অগ্রগতির পথে হাঁটছে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান


১০ জুলাই ২০২৫ ১১:০৭

॥ সাঈদ আব্দুল্লাহ ॥
আফগানিস্তান একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত মৃতপ্রায় জনপদ থেকেও ঘুরে দাঁড়িয়ে সফলতার পথে, গতিশীলতার সাথে এগিয়ে সফলতা পাওয়া যায়, তা যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। প্রায় দুই দশক ধরে পরাশক্তির সাথে লড়াই করে টিকে থেকে আজাদি অর্জন করা তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্র আফগানিস্তান।
আফগানিস্তানের দিকে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়বে আকাশছোঁয়া পাহাড়ের সারি। হিন্দুকুশ পর্বতমালার বিশাল প্রাচীর যেন দেশটির বুকচিরে দাঁড়িয়ে আছে। এই পাহাড়গুলো শুধু যে দেশটির শোভা বাড়িয়েছে তাই নয়, এর ভূ-রাজনীতিতেও রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
অথচ চমৎকার এ রাষ্ট্রটি বিগত কয়েক দশকের আলোচিত, সমালোচিত এবং এক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। সরকারি নাম আফগানিস্তান ইসলামী আমিরাত। প্রায় চার কোটি জনসংখ্যাসমৃদ্ধ ছয় লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ দেশটি পাহাড়ি স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর কথিত সন্ত্রাসী হামলার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান আক্রমণ করে এবং ২০০১-এর শেষে তালেবানদের উৎখাত করে এবং ক্ষমতায় বসায় তাদের ক্রীড়নক সরকার। ফলে আফগানিস্তান আবারও এক প্রকার পরাধীনতার শিকলে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। তালেবানদের কোণঠাসা করতে চলে অসম লড়াই। কিন্তু দীর্ঘ এ পথপরিক্রমায় তালেবানরা তাদের অধিকার আদায়ের লড়াই বন্ধ করেনি।
২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানের মধ্যে সম্পাদিত শান্তিচুক্তির অংশ হিসেবে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সাথে সাথে ২০২১ সালের ১ মে আফগানিস্তান সরকার ও এর মিত্রদের বিরুদ্ধে তালেবান আক্রমণ শুরু করে। ৬ আগস্ট থেকে তালেবান আফগানিস্তানের চৌত্রিশটি প্রদেশের মধ্যে কান্দাহার ও হেরাতসহ আঠারোটি প্রাদেশিক রাজধানী নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। দীর্ঘ লড়াইয়ের পরে আবার তারা স্বাধীনতা ফিরে পায় এবং আগস্টে সরকার গঠন করে।
তালেবানের নেতৃত্বে আফগানিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার, যা আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আফগানিস্তান ইসলামী আমিরাত’ নামে পরিচিত হয়। এটির গঠন এমন- একটি আমিরাত, যার রাজনৈতিক ক্ষমতা একজন আমীর ও তার উপদেষ্টা শূরা কমিটির হাতে ন্যস্ত এবং তারা সম্মিলিতভাবে নেতৃত্ব পরিষদ বা সুপ্রিম কাউন্সিল নামে পরিচিত।
তালেবানের শাসনের প্রায় চার বছর। কেমন চলছে তাদের সরকার?
