শান্তিময় দাম্পত্য জীবন


১০ এপ্রিল ২০২৫ ১৩:৩০

॥ আসমা খাতুন ॥
পুরুষ বিয়ে করে নারীর জীবনসঙ্গী হয় আর নারী হয় পুরুষের। সারা জীবনের সাথীটি নির্বাচন সঠিক হওয়াটা স্রষ্টার অফুরন্ত অনুগ্রহ। সঙ্গীর রুচি ও চাহিদার সাথে নিজের রুচি ও চাহিদার সমন্বয় হলে সংসারে সুখ ও শান্তি নিশ্চিত হয়। ভালো ও বিশ্বস্ত সঙ্গী জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপহার। সুখময় দাম্পত্য জীবনের জন্য পরস্পরকে বোঝার আন্তরিক চেষ্টা থাকতে হবে। সঙ্গীর জ্ঞান-বুদ্ধি, মন-মানসিকতা, স্বভাব-প্রকৃতি, দক্ষতা-গুণাবলি, দোষ-ত্রুটি, প্রিয় ও অপ্রিয় বিষয়গুলো জেনে-বুঝে চলতে হয়। মনের মতো মন গড়ে তুলতে আন্তরিকভাবে ভালোবাসার বিকল্প নেই। সঙ্গীর যোগ্যতা-প্রতিভা-গুণাবলি বিকাশে সহায়তা করা, দোষ ও ত্রুটি কৌশলে সারিয়ে তোলা, হাসিমুখে, খুশি মনে কথা বলা, সাথে নিয়ে বেড়াতে যাওয়া, ভদ্র-নম্র-বিনয়ী আচরণ করা, যে কাজ কিংবা গুণ ভালো লাগে তার প্রশংসা করা, ভরসাপূর্ণ-বিশ্বস্ত-ব্যক্তিত্ববান হওয়া, পরামর্শ করে সকল দিক যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেয়া, অবদানের স্বীকৃতি দেয়া, মানসিক ও জৈবিক দাবি পূরণ করা, কথা-কাজে, রাগে-অনুরাগে তার প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রাণখুলে প্রকাশ করা, ছোট-খাটো ত্রুটি-বিচ্যুতি উপেক্ষা করা, মাঝে মাঝে উপহার দেয়া, সাধ্যানুযায়ী মন রক্ষা করা, নিজেকে পরিছন্ন রাখা, যৌক্তিক আবদার রক্ষা করা, আপনার জন্য কষ্ট করলে ধন্যবাদ জানান, নিজের কর্মব্যস্ততার পরিধি জানিয়ে রাখা, নিজের দায়িত্ব ও সংকট নিয়ে প্রয়োজনে আলোচনা করা খুবই কল্যাণকর। সম্পর্কে আস্থা ও বিশ্বাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
উত্তম জীবনসঙ্গী সবারই প্রত্যাশা। প্রত্যেক নারীই উত্তম স্বামী আর প্রত্যেক পুরুষই উত্তম স্ত্রীর আকাক্সক্ষা করে। এ প্রত্যাশা পূরণে আল্লাহর ওপর একান্ত আস্থা ও বিশ্বাসের বিকল্প নেই। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে উত্তম জীবনসঙ্গী লাভের দোয়া শিখিয়েছেন।
অনেকেই জানতে চায়, কীভাবে উত্তম স্বামী কিংবা স্ত্রী পাওয়া যায়। আবার বিবাহিত স্বামী-স্ত্রীও জানতে চায় কীভাবে উত্তম সন্তান লাভ করা যায়। তাদের জন্যই এ কুরআনি আমল-
‘হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদের এমন স্ত্রী ও সন্তান দান করুন। যারা আমাদের চোখ জুড়িয়ে দেয় আর আমাদের (পুরুষদের) মুত্তাকি লোকদের নেতা বানিয়ে দাও।’ (সূরা ফুরকান : ৭৪)।
হযরত আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, আল্লাহর নবী (সা.) বলেছেন, একজন নারীকে বিয়ে করার সময় চারটি বিষয় লক্ষ করা হয়।
সেই নারীর ধন-সম্পদ
তার বংশ মর্যাদা
তার সৌন্দর্য
তার দীন।
সুতরাং তোমার দীনদার নারীই বিয়ে করা উচিত (অন্যথায়) তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
যেসব বিষয় স্ত্রীর চেয়ে স্বামীর বেশি হওয়া উচিত-
বয়স।
জ্ঞান।
অর্থ।
যেসব বিষয় স্বামীর চেয়ে স্ত্রীর বেশি থাকা উচিত-
ধৈর্য।
ভালোবাসা।
পরিচ্ছন্নতা।
সাংসারিক কর্ম আগ্রহী।
পরিকল্পনার জ্ঞান।
স্তব্ধ জীবনযাপনের অভ্যাস।
