চিরন্তন গন্তব্যে সৈয়দা সুলতানা ইসলাম
১০ এপ্রিল ২০২৫ ১৩:২৮
॥ এডভোকেট সাবিকুন্নাহার মুন্নী ॥
বাংলাদেশে ইসলামী মহিলা আন্দোলনের সম্মুখ সারির যোদ্ধা আমাদের পরম শ্রদ্ধেয়া খালাম্মা, অবিভক্ত ঢাকা মহানগরীর সাবেক কর্মপরিষদ সদস্যা সৈয়দা সুলতানা ইসলাম গত ২০ মার্চ অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেছেন চিরন্তন গন্তব্যে (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। পবিত্র রমাদান মাসে শুক্রবার দিন পাওয়া ছিল অত্যন্ত সৌভাগ্যের মৃত্যু। হাদিসে এসেছে- হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যেকোনো মুসলমান জুমার দিন কিংবা রাতে মৃত্যুবরণ করে নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তাকে কবরের ফেতনা থেকে নিরাপদ রাখেন।’ (মুসনাদে আহমদ, তিরমিযী, বায়হাকী, মিশকাত)।
আর হাদিসের ঘোষণা অনুযায়ী রমজানে কবরের আজাব বন্ধ থাকে। সেদিক থেকেও রমজানে মৃত্যুবরণকারী পুরো রমজান মাস আজাব বা শাস্তিমুক্ত থাকবে। সুতরাং যেসব ব্যক্তি জুমার দিন ও রমজান মাসে মৃত্যুবরণ করবে আর তারা যদি ঈমান ও আমলি জীবনযাপন করে মৃত্যুবরণ করে, তবে সেসব ব্যক্তির জন্য জুমার দিন ও রমজান মাসই নয়, বরং কেয়ামত পর্যন্ত থাকবে অনাবিল সুখ আর শান্তি। তারা পরকালের জীবনে থাকবে নিরাপদ।
মৃত্যুকালে খালাম্মার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর, তিনি তিন মেয়ে ও নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখেগেছেন। শেষ তিন-চার মাস তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন। সন্তানরা নিরবচ্ছিন্নভাবে মায়ের সেবা শুশ্রƒষায় লেগেছিলেন। খালাম্মার স্বামী মরহুম আমিনুল ইসলাম, সাবেক সচিব ছিলেন। খালুজানের চাকরির সুবাদে খালাম্মা বেশ কয়েক বছর পাকিস্তানেও কাটিয়েছেন। দায়ী হিসেবে সেখানেও দীনের কাজ করেছেন। খালাম্মা ইসলামী আন্দোলনের আরেক অগ্রদূত সুলতানা রাজিয়া খালাম্মার ক্লাসমেট ছিলেন।
যেখানেই যখন অবস্থান করতেন, সেখানেই একজন একনিষ্ঠ দায়ী হিসেবে দীনের আলো ছড়াতেন। একে একে মুরুব্বিদের বিদায় মনটাকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। মায়ের প্রস্থানের সাথে সাথে আস্তে আস্তে বটবৃক্ষসম অভিভাবকরা ছেড়ে যাচ্ছেন আমাদের। কিছুদিন আগে চলে গেলেন হাফেজা আসমা খালাম্মা। মাঝেমধ্যে নিজেদের বড্ড একা মনে হয়! যদিও অস্থায়ী জিন্দেগীর এটাই বৈশিষ্ট্য। আমরা সবাই সেই চীরস্থায়ী আবাসের প্রত্যাশী।
খালাম্মা বেড়াতে গিয়ে দীর্ঘসময় ধরে অস্ট্রেলিয়ায় মেয়ের বাসায় অবস্থান করছিলেন। কর্মব্যস্ত জীবনে কখনো ভ্রমণ করার সুযোগ না পেলেও শেষ বয়সে এসে সন্তানের সুবাদে ভ্রমণপিপাসু খালাম্মা অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন করে ছবিসহ স্ট্যাটাস দিতেন, আল্লাহর সৃষ্টিকে ঘুরে দেখা তার অন্যতম একটা শখ ছিল। পরবর্তীতে পায়ে আঘাতসহ বিপদাপদের মধ্য দিয়ে দীর্ঘসময়ে তিনি দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগছিলেন।
