ব্লেম গেম: জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করার এ কোন প্রবণতা!
২৭ মার্চ ২০২৫ ১৬:১৮
॥ সরদার আবদুর রহমান ॥
২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় উত্তরের জেলা গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গার মাস্টারপাড়ার নিজ বাড়িতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন। এ ঘটনায় লিটনের বড় বোন ফাহমিদা কাকলী বুলবুল সুন্দরগঞ্জ থানায় মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাত পাঁচ থেকে ছয়জনকে আসামি দেখানো হয়। ঘটনার পর এ হত্যাকাণ্ডের জন্য জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করা হয়। সেসময় জামায়াত-শিবিরের অসংখ্য নেতা-কর্মীকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের ওপর চালানো হয় নির্যাতন। দেশজুড়ে চলে অপপ্রচারের বন্যা। এমনকি জাতীয় সংসদে দেয়া বক্তৃতায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ঘটনার জন্য ঢালাওভাবে জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। সেই বক্তব্য আজো সংসদের কার্যবিবরণীতে থেকে গেছে। এছাড়া একটি ভিডিও কনফারেন্সে শেখ হাসিনা সাবেক এমপি লিটন হত্যার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘সংসদ সদস্য লিটন সবসময় এলাকায় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করেছেন। জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। এলাকার মানুষের শান্তি নিশ্চিত করতে কাজ করেছে।’
একজন শীর্ষ দায়িত্বশীল ব্যক্তির এরকম দায়িত্বহীন বক্তব্যে জাতি হতবাক হয়ে যায়। কেননা পরবর্তীকালে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানোর জন্য আওয়ামী লীগেরই সহযোগী জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি ও দলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) আবদুল কাদের খানসহ তার কতিপয় নেতা জড়িত থাকা আদালতে প্রমাণিত হয়। আবদুল কাদের খানসহ সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেনÑ আবদুল কাদের খানের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) মো. শামসুজ্জোহা, গাড়িচালক আবদুল হান্নান, গৃহকর্মী মেহেদী হাসান, শাহীন মিয়া ও আনোয়ারুল ইসলাম রানা এবং চন্দন কুমার সরকার। এর মধ্যে কাদের খানসহ ছয়জন আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। অপরজন চন্দন কুমার সরকার ভারতে পলাতক অবস্থায় সেখানে গ্রেফতার হন।
এটি একটি নমুনা। এরকম অসংখ্য ঘটনার জন্য ‘ব্লেম গেম’ বা ‘দোষারোপের খেলা’ খেলতে দেখা যায় বাম ও ধর্মনিরপেক্ষবাদী মহলকে। সব অপকর্মের জন্য ‘কেষ্ট বেটাই চোর’-এই শব্দসমূহ যেন কপালের লিখন হয়ে দাঁড়ায় তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের জন্য; বিশেষত ইসলামপন্থি রাজনীতির অনুশীলন করেন যারা, তাদের জন্য।
ব্লেম গেমের মনস্তত্ত্ব
‘ব্লেম গেম’ বা ‘দোষারোপের খেলা’ হচ্ছে একটি মানসিক রোগ বিশেষ। অপরকে দোষারোপের মনস্তাত্ত্বিক টার্ম হচ্ছে মনস্তাত্ত্বিক অভিক্ষেপ। এর ফলে মানুষের ভেতরে এমন একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি হয়, যার মাধ্যমে অপরকে বলীর পাঁঠা হিসেবে ব্যবহার করে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করা হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অন্যের ত্রুটি খুঁজে বের করা এবং নিজের ভুল সংশোধন না করা ব্যক্তিত্বের ব্যাধির লক্ষণ। কিছু ব্যক্তিত্বের ব্যাধিযুক্ত মানুষ তাদের আচরণ পরিবর্তন করতে মোটেও প্রস্তুত থাকেন না; এমনকি তা যদি তাদের জন্যও সমস্যার কারণ হয়, তবুও না। এসব মানুষ কেবল এককভাবে অবস্থান করে না, তারা দলবদ্ধভাবেও থাকে। এ খেলা খেলতে খেলতে তারা একপর্যায়ে এ খেলায় নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং সবখানেই এ কৌশল প্রয়োগ করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে এ রোগের প্রধান শিকার বাম ও ধর্মনিরপেক্ষবাদী বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীরা। তারা এ কাজে গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক মঞ্চকে ব্যবহার করে। সেসব মাধ্যম দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অতঃপর রাজনৈতিক মঞ্চও ব্যবহৃত হতে থাকে। এসব মাধ্যম ব্যবহারের ফলে এ ব্লেম গেমের প্রভাব দীর্ঘকাল বজায় থাকে। তবে সেটি কখনোই চিরস্থায়ী হয় না।
