দিকনির্দেশনা দিতে হবে রাজনৈতিক নেতাদেরই


২৭ মার্চ ২০২৫ ১৬:১৭

॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
বাংলাদেশের অভ্যুদয় প্রায় ৫৪ বছর। দেশের রাজনীতিবিদদের সঠিক সিদ্ধান্ত থেকে জাতি নিরাশ। ১৯৭১ সালে মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান জাতিকে অন্ধকারে রেখে পাকিস্তানে চলে যান। তার দলের লোকদেরও কোনো আদেশ-নির্দেশ দিয়ে যাননি। পরে তৎকালীন মেজর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা ও এমএ জি ওসমানির নেতৃত্বে এ দেশের মানুষ যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করে। ভারতের প্রত্যক্ষ মদদে দেশে একদলীয় সরকার বাকশাল কায়েম করেন শেখ মুজিবুর রহমান। সব পত্রপত্রিকা বন্ধ করে মাত্র ৪টি পত্রিকা প্রকাশ করার ব্যবস্থা করে। রক্ষীবাহিনী তৈরি করে প্রায় ৪০ হাজার রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে হত্যা করে। সিরাজ শিকদারকে গুলি করে হত্যা করে শেখ মুজিব সংসদে দাঁড়িয়ে দাম্ভিকতার সাথে বলেন, আজ সিরাজ শিকদার কোথায়? এভাবেই প্রকৃত দিকনির্দেশনা থেকে দেশ ও জাতি বঞ্চিত হয়। শেখ মুজিবের করুণ পরিণতি কারো অজানা নয়।
তখনকার মেজর জিয়ার নেতৃত্বে দেশ জরুরি অবস্থার মধ্যে পড়ে যায়। তারপরও জনগণ তাকে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন দেয়। তিনি ক্ষমতায় থেকেই দল গঠন করে নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। তিনি প্রেসিডেন্ট হন। ভারতের প্রত্যক্ষ মদদে জেনারেল এরশাদের কুচক্রে প্রেসিডেন্ট জিয়াকে হত্যা করা হয়। হত্যাকারীরা পালিয়েও রেহাই পায়নি।
জেনারেল এরশাদ নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন। তারও পরিণতি ভালো হয়নি। ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে। পরবর্তীতে বেগম জিয়ার আবির্ভাব ঘটে। প্রেসিডেন্ট জিয়া ক্ষমতায় এসে ডান-বাম দলের সমন্বয়ে দেশ চালাতে থাকেন। বেগম জিয়াও তাকে অনুসরণ করেন। জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে চারদলীয় সরকার গঠন করেন। দেশ ভালোই চলছিল। কিন্তু প্রতিবেশী ভারত আমাদের কখনোই ভালো থাকতে দেয়নি। এখনো তাদের নীতি বদলায়নি।
গত ১৬ বছর শেখ হাসিনা দেশের সার্বভৌমত্ব প্রকারন্তে কেড়ে নিয়ে পুতুল সরকার কায়েম করেছিল। ছাত্র-জনতার সব অধিকার হরণ করে তার দলের রাজত্ব কায়েম করেছিল। খুন, গুম, বিনাবিচারে হত্যা, ফাঁসি, আয়নাঘর করে নিরপরাধ মানুষকে নির্যাতন করে দেশটাকে নির্যাতনের বধ্যভূমি বানিয়েছিল।
বৈষম্য আর অর্থ লুট, ব্যাংক লুট থেকে শুরু করে আওয়ামী ঘরানাদের স্বর্গরাজ্য বানিয়েছিল। ছাত্র-জনতা কোটা আন্দোলন থেকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পর শেখ হাসিনা খেদানোর সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু করে। ছাত্র-জনতা; এমনকি মা-বোনেরাও তাদের নিজ সন্তানদের নিয়ে মাঠে নেমে আসেন। দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীও ছাত্র-জনতাকে গুলি করা থেকে বিরত থাকে। শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালিয়ে জীবন নিয়ে ভারতে চলে যান। আগের মতোই ভারত বাংলাদেশের ভালোর কথা চিন্তা না করে শেখ হাসিনা ও তার চোরতন্ত্রের সব লোককে আশ্রয় দেয়।