সময়ানুবর্তিতা।
আত্মত্যাগ।
যেসব বিষয় উভয়ের সমান হওয়া উচিত-
একে অপরকে বুঝতে পারা।
একে অপরের প্রতি সহনশীলতা।
একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
একে অপরের প্রতি সমান বিশ্বাসী।
আসলে উত্তম জীবনসাথী শুধু পছন্দ করে বসে থাকলেই চলবে না। চাইতে হবে মনে মনে আল্লাহর কাছে। রূপ-সৌন্দর্যে বিমোহিত না হয়ে পছন্দ করতে হবে কিছু বৈশিষ্ট্যকে।
মনে রাখবেন, সৌন্দর্য নয়, গুণ মানুষকে সুখী করে।
জীবনসাথী শুধু খাদ্য পানীয়ের আর পথচলার পাটনারশিপ নয়। জীবনসঙ্গী এমন একটি রিলেশনশিপ যার সাথে অনুভূতি, আবেগ, সুখ-দুঃখ, ভালোবাসা ভাগ করে নেওয়া যায়। যার প্রতি পাহাড় সমান আস্থা আর বিশ্বাস অনায়াসে জন্ম নেয়।
মনের কথা খোলাখুলি বলতে শিখতে হবে। সে সবসময় বুঝে নেবে বা অনুমান করতে পারবে এমন চিন্তা করবেন না। অনুভূতি প্রকাশ করা শিখুন। ছোট ছোট বিষয়ে রেগে যাবেন না। তার সাথে হাসি মশকরা করুন- যাতে আপনাদের দুজনের মনই প্রফুল্ল হয়। তাকে বলুন, আপনি স্ত্রী হিসেবে সেরা এবং এমন বিষয়ে নিজের উল্লেখ করুন, যেটা আপনি জানেন আসলেই প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু অহংকার করে নয়, বিনয় এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে। ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে, ‘ঞযব ধিু ঃড় ধ সধহ’ং যবধৎঃ রং ঃযৎড়ঁময যরং ংঃড়সধপয.’ তাই স্বামীর পছন্দের খাবার তৈরি করা শিখুন। আপনার পরিচিত বা আত্মীয়-স্বজনের কাছে কখনো তার বদনাম করবেন না। তারা যদি একথা মেনে নেয় ও বিশ্বাস করা শুরু করে, তাহলে তা আপানকেই পাল্টা আহত করবে। আপনি নিজেই তখন হীনমন্যতায় ভুগবেন এই ভেবে যে, আপনার স্বামী খারাপ, আবার অন্যরাও ভাববে যে, আপনার স্বামী খারাপ। আল্লাহ বলেছেন, “ধ্বংস ওই প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে পেছনে ও সম্মুখে লোকের নিন্দা করে।” -সূরা হুমাযা : ১। বুদ্ধিমত্তার সাথে আপনার সময়টাকে কাজে লাগান এবং আপনার দায়িত্ব সুন্দরভাবে সম্পাদন করুন। এতে আপনিও খুশি হবেন, আপনার স্বামীরও ভালো লাগবে। উপরের সবগুলো কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করুন; দেখবেন আপনি যা করছেন আল্লাহ তায়ালা তাতে বরকত দেবেন।
স্বামী স্ত্রী একে অপরের পছন্দ-অপছন্দ, করণীয়-বর্জনীয় বিষয়গুলো বিজ্ঞতার সাথে আলোচনা করবেন। স্ত্রী স্বামীকে এমনভাবে আদেশ বা নির্দেশ দেবেন না, যেন মনে হয় সে আপনার ‘অধীনস্থ’। আপনার সঙ্গীকে বার বার বলুন আপনি তাকে কত ভালোবাসেন। সুস্থ থাকুন এবং নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নিন, যাতে বলিষ্ঠভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। আচার-আচরণে মার্জিত থাকুন (যেমন- ঘ্যান ঘ্যান করা, অতি উচ্চৈঃস্বরে হাসা বা কথা বলা, থপথপ করে সশব্দে হাঁটাচলা করা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকুন।) স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রী বাড়ির বাইরে যাবে না, আর স্বামীও স্ত্রীকে জানিয়ে বের হবে। খেয়াল রাখুন পরিধেয় কাপড়গুলো যেন নিয়মিত পরিষ্কার থাকে। জরুরি অথবা বিতর্কিত বিষয়ে তার সাথে এমন সময় আলোচনা করবেন না যখন সে ক্লান্ত অথবা তন্দ্রাচ্ছন্ন থাকে। সঠিক সময়ে সঠিক আলোচনা করুন। আপনার সঙ্গীর প্রশংসা করুন। এতে তার কাজের স্পৃহা বাড়বে। আপনার চুল সব সময় আঁচড়ানো রাখুন। মাঝে মাঝে উপহার দিন। উপহারস্বরূপ তাকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসও দিতে পারেন। তার আগ্রহ ও শখের ব্যাপারে আপনিও আগ্রহী হওয়ার চেষ্টা করুন।