এ প্রশ্নের জবাবে দেখা যায়, যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানকে সতেজ সবুজে সাজিয়ে তুলতে সফল হয়েছে। তাদের অনেক পদক্ষেপের বিরোধিতা ও সমালোচনা থাকলেও তা তাদের বৃহত্তর সফলতাকে ম্লান করতে পারেনি। তালেবান শাসনের চার বছরে আফগানের অর্জন ও সফলতাগুলোকে পর্যালোচনামূলক দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়- তারা আসলেই চমৎকার সক্ষমতার সাক্ষ্য হতে চলেছে। একটা পর্যালোচনা তুলে ধরলে দেখা যায়:
নিরাপত্তাব্যবস্থা
বিশ বছরের যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটোর সৈন্য প্রত্যাহারের ফলে তালেবানরা ক্ষমতা দখলের পর থেকে প্রধান উন্নতি হলো শান্তি ও নিরাপত্তা। তালেবান বিরোধী প্রতিরোধ, বিশেষ করে ইসলামিক-স্টেটের (আইএস) দক্ষিণ এশীয় শাখা এবং সাবেক নিরাপত্তা বাহিনীর অবশিষ্টাংশ থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল জ্বলছে, তবে সংঘর্ষের সংখ্যা ক্রমাগত হ্রাস পেয়েছে।
তবে তালেবান গোয়েন্দারা স্পষ্টতই এ ধরনের গোষ্ঠীগুলোকে পর্যবেক্ষণ করছে এবং ইসলামিক স্টেটের ওপর সরকারের দমন-পীড়ন নৃশংস হয়েছে। আঞ্চলিক সরকারগুলো, যার মধ্যে অনেকেই চীন, তাজিকিস্তান এবং উজবেকিস্তান, সেইসাথে পাকিস্তানসহ আফগানিস্তানে আশ্রয় নেওয়া জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, তারাও তাদের নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবিলায় তালেবানের সাথে যোগাযোগ করেছে, যদিও ফলাফল সীমিত।
অর্থনীতি
তালেবান শাসনের প্রায় চার বছরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও দেশটির অর্থনীতি একরকম স্থবির। পাশাপাশি দেশটির মানবিক সংকট দিন দিন বাড়ছে। দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ৪১.৫ মিলিয়ন। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের মতে, প্রায় ৪৩% ১৪ বছরের কম বয়সী শিশু। ইউনিসেফের ২০২৫ সালের মার্চ মাসের এক প্রতিবেদন অনুসারে, আফগানিস্তানের প্রতি দ্বিতীয় শিশুর জরুরি সাহায্যের প্রয়োজন।
তবে তালেবানের সফলতার কাছে এসব খুব বড় ব্যর্থতা নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ২০২১ সালে তারা ক্ষমতা নেওয়ার পর দেশটিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। দেশটির মুদ্রার বিনিময় মূল্য বেড়েছে, দুর্নীতি কমেছে আর কর সংগ্রহ বেড়েছে। রাজস্ব সংগ্রহের জন্য তালেবান নানা ধরনের কর নির্ধারণ করেছে। ২০২৩ সালে তারা প্রায় ২৯৬ কোটি ডলার রাজস্ব সংগ্রহ করেছে।
২০২৩ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে বিশ্বের যেসব দেশের মুদ্রা সবচেয়ে ভালো করেছে তাদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে আফগানিস্তানের মুদ্রা আফগানি। তারা অর্থনীতি পুনর্গঠনে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এ অঞ্চলে ‘অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, ট্রানজিট ও বিনিয়োগ’ সম্পর্ক স্থাপন করতে পেরেছে সরকার।
তবে সর্বশেষ গত মে মাসের বিশ্বব্যাংক প্রদত্ত আপডেট তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে আফগানিস্তানের জিডিপি ২.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের টানা দ্বিতীয় বছর।
কৃষি খাত- আফিম থেকে জাফরান
যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের অর্থনীতির চাকা দ্রুত ঘুরাতে বড় অবদান রাখছে কৃষি। ডালিম চাষ আফগানিস্তানের অন্যতম কৃষি। ক্ষমতায় আসার পরপরই দেশটি নতুন করে গড়ে তুলতে ইমারতে ইসলামিয়া প্রশাসনের পদক্ষেপের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, আফিমসহ সকল মাদকদ্রব্য চাষের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ। মাদকের পরিবর্তে জাফরান ও গম চাষে বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করেন কৃষকরা। বিশ্বের অন্যতম দামি মসলা জাফরান চাষকারী বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎপাদনকারী দেশ এখন আফগানিস্তান।
