ওয়াক্ফ সম্পত্তি হাতিয়ে নিতে বিতর্কিত বিল পাস

ক্ষোভে ফেটে পড়েছে ভারতের মুসলমানরা


১০ এপ্রিল ২০২৫ ১৩:১১

॥ সাইদুর রহমান রুমী ॥
ভারতে এবার মুসলমানদের শত শত বছরের ঐহিত্যবাহী ওয়াক্ফ সম্পত্তিগুলো হিন্দুত্ববাদী মোদি সরকার কব্জায় নিতে বহুল বিতর্কিত ওয়াক্ফ বিল পাস করেছে। মুসলিম এবং বিরোধীদলের সদস্যদের তীব্র আপত্তির মুখেও লোকসভা ও রাজ্যসভায় পাস হয় ওয়াক্ফ (সংশোধনী) বিলটি। বিতর্কিত এ বিলে মুসলমানদের ওয়াক্ফ বোর্ডে হিন্দুরাও প্রধান নির্বাহী হওয়ার সুযোগ পাবেন। এ বিলের মাধ্যমে ১৯২৩ সালের ঐতিহ্যবাহী মুসলমান ওয়াক্ফ আইন বাতিল এবং ১৯৯৫ সালের ওয়াক্ফ আইন সংশোধন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। যার ফলে ভারতজুড়ে মুসলমানদের হাজার হাজার কোটি টাকা মূল্যের ওয়াক্ফ সম্পত্তির মালিকানা ও রক্ষণাবেক্ষণে বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদীদের দৌরাত্ম্যে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করবে। ভারতের সংসদে দীর্ঘ ১২ ঘণ্টা তর্ক-বিতর্কের পর গত ৩ এপ্রিল বহুল আলোচিত ওয়াক্ফ বিলটি পাস করা হয়। বিলটি পাস করার মাধ্যমে একজন অমুসলিমও এখন থেকে ওয়াক্ফ বোর্ডের প্রধান নির্বাহী হওয়ার সুযোগ পাবেন।
ওয়াক্ফ সম্পত্তি কী?
১৯১৩ সালের ‘ভারতের মুসলমান ওয়াক্ফ বৈধকরণ আইন’-এ প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী, ওয়াক্ফ অর্থ কোনো মুসলমান কর্তৃক তার সম্পত্তির কোনো অংশ এমন কাজের জন্য স্থায়ীভাবে দান করা; যা মুসলিম আইনে ‘ধর্মীয়, পবিত্র বা সেবামূলক’ হিসেবে স্বীকৃত।
যেসব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি আল্লাহর নামে উৎসর্গ করে দেওয়া হয়, সেসব সম্পত্তিকে বলা হয় ওয়াক্ফ সম্পদ। অর্থাৎ ইসলামী আইন শাস্ত্রের ভাষায় ওয়াক্ফ সম্পদ হলো সাধারণত ভূমি, ভবন বা সম্পদ, যা দাতব্য প্রতিষ্ঠান তৈরির উদ্দেশ্যে দান করা হয়েছে। মসজিদ, স্কুল, কবরস্থান, এতিমখানা, হাসপাতাল বা খালি জমিও এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এ ধরনের দানকৃত সম্পত্তি বিক্রয় বা ভিন্ন কোনোভাবে ব্যবহার ইসলামে নিষিদ্ধ। ওয়াক্ফকৃত সম্পদ ট্রাস্টের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং এ ধরনের দানশীল ব্যক্তিরা ওয়াকিফ বা দাতা হিসেবে পরিচিত হন।
ভারতে মুসলমানদের ওয়াক্ফ সম্পদ ও নতুন আইন
ভারতজুড়ে রেল এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর পর সবচেয়ে বেশি সম্পত্তি রয়েছে ওয়াক্ফ বোর্ডেরই। ভারতে কাগজে কলমে ২০ কোটি মুসলিম বসবাস করলেও প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি এবং দেশটিতে ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে বেশি ওয়াক্ফ সম্পত্তি রয়েছে। প্রায় ১০ লাখ একরের এসব জমির ওপর ৮ লাখ ৭২ হাজারেরও বেশি স্থাপনা রয়েছে বলে জানা যায়। যদিও বিভিন্ন সময় বিজেপি ও তার অংগসংগঠনগুলো বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিম সম্পত্তি দখল করার অভিযোগ রয়েছে। এসব সম্পত্তির মূল্য প্রায় ১৪ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার। এসব