প্রথম থেকে এদেশে মহিলাদের মাঝে ইসলাম প্রচারে যারা কাজ শুরু করেছিলেন খালাম্মা তাদের মধ্যে অন্যতম একজন। ইসলামী আন্দোলনে তার ত্যাগের দীর্ঘ ইতিহাস স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি খুবই কৌশলী ও কর্মঠ একজন মানুষ ছিলেন। পতিত স্বৈরাচারের আমলে বিভিন্ন সময়ে যখন মহিলাদের কাজে পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছিল, সেই কঠিন সময়ে খালাম্মার বাসায় মিটিংয়ের খবর পেয়ে পুলিশি অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। খালাম্মার প্রত্যুৎপন্নমতিতায় ও কৌশলী ভূমিকার কারণে সেদিন মিটিংয়ে আগত মহিলারা গ্রেফতার এড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন।
খালাম্মার সংস্পর্শে থেকে একসাথে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল। তিনি যেমন স্পষ্টভাষী একজন মানুষ ছিলেন তেমনি কুসুম কোমল হৃদয়েরও অধিকারী ছিলেন। আমাদের মতো ছোটদের আদর ও অভিভাবকত্বের বেষ্টনীতে বেষ্টন করে রাখা ছিল তার অন্যতম একটি স্বভাব। ভালো কাজে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন প্রেরণার আধার। আমাদের যারা শিশু সন্তানদের নিয়ে কাজ করতে হতো, শিশুদের অতিরিক্ত চঞ্চল্যতা আমাদের অনেক সময় বিরক্তির কারণ হলেও খালাম্মা সবসময় ধৈর্যের মাধ্যমে তাদের হ্যান্ডলিং করার পরামর্শ দিতেন, বিজ্ঞচিত ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নসিহা প্রদান করতেন, যা আজো স্মৃতির পাতায় জীবন্ত হয়ে ওঠে।
সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে সুস্থ অবস্থায় প্রায়ই তিনি ম্যাসেঞ্জারে কল করতেন, স্বৈরাচার আমলে পেরেশানির সাথে আন্দোলনের খোঁজখবর নিতেন, আমার লেখালেখিতে উৎসাহ জোগাতে ভুলতেন না, নানা কমেন্টস করে উৎসাহিত করতেন। তিনি ছিলেন ভ্রমণপিপাসু সাদা দিলের মানুষ।
অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন খালাম্মার সাথে আর যোগাযোগ রাখা সম্ভব হয়নি। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে যখন ইসলামী দলগুলো নিষিদ্ধ ঘোষিত ছিল তখনো খালাম্মা বিভিন্ন সংস্থার নামে মহিলাদের মাঝে দীনের কাজ করতেন। খালাম্মা আজ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু রেখে গেছেন তার কর্মময় স্মৃতি। তার এ কর্মময় বর্ণাঢ্য স্মৃতি যুগ যুগ ধরে আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। প্রকৃত অর্থে জীবনের সমাপ্তি পৃথিবীতে নয়, এ পৃথিবী পেরিয়ে মানুষ প্রবেশ করে নতুন এক জীবনে।
আমরা সবাই খালাম্মার জন্য দোয়া করছি- আল্লাহ যেন পবিত্র রমাদান মাসের উসিলায় খালাম্মার সমস্ত গুনাহখাতা মাফ করে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেন। সেই সাথে তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি- মহান রব যেন পরিবারের সবাইকে সদকায়ে জারিয়া সন্তান হবার সৌভাগ্য দান করেন।