আফগান জাফরান অ্যাসোসিয়েশনের প্রধানের এক বিবৃতি থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের প্রথমার্ধে ভারত, স্পেন এবং সৌদি আরবের মতো দেশে প্রায় ৩০ হাজার কিলো জাফরান রপ্তানি করা হয়েছে।’ আফগানিস্তান সেই বছরে প্রায় ৫০ টন জাফরান সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে।
বিপুল আয়তনের জমিতে সেচ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নিজস্ব প্রযুক্তি এবং অর্থায়নে ১০৮ মিটার প্রস্থ ও ২৮৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের কুশটেপা খাল তৈরি করছে তালেবান সরকার। এতে প্রায় ৬ লাখ হেক্টর জমিতে সারা বছর স্থায়ী সেচের ব্যবস্থা হবে।
খনিজসম্পদের ব্যবহার
আফগানিস্তানের প্রচুর খনিজসম্পদ আছে। কিন্তু দুর্বল অবকাঠামো, দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞের ঘাটতি ও সম্পদের অভাবে তা পারছে না।
বলা হয়, লিথিয়ামের ওপর ভাসছে আফগানিস্তান। দেশটির মাটির নিচে থাকা উত্তোলনযোগ্য লিথিয়ামের সম্পদমূল্য বর্তমান বাজার অনুযায়ী তিন ট্রিলিয়ন ডলার বা তিন লাখ কোটি ডলার। তালেবান সরকার এ ইস্যুতে কাজ করছে পরাশক্তি চীনের সাথে। বর্তমানে ২০টির বেশি চীনা প্রতিষ্ঠান আফগানিস্তানে কাজ করছে এবং শতাধিক চীনা কোম্পানি দেশটির খনিতে কাজ করার জন্য আফগানিস্তানের খনি মন্ত্রণালয়ে তাদের নামও নিবন্ধন করেছে।
শিক্ষা খাত
শিক্ষা খাতকে এগিয়ে নিতে তালেবান সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ১৫টি স্কুল নির্মাণ করেছে। দক্ষিণ-পূর্ব আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির লক্ষ্যে পাকতিয়া প্রদেশের ১৪টি জেলায় ১৫টি নতুন স্কুল ভবনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে তা হস্তান্তর করেছে আফগান শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
মেয়ে এবং ছেলে উভয়ের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে। তালেবানদের সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে তার নাগরিক এবং বহির্বিশ্বও প্রতিবাদ করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানগুলো দেখায় যে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গল্পটি ভিন্ন, বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে। বিশ্বব্যাংকের একটি জরিপ অনুসারে, ২০২৩ সালে সাত থেকে বারো বছর বয়সী ৬০ শতাংশ মেয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল, যা তালেবানদের দখলের আগে ৩৬ শতাংশ ছিল।
প্রযুক্তি খাত
তালেবান নেতৃত্বাধীন আফগানিস্তান ২০২৪ সালে অক্টোবরে একটি অত্যাধুনিক বাস তৈরি করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন পরিচিতি অর্জন করেছে। এর আগের বছরের শুরুর দিকে তালেবান সরকার এক অত্যাধুনিক সুপারকারের মডেল প্রকাশ করে, যার নাম রাখা হয়েছে ‘মাডা ৯’। এই গাড়িটি সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি করা হচ্ছে এবং এটি আফগানিস্তানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার এক নতুন দৃষ্টান্ত। ‘মাডা ৯’ এর ডিজাইন এবং উৎপাদনের জন্য তালেবান কাবুলের ‘আফগানিস্তান টেকনিক্যাল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট’ (এটিভিআই) এবং ‘এনটোপ’ নামক একটি সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা করেছে।
আশার দিক হলো, গত ১০ মাসে ২১৩টি সামরিক যানবাহন মেরামত করেছে ইমারতে ইসলামিয়া আফগানিস্তানের প্রযুক্তিবিদরা। ২০৭ আল-ফারুক কোরের তৃতীয় ব্রিগেডের প্রযুক্তিগত কর্মীদের দক্ষতায় এ যানবাহনগুলো পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী হয়েছে।
রাশিয়ার স্বীকৃতি