সম্পত্তি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ওয়াক্ফ বোর্ডগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। দেশটিতে সবচেয়ে বেশি ওয়াক্ফ সম্পত্তি আছে উত্তরপ্রদেশে (২,৩২,৫৪৭, দেশের মোট ওয়াক্ফ সম্পত্তির ২৭ শতাংশ)। তারপরই তালিকায় আছে পশ্চিমবঙ্গ। রিপোর্ট অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে মোট ৮০ হাজার ৫৪৮টি ওয়্ফা সম্পত্তি রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ওয়াক্ফ সম্পত্তির ওপরে রয়েছে ১৫৮টি স্কুল, ৪টি মডেল ইংলিশ মিডিয়াম মাদরাসা, ১৯টি মুসলিম হোস্টেল, ৯টি হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র।
নতুন বিতর্কিত এ আইনের ফলে শত শত বছর আগে প্রতিষ্ঠিত ওয়াক্ফ জমির ওপর গড়া মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। চরমপন্থি হিন্দু সংগঠনগুলো ভারতের নানা প্রান্তে বহু মসজিদের ওপর তাদের মন্দির আছে বলে দাবি করছে। তাদের দাবি, এসব মসজিদ পুরোনো হিন্দু মন্দির ভেঙে তৈরি। এ ধরনের অনেক মামলাও আদালতে বিচারাধীন। নতুন পাস এ ওয়াক্ফ আইনটির ফলে এ উগ্রবাদীরা নতুনভাবে চাঙ্গা হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নতুন আইন অনুযায়ী, এখন থেকে ওয়াক্ফ বোর্ডকে তাদের জমির মালিকানা প্রমাণ করতে জেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তার অনুমোদন নিতে হবে। সমালোচকদের মতে, এর ফলে বোর্ডের ক্ষমতা খর্ব হবে। আর তা মুসলমানদের জমি কেড়ে নেওয়ার পথ তৈরি করবে। বোর্ডগুলোকে কতবার এরকম জমির দাবির বৈধতা প্রমাণ করতে বলা হবে, তা-ও স্পষ্ট নয়।
বিবিসি বলছে নতুন ওয়াকফ আইনে সম্ভবত সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো কোনটাকে ওয়াক্ফ সম্পত্তি বলে চিহ্নিত করা হবে, সেই সংজ্ঞাটাই পাল্টে দেওয়া। এখন নতুন আইনে বলা হয়েছে, কোনো সম্পত্তিকে ওয়াক্ফ বলে দাবি করতে হলে সংশ্লিষ্ট ওয়াক্ফ বোর্ডকে তার স্বপক্ষে বৈধ নথিপত্র জমা দিতে হবে। বিতর্কিত কেসগুলোয়; বিশেষ করে সেই জমিটা যদি সরকারি মালিকানাধীন ‘খাস জমি’ বলে দাবি থাকে- সেখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার সরকারের ওপরেই ন্যস্ত থাকবে। দ্বিতীয়ত, নতুন আইনে মুসলিম নন, এমন ব্যক্তিরাও ওয়াক্ফ বোর্ড ও ট্রাইব্যুনালের সদস্য হিসেবে নিযুক্ত হতে পারবেন। তৃতীয়ত, এতদিন ওয়াক্ফ সম্পত্তি নিয়ে কোনো বিতর্কের ক্ষেত্রে ওয়াক্ফ ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তই ছিল চূড়ান্ত। কিন্তু নতুন আইনে বিচার বিভাগীয় হস্তক্ষেপেরও সুযোগ রাখা হয়েছেÑ যার অর্থ যে কোনো পক্ষ চাইলে আদালতের দ্বারস্থ হতে পারবেন। কোনো ওয়াক্ফ সম্পত্তির সার্ভে বা সমীক্ষা করানোর দরকার হলে তাতেও সরকারের ভূমিকা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি থাকবে, বস্তুত তারা এক্ষেত্রে ওয়াক্ফ বোর্ডের চেয়েও বেশি ক্ষমতাশালী হবে। আর সবকিছুর পেছনে মোদি সরকারের উদ্দেশ্য, রাজনীতি। ভারতের মুসলিমদের আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ ও কোণঠাসা করে রাখা এবং হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা।