কতিপয় ঘটনার উদাহরণ
এই ব্লেম গেম বা দোষারোপের খেলার বিষয়ে কতিপয় ঘটনার উদাহরণ দেয়া যাক। গাইবান্ধার লিটন হত্যা নিয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত এ গেমের অংশীদার, শুরুতেই তা উল্লেখ করা হয়েছে। এ মিথ্যা অপবাদ দিয়ে জামায়াত ও শিবিরের নিরাপরাধ নেতা-কর্মীদের ওপর কী ঝড় বইয়ে দেয়া হয়েছিল, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন। পরে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটিত হলেও এজন্য কোনো অনুতাপ প্রকাশ করা দূরে থাক, সাধারণ দুঃখ প্রকাশও করা হয়নি। মনে হয় যেন জামায়াত-শিবির এসবের ন্যায্য পাওনাদার।
১৯৯২ সালের ১৭ আগস্ট ওয়ার্কার্স পার্টির তোপখানা রোডস্থ কার্যালয়ের সামনে রাশেদ খান মেননকে গুলি করা হলে তিনি গুরুতর আহত হন। প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও পরে সিএমএইচে তার চিকিৎসা ও অপারেশনের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উদ্যোগে মেননকে উন্নত চিকিৎসার উদ্দেশ্যে লন্ডনে নিয়ে যাওয়া হয়। এ গুলির জন্য ঐ জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করা হয় এবং বিবৃতি ও প্রতিবাদের ঝড় তোলা হয়। যদিও পরে জানা যায় যে, মেননের নির্বাচনী এলাকা বরিশালের উজিরপুরের সর্বহারাদের সঙ্গে আন্তঃকোন্দলের জেরে তিনি হামলার শিকার হন। সে মোতাবেক পুলিশ তদন্ত করে কতিপয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে। তবে ১৪ দলীয় জোটের শরিক হিসেবে ওয়ার্কার্স পার্টি ক্ষমতার অংশীদার থাকা সত্ত্বেও মামলাটির সুরাহা হয়নি।
২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি পল্টনে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলে চারজন এবং পরে হাসপাতালে একজনসহ মোট পাঁচজন নিহত এবং ২০ জন আহত হন। এ ঘটনার জন্য যথারীতি জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করা হয়। তবে তদন্তে আর জামায়াত-শিবিরের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে এসব ঘটনায় ‘জঙ্গিরা জড়িত’ এমন অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ২০০৫ সালে সিপিবি সমাবেশে বোমা হামলার মামলাটি পুনঃতদন্তের আদেশ দেওয়া হয়। মামলাটি পুনঃতদন্তের পর ২০১৪ সালে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। বিচার শুরু হলে ঢাকার একটি আদালত মামলার ১২ আসামির মধ্যে ১০ জনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। আসামিদের মধ্যে মুফতি আবদুল হান্নানের ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় তাকে অপর মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। এছাড়া অপর দুজন আসামি খালাস পান।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিএনপি-জামায়াত তথা চারদলীয় জোট সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের সমাবেশে এক ভয়ংকর গ্রেনেড হামলা হয়। এ হামলায় মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ নেতাকর্মী নিহত হন। এ হামলার জন্য বিএনপি-জামায়াতকে ঢালাওভাবে দোষারোপ করা হয় এবং সেভাবে প্রচারণার বন্যা বইতে থাকে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এ হামলার জন্য হরকাতুল জিহাদ নামে একটি জঙ্গি সংগঠনকে (হুজি) অভিযুক্ত করা হলেও রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য এর সাথে