তার জন্য নিজেকে আকর্ষণীয় করে সাজান, তার সাথে খুনসুটি করুন। আপনার ত্বকের যত্ন নিন, বিশেষত চেহারার। চেহারাই আকর্ষণের মূল কেন্দ্রবিন্দু। তাকে বুঝতে সাহায্য করুন। নীরব থেকে পরিস্থিতি খারাপ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন না। প্রতিদিন, প্রতি ওয়াক্তের নামাজে আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন তিনি আপনাদের মধ্যকার ভালোবাসা ও সহমর্মিতার বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে দেন এবং শয়তানের অনিষ্ট থেকে হেফাজত করেন। দোয়ার মতো কার্যকরী কিছুই নেই। পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা তখনই থাকে, যখন আল্লাহ তাদের মাঝে এটা দেন।
নিজের সঙ্গীর সাথে অন্য সঙ্গীর তুলনা করবেন না। যেমন- কখনো বলবেন না, ‘অমুকের… তো এমন করে না, তুমি কেন এমন কর…’ আপনার ….যেমন, তাতেই সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করুন। কারণ কেউ নিখুঁত নয়, আপনিও নন। আর যদি, ত্রুটিহীন, নিখুঁত সঙ্গী চান তাহলে জান্নাতে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। ইনশাআল্লাহ সেখানে আপনি এবং আপনার স্বামী দুজনেই হবেন নিখুঁত ও ত্রুটিহীন। তাহাজ্জুদ নামাজের সময় ডাকুন এবং একসাথে নামাজ পড়তে বলুন। আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন তিনি দুজনকেই মুত্তাকি হতে সাহায্য করেন। যদি স্ত্রী আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টায় রত থাকে, নিশ্চিতভাবেই স্বামীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা অর্জন করতে পারবে। আল্লাহ সন্তুষ্ট থাকলে ফেরেশতারা আপনাকে ভালোবাসবে, সমস্ত সৃষ্টি আপনাকে ভালোবাসবে।
যারা মহান আল্লাহর কাছে উত্তম জীবনসঙ্গী লাভের প্রত্যাশা করে, তাদের উচিত মহান আল্লাহর কাছে তারই শেখানো ভাষায় আবেদন করা। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনুল কারিমে বান্দাকে উত্তম স্বামী/স্ত্রী ও সন্তান লাভের দোয়া শিখিয়েছেন। যেসব স্বামী/স্ত্রী ও সন্তান একে অন্যের চোখকে শীতল করবে।
কুরআনুল কারিমের এ আয়াতের আমলে আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক পুরুষকেই এমন উত্তম স্ত্রী ও সন্তান দান করবেন, যাদের দেখে পুরুষদের মন শান্ত হয়ে যাবে।
পক্ষান্তরে যেসব নারী এ দোয়ার আমল করবে, আশা করা যায়, আল্লাহ তায়ালা সেসব স্ত্রীদেরও নয়নজুড়ানো স্বামী ও সন্তান দান করবেন।
সুতরাং মুসলিম উম্মাহর উচিত আল্লাহ তায়ালার শেখানো ভাষায় তারই কাছে উত্তম জীবনসঙ্গী ও সুসন্তান লাভের দোয়া করা।
আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহকে কুরআনি আমলের মাধ্যমে উত্তম জীবনসঙ্গী ও সুসন্তান লাভের তাওফিক দান করুন। আমীন।