কী বলছে মুসলিম সংগঠনগুলো
ওয়াক্ফ সংশোধনী বিলের শুরু থেকেই মুসলিম সংগঠনগুলো বিরোধিতা করে বলে আসছে এর দ্বারা মোদির অন্য উদ্দেশ্য রয়েছে। তারা বলছে, ওয়াকফ বোর্ডের বিভিন্ন সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যেই এ বিল এনেছে মোদি সরকার। জমিয়তে ইসলামী হিন্দ এবং অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ডের মতো প্রধান মুসলিম সংগঠনগুলোর মতে, গেরুয়াশিবির দীর্ঘসময় ধরেই দিল্লিসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ওয়াক্ফ সম্পত্তি দখল করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। সে কারণেই তড়িঘড়ি করে পাস করানো হলো সংশোধনী বিল। বিলটি ‘অসাংবিধানিক, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপকারী’ বলে অভিযোগ তুলে ভারতের বিরোধীদলগুলোও একযোগে তা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। কংগ্রেস, তৃণমূলসহ বিরোধীদের অভিযোগ, ৪৪টি সংশোধনী এনে ওয়াক্ফ বোর্ডের ওপর সরকারি কর্তৃত্ব নিরঙ্কুশ করতে চাইছে নরেন্দ্র মোদি সরকার। মসজিদুল ওয়াক্ফ কমিটির সদস্য মাসুদ খান আল-জাজিরাকে বলেছেন, ‘ওয়াক্ফ আইন অনুযায়ী জেলা প্রশাসন বা সরকার অবৈধ নির্মাণ সরিয়ে দিতে বাধ্য। কিন্তু যখন সরকার নিজেই দখলের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তখন আইন রক্ষা করবে কে?’ ভারতের ওয়াক্ফ বোর্ডের সদস্যরা জানান, ভূপাল, ইন্দোরসহ মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন শহরে শতাধিক ওয়াক্ফ সম্পত্তি হয় রাজ্য সরকারের দখলে, নয়তো প্রভাবশালীরা দখল করে রেখেছে। অল ইন্ডিয়া ওয়াক্ফ বোর্ড সংবাদমাধ্যমকে জানান, ‘ভূপালে পুলিশ সদর দপ্তর, পুলিশ কন্ট্রোল রুম, ট্রাফিক পুলিশ স্টেশনসহ একাধিক সরকারি দপ্তর দখলকৃত ওয়াকফ সম্পত্তির মূল্যবান জমির ওপর নির্মিত। তিনি আরও জানান, ‘একসময় রাজধানী ভূপালে ১৪০টি কবরস্থান ছিল। বিভিন্ন সময় হিন্দত্ববাদীরা ১০০টিরও বেশি দখল করে নিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে এ বিল দেশটির মুসলিম সংখ্যালঘুদের অধিকারে আঘাত হানবে। আর সেই সুযোগে পুরোনো মসজিদসহ বহু ঐতিহাসিক সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে।
কী বলছে ভারতের বিরোধীদলগুলো
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ওয়াক্ফ বিল নিয়ে কংগ্রেস সংসদ সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তিনি বলেন, ওয়াক্ফ বিল নিয়ে তার দল বিরোধিতা করছে। অপর কংগ্রেস উপনেতা গৌরব বলেন, ‘বিজেপির নজর বিশেষ সম্প্রদায়ের জমির ওপর। ওরা তা কব্জা করতে চায়। সংশোধন করা যেতেই পারে। কিন্তু সেই সংশোধন এমন করুন, যার ফলে ভালো আইন হয়। কিন্তু এরা এমন সংশোধন এনেছে, যাতে সমস্যা বাড়ে। অনেক কবরস্থান আছে, যার কাগজ নেই, কিন্তু রায় আছে। ওরা সৌহার্দ্য নষ্ট করতে চায়।’ সমাজবাদী নেতা অখিলেশ বলেন, ‘এ সরকার ঘর ও দোকান মুসলিমদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিচ্ছে। যখন অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এর বিরুদ্ধে, তখন কেন সরকার এ বিল আনছে? এ বিল বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অংশ।’ তার অভিযোগ, ‘বিজেপি চায় মুসলিমরা উত্তেজিত হোক। বিজেপি বিভাজনের রাজনীতি করবে। ওরা জানে, যত বিভাজন হবে, তত ওদের রাজনৈতিক লাভ হবে। এজন্য ওই বিল আনা হয়েছে।’ ওয়াকফ বিল বিজেপির ঘৃণার রাজনীতির উদাহরণ।
