মতিউর রহমান মল্লিক : স্মৃতি ও সম্পর্ক


২০ মার্চ ২০২৫ ১৫:০৮

॥ জাকির আবু জাফর ॥
রুহের জগৎ থেকেই ইহজগতে আসে মানুষ। ইহজগৎ মানে দুনিয়ার জগৎ। মানুষ পৃথিবী বলে নামেই ডাকে একে! হাদিসের ভাষায় রুহের জগৎ হলো- আলমে আরওয়াহ্। আর ইহজগৎ হলো- আলমে দুনিয়া। প্রতিটি মানুষের জন্য অপেক্ষা করে আরও দুটি জগৎ। একটি আলমে বারজাখ। অন্যটি আলমে আখেরাহ্।
আলমে আরওয়াহ্ তে যে সব রুহ পরস্পর সম্পর্কিত হয়, কাছাকাছি হয়। দুনিয়ার জীবনেও কাছাকাছি থাকবে তারা। আবার দুনিয়ার জীবনে যারা সম্পর্কিত আলমে আখিরাতে হিসাবের মাঠে, যাকে হাশর বলা হয়, একসাথেই উঠবে। শুধু আলমে বারজাখ এ একাকী থাকবে মানুষ।
আলমে আরওয়াহ রুহের সাথে রুহের সম্পর্ক নিয়ে বেশ আনন্দের কথা হতো মতিউর রহমান মল্লিকের সাথে। তিনি একজন কবি, বিশিষ্ট গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী। ছিলেন ছড়াকার ও সাংস্কৃতিক সংগঠক।
আমাদের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা ছিল গাঢ়। সম্পর্কের সেই সেতু ধরেই চলত বহুবিধ আলোচনা, আড্ডা, আসর আর একান্ত সংলাপ।
রুহের জগৎ থেকে জান্নাত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল আমাদের আলোচনার বিষয়। তিনি বলতেন, রুহের জগৎ থেকেই আমাদের যাত্রা শুরু। পৃথিবীতে সে যাত্রাই অবিরাম। অবিচ্ছেদ্য।
হেসে বলতাম- আমাদের সম্পর্ক প্রাচীনতম। শতাব্দী থেকে শতাব্দীর।
আহা সে সময়গুলো মনে পড়ে খুব। মনে পড়ে জীবনের কত পথ। কত বাঁক। কত মুহূর্তের অবারিত চিহ্ন। স্মৃতি কাতর হয়ে ওঠে মন। নিরেট স্বপ্নের মতো মনে হয় সব। ফেলে আসা পথগুলো ঘুমের ঘোরে দেখা স্বপ্নের মতো চিকচিক করে স্মৃতির ডেরায়। হারানো সময় কি আর ফেরে? না, ফেরে না। কারোর জীবনেই না। কখনো না। সময়ের মোচনীয় অথবা অমোচনীয় দাগ, যা রেখে চলে যায় সে। যায় তো চিরদিনের দিকে। চিরতরে। পৃথিবী থেকে বিদায় নিলে মানুও আর ফেরে না। একটি মানুষের কর্ম আর কিছু স্মৃতি ছাড়া কিছুই থাকে না। সময়ের লবণখনিতে নিঃশেষ হয় সবই। তবুও মানুষ স্মৃতি হাতড়ায়। খোঁজে স্মৃতির ভেতর জীবনের কিছু গান। কিছু সুর। কিছু ছন্দ। কিছু তাল লয়। যিনি চলে যান তাকে ঘিরে জেগে ওঠে এমনই কিছু চিহ্ন। মল্লিক ভাইকে ঘিরে যেমন জেগেছে।
মতিউর রহমান মল্লিক নামটির একটি শব্দ আমাদের খুব সহজ হয়ে উঠল। আমার এবং আমাদের- শব্দটিÑ মল্লিক। সঙ্গে ভাই শব্দটি যোগ হয়ে মল্লিক ভাই হয়ে গেলো। সবার ভাই তিনি। সকলের মল্লিক ভাই। মুরুব্বি এবং আত্মীয়তার কিছু সম্পর্ক বাদ দিলে ‘ মল্লিক ভাই’ বলেই তার ডাক ছিল।
মল্লিক ভাই শব্দটি বছরের পর বছর উচ্চারণ করেছি। কতবার? শত হাজার? লক্ষ? নাকি লক্ষ লক্ষ বার? শেষের সংখ্যাটিই যুতসই হবে বলে মনে করি। কেননা কারণে ডেকেছি যেমন, অকারণেও কম ডাকিনি। সিরিয়াস হয়ে যেমন, সহজ হয়েও তেমনই। আবেগ আনন্দ থেকেও কম যায়নি।
