ডাকসু, রাকসু ও জাকসু নির্বাচন সেপ্টেম্বরে

স্টাফ রিপোর্টার
৩১ জুলাই ২০২৫ ১৪:৩৫

স্টাফ রিপোর্টার : জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ‘দ্বিতীয় সংসদ’ বা ‘মিনি সংসদ’ হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ৯ সেপ্টেম্বর। একই মাসের ১৫ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন হবে। এছাড়া কাছাকাছি সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনও হওয়ার কথা রয়েছে।
ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির একটি বড় ক্ষেত্র হলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচন। যদিও ডাকসু বাদে বাকি তিনটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন দশকের বেশি সময় ধরে এ নির্বাচন হয়নি। ছয় বছর আগে ডাকসু নির্বাচন হলেও এরপর তা আর হয়নি।
গত আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এখন তিনটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) নির্বাচনের তারিখ এখনো ঘোষণা করা হয়নি। নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করছে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। সর্বশেষ চাকসু নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯০ সালে।
ডাকসু নির্বাচন
ডাকসু নির্বাচনের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন গত ২৯ জুলাই মঙ্গলবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, নির্বাচনের খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে পরদিন ৩০ জুলাই বুধবার। ভোটার তালিকার বিষয়ে আপত্তি জানানোর শেষ তারিখ ৮ আগস্ট। এরপর ১১ আগস্ট চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে। মনোনয়নপত্র বিতরণ করা শুরু হবে ১২ আগস্ট। ১৮ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র বিতরণ করা হবে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ১৯ আগস্ট বেলা ৩টা।
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হবে ২০ আগস্ট। এরপর প্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করা হবে ২১ আগস্ট দুপুর ১২টায়। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২৪ আগস্ট দুপুর ১২টা।
প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে ২৫ আগস্ট সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বিকেল ৪টায়। ৯ সেপ্টেম্বর ভোটগ্রহণ করা হবে, সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি হল সংসদের নির্বাচনও এ দিন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের ফলাফলও এ দিন ঘোষণা করা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এবার নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না সন্ধ্যাকালীন কোর্সের শিক্ষার্থীরা। ভোটার ও প্রার্থী হতে হলে শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণকালীন শিক্ষার্থী হতে হবে; যিনি ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে স্নাতক প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়ে স্নাতক, স্নাতকোত্তর বা এমফিল প্রোগ্রামে অধ্যয়নরত এবং কোনো আবাসিক হলে অবস্থানরত বা সংযুক্ত হবেন।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সামনে আসা সংগঠন গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ, ছাত্র ইউনিয়ন, ইসলামী ছাত্রশিবির, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, ছাত্র অধিকার পরিষদ ডাকসু নির্বাচন নিয়ে ক্যাম্পাসে এখন তৎপর। ছাত্র সংগঠনগুলোর শীর্ষস্থানীয় নেতারা ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশ নিয়েছেন এমন শিক্ষার্থীরা সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন।
ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ, ইসলামী ছাত্রশিবির ও বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী। তবে ছাত্রদল মনে করে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিছুটা তড়িঘড়ি করে এ তফসিল ঘোষণা করেছে।
রাকসুর ভোট ১৫ সেপ্টেম্বর
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গত সোমবার রাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে অচল থাকা রাকসুর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৫ সেপ্টেম্বর। এ দিন হল সংসদ নির্বাচনও হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, রাকসু প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬২ সালে। এরপর মোট ১৪টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ রাকসু নির্বাচন হয় ১৯৮৯ সালে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্র সংগঠন, শিক্ষার্থী প্রতিনিধি এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর দাবির মুখে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি রাকসু নির্বাচনের পথনকশা প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে সে অনুযায়ী অগ্রগতি না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে নতুনভাবে নির্বাচনের বিস্তারিত ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
তবে ক্যাম্পাসের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে আবাসিক হলে ভোটকেন্দ্রের সিদ্ধান্ত বাতিল করে একাডেমিক ভবনে ভোটকেন্দ্র স্থাপনসহ তিন দফা দাবি জানিয়েছে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর মোর্চা গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক কয়েকজন সমন্বয়ক এবং গণঅভ্যুত্থানের সময় সামনের সারির কয়েকজন শিক্ষার্থী তফসিলকে স্বাগত জানিয়ে প্যানেল গোছানোর চেষ্টা করছেন।
ইসলামী ছাত্রশিবির রাকসু নির্বাচনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সম্মানজনক হিসেবে দেখছে। তবে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নির্বাচনের পথনকশা ঘোষণা করে। ছাত্র সংগঠনগুলোর মতবিরোধের কারণে কর্তৃপক্ষ ১ ফেব্রুয়ারি তফসিল ঘোষণার কথা ছিল। কিন্তু তফসিল ঘোষণা করতে পারেনি।
পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহের যেকোনো দিন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনার নিষ্পত্তির কথা বলেছিলেন ভিসি। তবে ঘোষণা অনুযায়ী বিচারকার্য সম্পন্ন করা সম্ভব হবে না জানিয়ে গত ২৬ জুন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন ভিসি। ওই আলোচনা সভায় আগামী ১১ সেপ্টেম্বর নির্বাচনে ভোটগ্রহণ এবং ৩ আগস্ট নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে বলে জানান ভিসি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান।
১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর পরের বছরই প্রথম জাকসু নির্বাচন হয়। এরপর বিভিন্ন মেয়াদে বিরতি দিয়ে আরও আটবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এবার ৩৩ বছর পর জাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সর্বশেষ ভোট হয়েছিল ১৯৯২ সালে।
তবে জাকসু নির্বাচন নিয়ে এখনো শঙ্কায় আছেন জাকসুর বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীরা। তাঁদের ভাষ্য, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত প্রশাসন তিনবার নির্বাচনের আশ্বাস দিয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হামলাকারীদের বিচারও চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি। তাই প্রশাসন নতুন করে যে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে, সেদিনই নির্বাচন হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবে জাকসু নির্বাচন নিয়ে আবারও যদি ‘টালবাহানা’ করা হয়, তাহলে তাঁরা ভিসির পদত্যাগের এক দফা আন্দোলনে যাবেন বলে জানিয়েছেন।