কূটনীতিতেও তালেবানরা বেশ সফলতা দেখাতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালে, তালেবান তাদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।
চার বছর পরে হলেও রাশিয়া তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়ে প্রথম দেশ হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখাল। এ পদক্ষেপ কেবল মস্কো-কাবুল সম্পর্ক নয়। বরং গোটা অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তালেবানকে তাদের সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে এবং আফগানিস্তানে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে যৌথ লড়াইয়ের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তালেবানের সঙ্গে অর্থনৈতিক লেনদেন করছে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে কাতার। আর আমিরাতের উড়োজাহাজ সংস্থার সহায়তাও তালেবানের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তালেবানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করা এটি ১১টি দেশে কূটনীতিক প্রেরণ করেছে। অন্যান্য দেশের মধ্যে তালেবানরা রাশিয়া, উজবেকিস্তান, ইরান, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং ক্রমবর্ধমানভাবে ভারতের সাথেও উষ্ণ সম্পর্ক উপভোগ করছে।
ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিসরি এ বছরের (২০২৫) জানুয়ারি মাসে দুবাইয়ে তালেবানের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির সাথে দেখা করেন, যা ২০২১ সালের আগস্টে সাবেক ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের পতনের পর নয়াদিল্লির সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্পৃক্ততা।
একই মাসে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরঘচিও তালেবান নেতাদের সাথে দেখা করার জন্য কাবুল সফর করেছিলেন। আট বছরের মধ্যে কোনো ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এটিই প্রথম সফর। ইরান নিশ্চিত করতে চায় যে, তালেবানরা ১৯৭৩ সালের হেলমান্দ নদীর পানি চুক্তি বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখবে।
পর্যটন শিল্পে গুরুত্বদান
পর্যটন অনেক দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বহু বিলিয়ন ডলারের শিল্প। তালেবান সরকার এবার পর্যটনশিল্পের প্রতিও বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে। এ থেকে তারা বড় একটা অংকের রাজস্ব আয় করতে পারবে বলে আশাবাদী। এমনকি তারা বহির্বিশ্ব থেকে বেড়াতে আসা পর্যটকদের স্বাগত জানাতে পেরে তারা অত্যন্ত আনন্দিত। বিমান, মোটরবাইক, ক্যাম্পার ভ্যান, এমনকি সাইকেলে করেও পর্যটকরা আফগানিস্তান আবিষ্কার করতে শুরু করেছেন, একক ভ্রমণকারী এবং পর্যটন দল ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টারত একটা দেশে।
তালেবান সরকারের পর্যটন উপমন্ত্রী কুদরতুল্লাহ জামাল জুনের গোড়ার দিকে এক সাক্ষাৎকারে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, “আফগান জনগণ উষ্ণ এবং স্বাগতপূর্ণ এবং অন্যান্য দেশের পর্যটকদের আতিথ্য দিতে এবং তাদের সাথে যোগাযোগ করতে চায়। পর্যটন একটি দেশের জন্য অনেক সুবিধা নিয়ে আসে। আমরা সেই সুবিধাগুলো বিবেচনা করেছি এবং আমাদের জাতিকে সেগুলো থেকে পূর্ণ সুবিধা নেওয়ার লক্ষ রেখেছি। এটি কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়; এটি আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক সুবিধাও বয়ে আনে।”
নারীনীতি
