পলাশী-উত্তর স্বাধীনতা আন্দোলনে তিতুমীর


৩ জুলাই ২০২৫ ১২:৪৪

॥ মনসুর আহমদ ॥
উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম অগ্নিপুরুষ শহীদ সৈয়দ নিসার আলী ওরফে তিতুমীর। তিনি ছিলেন হাজী শরীয়তুল্লাহর সমসাময়িক। তিতুমীরের ভূমিকা ছিল প্রধানত সশস্ত্র বিদ্রোহ এবং এ বিদ্রোহের পটভূমি ছিল ধর্মীয় সংস্কার। তিতুমীর পবিত্র মক্কায় হজ করতে গেলে মুক্তি সংগ্রামের পথপ্রদর্শক ও ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রধান সংস্কারক সৈয়দ আহমদ বেরলভীর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে। এছাড়া মক্কায় বসবাসকালে তিনি আবদুল ওহাবের অনুসারীদের সংস্পর্শে আসেন। তিনি সেখানে সৈয়দ আহমদ বেরলভীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৮২৭ সালে দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে তিনি প্রথমে সংস্কার আন্দোলনে আত্মনিয়োগ করেন। সংস্কার আন্দোলনের পাশাপাশি তিনি জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। আর এভাবে তাঁর সাথে নীলকর জমিদার ও সরকারের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম শুরু হয়। তাঁর এ সংস্কার আন্দোলন পরিণতিতে কৃষক ও প্রজা আন্দোলনে রূপ নেয়।
তিতুমীরের প্রজা আন্দোলন ছিল একটি গণবিপ্লব। কৃষক ও তাঁতিগণ এ আন্দোলনে যোগ দিয়ে জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিল। অত্যাচার-অবিচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে, শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তাঁর সংগ্রাম সেদিন ব্যর্থ হলেও তা পরবর্তীকালে স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রেরণা জুগিয়েছিল। তিতুমীরের নারিকেল বাড়িয়ায় বাঁশের কেল্লা আজ ইতিহাসে স্থান লাভ করেছে। এখানে ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ নভেম্বর তিতুমীর তাঁর চল্লিশজন অনুচরসহ ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হন।
উনিশ শতকের তৃতীয় পাদ পর্যন্ত উপমহাদেশের মুসলমানদের ইতিহাসের মূল কথা হচ্ছে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ। সৈয়দ আহমদ বেরলভীর নেতৃত্বে যে জিহাদী সংগঠন তৈরি হয়, তার প্রথম আক্রমণ উদ্যত হয় উদ্ধত ও অত্যাচারী শিখদের বিরুদ্ধে। প্রথম দিকে কিছুটা বিজয়ী হলেও বেরলভী বালাকোটে ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দের ৬ মে বিশিষ্ট আলেম ও সহকর্মী শাহ্ মুহাম্মদ ইসমাইলকে সঙ্গে নিয়ে শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও শহীদ হন। নেহাত সুবিধার জন্য এ আন্দোলনকে ওহাবী আখ্যা দেয়া হয়েছে এবং বিদেশি শাসক ইংরেজরা মুসলমানদের এ প্রতিরোধ আন্দোলনকে ওহাবী নামাঙ্কিত করেছে। বস্তুত এ উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে ও ইতিহাসে উনিশ শতকে ইংরেজের বিরুদ্ধে ‘ওহাবী’ নামাঙ্কিত মুসলমানদের যুদ্ধ প্রচেষ্টা এক বিশিষ্ট অধ্যায়। জিহাদী আন্দোলনকে ইংরেজরা ওহাবী বলে আখ্যায়িত করেছে ভারতীয় মুসলমানদের সহানুভূতি নষ্ট করে তাদের প্রতি বিতৃষ্ণা ও বিদ্বেষ জাগানোর দুরভিসন্ধি নিয়ে। ওহাবী আন্দোলন ও জিহাদী আন্দোলন দুটিকে একধর্মী আন্দোলন বলে চিহ্নিত করা চলে না। ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদার বেরলভীর জিহাদী আন্দোলনকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, ‘ভারতে তিনি (সৈয়দ আহমদ বেরলভী) এক বিরাট সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন এবং তা প্রথমে শিখ ও পরে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যে তুমুল সংগ্রাম করেন, তাহাই এ আন্দোলনের প্রধানকীর্তি। এর সাথে ওহাবীমতের কোনো সম্বন্ধ নেই। ধর্মমূলক হলেও ইহার সহিত বিনষ্ট মুসলমান রাজশক্তি উদ্ধারের আশা-আকাক্সক্ষা ছিল না- তাহা বলা যায় না। সুতরাং এ আন্দোলনকে এক হিসেবে ব্রিটিশ রাজত্বে মুসলমানদের প্রথম-মুক্তি সংগ্রাম বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে।’