আমাদের সময়গুলো ছিলো অনন্য। কখনো ব্যক্তিগত আলোচনা। আমার অথবা তার। অথবা দুজনেরই। কখনো প্রাতিষ্ঠানিক। কখনো অফিসিয়াল। কখনো কখনো অনুষ্ঠান অথবা আনুষ্ঠানিক বিষয়াবলি। আবার কখনো নিরেট আড্ডা। এভাবে মনের খেয়ালে উঠে আসা বিষয়ও ছিলো আমাদের কথার মালায়। অফিসে কাটানোর মুহূর্তগুলোও আমাদের অন্যরকম আনন্দের হয়ে উঠত। অফিস অর্থাৎ বাংলাদেশ সংস্কৃতি কেন্দ্র। তিনি নির্বাহী পরিচালক। আমি গবেষণা কর্মকর্তা। প্রতিটি দিনের দীর্ঘতা এখানেই কেটেছে আমাদের। সকাল ১১টা থেকে রাত অব্দি চলত আমাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজ। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের চোখগুলোকে উজ্জ্বল করে তোলার কাজ ছিলো আমাদের। আমাদের সামনে ছিলো বাংলাদেশ, বাংলাদেশের বিশ্বাসী মানুষের সাহিত্য ও সংস্কৃতির উত্তম আয়োজন।
বিশেষ করে জোহরের নামাজের বিরতির বিষয়টি ছিলো একদম আলাদা। মল্লিক ভাই অজু করার জন্য ঢুকতেন ওয়াশরুমে। দীর্ঘসময় পর বেরিয়ে আসতেন। যখন বেরোতেন তো হাসতে হাসতে বেরোতেন। তাকিয়ে দেখতাম গায়ের পাজামা-পাঞ্জাবির প্রায় অর্ধেক কিংবা তারও বেশি অংশ ভিজে যবুথবু। কিন্তু এ নিয়ে কোনো ভাবান্তর ছিলো না তাঁর। বরং তিনি হাসতে হাসতে বলতেন, বাথরুমে গেলে মাথা খুলে যায়! আজ এ চিন্তাটি এলো মাথায়। এভাবে একেকদিন একেক বিষয়ের পরিকল্পনার কথা বলতেন। একেক ধরনের চিন্তার কথা বলতেন। আবার কখনো খুব গম্ভীর ভাব নিয়ে বেরোতেন। হয়তো কোনো চিন্তার সমাপ্তি হয়নি বলে এমন হতো।
পাজামা-পাঞ্জাবির ভিজে যাওয়া প্রসঙ্গ তুলতেই বলতেন- পোশাকের কি তৃষ্ণা নেই? একটুখানি পানি খাওয়ালাম। কোনো কোনোদিন বলতেন, আজ জামাও অজু করেছে। তারপর হাসি। প্রাণখোলা হাসি। সে হাসিতে যোগ দিতেন উপস্থিত সকলেই।
নামাজ হতো। ইমামতি করতেন মল্লিক ভাই। কখনো কখনো শিশু সংগঠক হাসান মুর্তজা ভাই। মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করতেন শিল্পী মালিক আবদুল লতিফ। কবি আফসার নিজামও ছিলেন মুসল্লিদের মধ্যে।
নামাজ শেষে খাওয়ার পালা। নিচে বসেই খেতাম আমরা। একসাথে। খেতে খেতেও গল্পের আসর ফুরাতো না। কোনো কোনোদিন খাওয়ার সময় মেহমান হাজির হয়ে যেতেন। যেই আসুক উদার আমন্ত্রণ জানিয়ে তাকে খেতে আহ্বান করতেন মল্লিক ভাই।