তৃণমূল নেতা কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘সরকার ওয়াক্ফের কত জমি নিয়েছে, তার হিসাব দিন। দেয়া হয়নি। রাজস্থান সরকার ৮০ শতাংশ ওয়াক্ফের জমি দখল করেছে।’ প্রধান বিরোধীদল কংগ্রেসের সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেছেন, ‘যখন হিন্দু মন্দির পরিচালনা কমিটিতে অন্য ধর্মাবলম্বীরা স্থান পান না, তখন ওয়াক্ফ বোর্ডে অমুসলিমদের রাখা হবে কেন?’
বিলের কপি ছিঁড়ে প্রতিবাদ ওয়াইসির
এ বিলটির আগাগোড়া সবচেয়ে বড় সমালোচক ছিলেন অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের সভাপতি তথা হায়দরাবাদের প্রখ্যাত এমপি আসাদউদ্দিন ওয়াইসি। তিনি আইনটির বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টেরও শরণাপন্ন হয়েছেন। সেই বিলের আলোচনায় অংশ নিয়ে বিলের কপি ছিঁড়ে ফেললেন অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তিহাদুল মুসলিমীনের (এআইএমআইএম) সংসদ সদস্য আসাদউদ্দিন ওয়াইসি। বিলের আওতায় দুজন অমুসলিম সদস্যকে ওয়াক্ফ বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বিরোধীরা কঠোরভাবে প্রতিবাদ করেছে। ভারতে মুসলমানদের দান করা ওয়াক্ফ সম্পত্তির ৩৮ লাখ একর জমির ওপর সরকার নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে। বিলটি পাস হওয়ার পর আসাদউদ্দিন ওয়াইসি গর্জে উঠেন। যেটি সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। আসাদউদ্দিন ওয়াইসি এ বিল অসাংবিধানিক বলে দাবি করেছেন। ওয়াক্ফ বিলের তীব্র বিরোধিতা করে একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। ওয়াইসি বলেন, সরকার যে আইন তৈরি করছে, তা সংবিধানের ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন করা হয়েছে। বিজেপি দেশে সংঘাত তৈরি করতে চাইছে। একসময় কালেক্টর এবং ডিএম বলবেন যে, এটি সরকারি সম্পত্তি এবং সেখানে পোস্টার সাঁটাবেন। মসজিদগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে। তার দাবি, এ বিল পাস হলে দেশের প্রাচীন মন্দিরগুলো সুরক্ষিত হবে, কিন্তু মসজিদগুলো নয়। দেশের বৃহত্তম সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন ওয়াইসি। তার বক্তব্য, এ বিল মুসলিমদের দারিদ্র্য দূর করবে না। হায়দরাবাদের এ সংসদ সদস্য আরও বলেন, এ বিল সব ধর্মের সমতার যে সাংবিধানিক বিধান রয়েছে, তার পরিপন্থি। এটি সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদেরও লঙ্ঘন করে বলে দাবি করেছেন তিনি।