ক্ষমতা দখলের আগে থেকেই তালেবান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে প্রতিশ্রুতি দেয়, শরিয়া আইন অনুযায়ী নারী অধিকার নিশ্চিত করা হবে। এমনও বলেছিল, তালেবানের এবারের আমলে নারীরা পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে। কিন্তু তারা সেখানে কিছুটা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে, নারী অধিকার প্রশ্নে তারা আগের মতোই অনমনীয় রয়েছে। নারী শিক্ষা ও ঘরের বাইরে কাজ করার ক্ষেত্রে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যার সঙ্গে তাদের প্রথম শাসনামলের মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ করা। ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়তে পারা মেয়েদেরও শুধু নারী শিক্ষকই পাঠদান করতে পারবে।
তবে এবার বোধ হয় তারা উদারতা দেখাতে পারছে, কূটনৈতিক হিসেবে একজন নারীকে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে। তালেবান সরকারের অধীনে একজন নারী কূটনীতিকের পদে নিয়োগ পেয়েছেন। জাকিয়া ওয়ারদাক, যিনি দিল্লিতে আফগান দূতাবাসে দায়িত্ব পালন করছেন। জাকিয়া এ বছরের ১৬ জানুয়ারি তালেবান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় দিল্লিতে আফগান দূতাবাসের দায়িত্ব নিয়েছেন। তার নিয়োগ একদিকে যেমন তালেবান সরকারের নারীবিদ্বেষী নীতির বিপরীতে, তেমনি এটি আফগান কূটনীতির নতুন অধ্যায়ও বটে।
এমন অনেক আলোচনা-সমালোচনা, প্রতিবন্ধকতা, বিরোধিতা থাকলেও একটা ধ্বংসপ্রায় রাষ্ট্রকে অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে তার স্বরূপে ফিরিয়ে আনতে তালেবান সরকারের নিরলস প্রচেষ্টা, তাদের অন্য যেকোনো দুর্বলতা বা ব্যর্থতাকে বড় করে দেখে এ পরিশ্রমকে হেয় করে দেখা বা ম্লান করার কোনো যৌক্তিকতা আসলে থাকতে পারে না। তাদের কাজের ধরন বা পদ্ধতিগত ভুল থাকতে পারে। কিন্তু তা তাদের অর্জনসমূহকে একেবারে তুচ্ছ করার মতো নয়।
সর্বশেষ বলা যায়, আফগানিস্তানে তালেবান শাসন জাতিকে খুব বেশি সমৃদ্ধ করতে না পারলেও একেবারে আশাহত করেনি। বরং একটা আশাহত মৃতপ্রায় রাষ্ট্রযন্ত্রকে সচল করে জাতিকে আশার আলো দেখাতে সক্ষম হয়েছে। আফগানিস্তান শাসনে তালেবানের সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে হাজার কথা বলা যাবে, তাদের পদ্ধতিগত বা কৌশলগত হাজারো আলোচনা-সমালোচনা করা যাবে। কিন্তু এত আলাপের ভিড়ে জরুরি আলাপ হলো তালেবান যাদের শাসন করছে, সেই জনগণ তাদের কীভাবে গ্রহণ করছে বা মেনে নিচ্ছে! সরকারের ব্যাপারে তাদের ধারণা কি ইতিবাচক নাকি নেতিবাচক? এখানে বড় প্রশ্ন হলো- আফগান নাগরিকরা তালেবান শাসনকে কীভাবে দেখছেন?
আফগানরা তালেবান শাসনব্যবস্থাকে কীভাবে দেখে?
যেকোনো ধরনের ভিন্নমতের প্রতি তালেবানদের অসহিষ্ণুতার কারণে, শাসকগোষ্ঠীর জনসমর্থনের মাত্রা নির্ধারণ করা কঠিন।
তালেবানের শাসনামলে নিঃসন্দেহে অনেক আফগান বিরক্ত। ব্যাপকভাবে বলতে গেলে, তাদের বিরোধীদের মধ্যে রয়েছে প্রধান জাতিগোষ্ঠী পশতুন ছাড়া অন্যান্য জাতিগত গোষ্ঠীর অনেক মানুষ। তালেবানের নারী ও মেয়েদের ওপর বিধিনিষেধের বিরোধী নাগরিকগণ এবং যারা নতুন শাসনব্যবস্থার অস্বচ্ছ ধর্মতন্ত্রের চেয়ে পূর্বে ভোগ করা সাংবিধানিক ব্যবস্থা এবং স্বাধীনতা পছন্দ করে তারা।
অন্যদিকে জনসংখ্যার একটি অংশ তালেবানকে সমর্থন করে। আবারও এ অনুভূতির মাত্রা মূল্যায়ন করা কঠিন, তবে বিশেষ করে গ্রামীণ দক্ষিণ এবং পূর্বাঞ্চলে অনেক আফগান শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনকে আত্মনিয়ন্ত্রণের বিজয় হিসেবে চিত্রিত করে। তাদের পক্ষ যুদ্ধে জয়লাভ করেছে এবং তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এখন রাজধানীতে আরও বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে।
এখানে আফগানদের তৃতীয় আরেকটা শ্রেণি আছে, যারা এ শাসনব্যবস্থাকে সমর্থন বা বিরোধিতা করে না। অথবা এটিকে বিশেষ করে পূর্ববর্তী শাসনব্যবস্থার সাথে তুলনা করে একটি মিশ্র বিষয় বলেও মনে করে না। উদাহরণস্বরূপ, কেউ কেউ কয়েক দশকের যুদ্ধের পরে নতুন আবিষ্কৃত নিরাপত্তার প্রশংসা করেন, কিন্তু চান যে মেয়েরা এবং মহিলারা কম বাধার সম্মুখীন হোক।