হাওরবাংলার কবি মহিবুরের ইন্তেকাল
২৪ জুলাই ২০২৫ ১০:০৩
আহসানুল হক জুয়েল, কিশোরগঞ্জ: হাওরবাংলার কবি সদা হাসি-খুশি প্রাণোচ্ছল সদালাপী সরল মনের মানুষ, কবি-সাহিত্যিক ও গবেষক মহিবুর রহিম এ পৃথিবীর সফর শেষে চলে গেছেন বহু দূরে পরকালের অন্তত জীবনে। কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার ছাতিরচর গ্রামের মো. আমজাদ হোসেনের বড় সন্তান কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চলের গৌরব কবি ও সাহিত্যিক গবেষক ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চিনাইর ডিগ্রী কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান মহিবুর রহিম (৫২) গত ১৬ জুলাই বুধবার দিবাগত মধ্যরাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কাউতলীর বাসায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)। গত ১৭ জুলাই বৃহস্পতিবার প্রথম জানাযা সকাল সাড়ে ৮টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কাউতলীতে এবং দ্বিতীয় জানাযা তার কর্মস্থল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চিনাইর ডিগ্রী কলেজ মাঠে সকাল ১০টায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। তার তৃতীয় জানাযা তার নিজ গ্রামের বাড়ি ছাতিরচরের মাঠে বাদ আছর অনুষ্ঠিত হয়। জানাযা শেষে তার দাফন সম্পন্ন হয়। কবি মহিবুর রহিম ১৫ জানুয়ারি ১৯৭৩ সালে হাওর অঞ্চলের ছাতিরচর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ডায়াবেটিসসহ একাধিক রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন।
কবি মহিবুর রহিমের হাত ধরে অনেকেই সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও লেখালেখির জগতে পা রেখেছেন। তিনিই প্রথম তার নিজ গ্রামে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ঢাকা থেকে রেজিস্ট্রেশন নিয়ে হান্নান গ্রন্থ সুহৃদ সমিতি ও পাঠাগার নামে একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেন। তখন ওই গ্রামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়া আর কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না। তাঁর নিজ গ্রাম ছাতিরচর তথা হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা নিয়ে তাকে ভাবিয়ে তুলতো। তার কথায় ও লেখনীর মাধ্যমে হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার চিত্র ফুটে উঠেছে। এই ছাতিরচর গ্রামকে নদীর ভাঙন থেকে রক্ষার করার জন্য তার লেখনীর মাধ্যমে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ করে সরকারের দৃষ্টি কামনা করা হয়েছে। পুরাতন ছাতিরচরকে একটি মাত্র গ্রাম থেকে ইউনিয়নে রূপান্তরিত করার পিছনে ছাতিরচর গ্রামের যে সকল ব্যক্তিগণ অবদান রেখেছেন তার মধ্যে মহিবুর রহিমও একজন। এমনকি ৯০ দশকের পর থেকে এ পর্যন্ত ছাতিরচরের যত উন্নয়ন হয়েছে এসবের প্রতি ধাপে ধাপে অন্য ব্যক্তিদের পাশাপাশি রয়েছে মহিবুর রহিমেরও নানাবিধ অবদান। সেখানকার পরিবেশ রক্ষা থেকে শুরু করে সৌন্দর্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এবং বৃক্ষরোপণ ও বেড়িবাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে রয়েছে যথেষ্ট ভূমিকা। কর্মময় ব্যস্ত জীবনে তিনি এলাকা ছেড়ে দূরে থাকলেও সকল যোগাযোগ ছিল তার জন্মভূমির প্রতি।
