শোকে বিহ্বল গোটা দেশ ও জাতি, যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনায় দায়ীদের শাস্তি চায় জনগণ

স্কুলে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত

সোনার বাংলা রিপোর্ট:
২৪ জুলাই ২০২৫ ০৯:৩১

সোনার বাংলা রিপোর্ট: দুর্ঘটনা কি সবসময়ই নিছক দুর্ঘটনা- এমন প্রশ্ন উঠেছে রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজ ভবনের ছাদে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত ও বিস্ফোরণে ব্যাপক প্রাণহানির পর। এমন প্রশ্নের কারণ ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার এক বছর পূর্তি অনুষ্ঠানের সময় এমন ‘হরিষে বিষাদ।’ তদন্ত এবং প্রমাণের আগে কিছু বিষয় শুধু অনুমান করা যায়, নিশ্চিত করে কিছু বলা কঠিন। কিন্তু এমন অনুমান অপরাধ নয়। কারণ অনুমান তদন্ত কাজকে সহযোগিতা করে, যদি তা ভিত্তিহীন না হয়।
গত ২১ জুলাই সোমবার রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজ ভবনের ছাদে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মোট ৩২ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আরো দেড় শতাধিক শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীর অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় হতাহতের পরিবারে নেমে এসেছে বেদনাবিধুর পরিবেশ। আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। সন্তাদের জন্য অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের বুকফাটা আজাহারিতে আশপাশের কেউই চোখের পানি আটকে রাখতে পারেননি। পাইলট তৌকির ইসলামের লাশ জানাযা শেষে রাজশাহীতে গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়েছে। নিহত শিশু শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের লাশও স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। গত ২২ জুলাই মঙ্গলবার জাতীয় শোক দিবস পালন করা হয়েছে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রেখে ও শোকসভা আয়োজন করে।
ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে দেশের যুবক, কিশোর ও শিশু শিক্ষার্থীরা। হাসিনার প্রতিশোধপরায়ণার কথা কারো অজানা নয়। সেনাবাহিনীর অভ্যুত্থানে তার বাবা-মাসহ পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হয়েছে। তিনি বিবিসির সাথে সাক্ষাৎকারে অকপটে স্বীকার করেছিলেন, ‘তিনি রাজনীতি করেন তার বাবা-মা, ভাই, আত্মীয়-স্বজনের হত্যার প্রতিশোধ নিতে। জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে ক্ষমতা দখলের পর তিনি তার কথা রেখেছেন, পিলখানায় সেনা হত্যাকাণ্ড এবং বাংলাদেশ সেনাবহিনীকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার প্রামাণ্যতা। ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর সাপ্তাহিক সোনার বাংলার এ প্রতিবেদক একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিলেন, হাসিনা দেশকে অস্থিতিশীল করতে ‘এক দিনও শান্তিতে থাকতে দেবো না’ মিশনে নামবেন এবং এমন কিছু অঘটন ঘটাবেন, যা এদেশে ইতোপূর্বে ঘটেনি। মানে তিনি প্রমাণ করতে চাইবেন, তার সময় ‘এমন বর্বরতা ছিল না।’ ইতোমধ্যে যে তা শুরু হয়েছে, এতে সন্দেহ নেই। যেমন: পাথর দিয়ে মানুষ হত্যা, গান গাইতে গাইতে মানুষ হত্যা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ভাত খাওয়ানোর পর যুবক হত্যা ইত্যাদি। বিমান বিধ্বস্ত হয়ে বিস্ফোরণ তেমন কোনো ঘটনা কি না, তা তদন্তের আগে নিশ্চিত করে বলা যাবে না। তবে এটিও একটি নতুন ঘটনা। কারণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে বিস্ফোরণের ঘটনা খুবই বিরল। বিস্ফোরক থাকলে অথবা জ¦ালানি লাইনে ছিদ্র না থাকলে অথবা যেখানে পড়েছে, যেখানে দাহ্য পদার্থ না থাকলে এমন ঘটনা ঘটনার কোনো আশঙ্কা নেই। ইতোপূর্বে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দুর্ঘটনায় ভূপতিত বিমানের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে এ সত্য জানা অসম্ভব নয়। এদেশে ইতোপূর্ব আকাশে উড়ন্ত অবস্থায় দুটি ফাইটার জেটের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু দুজন পাইলট ছাড়া অন্য কেউ নিহত হননি। এসব ঘটনা জনবহুল স্থানে ঘটেনি- এ যুক্তি দিলেও এ কথা বলার সুযোগ নেই, বিধ্বস্ত হওয়ার পর বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
