়ার পরিবর্তে দেশের শাসনক্ষমতা তাদের পছন্দের দলকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দেয়ার ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করতে চেয়েছিলেন। গত দেড় দশকের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক ইতিবৃত্ত এবং দুঃশাসনের খতিয়ান সেই সত্যই প্রমাণ করে।