বিএনপির তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবর, আবদুস সালাম পিন্টু, জামায়াতে ইসলামীর আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, হারিছ চৌধুরী এবং ডিজিএফআই ও এনএসআইয়ের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তদের জড়িত করা হয়। আইন ও বিচারকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক অভিযুক্তদের মৃত্যুদণ্ডসহ বিভিন্ন মাত্রার সাজা প্রদান করা হয়। এর আগে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে অন্য মামলায় ফাঁসি কার্যকর করায় তাঁর নাম বাদ দেয়া হয়। তবে সাম্প্রতিক সরকার পরিবর্তনের পর নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়ায় আসামিরা একের পর এক মুক্ত হতে থাকেন। বলা হয়ে থাকে, এটি ছিল প্রতিপক্ষকে একযোগে দমনের জন্য একটি প্রকল্প। জামায়াত-বিএনপিকে জঙ্গিভুক্ত দেখানো এবং এর মাধ্যমে দমন করার জন্য এ কৌশল অবলম্বন করা হয়।
২০০৪ সালে ২৪ ডিসেম্বর প্রাতঃভ্রমণে বের হলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুর এলাকায় নিজ বাস ভবনের সামনে খুন হন রাবির অর্থনীতি বিভাগের আওয়ামীপন্থী অধ্যাপক রাবি শাখা বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি ড. ইউনুস। এ খুনের জন্য জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করে বিবৃতির ঝড় তোলা হয়। মিছিল-সমাবেশও হয় জামায়াত-শিবিরের বিচার চেয়ে। তবে শেষ পর্যন্ত তদন্তে উঠে আসে জেএমবির সংশ্লিষ্টতা। রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল জেএমবি’র দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রদান করেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক তাহের আহমদ ২০০৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তাঁর নিজ গৃহে হত্যার শিকার হন। এ হত্যা মামলা ইতোমধ্যে সম্পূর্ণ নিষ্পত্তি হয়েছে। এ মামলায় অধ্যাপক তাহেরের একজন সহকর্মী ও একজন গৃহকর্মীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। কিন্তু তাহের হত্যার পরপরই এর সঙ্গে কতিপয় গণমাধ্যম ইসলামী ছাত্রশিবিরের একজন নেতাকে জড়িয়ে শোরগোল তোলা হয়। সেই নেতাকে গ্রেফতার পর্যন্ত করা হয়। পরে তিনি বিচারিক আদালতে বেকসুর খালাস পান।
এছাড়া ২০১৬ সালের ২৩ এপ্রিল রাজশাহী নগরীর শালবাগান এলাকার বাড়ি থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার পথে খুন হন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম সিদ্দিকী। বাসভবনের খুব কাছেই তিনি যখন বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন, তখন অজ্ঞাতপরিচয় ঘাতক তাকে কুপিয়ে ও গলা কেটে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে পালিয়ে যায়। এ ঘটনার জন্যও শিবিরকে সন্দেহ করে ধরপাকড় করা হয়। শিবিরের একজন স্থানীয় দায়িত্বশীল গুরুতর অসুস্থ হওয়া সত্ত্বেও পুলিশের হাতে নির্যাতনের শিকার হন এবং এর জেরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তীকালে তদন্তে ধরা পড়ে রেজাউল করিম হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী জঙ্গি শরিফুল। যদিও পুলিশ তাকে ধরতে পারেনি।
পহেলা বৈশাখ উদযাপনের একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ১৪ এপ্রিল ২০০১ তারিখে রমনা বটমূলে বোমা হামলা একটি সিরিজ বোমা হামলা। হরকাত-উল-জিহাদ আল-ইসলামী জঙ্গি সুজানসহ দশজন মারা যান এবং আরো অনেক লোক আহত হন। এ ঘটনার পেছনেও জামায়াত-শিবিরের অস্তিত্ব অনুসন্ধান করতে সময়ের অপব্যয় করে সংশ্লিষ্ট মহলটি। এভাবে দেশে সংঘটিত যেকোনো অরাজক পরিস্থিতির পেছনে ইসলামপন্থিদের সংশ্লিষ্টতার দায় চাপিয়ে তাদের জাতির কাছে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত করে তোলা ছিল খুবই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কিন্তু তারা কি সফল হতে পেরেছে?