বিকেলটা আরও জমজমাট হয়ে উঠত। বাংলাদেশ সংস্কৃতি কেন্দ্র। যার পোশাকি নাম ছিলো- প্রত্যাশা প্রাঙ্গণ। গজনবী রোড। মোহাম্মদপুর। এখানে বিকেল নামতো প্রায়ই নামিদামি মুখগুলোর আগমনী ধ্বনির সঙ্গে। এমন গুণিজনদের মধ্যে উল্লেখ্য হলেন- মনীষী সৈয়দ আলী আহসান, কবি আল মাহমুদ, ডক্টর আসকার ইবনে শাইখ, নাট্যশিল্পী ওবায়দুল হক সরকার, অভিনেতা আরিফুল হক, চিত্র পরিচালক হাফিজ উদ্দিন, চিত্র পরিচালক খলিলুল্লাহ খান, শিল্পী আন্জুমান আরা বেগম, প্রফেসর ড. আফতাব আহমাদ, প্রফেসর ড. আবদুর রবসহ বেশকিছু খ্যাতিমান মুখ। কবিদের অনেকেই আসতেন এখানে। কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ, কবি আফজাল চৌধুরী, কবি সাজজাদ হোসাইন খান, কবি আবদুল হাই শিকদার, কবি সোলায়মান আহসান, কবি হাসান আলীমসহ অনেক তরুণ কবিদের ভিড় ছিলো এখানে। শিল্পী খালিদ হোসেন, শিল্পী সাইফুল্লাহ মানছুর, শিল্পী তারিক মুনাওয়ার, শিল্পী আবুল কাসেমসহ আসতেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নবীন-তরুণ শিল্পীরা। এদের সবার সাথে মল্লিক ভাইয়ের ছিলো অন্তরঙ্গতা। ছিলো আনন্দময় সম্পর্ক। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও প্রশিক্ষণ কর্মশালায় এমনই বিখ্যাতদের যাতায়াত ছিলো প্রায় নিয়মিত।
এসব গুণীদের একেক জনের একেক বৈশিষ্ট্য। যে যার মতো আলাদা। কিন্তু আড্ডায় যেন সকলেই এক প্রাণ! একরূপ। একমুখী। একই আনন্দের সঙ্গী। মল্লিক ভাই এবং আমাদের নিত্য আড্ডার এমনই ছিলো বৈশিষ্ট্য।
প্রথম সাক্ষাতের মুহূর্তটি জ্বলজ্বলে এখনো। সালটি ঠিক মনে নেই। কোনো এক শেষ বিকেলের ঘটনা। মগবাজার ওয়্যারলেস থেকে আগবাড়িয়ে। রাস্তায় হঠাৎ দেখা। সালাম বিনিময় হলো। বললাম, মল্লিক ভাই দূর থেকে চিনি আপনাকে। ভালোও বাসি।
স্বভাব ভঙ্গিতে মুচকি হাসলেন। বললেন, এখন কাছে থেকে দেখলে। এ দেখায় যদি ভালোবাসা আরও খানিক বেড়ে যায় তো মন্দ কি! মন খুলে হাসার দরজা খুলে গেলো আমাদের। সেই থেকে আর কখনো বন্ধ হয়নি সে দরজা।
বরং সময় গড়িয়েছে যতো খুলে গেছে আরও আরও নতুন দরজা। সে দরজাগুলোর কত ধরন। কত রকমফের! কত ঘনিষ্ঠ সময় ছুঁয়ে গেছে আমাদের! কত স্বপ্নের কথকতা সাজিয়েছি চুপিসারে। স্ব রবে। নীরবে। নিত্য এবং নিয়ত। একসাথে চলার এক দীর্ঘ পথ আছে আমাদের। দীর্ঘ স্মৃতি আছে। আছে জীবন সংক্রান্ত নানাবিধ সরল গরল দৃষ্টির শিখা।
কিশোরকালেই স্বপ্ন বেঁধেছিলো আমার বুকের ভেতর। স্বপ্নটি কবিতার। স্বপ্নটি গানের। স্বপ্নটি সুরও ছন্দের! বেড়ে উঠছিলাম সময়ের সাথে। একটি অজগাঁ আমার। যেখানে অবারিত আকাশ আর সবুজের হাতছানি। বুনোহাঁস বুনো পাখি আর বনানীর সমাহার। একদিকে লতাপাতা আর বৃক্ষের সারি; অন্যদিকে খোলা চর। চরের পাঁজর ঘেঁষে স্রোতবাহী ফেনী নদী। নদীর ওপরে কিছু দূরেই পাহাড়। প্রতিদিন সকালের সূর্যটি পাহাড়ের ওপার থেকে উঠে আসত। সূর্যের লালাভ জ্যোতির রেখা ছড়িয়ে যেত নদীর ঢেউয়ে। তারপর চরের বিশাল বুকে নরম রোদের খেলা। তারপরই আমাদের সবুজ গাঁয়ের ওপর রোদের আনন্দ ছড়াতো। আহা কী চমৎকার ছিলো সেইসব দৃশ্য!
আনন্দে পাখিরা গেয়ে উঠত। পাখির গানে উড়াল দিত মন। ভাবতাম এমন করে পাখির মতো গাইতে যদি পারি!
