নতুন বাংলাদেশের সন্ধিক্ষণে বিভাজন নয়, প্রয়োজন ঐক্য
২৪ জুলাই ২০২৫ ০৯:৩৭
॥ ড. মুহাম্মদ মুঈনুদ্দীন মৃধা ॥
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশে এক ঐতিহাসিক মোড় বদল হয়েছে। ১৬ বছরের একচ্ছত্র শাসনের নিপীড়ন, অংশগ্রহণহীন ফ্যাসিবাদী কাঠামো ও গণতন্ত্রহীনতার বিরুদ্ধে জনগণের বিস্ফোরণ কেবল সরকার পরিবর্তন নয়- এ যেন এক নতুন রাষ্ট্রচিন্তার জন্ম। অনেকেই একে বলছেন, “বাংলাদেশ ২.০” বা “দ্বিতীয় মুক্তি”। কিন্তু এ নবযাত্রার সাফল্য নির্ভর করছে একটি প্রশ্নের ওপর- আমরা কি পারবো বিভক্তিকে পেছনে ফেলে, যুক্তিবাদী ও সমন্বিত রাজনীতির দিকে এগোতে? বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক অবিশ্বাস, ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসার বৃত্তে আবদ্ধ। স্বাধীনতার পর থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ক্ষমতার পালাবদলের প্রতিটি ধাপে দেখা গেছে প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার প্রবণতা। বিশেষত, আওয়ামী লীগের একদলীয় বাকশালী শাসন থেকে শুরু করে শেখ হাসিনার দীর্ঘ স্বৈরশাসন, সবসময় ভিন্নমতের প্রতি অবজ্ঞা, প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ এবং বিরোধীদের রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের শিকার করে তোলা হয়েছে। তবে এরই ফাঁকে আরও এক জটিল বাস্তবতা সামনে এসেছে বিএনপির একগুঁয়ে ও নেতিবাচক রাজনীতি। অভ্যুত্থান-পরবর্তী গণতান্ত্রিক সংস্কারের পথযাত্রায় বিএনপি যেখানে একটি দায়িত্বশীল বিরোধীদলের ভূমিকা পালন করতে পারতো, সেখানে তারা বিভিন্ন উদ্যোগ; বিশেষ করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপ- বিভ্রান্তিমূলক প্রচার, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও ষড়যন্ত্রমূলক অপপ্রচারে বাধা দিয়ে যাচ্ছে। হেফাজতের মতো প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে পেছন থেকে সমর্থন দিয়ে কিংবা অনলাইন অপপ্রচারে নেতৃত্ব দিয়ে বিএনপি যেন ইচ্ছাকৃতভাবে সংস্কারের গতিকে স্তব্ধ করে দিতে চায়।
এ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কেবল দলীয় বিভক্তি তৈরি করছে না, বরং দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রের ভিত্তিকে বিপন্ন করে তুলছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- জাতীয় ঐকমত্য ভঙ্গুর হলে, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র আরও সহজ হয়। এক-এগারোর অভ্যুত্থান, বিডিআর ট্র্যাজেডি কিংবা সাম্প্রতিক সময়ের বিভ্রান্তিকর গুজব- সবই এ অনৈক্যের পরিণতি। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আজও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হতে পারেনি। বিচার বিভাগ, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী- সবখানে দলীয় স্বার্থের ছায়া। এ দুর্বলতা শুধু সুশাসন ও জবাবদিহি ব্যাহত করে না, বরং জনগণের আস্থার অভাব তৈরি করে এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকে বিপন্ন করে।
নতুন বাংলাদেশে প্রয়োজন এক যৌথ সংস্কারের রূপরেখা। সবার অংশগ্রহণে সংলাপ, যুক্তিসংগত সমালোচনা, শিষ্টাচারপূর্ণ বিরোধিতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা- এ চারটি স্তম্ভেই গঠিত হতে পারে একটি টেকসই রাজনৈতিক পরিমণ্ডল। তবে তা বাস্তবায়নে শুধুই সরকারের সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়; বিরোধীদলগুলোরও ইতিবাচক অংশগ্রহণ অপরিহার্য। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিএনপি ও তাদের সহযোগী দলগুলো এখনো সেই ঐক্যমঞ্চে সক্রিয় নয়, বরং অভ্যুত্থানপন্থি দলগুলোর নারী নেতাদের অনলাইনে লাঞ্ছিত করে চলেছে। প্রতিপক্ষকে ‘ভারতীয় দালাল’ বা ‘সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ট’ বলার মতো অপমানজনক ও গুজবনির্ভর ভাষায় আক্রমণ করছে। এটা গণতান্ত্রিক সহনশীলতার ধারায় নয়, বরং রাজনৈতিক অবক্ষয়ের ধারক। তরুণ প্রজন্মÑ যারা এ অভ্যুত্থানের কেন্দ্রবিন্দু ছিল, তাদের প্রত্যাশা একটি সহনশীল, যুক্তিনির্ভর ও নীতিকেন্দ্রিক রাজনীতির সূচনা। আমাদের দরকার এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে প্রতিটি দল তার ভিন্নমত পেশ করবে যুক্তির মাধ্যমে, শিষ্টাচার বজায় রেখে, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ বা আক্রমণের আশ্রয় না নিয়ে। উন্নত বিশ্বে; এমনকি প্রতিবেশী ভারতেও মৌলিক রাষ্ট্রীয় প্রশ্নে রয়েছে সর্বদলীয় ঐক্য, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো আজও অনুধাবন করতে পারেনি।
সবচেয়ে বড় কথা, সত্যিকার গণতন্ত্র কখনো একমুখী হয় না। একটি কার্যকর গণতন্ত্রে সরকার ও বিরোধীদল উভয়ের দায়িত্ব থাকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করা এবং একটি টেকসই রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণে পারস্পরিক সহযোগিতা করা। বিএনপি যদি সত্যিই ভবিষ্যতের বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক অংশীদার হতে চায়, তবে তাদের নিজেদের মধ্যকার বিদ্বেষ, ষড়যন্ত্রবাদিতা ও রাজনৈতিক কচলানি থেকে বেরিয়ে এসে গঠনমূলক সংলাপের পথে হাঁটতে হবে।
২০২৪-এর অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগ কেবল একটি সরকারের পতনের জন্য ছিল না, ছিল একটি গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার জন্য। সেই আত্মত্যাগকে মূল্য দিতে হলে আমাদের দরকার সহনশীলতা, সম্মান এবং রাষ্ট্রভিত্তিক ঐক্যের সংস্কৃতি। বিভাজন নয়, ঐক্যই হোক নতুন বাংলাদেশের মাইলফলক।
লেখক: অর্গানাইজিং সেক্রেটারি, ফাইট ফর রাইটস ইন্টারন্যাশনাল, ইউকে।