পার্লামেন্টে ও পার্লামেন্টের বাইরে তিনি যুক্তি দিয়েছেন, এ বিলটির আসল উদ্দেশ্য মোটেও সংস্কার নয়, বরং সংসদের গরিষ্ঠতাকে ব্যবহার করে মুসলিমদের অধিকারকে ছিনিয়ে নেওয়া। কেন্দ্র ও রাজ্য স্তরের ওয়াক্ফ বোর্ডগুলোয় গরিষ্ঠ সংখ্যক সদস্য যাতে অমুসলিম হতে পারেন, সেই পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে এ বিল। তিনি বলছেন, এখন একই জিনিস কিন্তু আপনি হিন্দু বা জৈন এনডাওমেন্ট বোর্ডে অথবা শিখদের গুরুদোয়ারা প্রবন্ধক কমিটিতে করতে পারবেন না, ফলে এ গোটা পদক্ষেপটাই অসাংবিধানিক ও মুসলিমবিরোধী।
বিল পাসের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভারতের রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর
বিলটি পাসের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু কার্যত রেকর্ড সময়ের মধ্যে বিলটিতে তার সম্মতি দিয়ে দিয়েছেন, যার ফলে এটি এখন ভারতের একটি আইনে পরিণত হয়েছে। উল্লেখ্য, বিলটি প্রথম সংসদে পেশ করা হয় গত বছর। বিরোধীদলগুলো বলছে, এরপর তারা কিছু সংশোধনী প্রস্তাব দিলেও সেগুলো আমলে নেওয়া হয়নি। মোদি সরকারের দাবি, বিরোধীরা গুজব ছড়াচ্ছে এবং ওয়াক্ফ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাধাগ্রস্ত করছে। এ সংক্রান্ত কমিটিতে মোদি সরকারের পক্ষ থেকে ২৩ এবং বিরোধীদলগুলোর পক্ষ থেকে ৪৪টি সংশোধনী প্রস্তাব জমা পড়েছিল। সরকারপক্ষের সংসদ সদস্যদের আনা ১৪টি সংশোধনী গৃহীত হলেও বিরোধীদের সব কটি সংশোধনী প্রস্তাবই খারিজ করে দেওয়া হয়। ভারতের লোকসভার পাশাপাশি রাজ্যসভায়ও পাস হয় ওয়াক্ফ (সংশোধনী) বিল। গত ৩ এপ্রিল বিলটি পেশ করা হয়েছিল দেশটির সংসদের উচ্চকক্ষে। সেখানেও প্রায় ১২ ঘণ্টা আলোচনা হয় এ বিলটি নিয়ে। এরপর তা অনুমোদিত হয় রাজ্যসভায়ও। বিলটির পক্ষে ১২৮টি এবং বিপক্ষে ৯৫টি ভোট পড়ে উচ্চকক্ষে। এর আগে লোকসভায় এ বিলের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন ২৮৮ জন সংসদ সদস্য বিপক্ষে ভোট দিয়েছিলেন ২৩২ জন সংসদ সদস্য।
এদিকে ইতোমধ্যে এ বিলটিকে চ্যালেঞ্জ করে অন্তত চারটি পিটিশন সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা হয়েছে, যেগুলো করেছেন এআইএমআইএম, কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি বা আরজেডির মতো দলের নেতারা এবং অন্তত একটি সিভিল রাইটস গোষ্ঠী। তারা প্রত্যেকেই দাবি করছেন, এ বিলটি চূড়ান্ত অসাংবিধানিক এবং দেশের সংখ্যালঘু নাগরিকদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করছে। এখন সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে কী অবস্থান নেয় এবং মামলাগুলো শুনানির জন্য গ্রহণ করে কি না, সেটাই দেখার বিষয়।
জামায়াতের প্রতিক্রিয়া
‘মুসলিম স্বার্থবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে ভারতের লোকসভায় পাস হওয়া ওয়াকফ সংশোধনী বিলের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে বলেছেন, এ বিল মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা, মালিকানা ও অধিকার হরণের একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা। বিবৃতিতে বলা হয়, সংশোধনী বিলে ওয়াক্ফ বোর্ড ও কেন্দ্রীয় ওয়াকফ কাউন্সিলে অমুসলিম দুজন সদস্য রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা বোর্ডের স্বাধীনতা খর্ব করবে এবং মুসলমানদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সরকারি