এখনো এ গোষ্ঠী ভারত থেকে দফায় দফায় দেশকে অশান্ত করার চেষ্টা করছে। আমাদের সজাগ থাকতে হবে। স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার দোসরদের কাউকেই ছাড় দেয়া যাবে না। আইনের আওতায় এনে দেশদ্রোহীদের বিচার করতে হবে। দেশদরদির ঐক্য বজায় রাখতে হবে, নিজেদের মধ্যকার সব মতপার্থক্য দূর করে দেশকে ভালোবাসতে হবে।
দেশে সংস্কারকাজ চলছে। যৌক্তিক সংস্কার করেই আগে স্থানীয় নির্বাচন, পরে জাতীয় নির্বাচন দিতে হবে। কারও দ্বিমত থাকতে পারে। তবে স্থানীয় নির্বাচন আগে হলে এলাকায় আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হবে। জনগণের সেবা পেতে সহজ হবে।
এখনো বিভিন্ন দলের মধ্যে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। মতপার্থক্য আছে, থাকবে। তবে কমন মতপার্থক্য দূর করে নির্বাচনের দিকে এগোতে হবে। কোনো দলীয় সরকার শাপলা চত্বরের খুনের বিচার, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের বিচার, ১৬ বছরের গুম-খুনের বিচার করতে পারবে না।
ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী দোসররা তাদের ব্যাংক লুটের টাকা দিয়ে কিছু নেতাকে কিনে নিয়েছে। তাদের আশ্রয়ে তারা থাকছে। আবার দলে বিভেদ সৃষ্টি করে দেশে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
বিভিন্ন গুজব ছড়িয়ে সেনাবাহিনী ও জনতার মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করছে, যা মোটেই কাম্য নয়। সেনাবাহিনী আমাদের গর্বের বাহিনী। দেশে এবং বিদেশে শান্তিরক্ষার কাজে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আনছে। তাই সেনাবাহিনীতে আমার-আপনার ছেলে ও মেয়েরা দায়িত্ব পালন করছে। তাদের সম্মানের হানিকর কোনো কাজ করা যাবে না। ভেতরের দোসরদের ছাড় দেয়া যাবে না। শেখ হাসিনা ও তাদের দোসরদের বিচার দ্রুততম সময়ে শেষ করে তা কার্যকর করতে হবে। দেশদ্রোহীদের কোনো ছাড় নেই। তাদের সম্পদ, টাকা-পয়সা সব বাজেয়াপ্ত করতে হবে। সেটা দেশে হোক আর বিদেশে হোক।
আমাদের বিভিন্ন দলের মধ্যে যারা ইতোমধ্যেই ভারতের দালাল সেজেছে, তাদের পরিচয় জনগণকে জানাতে হবে। কারণ ভারতের দালালি করে এদেশে রাজনীতি করা যাবে না। তার প্রমাণ জুলাই-আগস্ট বিপ্লব।
আমার বিষয় ছিল রাজনীতিবিদদের জনগণকে দিকনির্দেশনা দিতে হবে। বাপ-বেটি পালাইছে কোনো দিকনির্দেশনা দল বা জনগণকে দেয়নি বা দেয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। শুধু তাই নয়, ৩০০ এমপি-মন্ত্রী, মেয়র-চেয়ারম্যান, এমনকি বায়তুল মোকাররমের খতিবও পালাইছে, যা খুবই লজ্জাজনক। এদেশে বহুবার ক্ষমতার বদল হয়েছে, কিন্তু পরাজিত দলের লোকেরা তো দেশ ছেড়ে পালায়নি।
বিচার শুরু হয়েছে, স্বাস্থ্য বিভাগের ড্রাইভারের ১৩ বছরর জেল হয়েছে। আরও বিচার অপেক্ষা করছে। স্বচ্ছ বিচারের মাধ্যমেই সবাইকে সর্বোচ্চ সাজা দিতে হবে। দেশকে চাঁদাবাজ-লুটেরামুক্ত করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