পাখির গান শুনতে কেন এত ভালো লাগত এখন বুঝি! বুঝি কেন বাতাস ও বৃষ্টির ছন্দ নেচে উঠত আমার গভীরে! কবিতার ছন্দের সাথে দেখা হবার পর আরও পরিষ্কার হলো বিষয়টি।
একটি সন্ধ্যার কথা বলি। সন্ধ্যাটি নেমেছিলো আমাদের গ্রামে। নিঝুম পাড়ায়। সন্ধ্যা ঠিক সন্ধ্যা নয়! রাত হয়ে গেছে প্রায়। রাতটি ছিলো ঈদুল আজহার রাত। কিশোর আমি। ঈদের আনন্দে মন উথাল-পাতাল। আকাশে চাঁদ বেশ বড় হয়ে উঠেছে। চাঁদের জোছনা আমার শৈশব থেকেই অতি প্রিয়। আমি একাকীই চাঁদের আলোয় ডুবে থাকতাম। চাঁদের আলোয় পুঁথি পড়েছি কতো!
ঈদুল আজহার সেই সন্ধ্যা- রাত্রির বহরে একা আমি বাড়ির সামনে। হঠাৎ পাশের বাড়ি থেকে টেপ রেকর্ডারে বেজে উঠলো গান। তখন একটি অজপাড়া গাঁয়ে টেপ রেকর্ডার বেশ দুর্লভ। এমন দুর্লভ জিনিসটি যখন নিঃশব্দ রাতে বেজে ওঠে, তার আবেদন খানিকটা ভিন্ন হবারই কথা। তো বেজে উঠল গান। কিন্তু গানগুলো আর দশটি পরিচিত গানের মতো নয়। একদমই আলাদা। গানের বাণী, সুর এবং গায়কী ঢং সবই অন্যরকম। গানে কোনো মিউজিক নেই। খালি গলা। অনেক কণ্ঠ একসাথে। যাকে বলে যৌথ কণ্ঠ। আবার একক কণ্ঠের গানও ছিলো দু-চারটি।
আমি বেশ মনোযোগ দিলাম। গানগুলো একটির পর একটি বেজে যাচ্ছিলো।
লাগোয়া বাড়ি হলেও কিছুটা দূরত্ব আছে বৈকি। কিন্তু ঠাণ্ডা রাত বলে কথা। হেমন্তের শেষাশেষি! গ্রাম মানেই নিঝুম নীরবতা! সেই নীরবতায় ডুবে থাকার গভীর মর্ম আমার গভীরে আঁকা। এমন নীরবতায় নতুন বাণী ও সুরের যৌথকণ্ঠ আপ্লুত করলো আমাকে।
গান বাজাচ্ছিলেন যিনি, একজন ব্যবসায়ী। ছিলেন বিদেশে। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো একটি দেশে। আসার সময় সে দেশ থেকে টেপ রেকর্ডারটি এনেছিলেন। ফিরে আর যাননি। ফলে সোনাগাজীতে একটি খাবার হোটেল দিলেন। তিনি ঠিক তার ঘরের ভেতরে বাজাচ্ছিলেন না। ঘরের ঢেলায় রেখে বেশ বড় আওয়াজে বাজাচ্ছিলেন। রাত্রির নৈশব্দ ভেদ করে গানের সুর পৌঁছে যাচ্ছিলো আমার কুহরে।
আমার কানে প্রবেশ করলো একটি গান-
মুসলিম আমি সংগ্রামী আমি /
আমি চির-রণ-বীর/
আল্লাহকে ছাড়া কাউকে মানি না/
নারায়ে তাকবির /
নারায়ে তাকবির॥
যৌথকণ্ঠে গানটি আমার ভেতর পৃথিবীতে তোলপাড় তুলে দিলো। আমি কান পেতে থাকি। শুনি তার সুরের গুঞ্জন। কথা ও বাণীর নিঃসংকোচ উচ্চারণ!
আরও একটি গান-
ইনকিলাবের অস্ত্র মোদের/
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ/
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।
এ দুটি গানের বাণীর দৃঢতা এবং উচ্চারণ আমাকে ভাবাতে থাকলো বার বার।
কত ইচ্ছে জাগে একটি কিশোর মনে। জাগলো তখন- কে এসব গানের লেখক?