হস্তক্ষেপের ঝুঁকি বাড়াবে। এটি মুসলমানদের জন্য চরম উদ্বেগজনক ও ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিপন্থি। গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, ‘ভারতে বর্তমানে ২৫ কোটির বেশি মুসলমান রয়েছে। সেখানে ধারাবাহিকভাবে মুসলিমবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। মসজিদ ও মাদরাসা ধ্বংস, তিন তালাক নিষিদ্ধ, লাভ ম্যারেজ ও ধর্মান্তরে বাধা, গরুর গোশতের নামে পিটিয়ে হত্যা ও ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করা- এসব বিজেপি সরকারের মুসলিমবিদ্বেষের প্রতিচ্ছবি। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, জামায়াতে ইসলামী ভারতের বিজেপি সরকারকে মুসলিমবিদ্বেষী অপতৎপরতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানায় এবং আশা করে, তারা দেশটির মুসলমানদের জীবন, সম্পদ ও অধিকার রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেবে। গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, এ বিলের মাধ্যমে মুসলিমদের দান করা মসজিদ, মাদরাসা, কবরস্থান ও আশ্রয়কেন্দ্রের মতো ধর্মীয় সম্পত্তিতে সরকারি হস্তক্ষেপ ও দখলের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
বিএনপির প্রতিক্রিয়া
ভারতে পাস হওয়া ওয়াক্ফ বিল নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এ বিল পাসের মাধ্যমে দেশটির সংখ্যালঘু মুসলমানদের অধিকার খর্ব করা এবং বৈষম্যমূলক আচরণের চেষ্টা করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। রাজধানীর গুলশানে বিএনপির সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘কয়েকদিন আগে ভারতের পার্লামেন্টে মুসলিম ওয়াক্ফ (সংশোধন) বিল ২০২৫ নামে একটি আইন পাস করা হয়। আইনটির বিভিন্ন ধারা বিশ্লেষণ করে আমরা দেখেছি, ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের অধিকার খর্ব করা এবং বৈষম্যমূলক আচরণের চেষ্টা করা হয়েছে এ আইনে। ভারতে মুসলমানরা এবং বিভিন্ন মুসলিম সংগঠন এ বিলকে অসাংবিধানিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।’ বিএনপির স্থায়ী কমিটির এ সদস্য বলেন, ভারতের জনসংখ্যার ১৪ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ২০ কোটি মুসলমানদের ধর্মীয় ঐতিহ্য, অধিকার, সংস্কৃতি ও স্বার্থবিরোধী এ আইনকে অপব্যবহারের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে, যা ইসলামী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যাপক বিপর্যয়কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। ভারতে ওয়াক্ফ বোর্ডগুলোর অধীনে সম্পত্তির মধ্যে অধিকাংশই ব্যবহৃত হয় মসজিদ, মাদরাসা, কবরস্থান ও এতিমখানার মতো জনকল্যাণমূলক কাজে। নতুন আইনে পরিচালনা বোর্ডে অমুসলিম সদস্যদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি বিতর্কের সৃষ্টি করেছে, যার ফলে মুসলিম নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হতে পারে।

রুশ বোমারু বিমান বিধ্বস্ত, নিহত ৬
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:০৩