এ দুর্ঘটনাকে স্বাভাবিক মনে করা হচ্ছে না, কারণ জনবহুল এ মেগাসিটিতে কেন প্রশিক্ষণ বিমান উড়ানো হলো? দেশে প্রশিক্ষণ বিমান ঘাঁটির তো অভাব নেই।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ‘শাহজালাল বিমানবন্দরে একটাই রানওয়ে দিয়ে বাণিজ্যিক ও সামরিক উড়োজাহাজ চলাচল করছে। এর চারপাশে বহুতল ভবন, ঘনবসতি- সব মিলিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা। তিনি বলেন, প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না, তবে তা নির্জন, দূরবর্তী ও নিরাপদ আকাশসীমায় হওয়া উচিত। অনেক দেশে সামরিক বাহিনী প্রশিক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট অঞ্চল ব্যবহার করে, যেগুলো জনসাধারণের বসবাসের বাইরে।’
এ প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই বাংলাদেশ বিমানবাহিনীকে দিতে হবে। আরো যেসব প্রশ্নের উত্তর জাতি জানতে চায়, তা হলো- ১. উড়ন্ত কফিনখ্যাত এফটি-৭ বিজিআই মডেলের বিমানগুলো কেন বাতিল হওয়ার ১৪ বছরও পরও বহরে রাখা হয়েছে? ২. বিমানটি আকাশে উড়ার আগে কে পরীক্ষা করে সবকিছু ঠিক আছে বলে সনদপত্র দিয়েছে? তাদের জবাবদিহি করা হয়েছে কি? হলে তারা কী জবাব দিয়েছেন। ৩. এসব বিমান ক্রয়ে যে পুকুরচুরির দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, তার তদন্ত বিগত এক বছরেও কেন হয়নি। ৪. দুর্ঘটনার পরপরই লাশ গুমের অভিযোগ কারা তুলে সচিবালয়সহ স্কুল এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে? এর পেছনে কারা ইন্ধন জোগাচ্ছে? ৫. আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থল ঘিরে রাখার পরও কীভাবে শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীরা একা একা বের হওয়ার সুযোগ পেল। অথচ উচিত ছিল তাদের তত্ত্বাবধানে নিরাপদ স্থানে রেখে অভিভাবকদের কাছে হস্তান্তর করা। ৬. স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে- তিনি বিগত সরকারের দোসর হিসেবে অবৈধভাবে সরকারি জায়গা দখল করে, বিধিমালা না মেনে তলার সংখ্যা বাড়িয়েছেন। এতে ঝুঁকি বেড়েছে।
পরিসংখ্যানে প্রকাশ, ৩৪ বছরে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ৩২টি বড় বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে। বেশিরভাগ দুর্ঘটনা প্রশিক্ষণ চলাকালেই ঘটেছে, যা পিটি-৬, ইয়াক-১৩০, এল-৩৯ বা এফ-৭ টাইপ বিমানের ক্ষেত্রে বেশি দেখা গেছে। প্রায় প্রতি দশকেই ফ্লাইট ক্যাডেট এবং স্কোয়াড্রন লিডারদের প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে বিমানের সবচেয়ে বেশি ক্ষয়-ক্ষতি হয়। একদিনেই ৪৪টি বিমান বিধ্বস্ত হয়। কিন্তু তারপরও এত ব্যাপক প্রাণহানি হয়নি।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আর্মি অ্যাভিয়েশনে কর্মরত ছিলেন কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ সোহেল রানা। সার্বিক বিষয়ে তিনি বলেন, ‘একটি বিমান যখন পাইলটকে দেয়া হয় তার মানে সে ক্যাপাবল। উড়ানোর অনুমতি দেয়া মানে এয়ারক্রাফটও ফিট। আমি মনে করি, আমাদের এয়ারক্রাফট বা মেশিনারিজ পুরনো, আধুনিকায়নও হয়তো হয় না। এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন, নতুন এয়ারক্রাফট সংযোজন করা। সেটা যে হঠাৎ করে কেনা যায় না এটা সত্যি, কিন্তু কেনার প্রক্রিয়া চলমান থাকা উচিত। কেনার সময় অনেক কিছু বিবেচনায় আনতে হয়। ক্রমাগত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি, নিজস্ব চাহিদা, পারিপার্শ্বিক আবহাওয়া, আর্থিক সক্ষমতা, স্পেয়ার পার্টসের সহজলভ্যতা ইত্যাদি অনেক কিছু বিবেচনায় আনতে হয়। চীন, রাশিয়া, ইউরোপ না- আমেরিকা কোন ব্লকের দিকে যাব, এসব বিষয় তো থাকেই। তবে সবকিছু মিলিয়েই বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন দরকার।’
দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভারতমুখী করে রাখার কারণেই এ খাতটিকে দুর্বল করেছে পতিত স্বৈরাচার। এখন সময় এসেছে নজর দিতে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করে জাতির সামনে উপস্থাপন করার দায়িত্ব সরকারের। ফি বছর এ দুর্ঘটনা এবং মেধাবী পাইলটদের মৃত্যু মেনে নেয়া যায় না। এবার নিহতের তালিকায় যোগ হলো ফুলের মতো এক ঝাঁক শিশু-কিশোর শিক্ষার্থী। এদেশের মানুষ চায় অবহেলা, দুর্নীতি, ষড়যন্ত্র কারণ যাই হোক, দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।