শিল্পীদের আগে গান রচয়িতার মুখ খুঁজতে থাকলো আমার মন। কেবলি মনে হচ্ছিল- ইস যদি এ গানের লেখকের সাথে দেখা হতো! যদি পরিচয় হতো! কিন্তু কি করে? আমি যে অজগাঁয়ের কিশোর। কি করে দেখা হবে রাজধানীর একজন লেখকের সাথে। তখন কি জানতাম ইটপাথরের এ রাজধানীর আমিও হবো একজন। আমিও ছন্দে গন্ধে জড়িয়ে যাবো গান কবিতার উৎসবে! যাই হোক, আমার ইচ্ছে জাগলো, জানতে হবে কে এ গানের লেখক। তারপর না হয় শিল্পীদের কথা ভাবা যাবে।
যিনি গান বাজিয়েছেন তাকে জিজ্ঞেস করলে হয়তো বলতে পারবেন। পরদিনই ঈদের মাঠে দেখা লোকটির সাথে। কোলাকুলির মুহূর্তেই জিজ্ঞেস করলাম- গানগুলোর লেখক কে?
তিনি আমতা আমতা জবাব দিলেন কি যেন মল্লিক। পুরো নামটি স্মৃতি খুঁজে বলতে পারেননি তিনি। কিন্তু মল্লিক নামটি বললেন ঠিক ঠিক। আমার মনেও গেঁথে গেলো মল্লিক!
সেই মল্লিকের সাথে এতটা ঘনিষ্ঠ হবো জানতাম কি আমি!
গীতিকার হিসেবে একজন বড় মাপের গীতিকার মতিউর রহমান মল্লিক। সুরকার এবং শিল্পী হিসেবেও তিনি বেশ উঁচুতে। কবি হিসেবেও তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ। আদর্শ এবং বিশ্বাসের জায়গায় দাঁড়িয়ে তিনি নিজেকে দেখেছেন গভীর ভাবে। বুঝেছেন জীবনের সমাপ্তি পৃথিবীতে নয়। বুঝেছেন পৃথিবী পেরিয়ে মানুষ প্রবেশ করে নতুন জীবনে। এমনই দূরদৃষ্টির সান্নিধ্য থেকে চিহ্নিত করেছেন জীবনের সব।
একইভাবে দেখেছেন মানুষকে। দেখেছেন সমাজ ও দেশকে। তাঁর কাছে ইহকাল এবং পরকালের জীবন ছিলো স্বচ্ছ। জীবনের কোনো গানই বৃথা যায় না। যেতে পারে না। পারে না বলেই কোনো কোনো মানুষ পৃথিবীতে বিনিময় চায় না সব কাজের। ফলে অকাতর ত্যাগ করেন এমন মানুষ। ত্যাগের দৃষ্টান্তে অন্যতম একজন কবি মতিউর রহমান মল্লিক।
নিজেকে লুকিয়ে রাখার প্রবণতা ছিলো তাঁর। যখন তখন নিজেকে প্রকাশ করার মন ছিলোই না। কিংবা ছিলো না যে কারো কাছে সহজে নিজেকে খোলার ইচ্ছে। অকারণ প্রকাশ করার বাহানাও ছিলো না মোটেই।
কখনো উচ্চকণ্ঠ ছিলেন না। নীরব ও নিভৃতির সঙ্গী ছিলেন তিনি। নিষণ্ন পাখির নীড়ের মতোই ছিলো তার ভেতর জগৎ। ছিলেন নির্লোভ। নিরহংকার। নিঃস্বার্থ। কিন্তু কবির অহংবোধ ছিলো বেজায় টনটনে। মর্যাদায় ঘাটতি হলে সহসা ঘুরিয়ে নিতেন মুখ। যার সাথে হবে না, দূরে থাকতেন তাঁর থেকে।
হজম করতেন নিজের দুঃখগুলো। কষ্ট লুকিয়ে রাখতেন বুকের বিবরে। বেদনা চেপে রাখার ছিলো দুরন্ত সাহস। নিজের অভিজ্ঞতাকে শিক্ষক মানতেন।
হঠাৎ আনমনা হওয়া একজন কবির খুব স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। তিনিও হতেন। হতেন তো কথা বলতে বলতেই। উপস্থিত থেকেও না থাকা অথবা হারিয়ে যাওয়া দূরে কোথাও- খুব ইচ্ছে হতো তার।
কি বিচিত্র এবং বৈচিত্র্য মানুষের জীবন। ভাবি রোজ। ভাবি জীবন মানুষকে টানে। নাকি মানুষ জীবনকে টানে। হয় তো দুটো দুটোকেই টানে। এ টানাটানির ভেতর মানুষ রেখে যায় তার কর্মের দাগ। মতিউর রহমান মল্লিক, আমাদের মল্লিক ভাইও রেখে গেছেন তাঁর সৃষ্টি সম্ভার। গান ও কবিতার শব্দগুলো বেজে যাবে অহর্নিশ। বাজবে তাঁর সত্যনিষ্ঠ সুরের ধ্বনি।
লেখক : কবি।