দেশে শান্তি-স্বস্তি ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব দেশের সব দলের নেতাদের ওপর বর্তায়। নিজে ভালো হলে সবাইকে ভালোর পরামর্শ দেয়া যেতে পারে। বিএনপির কয়েকজন নেতার বক্তব্য শুনে মনে হয়, দেশটা তাদের তালুক। জেনারেল জিয়াউর রহমান এদেশকে ভারতীয় দালালমুক্ত ও ইসলামী দেশ করার কাজ করে গেছেন। আর এরা ভারতের দালাল হিসেবে ড. ইউনূস সরকারকে সহযোগিতা করছে না। তারেক জিয়া কিন্তু দেশের সবার ভালো চেয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন। বেগম জিয়া তো পূর্ব থেকেই আপসহীন নেত্রী। বিএনপিতে অনেক ভালো মানুষ আছে। তাই ভালো নেতৃত্ব এগিয়ে আসতে হবে। কোনো দলের লোক যেন চাঁদাবাজি, দখলবাজিতে জড়িয়ে না পড়ে, সেদিকে নজর রাখতে হবে।
জামায়াতে ইসলামী-ছাত্রশিবিরের লোকেরা সারা দেশে সৎ, যোগ্য, চাঁদাবাজহীন সমাজ কায়েমের কাজ করে যাচ্ছেন। সারা দেশে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদরাসা, হাসপাতাল, ব্যাংক-বীমাসহ হাজারো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে চাঁদাবাজ, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ কায়েমের নমুনা পেশ করেছেন। দেশটাকে তারা সততা ও যোগ্যতার সাথে চালাতে পারবেন, ইনশাআল্লাহ।
তাই সততা-যোগ্যতার প্রতিযোগিতা দিয়েই মানুষের মন জয় করে জনগণকে সেবা দিতে হবে। পরমতসহিষ্ণু হয়েই জনগণের কাছে যেতে হবে। জনগণ যাকে ইচ্ছা ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি বানাতে পারবে এমন পরিবেশ আমরা তৈরি করতে চাই।
প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস চীন সফরে গেছেন। আমরা আশা করি, তিস্তা প্রকল্পসহ দেশের উন্নতির জন্য বেশকিছু প্রকল্প নেয়া হবে। আমরা দেশের ভালোর জন্য সব দেশের সাথেই ভালো সম্পর্ক রাখতে চাই। কিন্তু কারো প্রভুত্ব মেনে নিতে চাই না। যেমন শেখ হাসিনা মোদির প্রভুত্ব মেনে দেশকে ফতুর করে পালিয়েছেন। ভারতকে তিনি এত দিয়েছেন যে, তারই কথা হলো ভারত সারা জীবন মনে রাখবে। আমাদের পানির অভাব, তার মধ্যেও ফেনী নদীর পানি ভারতকে দিয়েছে ভারতের উন্নয়নের জন্য।
দেশের সব বিভাগ ও ক্ষেত্র থেকে দালালমুক্ত প্রশাসন চাই। নিচ থেকে শুরু করে ওপর পর্যন্ত সব জায়গা থেকে পতিত সরকারের সবাইকে সরাতে হবে। সব জায়গায় সৎ ও যোগ্য দেশপ্রেমিক লোক নিয়োগ দিতে হবে। যাতে তারা দেশের জনগণের সেবা করতে পারে।
যারা মনে করেন, পতিত সরকার আবার দেশে ফিরতে পারবে, তারা বোকার স্বর্গে বাস করেন। পতিত সরকার কোনোদিন ফিরতে পারবে না। কারণ হাসিনার পিয়নও ৪০০ কোটি টাকার মালিক হয়েছে অবৈধ কামাই করে, যা শেখ হাসিনা নিজেই গর্বের সাথে প্রচার করেছেন।
রোজার মাস প্রায় শেষ। জাকাত দেয়ার মতো আয় থাকলে জাকাত দিয়ে দিতে হবে এ সওয়াবের মাসেই। মাস শেষে ঈদুল ফিতরের নামাজের আগেই বাড়ির সবার ফিতরা দিতে হবে। ঈদুল ফিতরের নামাজ মাঠে পড়লে উত্তম। এক পথে যাওয়া অন্য পথে এলে নবীর সুন্নত পালন হবে।
সবাই আমরা এ মোবারক মাসে নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, দেশের জন্য সমগ্র মুসলিম উম্মাহর গুনাহ মাফ ও উন্নতির জন্য মহান আল্লার কাছে দোয়া করব। আল্লাহ আমাদের এ জন্মভূমি বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত রাখুন। সকল বাধা-বিপত্তি উতরে এগিয়ে যাওয়ার তাওফিক দিন। আমীন।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।