ঈদযাত্রা স্বস্তির হলেও থামেনি বাড়তি ভাড়া আদায়
১০ এপ্রিল ২০২৫ ১২:৫৭
স্টাফ রিপোর্টার : এবারের ঈদযাত্রায় সড়ক, রেল, নৌ ও আকাশপথে কোনো বিড়ম্বনা ছিল না। যানজটও ছিল বিগত বছরগুলোর তুলনা কম। দীর্ঘ ছুটি থাকা মানুষের সদরঘাট, বাস ও রেল স্টেশনগুলোয় বাড়তি মানুষের চাপও অন্য বছরের তুলনায় কম ছিল। তবে সরকারি কড়াকড়ি (ভ্রাম্যমাণ আদালত সক্রিয় ছিল) থাকলেও বাড়তি ভাড়া নেওয়া ঠেকানো যায়নি। দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের মধ্যে যারা লঞ্চে যাতায়াত করেছেন, তারা স্বাভাবিক সময়ে নির্ধারিত হওয়া ভাড়ায়ই যাতায়াত করতে পেরেছেন। তবে দূরপাল্লার বাস, ঢাকার অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী বাস এবং রিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলো দ্বিগুণ কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনগুণ ভাড়া আদায় করেছে। এবারের ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনায় অনেকের ঈদ পরিণত হয়েছে বিষাদে।
রাজধানীর সাইনবোর্ড থেকে ‘লাব্বাইক এবং লাভলী’ পরিবহনে বাস গোলাপবাগ, মালিবাগ মৌচাক ফার্মগেট হয়ে সাভার যায়। ওই বাসের এক যাত্রী এ প্রতিবেদকের কাছে জানিয়েছেন, ঈদের তিন দিন আগ থেকে টানা এক সপ্তাহ ধরে বাসটি দুই থেকে আড়াইগুণ ভাড়া আদায় করেছে যাত্রীদের কাছ থেকে। সাইনবোর্ড থেকে মৌচাক ভাড়া ৩০ টাকা, ঈদের সময় আদায় করেছে ১০০ টাকা। অর্থাৎ তিনগুণের বেশি। রিকশা চালকরাও দ্বিগুণ এবং সিএসজিচালিত অটোরিকশাওয়ালারাও দ্বিগুণ ভাড়া আদায় করেছে। ঢাকা টু কুয়াকাটা যাওয়া একজন যাত্রী এ প্রতিবেদককে জানান, এসি বাসে স্বাভাবিক ভাড়া ১৫শ’ টাকা হলেও ঈদের সময় দিতে হয়েছে ২৫শ’ টাকা। লঞ্চে বাড়তি ভাড়া দিয়ে না হলেও কেবিন পেতে স্টাফ ও সুপারভাইজারকে দিতে হয়েছে বকশিশ। ভোলার লালহোমন থেকে ঢাকায় আসতে ঈদে কেবিন বুকিং দিতে এমভি ফারহান ৬ লঞ্চের একজন স্টাফকে বকশিশ নিয়ে কেবিন বুকিং দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
১১ দিনে গড়ে ২২ জনের মৃত্যু
এবারের ঈদুল ফিতরের আগে-পরে ১১ দিনে (২৬ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিল) দেশে ২৫৭টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৪৯ জন। প্রতিদিন গড়ে ২২ দশমিক ৬৩ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা শতাধিক। গত ৭ এপ্রিল ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। ৯টি জাতীয় দৈনিক, ৭টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে সংগঠনটি। প্রতিবেদনে বলা হয়, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী ঈদের ছুটির ১১ দিনে আহত হয়েছেন ৫৫৩ জন। কিন্তু বাস্তবে আহতের সংখ্যা ২ হাজারে বেশি। সংগঠনটির প্রতিবেদনে ঈদযাত্রা ও দুর্ঘটনা পর্যালোচনা করে বলা হয়েছে, এবারের ১১ দিনের ঈদযাত্রায় প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছেন ২২ দশমিক ৬৩ জন। ২০২৩ সালের ঈদুল ফিতরের আগে-পরে ১৪ দিনে ২৪০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৮৫ জন নিহত এবং ৪৫৪ জন আহত হয়েছিলেন। প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছিলেন ২০ দশমিক ৩৫ জন। আর ২০২৪ সালে ১৫ দিনে ৩৫৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৬৭ জন নিহত ও ১ হাজার ৫০০ জনের বেশি আহত হয়েছিলেন। প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছিলেন ২৪ দশমিক ৪৬ জন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ঈদ উদযাপনকালে ব্যাপক হারে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটেছে। বেপরোয়া মোটরসাইকেলের ধাক্কায় ১৩ জন পথচারী নিহত হয়েছেন। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের মধ্যে ৫৭ শতাংশের বয়স ১৪ থেকে ২০ বছর।
এদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সূত্র তথ্যমতে, ঈদুল ফিতরের আট দিনের ছুটিতে সারা দেশে ১১০টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ১৩২ জন নিহত এবং ২০৮ জন আহত হয়েছেন।
৮৩২ কোটি টাকা অতিরিক্ত ভাড়া আদায়!
ঈদের আগে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী দাবি করেছেন, ঈদযাত্রায় ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় গণপরিবহনে ঈদ বকশিশ বা অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নামে ৮৩২ কোটি ৩০ লাখ টাকা বাড়তি ভাড়া আদায় চলছে।
প্রসঙ্গত, এবারের ঈদুল ফিতরে রাজধানী ঢাকা থেকে কমবেশি ১ কোটি ১৫ লাখ মানুষ ঘরমুখী যাত্রা করেছেন এবং দেশের অভ্যন্তরে প্রায় ৪ কোটি মানুষ যাতায়াত করেছেন। ঈদের আগে-পরে যথেষ্ট ছুটি থাকা, অনুকূল আবহাওয়া, বিভিন্ন সড়কের অবস্থা ভালো থাকা এবং সরকারের ব্যাপক তৎপরতার কারণে ঈদযাত্রা স্বস্তিকর ছিল।