এলাকার লোকজনের সাথে নিয়মিত ছিলো তার যোগাযোগ বিভিন্ন মাধ্যমে। প্রায়ই তিনি কথা প্রসঙ্গে নদী ভাঙনকবলিত ছাতিরচরের অতীত ইতিহাস তুলে ধরতেন। এমনকি শৈশব স্মৃতিচারণে তাকে চোখের জল ঝরাতেও দেখা গেছে। কীভাবে বাপ-দাদার বসতভিটা নদী কেড়ে নিয়েছে, কীভাবে নদী তাদের মতো অসংখ্য পরিবারকে এলাকা ছাড়া করতে বাধ্য করেছেÑ এমন বাস্তবতা তিনি প্রায়ই তুলে ধরতেন তার কথায়। তাঁর অসংখ্য লিখনী প্রমাণ করে তিনি কতটা হাওরপ্রেমী ছিলেন।
তিনি সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা থেকে শুরু করে অসংখ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিদের জীবন ও তাদের কৃতিত্ব তুলে ধরেছেন তাঁর বিভিন্ন লিখনির মাধ্যমে। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বন্ধু প্রিয় একজন মানুষ। তাঁর অসংখ্য গঠনমূলক লেখা বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিনে স্থান করে নিয়েছে। তার লিখনীর মাধ্যমে বেঁচে থাকার জীবনে নানাভাবে পুরস্কৃতও হয়েছেন। শুধু নিজ জেলা কিশোরগঞ্জের নন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাহিত্য অঙ্গনে তার যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। সারা দেশের সাহিত্যাঙ্গনেও তার সুনাম রয়েছে। হাওরের বুকে বেড়ে ওঠা রাখালদের সাথে সময় কাটানোর সাথে জড়িয়ে থাকা সংগ্রামী কবি মহিবুর রহিম প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি প্রিয়জনদের অনুপ্রেরণায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চিনাইর ডিগ্রি কলেজে প্রভাষকের চাকরি নেন। সেই সুবাদে সেখানে অবস্থানকালেই তাঁর মৃত্যু হয়। কবি মহিবুর রহিমের অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুর খবরে তার স্বজন-সঙ্গী ও গুণগ্রাহীদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মৃত্যুকালে স্ত্রী, তিন পুত্রসন্তান এর মধ্যে একজন সন্তান অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। এছাড়া ভাই-বোনসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। এ কবির মৃত্যুতে বিভিন্নজন মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেছেন। নব্বই দশকের খ্যাতিমান এ কবি। তিনি বাংলায় একাডেমির একজন স্থায়ী সদস্য ছিলেন। তার লেখা গবেষণা গ্রন্থসহ কয়েকটি কবিতার বই ব্যাপক পাঠকপ্রিয়। কবি মহিবুর রহিম বাংলা একাডেমি তরুণ লেখক প্রকল্পে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। কবি মহিবুর রহিমের প্রকাশিত গ্রন্থগুলো হলোÑ (১) ‘অতিরিক্ত চোখ’, (২) ‘হে অন্ধ তামস’,(৩) ‘অনাবাদি কবিতা’, (৪) ‘পলি মাটির অন্তর’, (৫) ‘দঃখগুলো অনাদির বীজপত্র’,(৬) মিলেনিয়াম শব্দজট’,(৭) ‘সবুজ শ্যামল মন’,(৮) ‘শিমুল রোদে রঙিন দিন’ (৯) ’ ও ‘হৃদয়ে আমার কোন মন্দা নেই’। (১০) হাওর বাংলা। তাঁর রচিত ‘‘ভাটি বাংলার লোকভাষা ও লোক সাহিত্য’ ২০১৯ সালে কুমিল্লা জেলা প্রশাসন থেকে প্রকাশ করা হয়।
মৌলিক সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতিস্বরূপ মহিবুর রহিম ‘প্রজ্ঞা’ শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি পদক’, ‘স্মৃতি’৫২ সম্মাননা’, ‘রকি সাহিত্য পদক ২০১১’, ‘মেঠোপথ সাহিত্য পদক ২০১৩’, ‘শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহিত্য পদক-২০১৪’ ও ‘সুকুমার রায় সাহিত্য পুরস্কার ও সম্মাননা ২০১৮’ লাভ করেন।